বৃষ্টি আর রাতের প্রতিশোধ

বর্ষণমুখর একটি বিকেল। ঢাকার ধানমন্ডির এক নিরিবিলি ক্যাফের কাঁচের জানালার পাশে বসে বাইরে অবিরাম ঝরে পড়া বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আছে সায়রা। কফির কাপ থেকে ওঠা ধোঁয়া তার চোখের চশমার কাঁচকে একটু আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে। হাতের আংগুলগুলো বারবার নাড়াচাড়া করছে চায়ের কাপের হাতলটা। ঠিক সামনেই বসে আছে অর্কদীপ। বহু বছর, দীর্ঘ সাতটি বছর পর আজ আবার মুখোমুখি ওরা।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

সময়ের স্রোতে দুজনেরই চেহারায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। সায়রার মুখের সেই চঞ্চল হাসিটা এখন অনেক বেশি সংযত, গাম্ভীর্যে ঢাকা। আর অর্কদীপের চওড়া কাঁধ, কপালে কিছুটা বয়সের ও অভিজ্ঞতার ছাপ, চোখের কোণে জমে থাকা কিছু না বলা কথার গভীরতা—সব মিলিয়ে তাকে এক অন্য রকম পুরুষ হিসেবে মেলে ধরেছে। কিন্তু এই বাহ্যিক পরিবর্তনের আড়ালে রয়ে গেছে সেই পুরনো অর্কদীপ, যে একসময় সায়রার জীবনের সবথেকে বড় আশ্রয় ছিল।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

তাদের পরিচয়টা হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের সবুজ চত্বরে। চারপাশের কোলাহল থেকে দূরে, লাইব্রেরির কোনায় বা লাইব্রেরি সংলগ্ন ছোট্ট চায়ের দোকানে তাদের প্রথম চোখাচোখি। বন্ধুত্ব থেকে কখন যে তা গভীর ভালোবাসার চাদরে ঢাকা পড়েছিল, তা দুজনেই টের পায়নি। কিন্তু সেই সম্পর্কে প্রথম ধাক্কাটা এসেছিল পারিবারিক ও সামাজিক দূরত্বের কারণে। সায়রার পরিবার সমাজের চোখে অত্যন্ত রক্ষণশীল এবং অভিজাত শ্রেণির মধ্যে পড়ে। তাদের পরিবারে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বংশমর্যাদা, সামাজিক অবস্থান এবং ধর্মের মতো অদৃশ্য অথচ দুর্লঙ্ঘ্য দেয়ালগুলো অত্যন্ত পাথুরে কঠিন।

 

অর্কদীপের সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার এবং তার সামাজিক পরিচয় সায়রার বাবা চৌধুরূ সাহেবের কাছে ছিল সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। সায়রার বাবা যখন জানতে পেরেছিলেন যে তাদের একমাত্র মেয়ের মন কেড়ে নিয়েছে অর্কদীপ, তখন রীতিমতো ঝড় বয়ে গিয়েছিল তাদের বাড়িতে। চৌধুরী সাহেবের কড়া নির্দেশ ছিল, এই সম্পর্ক যদি সায়রা নিজে থেকে না ভাঙে, তবে অর্কদীপের পরিবারের ওপর নেমে আসবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক খড়্গ। সায়রা সেদিন ভয়ে, পরিবারের চাপে এবং অর্কদীপকে যেকোনো বিপদের হাত থেকে বাঁচানোর তাগিদেই দূরে সরে যেতে বাধ্য হয়েছিল। কোনো সুন্দর বিদায় ছিল না, ছিল শুধু একটা হঠাৎ দূরত্ব এবং দীর্ঘ নীরবতা।

 

"এখনো আগের মতো কফিতে অতিরিক্ত চিনি খাও?" অর্কদীপের গম্ভীর অথচ ভরাট কণ্ঠস্বর সায়রাকে বর্তমানের বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনে।

 

সায়রা চমকে তাকায়। মৃদু হেসে বলে, "না, এখন তেতো কফিই বেশি টানে। বয়স বাড়ছে তো, তেতো সত্যিগুলোর সাথে মানিয়ে নিতে শিখে গেছি।"

 

অর্কদীপ কোনো কথা বলে না। সে তার পকেটে হাত দেয় এবং সাবধানে একটি ছোট চামড়ার পাউচ টেবিলে সায়রার দিকে এগিয়ে দেয়। "এটা তোমার কাছেই থাকুক সায়রা। গত সাত বছর ধরে এটা আমার ওয়ালেটের সবচেয়ে নিরাপদ কোণেই ছিল।"

 

সায়রা কৌতূহলী ও কাঁপাপা হাতে পাউচটি খোলে। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে একটি ছোট রূপোর পেঁচার লকেট, যা সায়রা কলেজ জীবনের কোনো এক জন্মদিনে অর্কদীপকে উপহার দিয়েছিল। লকেটটা দেখে সায়রার গলার কাছে দলা পাকিয়ে ওঠে একরাশ কান্না। সে বুঝতে পারে, সময় আর সমাজ তাদের ভৌগোলিক দূরত্ব তৈরি করলেও, অর্কদীপ তার ভেতরের অনুভূতিটাকে একটুও মরচে পড়তে দেয়নি।

 

ক্যাফের নরম আলোয় দুজন কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। বাইরের বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। কিন্তু তাদের এই নীরবতার ভেতর জমে থাকা আবেগ যেন বয়ে চলা কোনো খরস্রোতা নদীর মতো গর্জন করছে। অর্কদীপ হাত বাড়িয়ে টেবিলের ওপর রাখা সায়রার ঠান্ডা আঙুলগুলো নিজের হাতের তালুতে তুলে নেয়।

 

"সায়রা..." অর্কদীপের ফিসফিসানি স্বরে এক অদ্ভুত সম্মোহন ছিল। "সাতটা বছর একটা দীর্ঘ সময়। এই সময়ে অনেক রাত কেটেছে যখন তোমার কণ্ঠস্বর শোনার জন্য পাগল হয়েছি। কিন্তু তোমার বাবার হুমকির কথা ভেবে নিজেকে আটকে রেখেছি। আজ যখন সামনে পেলে, আর নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারব না।"

 

সায়রা অর্কদীপের হাতের ছোঁয়ায় কেঁপে ওঠে। তার শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এক অজানা শিহরণ বয়ে যায়। অর্কদীপের হাতের উষ্ণতা যেন তার জমে থাকা সমস্ত কষ্টকে মুহূর্তে গলিয়ে দিতে শুরু করে। সে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিতে চায় না, বরং অর্কদীপের হাতের মুঠোয় নিজের হাতটা আরও শক্ত করে সেঁটে দেয়।

 

"অর্ক... তুমি বুঝছ না পরিস্থিতি কতটা জটিল," সায়রার গলার স্বর কাঁপছিল। "বাবা এখনো সেই একই মানুষ। আমার ওপর তার নজরদারী একচুলও কমেনি। আজ তোমার সাথে দেখা করার জন্যও আমাকে মিথ্যে বলতে হয়েছে।"

 

"মিথ্যে আর কতদিন লুকাবে সায়রা?" অর্কদীপ চেয়ার ছেড়ে উঠে সায়রার ঠিক পাশেই এসে বচে। তার শরীরের উষ্ণতা এবং কড়া পারফিউমের মোহময় গন্ধ সায়রার চারপাশের বাতাসকে ভারী করে তোলে। অর্কদীপ তার ডান হাতটা সায়রার চুলে আলতো করে বুলিয়ে দেয়, কানের পেছনের নরম ত্বকে আঙুলের ছোঁয়া লাগতেই সায়রা অবচেতনে চোখ বুজে ফেলে।

 

"অর্কদীপ... এখানে সবাই দেখছে..." সায়রা ফিসফিস করে বলে, কিন্তু তার শরীরের ভাষা অন্য কথা বলে। সে অর্কদীপের মুখের এত কাছাকাছি চলে এসেছে যে দুজনের নিঃশ্বাস একে অপরের সাথে মিশে যাচ্ছে।

 

অর্কদীপ এক মুহূর্তের জন্যও চোখ সরায় না সায়রার চোখের গভীর থেকে। সে সায়রার চিবুকটা নিজের আঙুলের ডগায় তুলে ধরে, তার চোখের পলকগুলোর ওপর আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়। সেই মৃদু স্পর্শেই সায়রার বুকের ভেতরটা থরোথরো করে কেঁপে ওঠে। বহু বছরের জমানো ক্ষোভ, দূরত্ব আর অপ্রেম যেন এই একটা ছোঁয়াতেই ধুলিসাৎ হয়ে যায়।

 

"কাউকে পরোয়া করি না আমি, সায়রা," অর্কদীপ সরাসরি সায়রার চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত নিচু এবং ভারী গলায় বলে। "সমাজ, পরিবার, নিয়ম—সবকিছুর বাইরে আজ শুধু তুমি আর আমি আছি। এই মুহূর্তে তোমাকে হারালে আমি আর বাঁচব না।"

 

সায়রা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। সে তার সমস্ত দ্বিধা, ভয় আর সামাজিক নিরাপত্তার দেয়ালগুলোকে এক নিমেষে ভেঙে ফেলে অর্কদীপের বুকের মধ্যে নিজেকে সঁপে দেয়। অর্কদীপও আর এক মুহূর্ত দেরি না করে সায়রার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নেয়। ক্যাফের কোণের এই আড়ালে বসা দুজনের মধ্যে তৈরি হয় এক তীব্র ঘনিষ্ঠতা।

 

অর্কদীপের ঠোঁট যখন সায়রার ঘাড়ের নরম অংশে এসে নামে, তখন সায়রা মৃদু শিউরে ওঠে এবং অজান্তেই অর্কদীপের শার্টের কলার খামচে ধরে। ক্যাফের মৃদু আলো, বাইরের বৃষ্টির ঝাপটানি আর দুজনের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এই রোমাঞ্চকর নৈকট্য তাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে ভালোবাসা কখনো ফুরোয় না, তা শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষায় থাকে।

 

কিন্তু এই গভীর আলিঙ্গন ও আবেগের মুহূর্তেও সায়রার অবচেতন মন তাকে মনে করিয়ে দেয় যে, তাদের এই মিলনের পথ এত সহজ নয়। ক্যাফের কাঁচের দরজার বাইরে হঠাৎ পরিচিত একটা গাড়ি এসে দাঁড়াতে দেখেই সায়রার চোখ দুটো ভয়ে চড়কগাছ হয়ে যায়। সেটা আর কেউ নয়, স্বয়ং সায়রার বাবার গাড়ি।

 

সায়রা শিউরে উঠে অর্কদীপকে এক ধাক্কায় একটু দূরে সরিয়ে দেয়। তার বুক তখনো হাঁপাচ্ছে, ঠোঁটে লেপটে আছে রোমাঞ্চের আবেশ আর চোখে আসন্ন ঝড়ের আতঙ্ক।

 

অর্কদীপ সায়রার এই আকস্মিক ভয়ের কারণ বুঝতে পেরে শক্ত চোয়ালে বাইরে তাকায়। সে বুঝতে পারে, তাদের এই প্রেমের গল্পে সবচেয়ে ভয়ংকর এবং কঠিন অধ্যায়টি কেবল শুরু হতে চলেছে। চৌধুরী সাহেবের কালো রঙের মার্সিডিজ গাড়িটি ক্যাফের ঠিক সামনে এসে থেমেছে, আর গাড়ির ভেতর থেকে নেমে আসছে দুজন দেহরক্ষী সহ স্বয়ং সায়রার বাবা।

 

সায়রা কাঁপতে কাঁপতে অর্কদীপের হাতটা শেষবারের মতো চেপে ধরে ফিসফিস করে বলে, "পালিয়ে যাও অর্ক... বাবা দেখে ফেললে উনি তোমাকে বাঁচতে দেবেন না।"

 

অর্কদীপ সায়রার চোখের দিকে তাকায়, তার চোখে কোনো ভয় নেই, আছে এক গভীর জেদ। সে সায়রার হাতটা শক্ত করে ধরে বলে, "আর পালাই না সায়রা। অনেক পালিয়েছি। এবার যা হবে, সামনাসামনি হবে।"

 

বাইরের ভারী বৃষ্টির ফোঁটাগুলোর শব্দ ছাপিয়ে তখন ক্যাফের কাঁচের দরজায় এসে লাগে চৌধুরী সাহেবের জুতোর ভারী আওয়াজ। প্রথম পর্বের এই রোমাঞ্চকর ও উত্তেজনাকর সমাপ্তির মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, আগামী দিনগুলোতে এই প্রেমকে বাঁচিয়ে রাখতে তাদের পাড়ি দিতে হবে এক অগ্নিপরীক্ষা।

ক্যাফের কাঁচের দরজা ঠেলে চৌধুরী সাহেবের প্রবেশ এবং অর্কদীপের সেই শান্ত কিন্তু দৃঢ় অবস্থান—সব মিলিয়ে মুহূর্তেই পরিবেশটা বরফশীতল হয়ে গিয়েছিল। তবে সেদিন ভাগ্যক্রমে অর্কদীপের এক বিশ্বস্ত বন্ধুর উপস্থিতিতে এবং পেছনের দরজা দিয়ে সায়রার দ্রুত প্রস্থানে বড় কোনো কেলেঙ্কারি এড়ানো সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু তাতে ঝড়ের গতি একটুও কমেনি, বরং তা আরও তীব্র রূপ ধারণ করেছিল।

 

বাড়ি ফেরার পর সায়রার ওপর শুরু হয় এক অদৃশ্য কারাবাস। তার মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়, ঘরের বাইরে বের হওয়ার ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, এবং সার্বক্ষণিক নজরদারির জন্য দুজন নতুন বিশ্বস্ত কর্মী নিয়োগ করা হয়। চৌধুরী সাহেব স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, এই পরিবারে অবাধ্যতার কোনো জায়গা নেই। সায়রার জীবনটা এখন একটি সুন্দর খাঁচায় বন্দি সোনার পাখির মতো, যার প্রতিটি ডানা ঝাপটানোর স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

 

কিন্তু ভালোবাসা যখন তীব্র হয়, তখন হাজারটা পাহারাও তাকে আটকাতে পারে না। অর্কদীপও হাল ছাড়ার পাত্র ছিল না। সে জানত সায়রাকে এই পরিস্থিতি থেকে বের করে আনতে হলে শুধু আবেগ নয়, চাই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং চরম ঝুঁকি নেওয়ার সাহস। মোমবাতির ক্ষীণ আলোর মতো একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল সে। আর সেই সুযোগটা আসে এক অমাবস্যার রাতে, যখন সায়রার বাড়ির পাহারাদাররা কিছুটা নির্ভার ছিল।

 

রাত তখন প্রায় দুটো। ঝিঁঝি পোকার ডাক আর মাঝরাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে সায়রার ঘরের জানালার কাঁচের গায়ে হালকা টোকা পড়ে। সায়রা তখনো বিছানায় জেগে, বালিশে মুখ গুঁজে চোখের জল ফেলছিল। জানালার কাছে গিয়ে সে যখন পর্দা সরায়, চাঁদের আলোয় অর্কদীপের চেনা মুখটা দেখে তার বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। তিন তলার উঁচুতে পাইপ বেয়ে উঠে এসেছে অর্কদীপ। তার কপালে ক্লান্তির ঘাম, পরনে কালো রঙের টি-শার্ট, আর চোখের দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত জেদ ও আকুলতা।

 

সায়রা কাঁপতে কাঁপতে জানালার ফ্রেমে খিল খুলে দেয়। অর্কদীপ নিমিষেই ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে। ঘরের গাঢ় অন্ধকারে দুজনের আর কোনো দূরত্ব থাকে না। সায়রা আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে সরাসরি অর্কদীপের শক্ত বুকের মধ্যে আছড়ে পড়ে। তার সমস্ত কান্না, জমাট বাঁধা কষ্ট আর ভয় যেন অর্কদীপের ছোঁয়ায় এক নিমেষে উবে যায়।

 

অর্কদীপ সায়রাকে নিজের বাহুডোরে এমনভাবে পেঁচিয়ে ধরে, যেন পৃথিবীর সমস্ত ঝড় থেকে তাকে আড়াল করে রাখতে চায়। সে সায়রার চুলে মুখ ডুবিয়ে তার চুলে জমে থাকা সুবাস গভীর করে টেনে নেয়। "বলেছিলাম না সায়রা, তোমাকে আমি এক মুহূর্তের জন্যও হারাতে দেব না," অর্কদীপের গলাটা গভীর রাতে আরও ভারী শোনায়।

 

সায়রা অর্কদীপের বুকে মুখ রেখেই অস্ফুটে বলে, "তুমি কেন এলে অর্ক? ধরা পড়ে গেলে বাবা তোমাকে সত্যি মেরে ফেলবে... আমার খুব ভয় করছে।"

 

অর্কদীপ সায়রার চিবুকটা ধরে তার মুখটা ওপরে তোলে। অন্ধকার ঘরেও সায়রার চোখের জল তার আঙুলের ডগায় অনুভূত হয়। অর্কদীপ এক ফোঁটা সময় নষ্ট না করে তার উষ্ণ ঠোঁট নামিয়ে আনে সায়রার ভেজা চোখের পাতায়, তারপর গাল বেয়ে নেমে আসা জলের রেখায়, এবং সবশেষে সরাসরি সায়রার কাঁপতে থাকা ঠোঁটে।

 

সেই চুম্বনে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না, ছিল বহুদিনের তৃষ্ণা আর গভীর রোমান্সের এক মোহময় বিস্ফোরণ। সায়রার দুই হাত অর্কদীপের কাঁধ খামচে ধরে, তার শরীরের প্রতিটি রক্তকণিকায় বইতে শুরু করে এক তীব্র উষ্ণতা। ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা যেন হঠাৎ করেই অনেক বেড়ে যায়। অর্কদীপের হাতের ছোঁয়া সায়রার পিঠের নরম ত্বকে লাগতেই সায়রা শিউরে ওঠে এবং তার আঙুলগুলো অর্কদীপের চুলে বিলিয়ে দেয়।

 

বাইরে তখন ঝোোড়ো হাওয়া বইতে শুরু করেছে, জানালার পাল্লাগুলো কাঁপছে। কিন্তু সেই ঘরের চার দেয়ালের ভেতরে সময়ের গতি থমকে গেছে। অর্কদীপ সায়রাকে আলতো করে বিছানার দিকে টেনে নিয়ে যায়। মোমবাতির আলো বা চাঁদের রোশনাইয়ে দুজনের দীর্ঘছায়া একাকার হয়ে যায়। অর্কদীপের বাহুডোরের উষ্ণতা এবং সায়রার নিঃশ্বাসের ওম রাতের অন্ধকারকে লজ্জা দেয়।

 

"সায়রা... তুমি কি আমার সাথে এই খাঁচা ছেড়ে পালাতে রাজি আছো?" অর্কদীপ সায়রার গলার কাছে মুখ রেখে ফিসফিস করে, তার ঠোঁটের ছোঁয়ায় সায়রার গায়ের লোমগুলো দাঁড়িয়ে যায়। "সমাজ, নিয়ম আর এই বাবার শাসনকে পেছনে ফেলে শুধু আমার হাত ধরে নতুন এক পৃথিবী গড়ার ঝুঁকি নেবে?"

 

সায়রা অর্কদীপের চোখের গভীরে তাকায়। সে দেখতে পায় সেখানে কোনো সংশয় নেই, আছে কেবল তাকে আগলে রাখার অদম্য ইচ্ছে। সায়রা আর এক মুহূর্তও দ্বিধা করে না। সে অর্কদীপের গালে হাত রেখে নরম অথচ দৃঢ়স্বরে বলে, "তোমার সাথে মৃত্যুর মুখে দাঁড়াতেও আমার কোনো ভয় নেই, অর্ক।"

 

তাদের এই গভীর প্রতিশ্রুতি আর শারীরিক ও মানসিক নৈকট্যের মাধ্যমেই রচিত হয় তাদের আগামী দিনের সংগ্রামের প্রথম ধাপ। কিন্তু তারা জানত না, এই রাতের অন্ধকারেই তাদের এই অভিসারের খবর পৌঁছে গেছে চৌধুরী সাহেবের কানে। পাশের ঘরের করিডোরে ভারী জুতোর শব্দ এবং দরজায় আঘাতের আওয়াজ তাদের সেই রোমাঞ্চের রেশকে এক পলকে ভেঙে চুরমার করে দেয়।

"দরজা খোলো সায়রা! আমি জানি ওই অর্ক নামের ছেলেটা ভেতরে আছে!" চৌধুরী সাহেবের গলার গর্জন পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে তুলছিল।

 

দরজায় মুহুর্মুহু ভারী ধাক্কার শব্দে মুহূর্তেই কক্ষের ভেতরের রোমাঞ্চকর ও নিস্তব্ধ পরিবেশ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সায়রার মুখটা ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে অর্কদীপের শার্টের হাতা খামচে ধরে আতঙ্কে কাঁপতে লাগল। কিন্তু অর্কদীপের মুখে বিন্দুমাত্র ভয়ের লেশমাত্র ছিল না। তার চোয়াল শক্ত, চোখে আগুন এবং বুকটা অবিচল।

 

"ভয় পেও না সায়রা," অর্কদীপ অত্যন্ত শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বলল। সে নিজে গিয়ে সজোরে রুমের দরজাটা খুলে দিল।

 

দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন চৌধুরী সাহেব, তার পেছনে রয়েছে চারজন সশস্ত্র দেহরক্ষী এবং বাড়ির দুই চাকর। চৌধুরী সাহেবের চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে উঠেছে। তিনি ভেতরে প্রবেশ করেই সরাসরি অর্কদীপের कॉলার চেপে ধরতে গেলেন। কিন্তু অর্কদীপ বিদ্যুৎগতিতে তার হাত ধরে ফেলে এক ঝটকায় দূরে সরিয়ে দিল।

 

"আপনার এই ঔদ্ধত্যের ফল আজ খুব খারাপ হবে, অর্কদীপ!" চৌধুরী সাহেব চিৎকার করে উঠলেন। "আমার মেয়ের জীবন থেকে চিরতরে দূরে থাকার হুমকি এর আগেও দিয়েছিলাম!"

 

"হুমকি আর ভয় দেখানোর দিন শেষ, চৌধুরী সাহেব!" অর্কদীপ তার নিজের কণ্ঠস্বর এমন এক ভারী ও উচ্চগ্রামে রাখল যা ঘরে উপস্থিত সবাইকে চুপ করিয়ে দিল। "আপনার অহংকার, আপনার টাকা আর ক্ষমতার জোরে সায়রাকে আটকে রাখতে পেরেছেন এতদিন, কিন্তু ওর ভালোবাসাকে পারেননি। আজ হয় আমরা দুজনে একসাথে এই বাড়ি থেকে বের হব, নয়তো আপনাদের এই অহংকারের দেয়াল আজ ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে।"

 

সায়রা বিছানার পাশ থেকে ছুটে এসে অর্কদীপের হাত শক্ত করে ধরে ফেলল। সে তার বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বলে উঠল, "বাবা, আমি আর এই খাঁচায় এক মুহূর্তও থাকব না। অর্কদীপ ছাড়া আমার অন্য কোনো ভবিষ্যৎ নেই। তোমরা আমাকে জোর করে আটকে রাখতে পারো, কিন্তু আমার মনটাকে কখনো কিনতে পারবে না।"

 

মেয়ের এমন সাহসী ও অনমনীয় রূপ দেখে চৌধুরী সাহেব যেন কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, যে মেয়েকে তিনি সারাজীবন ভয়ে ভয়ে রেখেছেন, আজ সেই মেয়ে ভালোবাসার শক্তিতে তার সমস্ত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। পেছনের দেহরক্ষীরা এগিয়ে আসতে গেলে চৌধুরী সাহেব হাত তুলে তাদের থামিয়ে দেন। তার মুখের কঠোরতা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসে, চোখের কোণে জমে ওঠে এক দীর্ঘশ্বাসের ছায়া। এক অভিমানী ও রাগী পিতার হার মানার মুহূর্ত এটাই ছিল।

 

"যাও..." চৌধুরী সাহেব মুখ ফিরিয়ে নিয়ে খুব নিচু ও ক্লান্ত গলায় বললেন। "আমার এই রাজত্বে আজ থেকে তোর কোনো অধিকার রইল না। কিন্তু মনে রাখিস, এই পথের কষ্ট তোকেই পোহাতে হবে।"

 

বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে অর্কদীপ সায়রার হাতটা নিজের মুঠোয় আরও শক্ত করে নিলো। তারা আর পেছনে ফিরে তাকাল না। চৌধুরী সাহেবের সেই বিলাসবহুল প্রাসাদের ভারী লোহার গেট পার হয়ে যখন তারা বাইরে এল, তখন রাতের কালো আকাশ চিরে পূর্ব দিগন্তে উঁকি দিচ্ছে এক নতুন ভোরের সোনালী আলো।

 

রাস্তার ধারের ঠান্ডা বাতাস তাদের গায়ে লাগতেই সায়রা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সমস্ত বাধা, সমাজ, নিয়ম আর বাবার রক্তচক্ষু পেছনে ফেলে তারা আজ স্বাধীন। অর্কদীপ সায়রার দিকে তাকিয়ে এক চিলতে মিষ্টি হাসি দিল। তারপর তার কোমর জড়িয়ে নিজের আরও কাছে টেনে এনে প্রকাশ্য রাস্তায় সায়রার কপালে এঁকে দিল এক গভীর ভালোবাসার উষ্ণ চুম্বন।

 

বহু বছরের জমানো কষ্ট, অশ্রু আর দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে তাদের এই পথচলা এক নতুন ও সুন্দর সূচনার জন্ম দিল। ঝোোড়ো হাওয়া ও অন্ধকারের দিনগুলো পেছনে ফেলে অর্কদীপ আর সায়রা হাত ধরে পা বাড়াল এক অজানা, কিন্তু নিজেদের ভালোবাসার রঙে রাঙানো ভবিষ্যতের দিকে।

....
👁 57