অবরুদ্ধ আবেগের মুক্তি মুহূর্ত

ইশতিয়াকের ঘরের কোনায় রাখা ভারী মেহগনি কাঠের আলমারির পাল্লাটা অনেক দিন ধরেই একটু টেউ খেলানো। ঠিকমতো আঁটে না। মেহরুন বহুবার দেখেছে, সামান্য একটু টান লাগলে দরজাটা ফাঁক হয়ে বেরিয়ে আসে। সেদিন দুপুরের দিকে হুট করে দমকা হাওয়া দেওয়ায় সেই ফাঁকাটা আরও একটু চওড়া হয়ে গেল। আলমারির একদম নিচের তাকে, যেখানে ইশতিয়াক তার পুরানো ফাইলপত্র আর অব্যবহৃত খাতাগুলো গুছিয়ে রাখত, তার ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছিল লাল মলাটের একটা পুরোনো নোটবুক। খাতাটার পিঠের দিককার বাইন্ডিং খুলে গেছে, পাতাগুলো কিছুটা হলদেটে।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

মেহরুন সেদিকে তাকাল। তার মনে কোনো অতিরিক্ত কৌতূহল কাজ করল না। ইশতিয়াক এমন একজন মানুষ, যার আবেগের পরিধিটা সবসময় একটা দুর্ভেদ্য প্রাচীরের আড়ালে ঢাকা থাকে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, সে বুঝি অনুভূতিহীন কোনো পাথর। বিয়ের পর থেকেই মেহরুনের মনে একটা গভীর ক্ষতের মতো এই ধারণাটা গেঁথে গিয়েছিল যে, ইশতিয়াক তাকে এই সংসারের শুধু একজন দায়বদ্ধতা হিসেবেই দেখে, কোনো জীবনসঙ্গী হিসেবে নয়। ইশতিয়াকের শীতল দৃষ্টি, তার কম কথা বলা, আর ঘরের ভেতরে থেকেও যেন এক আকাশ দূরত্বের ব্যবধান তৈরি করে রাখা—সবকিছু মিলিয়ে মেহরুন নিজের ভেতরের সবটুকু অনুভূতিকে এক অদ্ভুত কুঁকড়ে থাকা শামুকের মতো গুটিয়ে রেখেছিল।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

হাত বাড়িয়ে খাতাটা তুলে নিল মেহরুন। পাতার ওপরে ইশতিয়াকের সেই চিরচেনা টানাটানি হাতের লেখা। একটু মোটা নিবের ফাউন্টেন পেন দিয়ে লেখা শুরু হয়েছে খাতাটা। পাতার প্রথম লাইনটার দিকে চোখ পড়তেই মেহরুনের বুকের ভেতরটা কেমন যেন এক মোচড়ে কেঁপে উঠল।

 

“আজ ওকে প্রথম দেখলাম এই ছাদের নিচে। কী এক অদ্ভুত টান ছিল ওর চোখের চাউনিতে। অথচ আমি ইচ্ছে করেই মুখ ফিরিয়ে নিলাম। ভয় হয়, যদি অতিরিক্ত ভালোবেসে ফেলি, তবে এই চার দেয়ালের গণ্ডিটুকু তাকে দমবন্ধ করে ফেলবে।”

 

মেহরুন শক্ত হয়ে বসে রইল খাটের কিনারে। খোলা জানাচার বাইরে তখন রোদের তেজ একটু কমে এসেছে, বিকেলের নরম ছায়া এসে পড়েছে ঘরের মেঝের ওপর। একটা একটা করে পাতা উল্টাতে লাগল সে। আর যত পাতা সে উল্টাচ্ছে, ততই যেন তার চোখের সামনে উন্মোচিত হতে শুরু করল এমন এক মানুষের অবয়ব, যাকে সে এতদিন সম্পূর্ণ ভুল বুঝেছিল।

 

ইশতিয়াকের ডায়েরির পাতাগুলো শুধু কিছু লেখার সমষ্টি ছিল না; সেগুলোর একেকটি লাইন যেন ছিল জমাট বাঁধা এক দীর্ঘশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। ইশতিয়াক লিখেছে, কেমন করে সে রাতের পর রাত জেগে মেহরুনের শাড়ির সুতোর ভাঁজে জমে থাকা ক্লান্তি দেখত, অথচ মুখে একটা প্রশংসার শব্দও উচ্চারণ করতে পারত না। সে লিখেছে নিজের অসহায়ত্বের কথা। সামাজিক কিছু বাধ্যবাধকতা আর নিজের অন্তরের সুপ্ত অহংকার কীভাবে তাকে দিন দিন আড়ষ্ট করে তুলছিল, তার নিখুঁত বিবরণ ছিল সেখানে। একটা জায়গায় লেখা ছিল—

 

“মেহরুন হয়তো ভাবে আমি বরফ। সে জানে না, এই বরফের তলায় কীভাবে একটা প্রমত্তা নদী উথালপাথাল করে বয়ে চলে। আজ ও রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে চা বানাচ্ছিল, আমার খুব ইচ্ছে করেছিল পিছন থেকে গিয়ে ওর ভেজা চুলে মুখ ডুবিয়ে দিই। কিন্তু পারিনি। নিজের ভেতরের এই পাথরটাকে ভাঙার ক্ষমতা আমার নেই।”

 

ডায়েরির এই লাইনগুলো পড়ার সময় মেহরুনের হাতের আঙুলগুলো কাঁপছিল। তার চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল উষ্ণ জলের ধারা। এতগুলো বছর সে যাকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় কারাগার বলে ভেবে এসেছে, সেই মানুষটাই আসলে নিজের ভেতর এক অবরুদ্ধ অন্ধকূপে নিজেকে বন্দি করে রেখেছিল। ইশতিয়াকের নীরবতা কোনো অবহেলা ছিল না, সেটা ছিল এক তীব্র ভালোবাসার আত্মহনন।

 

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। বাইরে থেকে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। ইশতিয়াক ফিরেছে অফিস থেকে। রোজকার মতো আজও সে কোটের বোতাম খুলতে খুলতে ঘরে প্রবেশ করল। কিন্তু আজ ঘরের পরিবেশটা অন্যরকম। মেহরুন আগের মতো চুপচাপ মুখ নিচু করে বসে নেই। তার কোলে খোলা সেই পুরোনো লাল মলাটের ডায়েরিটা।

 

ইশতিয়াক ঘরে ঢুকে মেহরুনের চোখের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে চিরদিনের সেই শীতলতা নেই, বরং পলকহীন এক আতঙ্ক আর চরম ধরা পড়ার কাঁচা লজ্জা স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠল। সে যেন নিমেষেই বুঝতে পেরেছে, তার বহু যত্নে পাহারা দেওয়া গোপন রাজত্ব আজ এই সন্ধ্যার আলোয় সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হয়ে গেছে।

 

মেহরুন ধীরে ধীরে শয্যা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার বুক তখন চরম উত্তেজনায় আর এক অদ্ভুত আবেগে কেঁপে কেঁপে উঠছে। দীর্ঘদিনের সেই দূরত্ব, সেই ভুল বোঝাবুঝির পাহাড় যেন চোখের পলকে গলে জল হয়ে গেছে। ইশতিয়াক কোনোরকম আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাওয়ার আগেই মেহরুন এগিয়ে গেল তার দিকে।

 

ঘরের মৃদু আলোয় দুজনের ছায়া এসে মিলেছে এক বিন্দুতে। ইশতিয়াক তার শক্ত চোয়াল দুটোকে কঠোর করে কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু গলার শব্দটা তার কণ্ঠনালীতেই আটকে গেল। মেহরুন সোজা গিয়ে দাঁড়াল তার ঠিক মুখোমুখি, একদম কাছাকাছি। ইশতিয়াকের বুক তখন প্রবল বেগে স্পন্দিত হচ্ছে, যা তার শার্টের ফ্রেমে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। মেহরুন ইশতিয়াকের চোখের খুব গভীরে তাকাল—যে চোখের ভাষা সে এতদিন পড়তে পারেনি, আজ ডায়েরির পাতার অক্ষরে সেই ভাষা তার মুখস্থ হয়ে গেছে।

 

“এত বছর ধরে আমাকে শাস্তি দিলে কেন?” মেহরুনের গলার স্বরটা কেঁপে উঠল, অথচ তাতে এক তীব্র ভালোবাসার উষ্ণতা মিশে ছিল।

 

ইশতিয়াক আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার সমস্ত সংযম, সমস্ত প্রাচীর এক নিমিষে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে তার দুহাত বাড়িয়ে শক্ত করে টেনে নিল মেহরুনকে নিজের বুকে। সেই বুক—যেখানে এতদিন শুধু জমে ছিল না বলা কথার পাহাড়, আজ সেখানে বইছে এক অপ্রতিরোধ্য প্লাবন। মেহরুনও আর কোনো রাখঢাক রাখল না, সে তার দুই হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরল ইশতিয়াকের চওড়া পিঠ।

 

বাইরে তখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বৃষ্টির ছাঁট এসে লাগছে জানালার কাচে। ঘরের ভেতরের অবরুদ্ধ বাতাস ভেদ করে যেন বেরিয়ে এল এক যুগ ধরে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসের উত্তাপ। ইশতিয়াক তার মুখ নামিয়ে আনল মেহরুনের কপালে, আর তার দীর্ঘদিনের চাপা পড়া অভিমান আর তীব্র আকুলতা মিশে গেল এক নিবিড় ছোঁয়ায়। প্রথম পর্বের এই শেষ মুহূর্তে দুজনের নিঃশ্বাস একাকার হয়ে গেল, যেন আর কোনো দূরত্বই অবশিষ্ট রইল না এই পৃথিবীর মানচিত্রে।

বাইরে তখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ফোঁটা জানালার কাচে টুপটাপ শব্দ তুলে গড়িয়ে পড়ছে। ঘরের ভেতরকার নিস্তব্ধতাটুকু ভেদ করে ভেসে আসছে দুজনের জোরালো নিঃশ্বাসের শব্দ। ইশতিয়াকের দুহাতের আঁটোসাঁটো বেষ্টনীতে মেহরুন যেন সম্পূর্ণ হারিয়ে গিয়েছিল। এতদিন ধরে যে মানুষটিকে সে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় দূরত্ব বলে ভেবে এসেছে, সেই মানুষটার বুকের গভীরে লুকিয়ে থাকা এই অপ্রতিরোধ্য উষ্ণতা যেন তার সমস্ত অস্তিত্বকে নাড়া দিয়ে গেল।

 

ইশতিয়াক তার চিবুকটা একটু ওপরে তুলে মেহরুনের মুখখানা ধীরে ধীরে নিজের দিকে ফিরিয়ে আনল। তার চোখের ভেতর জমে থাকা সমস্ত অভিমান, বছরের পর বছর ধরে জমিয়ে রাখা না-বলা আকুলতা আর অনুশোচনা একসঙ্গে উপচে পড়ছিল। সে আর নিজেকে এক মুহূর্তের জন্যও আটকে রাখতে পারল না। মেহরুনের নরম ঠোঁটের ওপর যখন তার অধরের ছোঁয়া পড়ল, তখন মনে হলো যেন দীর্ঘ মরুভূমির বুকে হঠাৎ করেই এক পশলা মেঘভাঙা বৃষ্টি নেমে এসেছে।

 

সেই চুম্বনের তীব্রতা ছিল ভয়ংকর অথচ পরম যত্নে মোড়ানো। ইশতিয়াকের হাতের আঙুলগুলো মেহরুনের ঘন লম্বা চুলের ভেতরে গভীর করে ঢুকে গেল, যেন সে কোনো অমূল্য সম্পদকে নিজের মুঠোয় চিরতরে বন্দি করে রাখতে চাইছে। মেহরুন প্রথমে একটু কেঁপে উঠলেও পরমুহূর্তেই নিজের সমস্ত প্রতিরোধ বিসর্জন দিয়ে ইশতিয়াকের ঘাড়ে হাত রেখে তার শরীরের আরও কাছাকাছি সেঁটে গেল। তাদের দুজনের মাঝখানে আর এক ফোঁটা হাওয়া চলাচলেরও যেন কোনো অবকাশ রইল না।

 

বাইরের অন্ধকারের বুক চিরে একটা বিজলির চমক ঘরের কাচে এসে পড়ল, আর ঠিক সেই মুহূর্তেই ইশতিয়াক মেহরুনকে আরও শক্ত করে নিজের বাহুডোরে তুলে নিল। তার চুম্বনের গতিতে তখন এক উন্মত্ত নেশা। মেহরুনের গলা থেকে বুক চিরে বেরিয়ে এল এক অদ্ভুত শিহরণ জাগানো মৃদু গোঙানি। ইশতিয়াকের হাত দুটো মেহরুনের পিঠের সুতোর ভাঁজ বেয়ে নিচে নেমে এল, তার প্রতিটি ছোঁয়ায় যেন বহুদিনের অবদমিত সমস্ত আবেগ স্ফুলিংগের মতো ছড়িয়ে পড়তে লাগল।

 

ঘরটার তাপমাত্রা যেন হঠাৎ করেই অনেকখানি বেড়ে গেল। ইশতিয়াকের ভারী নিঃশ্বাসগুলো আছড়ে পড়ছিল মেহরুনের গলার খাঁজে, কানের লতিতে। সে তার ঠোঁট নামিয়ে আনল মেহরুনের গলার সংবেদনশীল চামড়ার ওপর, আর সেই তীব্র আদুরে কামড়ে মেহরুন নিজের সর্বস্ব সঁপে দেওয়ার এক অদ্ভুত ঘোরে কাঁপতে শুরু করল। তার দুই হাত ইশতিয়াকের শক্ত চওড়া কাঁধের শার্ট খামচে ধরে রইল, যেন এই গভীর সমুদ্রের মাঝে সে একমাত্র খড়কুটো হিসেবে এই মানুষটিকেই আঁকড়ে ধরে আছে।

 

“মেহরুন... ক্ষমা কোরো আমাকে,” ইশতিয়াকের গলাটা ভারী হয়ে এল, তার মুখ থেকে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ যেন উষ্ণ বাষ্পের মতো মেহরুনের চিবুক ছুঁয়ে গেল। “আমি জানতাম না... নিজেকে বাঁচানোর এই বর্মটা তোমাকে এতখানি কষ্ট দেবে।”

 

মেহরুন কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার গলার স্বর তখন আবেগে রুদ্ধ হয়ে গেছে। সে শুধু ইশতিয়াকের চুলে নিজের আঙুলগুলো ডুবিয়ে দিয়ে তাকে আরও তীব্রভাবে নিজের কাছে টেনে নিল। তাদের সেই নিবিড় মিলনের মুহূর্তে বাইরের বৃষ্টির শব্দও যেন ম্লান হয়ে গিয়েছিল। ঘরের মৃদু হলুদ আলোর নিচে দুজনের শরীর ও মন একাকার হয়ে তৈরি করেছিল এক আদিম অথচ পবিত্র প্রেমের আবহ।

 

ইশতিয়াক আস্তে করে তাকে বিছানার নরম গদির ওপর নামিয়ে আনল। তার ওপর ঝুঁকে পড়ে সে আবার মেহরুনের চোখের দিকে তাকাল—যে চোখে এখন আর কোনো ভয় বা দূরত্ব নেই, আছে শুধু নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা ঠাণ্ডা হাওয়া আর ভেতরের এই দাবদাহে মেহরুনের সমস্ত শরীর তখন থরথর করে কাঁপছে। ইশতিয়াক তার বুকের ওপর ঝুঁকে পড়ে আবার তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট এলিয়ে দিল, আর সেই অন্তহীন আবেগের স্রোতে ডুব দিয়ে তারা হারিয়ে গেল সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে এক অচেনা ভুবনে।

বাইরের বৃষ্টি তখন থেমে এসেছে, কেবল গাছের পাতা থেকে টুপটাপ জলের ফোঁটা ঝরে পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে। ঘরের ভেতরে তখনো লেগে আছে এক মত্ত করা আবেশ আর দুজনের শরীরের উষ্ণ সুবাস। বিছানার নরম চাদরের ওপর পাশাপাশি শুয়ে ছিল ইশতিয়াক আর মেহরুন। তাদের দীর্ঘশ্বাস আর ক্লান্তির অবয়বগুলো মিলিয়ে এক শান্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।

 

মেহরুন তার মাথাটা আলতো করে রেখেছিল ইশতিয়াকের চওড়া বুকের ওপর। ইশতিয়াক তার এক হাত দিয়ে মেহরুনের কাঁধটা জড়িয়ে ধরে রেখেছিল, আর অন্য হাতের আঙুলগুলো আলতো করে বুলিয়ে দিচ্ছিল তার খোলা চুলে। এত বছরের ব্যবধান, না-বলা কথা আর অন্ধকারের দেয়াল—সব যেন এই একটিমাত্র রাতের ছোঁয়ায় ধুলোয় মিশে গেছে।

 

“আচ্ছা, এতদিন কেন মুখ ফুটে একটিবারও কিছু বললে না?” মেহরুন তার আঙুল দিয়ে ইশতিয়াকের বুকের পশমগুলোর ওপর ছোট ছোট বৃত্ত আঁকতে আঁকতে মৃদুস্বরে প্রশ্ন করল।

 

ইশতিয়াক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার সেই দীর্ঘশ্বাসের ওঠানামায় মেহরুনের মাথাটাও একটু কেঁপে উঠল। সে মেহরুনের কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে নরম গলায় বলল, “ভয় পেতাম, মেহরুন। আমার ভেতরে যে একটা অসুস্থ জেদ কাজ করত, আমি ভেবেছিলাম ভালোবাসার কথা মুখে প্রকাশ করলেই বুঝি আমার সমস্ত শক্তি ফুরিয়ে যাবে। আমি নিজেকে এমন এক খোলসে বন্দি করেছিলাম যেখান থেকে নিজের ইচ্ছে করলেও বের হতে পারতাম না। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, এতদিন আমি কী বোকামিই না করেছি।”

 

মেহরুন ইশতিয়াকের বুকে একটু মুখ গুঁজে মৃদু হাসল। সেই হাসির ভেতর কোনো ক্ষোভ বা অভিমান ছিল না, ছিল এক পরম স্বস্তির দীপ্তি। সে তার হাতটা আরও শক্ত করে ইশতিয়াকের পাঁজরের ওপর রাখল। ঘরের কোনায় ঝুলে থাকা পুরোনো ডায়েরিটা তখনো টেবিলের ওপর খোলা অবস্থায় পড়ে আছে, যেন সাক্ষী হয়ে আছে এক অকথ্য প্রেমের রূপান্তরের।

 

ইশতিয়াক মেহরুনের চিবুকটা ধরে মুখটা ওপরে তুলল। তার চোখের চাউনিতে তখন এক নতুন মানুষের জন্ম নেওয়ার দীপ্তি। সে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে আবার ঝুঁকে পড়ল মেহরুনের ঠোঁটের দিকে। সেই চুম্বনে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না, ছিল একটা স্থায়ী শান্তির পরশ—যেন তারা দুজনে চিরকালের মতো একে অপরের ঠিকানায় পৌঁছে গেছে।

 

বাইরে তখন ভোর হওয়ার ফ্যাকাশে আলো ফুটতে শুরু করেছে। রাতের সেই কালো মেঘ কেটে গিয়ে আকাশে দেখা দিয়েছে এক টুকরো পরিষ্কার আকাশ। আর এই নতুন ভোরের আলোয় ইশতিয়াক আর মেহরুনের নতুন সংসার, নতুন জীবনের পথচলা শুরু হলো—যেখানে আর কোনো দূরত্ব নেই, আছে শুধু একে অপরকে নিঃশেষে ভালোবেসে যাওয়ার অন্তহীন এক গল্প।

....
👁 57