অপরিচিত স্বামীর উষ্ণ স্পর্শ

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নামার ঠিক আগ মুহূর্তের আলোটা শহরের বড় বড় জানালার কাচে এসে আছড়ে পড়ে এক অদ্ভুত সোনালী মায়া তৈরি করে। কিন্তু লাবণ্যের এই বিশাল অ্যাপার্টমেন্টের ড্রয়িংরুমে সেই আলোর কোনো উষ্ণতা ছিল না। ঘরটা যেন কেমন থমথমে, ভারী এক নিস্তব্ধতায় মোড়ানো। ডাইনিং টেবিলের ওপর সাজানো রয়েছে রাতের খাবার, কিন্তু কেউ তাতে হাত দেয়নি। গত ছয় মাস ধরে এই বাড়িতে এটাই নিত্যদিনের রুটিন। হঠাৎ করেই যেন একটা ঝড়ের মতো তাদের বিয়েটা হয়েছিল। পরিবারের বড়দের সিদ্ধান্ত, সামাজিক চাপ আর কিছু বাধ্যবাধকতার স্রোতে ভেসে লাবণ্য আর রায়ান এক ছাদের নিচে এসে দাঁড়িয়েছিল।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

রায়ানের মুখটা এখনও লাবণ্যের চোখের সামনে স্পষ্ট ভেসে ওঠে। বিয়ের পর প্রথম রাতে রায়ান তার সামনে এসে খুব স্পষ্ট, কঠিন গলায় জানিয়ে দিয়েছিল, এই সম্পর্কটা সে মন থেকে মেনে নেয়নি। কোনো জোর জবরদস্তি বা আবেগের জায়গা এখানে নেই, তাই লাবণ্য যেন তার কাছ থেকে কোনো ধরনের স্বামীসুলভ অধিকার বা ভালোবাসার আশা না করে। কথাটা শোনার পর লাবণ্য সেদিন পাথর হয়ে গিয়েছিল। একটা মেয়ে যখন নতুন সব স্বপ্ন বুক বেঁধে শ্বশুরবাড়িতে পা রাখে, তখন তার প্রথম আঘাতটা কেমন হতে পারে, তা শুধু সেই মুহূর্তে লাবণ্যই বুঝেছিল।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

তবে লাবণ্য ভেঙে পড়ার মেয়ে ছিল না। নিজের আত্মসম্মানকে পুঁজি করে সে ধীরে ধীরে রায়ানের জগত থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। এই বিশাল বাড়িতে সে নিজের একটা আলাদা দুনিয়া তৈরি করে ফেলে। সকালে রায়ান অফিসে চলে যাওয়ার পর লাবণ্য নিজের মতো করে সময় কাটায়। বারান্দার গ্রিলে ঝুলে থাকা অর্কিডগুলোর যত্ন নেওয়া, বই পড়া, নিজের পছন্দমতো ঘর সাজানো—এসবের মাধ্যমেই সে তার একাকীত্বকে মানিয়ে নিয়েছিল। রায়ানের সাথে তার কথা হতো কেবল প্রয়োজনমতো, তাও খুব সংক্ষিপ্ত এবং মেপে মেপে।

 

আজ রায়ানের অফিসে একটু দেরি হওয়ার কথা। লাবণ্য নিজের রুমে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। বৃষ্টিভেজা রাজপথের নিয়ন আলো আর গাড়ির লাল-নীল বাতিগুলো এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা ছড়াচ্ছে। ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমের ভারী দরজা খোলার শব্দ হলো। রায়ান ফিরল। তার ক্লান্ত শরীরের ভাষা আর চোখে মুখে একরাশ ক্লান্তি স্পষ্ট। সে কোটের বোতামগুলো খুলতে খুলতে ডাইনিংরুমের দিকে এগিয়ে গেল।

 

লাবণ্য রুম থেকে বেরিয়ে এসে শান্ত গলায় বলল, "খাবারটা টেবিল ঢাকা আছে, গরম করে দেব?"

 

রায়ান শীতল দৃষ্টিতে লাবণ্যের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে না ছিল কোনো রাগ, না ছিল কোনো অনুরাগ—কেবল এক অদ্ভুত উদাসীনতা। সে শুধু মাথা নেড়ে বলল, "না, দরকার নেই। আমার খিদে নেই। তুমি খেয়ে নাও।"

 

রায়ান তার শোবার ঘরের দিকে চলে গেল। লাবণ্য এক মুহূর্ত তার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই মানুষটার সাথেই সে একটা পুরো জীবন কাটানোর চুক্তি সই করেছে কাগজে-কলমে, কিন্তু বাস্তবতায় তাদের মাঝে রয়েছে আকাশ-পাতাল দূরত্ব।

 

পরদিন সকালের রোদ বেশ কড়াভাবে জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরে ঢুসল। রায়ানের উইকেন্ডের ছুটি ছিল আজ। সাধারণত ছুটির দিনগুলোতে রায়ান তার স্টাডি রুমে ল্যাপটপ নিয়ে বসে থাকে কিংবা বন্ধুদের সাথে বাইরে চলে যায়। আজ সে লিভিং রুমে বসে কফি খাচ্ছিল। লাবণ্য রান্নাঘর থেকে চা নিয়ে আসার সময় হঠাৎ রায়ানের ল্যাপটপটা টেবিল থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। রায়ান হাত বাড়িয়ে সেটা সামলে নেওয়ার চেষ্টা করতেই তার কফি কাপটা উল্টে গিয়ে তার শার্টের ওপর কিছুটা পড়ে গেল।

 

"ইশ!" রায়ান বিরক্ত হয়ে নিজের শার্টের কলারটা টানল।

 

লাবণ্য দেরি না করে এক মুহূর্তের জন্যও দ্বিধা না করে দ্রুত এগিয়ে এল। তার হাতে থাকা নরম সুতির তোয়ালে দিয়ে সে রায়ানের শার্টের ভিজে যাওয়া অংশটা মুছতে শুরু করল। ঠিক এই মুহূর্তেই ঘটে গেল এক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন। লাবণ্য যখন রায়ানের খুব কাছাকাছি ঝুঁকে কাজটা করছিল, তখন রায়ানের নাকে এসে লাগল লাবণ্যের চুলে থাকা বেলি ফুলের মৃদু সুবাস আর তার গায়ের সুগন্ধির মাদকতা। রায়ানের চোখ দুটো আপনাআপনি লাবণ্যের মুখের ওপর স্থির হলো।

 

লাবণ্যের চোখের পলকগুলো কাঁপছিল। সে কিঞ্চিৎ অস্বস্তি বোধ করে সরে যাওয়ার চেষ্টা করতেই রায়ান হঠাৎ তার ডান হাতটা বাড়িয়ে লাবণ্যের কোমরের নরম জায়গায় আলতো করে ধরে ফেলল। সেই স্পর্শটা ছিল হঠাৎ, কিন্তু তার মধ্যে কোনো রুক্ষতা ছিল না—বরং ছিল এক অদ্ভুত গভীর টান। রায়ানের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এল। সে লাবণ্যের মুখের আরও কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, "তুমি এত দূরে সরে থাকো কেন, লাবণ্য?"

 

লাবণ্যের হৃদস্পন্দন তখন যেন বাঁধ মানছিল না। রায়ানের চোখের গভীরে সে এক অচেনা মোহ দেখল, যা এতদিন কেবল বরফের মতো শীতল ছিল। আজ সেই বরফ যেন গলতে শুরু করেছে। রায়ানের গরম নিঃশ্বাস লাবণ্যের গালের চামড়ায় ছুঁয়ে যাচ্ছিল, যা তার শরীরের প্রতিটা রক্তকণিকায় এক নতুন উষ্ণতা ছড়িয়ে দিচ্ছিল। লাবণ্য নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার শেষ চেষ্টা করেও যেন আটকে গেল। রায়ানের হাতের আঙুলগুলো তার কোমরকে আরও একটু শক্ত করে নিজের কাছে টেনে নিল। ঘরের ভেতরের বাতাস যেন ভারী হয়ে এল, আর তাদের দু'জনের দূরত্বটুকু নিমেষেই মিলিয়ে গেল।

সেই সকালের পর থেকে রায়ানের বাড়ির বাতাস যেন বদলে গিয়েছিল। দু'জনের মাঝে যে অদৃশ্য বরফ প্রাচীর এতদিন দাঁড়িয়ে ছিল, তা আজ এক অদ্ভুত উত্তাপে ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। লাবণ্য লক্ষ্য করল, রায়ান আগের মতো আর তাকে এড়িয়ে চলে না। বরং অফিসে যাওয়ার সময় বা রাতে ফেরার পর তার চোখের ভাষা অনেক বেশি কথা বলে। কিন্তু তাদের এই সম্পর্কের মাঝে তখনও একটা লুকোচুরি খেলা চলছিল—কেউ কাউকে সরাসরি কিছু বলছিল না, অথচ দু'জনেই অনুভব করছিল এক তীব্র অদৃশ্য আকর্ষণ।

 

সেদিন রাতে হাড়কাঁপানো বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। শহরের রাস্তায় জল জমে যাওয়ার কারণে রায়ান অফিস থেকে ফিরতে বেশ রাত করেছিল। যখন সে ঘরে প্রবেশ করল, তখন তার পুরো শরীর বৃষ্টির জলে কিছুটা ভেজা। লাবণ্য বসার ঘরে প্রদীপ জ্বেলে একটা বই পড়ছিল। রায়ানের আসার শব্দ শুনে সে দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে তার দিকে এগিয়ে গেল।

 

"এত বৃষ্টিতে ভিজে এলে কেন? ছাতা ছিল না?" লাবণ্যের গলায় এক অজান্তে লুকিয়ে থাকা নিখাদ উদ্বেগ ঝরে পড়ল।

 

রায়ান মৃদু হাসল। সেই হাসিতে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল এক ক্লান্ত অথচ গভীর তৃপ্তি। সে নিজের ওভারকোটটা খুলতে খুলতে বলল, "রাস্তায় জ্যামের কারণে ক্যাব ছাড়ে না, তাই কিছুটা পথ হেঁটে আসতে হয়েছে।"

 

লাবণ্য আর কোনো কথা না বাড়িয়ে বাথরুম থেকে একটা বড় নরম তোয়ালে নিয়ে এল। সে নিজে হাতে রায়ানের মাথা আর চুলগুলো মুছে দিতে লাগল। রায়ানের উচ্চতা লাবণ্যের চেয়ে অনেকটাই বেশি, তাই তাকে একটু উঁচুতে হাত তুলে কাজটা করতে হচ্ছিল। মুছতে মুছতে হঠাৎ লাবণ্যের হাতটা রায়ানের চওড়া কাঁধে এসে আটকে গেল।

 

রায়ান এক পা এগিয়ে এসে লাবণ্যের আরও কাছাকাছি দাঁড়াল। ঘরের নরম আলোয় রায়ানের গভীর চোখ দুটো লাবণ্যের চোখের ওপর স্থির হলো। রায়ানের শরীরের অবিন্যস্ত সুবাস আর বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ মিলে এক মোহময় পরিবেশ তৈরি করেছিল। রায়ান তার একটা হাত বাড়িয়ে লাবণ্যের চিবুকটা আলতো করে ধরে ওপরে তুলল।

 

"তুমি আমার এত যত্ন কেন করো, লাবণ্য?" রায়ানের গলাটা বেশ নিচু, কিন্তু তাতে এক ধরনের আকুলতা ছিল।

 

লাবণ্যের বুক তখন দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছিল। সে চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, "এটা... এটা আমার দায়িত্ব।"

 

"দায়িত্ব?" রায়ান মৃদু হেসে বলল, "না, এটা শুধু দায়িত্ব নয়। এর বাইরেও অনেক কিছু আছে, যা তুমি মানতে চাও না।"

 

কথাটা শেষ করেই রায়ান আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। সে তার দুই বাহু দিয়ে লাবণ্যকে একেবারে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরল। লাবণ্যের মুখটা রায়ানের শক্ত বুকের সাথে লেগে গেল। রায়ানের বুকের ভেতরকার হৃদস্পন্দনের শব্দ লাবণ্য পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছিল—সেটা বেশ দ্রুত এবং তীব্র ছিল। রায়ান তার ডান হাতটা লাবণ্যের পিঠের ওপর রেখে আস্তে আস্তে নামাতে নামাতে তার কোমর স্পর্শ করল। সেই স্পর্শে লাবণ্যের শরীর কেঁপে উঠল। এক শিহরণ তার মেরুদণ্ড বেয়ে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ল।

 

রায়ান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে লাবণ্যের চিবুকটা ধরে মুখটা একটু ওপরে তুলে তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট নামিয়ে আনল। সেই প্রথম গভীর চুম্বনটা ছিল ঝড়ের মতো আকস্মিক, অথচ অসম্ভব সুমিষ্ট। লাবণ্য প্রথমে একটু চমকে গিয়ে রায়ানের কাঁধের জামাটা খামচে ধরেছিল, কিন্তু পরের মুহূর্তেই সে রায়ানের এই উষ্ণতার কাছে নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করে দিল। বাইরের ঝুমঝুম বৃষ্টির শব্দ আর ঘরের ভেতরের এই গোপন তীব্র রোমান্স তাদের চারপাশের পৃথিবীকে যেন থামিয়ে দিয়েছিল। রায়ানের হাতের বাঁধন আরও শক্ত হলো, যেন সে লাবণ্যকে নিজের অস্তিত্বের সাথে মিশিয়ে নিতে চায়। দীর্ঘক্ষণ পর যখন তারা দুজন নিজেদের থেকে মুখ সরিয়ে নিল, তখন দুজনেরই নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এসেছে। রায়ান লাবণ্যের কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে খুব স্নেহের সাথে ফিসফিস করে বলল, "আর দূরে সরে থেকো না, লাবণ্য।"

 

পরের দিন সকালবেলা রোদের মিষ্টি আলোয় চারদিক ঝলমল করছে। গত রাতের সেই ঘটনার পর আজ সকালের আবহাওয়াটা একেবারেই আলাদা। লাবণ্য রান্নাঘরে কফি তৈরি করছিল। রান্নাঘরের ছোট কাউন্টারটার সামনে দাঁড়িয়ে সে যখন কাপে কফি ঢালছিল, তখন পেছন থেকে এক জোড়া শক্ত বাহু তাকে ঘিরে ধরল। রায়ানের চিবুক লাবণ্যের কাঁধে ছোঁয়া লাগতেই লাবণ্যের হাত থেকে কফির কাপটা সামান্য কেঁপে উঠল।

 

"সকালে একা একা কফি খাচ্ছ যে বড়?" রায়ানের গলাটা ঘুমজড়ানো অথচ বেশ গভীর।

 

লাবণ্য লজ্জা রাঙা মুখে হাসল। সে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই রায়ান তাকে আরও শক্ত করে নিজের আলিঙ্গনে আটকে ফেলল। রান্নাঘরের এই নিভৃতে দুজনের মাঝে তৈরি হলো এক গভীর অন্তরঙ্গ মুহূর্ত। রায়ান লাবণ্যের ঘাড়ের নরম ত্বকে নিজের নাক ঘষে হালকা চুমু খেল। লাবণ্যের মুখ থেকে একটা মৃদু দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। সে রায়ানের বাহুর বেড়াজালে নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। রায়ানের হাতের উষ্ণ আঙুলগুলো লাবণ্যের কোমর থেকে ওপরে উঠে তার পিঠের ওপর আলতো করে বুলিয়ে দিচ্ছিল, যা তাদের মধ্যকার সমস্ত দূরত্ব এবং অভিমানকে চিরতরে ধুয়ে মুছে সাফ করে দিয়েছিল।

বাইরে তখন শরৎকালের হালকা রোদ্দুর পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। গত কয়েকদিনের ঘটনার পর লাবণ্য ও রায়ানের সম্পর্কের রসায়ন পুরোপুরি বদলে গেছে। তাদের মাঝে যে অদৃশ্য দেয়াল বা দূরত্ব ছিল, তা আজ সম্পূর্ণ উবে গেছে। এখন তারা একে অপরের পরিপূরক। কিন্তু জীবনের আসল পরীক্ষা তো তখনই শুরু হয়, যখন সবকিছু ঠিকঠাক চলতে শুরু করে।

 

সেদিন বিকেলে রায়ানের অফিসের জরুরি এক মিটিংয়ে বাইরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই মিটিংটা ক্যানসেল হয়ে যাওয়ায় সে একটু আগেই বাড়ি ফিরে এল। লিভিং রুমে এসে সে দেখল, লাবণ্য হালকা নীল রঙের একটা সুন্দর শাড়ি পরে চুলগুলো খোলা রেখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে কিসের যেন একটা বই পড়ছে। রোদ এসে তার মুখের ওপর পড়েছে, যা তাকে এক অপরূপ লাবণ্যময় রূপ দিয়েছে।

 

রায়ান পা টিপে টিপে পেছনের দিক থেকে এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ লাবণ্যকে নিজের দুই বাহুর বেড়াজালে জড়িয়ে ধরল। লাবণ্য সামান্য চমকে গিয়ে হেসে উঠল।

 

"তুমি এত তাড়াতাড়ি ফিরে এলে যে?" লাবণ্য বইটা বন্ধ করে রায়ানের দিকে ঘুরে দাঁড়াল।

 

রায়ান লাবণ্যের চোখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, "মন টিকল না অফিসে। মনে হচ্ছিল, ঘরের কোণে আমার আসল জগতটা একা একা বসে আছে, সেখানে ফিরে যাওয়া দরকার।"

 

কথাগুলো শোনার পর লাবণ্যের বুকটা গর্ব ও ভালোবাসায় ভরে গেল। সে নিজের হাত দুটো রায়ানের গলায় জড়িয়ে ধরে মিষ্টি হেসে বলল, "তাহলে তো তোমার শাস্তি হওয়া উচিত, এভাবে কাজের মাঝখানে পালিয়ে আসার জন্য।"

 

"কী শাস্তি?" রায়ান দুষ্টু মিষ্টি হেসে লাবণ্যের মুখের আরও কাছে মুখ নিয়ে এল।

 

"শাস্তি হলো—আজ রাতের পুরো রান্নাটা তোমাকে করতে হবে!" লাবণ্য চোখ টিপে বলল।

 

"মঞ্জুর!" রায়ান এক মুহূর্তও দেরি না করে বলে উঠল।

 

রাত তখন গভীর। রান্নাঘরের নরম আলোয় শুরু হলো তাদের এক অন্যরকম খুনসুটি। রায়ান সত্যি সত্যিই হাত গুটিয়ে কড়াইতে মশলা কষাতে শুরু করল। লাবণ্য তার পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাকে সাহায্য করছিল। রান্নার ফাঁকে রায়ান হঠাৎ একহাতে লাবণ্যের কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে রান্নাঘরের ক্যাবিনেটের সাথে মিশিয়ে দিল। চারপাশটা নিস্তব্ধ, শুধু গ্যাসের চুলার মৃদু আওয়াজ আর তাদের দু'জনের ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ।

 

রায়ান তার মুখটা লাবণ্যের কানের কাছে নিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল, "রান্না তো অনেক হলো, এবার আসল কাজটা হোক।"

 

লাবণ্যের গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। সে কিছু বলার আগেই রায়ান তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট মিলিয়ে দিল। সেই চুম্বনটা ছিল আগের চেয়েও অনেক বেশি গভীর, অনেক বেশি আবেগময় ও মাদকতায় ভরপুর। রায়ানের হাতের উষ্ণতা লাবণ্যের সারা শরীরে এক ঝড়ের সৃষ্টি করল। লাবণ্য নিজের দু'হাতে রায়ানের চওড়া কাঁধ খামচে ধরে সেই গভীর ভালোবাসার সমুদ্রে নিজেকে ভাসিয়ে দিল। রান্নাঘরের সেই ছোট জায়গাটুকু তখন তাদের কাছে সারা পৃথিবীর চেয়েও বেশি সুন্দর ও আপন হয়ে উঠেছে।

 

পরের দিন সকালে ঘুম ভাঙার পর রায়ান যখন চোখ মেলল, তখন সে দেখল লাবণ্য তার পাশেই শুয়ে আছে, আর তার চুলে রোদের আলো এসে পড়েছে। রায়ান আলতো করে হাত বাড়িয়ে লাবণ্যের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। লাবণ্য চোখ মেলে মুচকি হাসল। রায়ান তার কপালে খুব যত্নের সাথে একটা ভালোবাসার চুমু এঁকে দিয়ে বলল, "লাবণ্য, আর কখনো তোমাকে আমার কাছ থেকে দূরে সরতে দেব না। আমাদের এই গল্পটা আজ এক নতুন পূর্ণতা পেল।"

 

লাবণ্য রায়ানের বুকের ওপর মাথা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজল। সে বুঝতে পেরেছিল, তাদের এই হঠাৎ শুরু হওয়া অপরিচিত সম্পর্কটা আজ এক গভীর, চিরস্থায়ী ভালোবাসায় রূপ নিয়েছে।

....
👁 62