জমে থাকা অনুভূতির গলন

জানালার কাচে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো আছড়ে পড়ছিল। বাইরে তখন ফাগুনের মৃদু হাওয়া বইলেও, অন্বেষার ঘরের ভেতরকার আবহাওয়াটা ছিল বরফশীতল। বিছানার একপাশে গুটিসুটি মেরে বসে আছে সে। পরনে লাল রঙের বেনারসি শাড়ি, গা ভর্তি ভারী সোনা—অথচ এই মানুষগুলোকে সে আজকেই প্রথম দেখল। বিয়ের পিঁড়িতে বসার আগ পর্যন্ত সে জানত না কার গলায় মালা পরাতে চলেছে। শুধু বাবা-মার পছন্দ আর পারিবারিক সম্মানের কথা ভেবে চুপচাপ মেনে নিয়েছিল।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

দরজা খুলে ঘরে প্রবেশ করল শাহরিয়ার। দীর্ঘদেহী, পরিপাটি চুল, চোখেমুখে রাজ্যের ক্লান্তি আর এক অজানা বিরক্তি। সে ঘরে ঢুকেই পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করল, তারপর অন্বেষার দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে শীতল গলায় বলল, "দরজার ওপাশের লোকজনকে দেখানোর জন্য এই নাটক। কিন্তু মনে রেখো, এই ঘরের ভেতরে আমাদের সম্পর্কটা সম্পূর্ণ আলাদা। তোমার জন্য আমার জীবনে কোনো স্থান নেই, আর আমার জীবনে নাক গলানোর চেষ্টা কোরো না।"

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

অন্বেষার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। বিয়ের রাতে এমন কথা শোনার জন্য সে প্রস্তুত ছিল না। সে শুধু মৃদুস্বরে বলল, "তাহলে বিয়েটা করলেন কেন?"

 

শাহরিয়ার এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। তার চোখের গভীরে কোনো এক ঝড়ের ছায়া দেখা গেল, যা পরক্ষণেই নিপুণ দক্ষতায় সে লুকিয়ে ফেলল। ঠান্ডা গলায় সে জবাব দিল, "ওসব তোমার না জানলেও চলবে। নিজের মতো করে থাকো, আমার সীমানায় আসার চেষ্টা কোরো না।"

 

বলেই সে আর এক মুহূর্তও না দাঁড়িয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। ঘরের ভারী নীরবতায় অন্বেষার চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।

 

পরের দিনগুলো কাটল এক অদ্ভুত যন্ত্রণায়। শাহরিয়ার ভোরে ঘুম থেকে উঠে অফিস চলে যেত, আর ফিরত গভীর রাতে। তাদের মধ্যে কথা হতো না বললেই চলে। বাড়িতে গৃহকর্মী ছিল, সে খাবার দিয়ে যেত। অন্বেষা সমস্ত দিন একটা বিশাল ফ্ল্যাটে একা একা সময় কাটাত। শাহরিয়ার তার খোঁজ নিত না, অথচ তার প্রতিটি সুবিধার দিকে কড়া নজর ছিল। খাবার ঠিকমতো আসছে কি না, ফ্ল্যাটের এসি ঠিকমতো কাজ করছে কি না—সব ঠিক থাকত, শুধু ছিল না মানুষের ছোঁয়া, ভালোবাসার উষ্ণতা।

 

অন্বেষা নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। সে বই পড়ে, বারান্দায় দাঁড়িয়ে মেঘ দেখ1য় আর শাহরিয়ারের রহস্যময় ব্যক্তিত্বের পিছনের কারণটা খোঁজার চেষ্টা করে। লোকটার মধ্যে এক তীব্র কষ্ট লুকানো আছে, যা সে আড়াল করতে চায় রাগের আড়ালে।

 

একদিন বিকেলবেলা হঠাৎ করেই আবহাওয়া বদলাল। কালবৈশাখীর ঝড়ে আকাশ কালো করে এল। অন্বেষা বারান্দা থেকে ভেজা কাপড়গুলো তুলতে গিয়েছিল, তখনই প্রচণ্ড বাতাসে তার মাথাটা কেমন যেন ঘুরে উঠল। গত দু-তিন দিন ধরে তার শরীরটা এমনিতেই ভালো যাচ্ছিল না, ঠিকমতো খাচ্ছিলও না। হঠাৎ চোখে অন্ধকার দেখে সে বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। তক্ষুনি সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।

 

সন্ধ্যায় শাহরিয়ার যখন অফিস থেকে ফিরল, ফ্ল্যাটজুড়ে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। সাধারণত বারান্দার বাতি জ্বালানো থাকে, আজ তা অন্ধকার। সে ড্রয়িংরুমে ব্যাগ রেখে ডাকল, "অন্বেষা?"

 

কোনো সাড়া এল না। শাহরিয়ার ভ্রু কুঁচকে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে ফ্লোরে অন্বেষা অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে। তার কপাল বেয়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে, ঠোঁটগুলো শুকিয়ে সাদা।

 

শাহরিয়ারের বুকটা এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল। তার মাথা থেকে সমস্ত শীতলতা নিমেষে উবে গেল। সে এক দৌড়ে অন্বেষার কাছে গিয়ে তাকে কোলে তুলে নিল। তার শরীরটা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে।

 

"অন্বেষা! অন্বেষা চোখ খোলো!" শাহরিয়ারের গলায় যে ভয় আর আকুলতা প্রকাশ পেল, তা সে নিজেও কোনোদিন কল্পনা করেনি।

 

সে দ্রুত অন্বেষাকে বেডে শুইয়ে দিল। ভেজা তোয়ালে এনে কপাল জলপটি দিতে লাগল। তার হাত দুটো কেঁপে যাচ্ছে। ড্রেসিং টেবিল থেকে ফাস্ট এইড বক্স টেনে বের করে প্যারাসিটামল খুঁজতে লাগল। শাহরিয়ারের এই রূপ সম্পূর্ণ নতুন—এক অস্থির, ব্যাকুল মানুষ, যে তার সমস্ত শক্তিতে এই মেয়েটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে।

 

সারারাত শাহরিয়ার এক মুহূর্তের জন্যও ঘুমাল না। সে অন্বেষার মাথার কাছে বসে তার কপালে হাত বুলিয়ে দিল। ফিসফিস করে বলল, "আমাকে ক্ষমা কোরো অন্বেষা... আমি এত নিষ্ঠুর হতে চাইনি।"

 

পরদিন ভোরে অন্বেষার যখন জ্বর কমল এবং সে আস্তে আস্তে চোখ মেলল, তখন দেখল শাহরিয়ার তার হাত শক্ত করে ধরে টেবিল ল্যাম্পের আলোয় ক্লান্ত মুখে বসে আছে। অন্বেষার চোখ পড়তেই শাহরিয়ার দ্রুত তার হাতটা সরিয়ে নিয়ে স্বাভাবিক গম্ভীর ভাব আনার চেষ্টা করল, কিন্তু তার চোখের কোণের ভেজা ভাবটা লুকোতে পারল না।

 

অন্বেষা দুর্বল গলায় ফিসফিস করে বলল, "আপনি সারারাত জেগে ছিলেন?"

 

শাহরিয়ার চোখ সরিয়ে নিয়ে শক্ত গলায় বলল, "বেশি কথা বলার দরকার নেই। শরীর দুর্বল। চুপচাপ শুয়ে থাকো।"

 

কিন্তু সেই শীতল গলার আড়ালে যে উষ্ণ মায়া লুকিয়ে ছিল, তা অন্বেষার বুঝতে বাকি রইল না। এই প্রথম তাদের মাঝের অদৃশ্য বরফ গলতে শুরু করল।

অন্বেষার অসুস্থতা যেন তাদের এই অচেনা সম্পর্কের গতিপথটাই বদলে দিল। শাহরিয়ার মুখে যতই শক্ত খোলস পরে থাকুক না কেন, তার চোখের চাহনি আর হাতের অযত্নহীন ছোঁয়াতে ধরা পড়ে যেত এক গভীর লুকানো টান। জ্বর ছাড়ার পরও অন্বেষার শরীর বেশ দুর্বল ছিল। বিছানা থেকে ওঠার শক্তি ছিল না বললেই চলে। কিন্তু অবাক কাণ্ড হলো, শাহরিয়ার এখন আর আগের মতো সকাল সকাল অফিস চলে যায় না। কিংবা গেলেও দুপুরের মধ্যে একবার অন্তত বাড়ি ফিরে আসে।

 

সেদিন দুপুরবেলা। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। শাহরিয়ার অফিস থেকে সোজা বেডরুমে এসে প্রবেশ করল। তার হাতে একটা কাঁচের বাটি। বাটি থেকে ধোঁয়া উঠছে—হাতে তৈরি গরম গরম স্যুপ।

 

সে অন্বেষার বিছানার পাশে এসে দাঁড়াল। গম্ভীর গলায় বলল, "উঠে বসো। এই স্যুপটা খেয়ে নাও। ডাক্তার বলেছে নিয়ম করে পুষ্টিকর খাবার খেতে।"

 

অন্বেষা দুর্বল শরীর নিয়ে কোনোমতে বিছানায় পিঠ এলিয়ে বসল। শাহরিয়ার বাটিটা টুলের ওপর রেখে চামচে করে স্যুপ তুলে অন্বেষার মুখের সামনে ধরল। অন্বেষা একটু থমকে গেল। সে নিজে হাত বাড়িয়ে চামচটা নিতে চাইল, কিন্তু শাহরিয়ার তার হাতটা এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে কড়া গলায় বলল, "হাত তুলতে হবে না। চুপচাপ খাও বলছি।"

 

অন্বেষার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল। লোকটার এই শাসানোর ভেতরে কী যে এক অদ্ভুত অধিকারবোধ লুকিয়ে আছে, তা ভেবেই তার মনটা ভিজে গেল। সে আর কথা বাড়াল না, চুপচাপ শাহরিয়ারের হাত থেকে স্যুপ খেতে লাগল।

 

স্যুপ খাওয়ানো শেষ হলে শাহরিয়ার নিজের পকেট থেকে একটা ছোট সুতির রুমাল বের করে অন্বেষার ঠোঁটের পাশটা আলতো করে মুছে দিল। সেই ছোঁয়াটা এত হালকা ছিল যে অন্বেষার গাল দুটো লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। শাহরিয়ারের বুকটাও কেঁপে উঠল অন্বেষার মুখের দিকে তাকিয়ে। মুহূর্তের জন্য তাদের চোখের পলক পড়ল না। ঘরের বাতাসে যেন হঠাৎ করেই বারুদের গন্ধের বদলে নেমে এল এক গাঢ় মাদকতা। শাহরিয়ার দ্রুত নিজের হাতটা সরিয়ে নিয়ে কাশি দিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল।

 

সেদিন বিকেলে শাহরিয়ার আর অফিসে গেল না। ল্যাপটপ কোলে নিয়ে বেডরুমের সোফাতেই বসে অফিসের কাজ করছিল। অন্বেষা বিছানায় শুয়ে বই পড়ছিল, কিন্তু তার পুরো মনোযোগটাই ছিল শাহরিয়ারের দিকে। লোকটা যখন গভীর মনোযোগে কাজ করে, তখন তার কপালে যে সামান্য ভাঁজ পড়ে, তা দেখতে বড়ো মিষ্টি লাগে।

 

হঠাৎ করেই লোডশেডিং হলো। চারপাশ একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেল। বৈশাখী মেঘের গর্জনে কেঁপে উঠল আকাশ। অন্বেষা অন্ধকারের বড্ড ভয় পায়। এই বিশাল ফ্ল্যাটে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় সে ভয়ে কেঁপে উঠে বিছানায় গুটিসুটি মেরে বসল। তার গলা শুকিয়ে কাঠ।

 

অন্ধকারের ভেতর থেকেই শাহরিয়ারের ভারী গলার ডাক শোনা গেল, "অন্বেষা, ভয় পেও না। আমি এখানেই আছি।"

 

পরক্ষণেই শাহরিয়ারের মোবাইলের টর্চলাইট জ্বলে উঠল। সে দ্রুত উঠে এসে অন্বেষার বিছানার পাশে বসল। অন্বেষার সারা শরীর ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে সোজা শাহরিয়ারের বুকের ভেতর মুখ গুঁজে দিল।

 

শাহরিয়ার এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর তার শক্তপোক্ত বাহু দুটো ধীরে ধীরে অন্বেষার পিঠের জাদুতে জড়িয়ে ধরল। সে অন্বেষার চুলে আঙুল চালিয়ে সান্ত্বনা দিতে লাগল, ফিসফিস করে বলল, "ভয় নেই সোনা... আমি তো আছি। কিচ্ছু হবে না।"

 

সেই প্রথম শাহরিয়ার তাকে নিজের করে এমন শক্ত করে জড়াল। অন্বেষা তার বুকের স্পন্দন শুনতে পাচ্ছিল—ধক ধক শব্দটা যেন তার নিজের বুকের ভেতর প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে, আর সেই অন্ধকারের আবছা আলোয় দুজনের নিঃশ্বাস মিশে একাকার হয়ে গেল। শাহরিয়ারের ঠোঁট অন্বেষার কপালে এক আলতো ছোঁয়া রাখল। সে ছোঁয়াতে কোনো রাগ ছিল না, কোনো অভিমান ছিল না—ছিল শুধু বছরের পর বছর জমানো অব্যক্ত এক ভালোবাসা আর আকুলতা।

 

অন্বেষা চোখ বন্ধ করে শাহরিয়ারের শার্টের কলার শক্ত করে খামচে ধরল। সে বুঝতে পারছিল, এই মানুষটা যতই আড়াল করার চেষ্টা করুক না কেন, তার মনের গভীরে অন্বেষার জন্য এক প্রবল প্লাবন বইছে।

 

পরের দিন সকালে যখন রোদ উঠল, তখন তাদের মাঝের সমস্ত অদৃশ্য দেওয়াল চিরতরে গুঁড়িয়ে গেছে। শাহরিয়ার আর আগের মতো দূরে সরে থাকে না। কিন্তু অন্বেষার মনে বারবার একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—যে মানুষটা তাকে প্রথম দিনেই এত দূরে ঠেলে দিতে চেয়েছিল, সে হঠাৎ এতটা মায়া কেন দেখাচ্ছে? কোন পুরোনো প্রতিশ্রুতির কথা সে সেদিন ডায়েরির পাতায় বা ঘুমে আচ্ছন্ন অবস্থায় ফিসফিস করে বলেছিল?

ঝুম বৃষ্টির রেশ কেটে গিয়ে বিকেলে সোনালী রোদে ঝলমল করে উঠল চারপাশ। অন্বেষা ড্রয়িংরুমের টেবিলে চা বানাচ্ছিল। শাহরিয়ার আজ একটু আগেই অফিস থেকে ফিরে এসেছে। সে সোফায় বসে ল্যাপটপ দেখছিল, কিন্তু তার ঘন ঘন রান্নাঘরের দিকে তাকানো দেখেই বোঝা যাচ্ছিল তার মন কাজে নেই।

 

অন্বেষা চায়ের কাপ ট্রেতে করে নিয়ে এসে টেবিলের ওপর রাখল। ঠিক তখনই শাহরিয়ার হঠাৎ করে তার হাতটা শক্ত করে ধরে নিজের কাছে টেনে নিল। অন্বেষা একটু চমকে গিয়ে বলল, "কী হলো? চা ঠান্ডা হয়ে যাবে তো!"

 

শাহরিয়ার মৃদু হেসে অন্বেষার চোখের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে আজ আর কোনো রাখঢাক নেই—পুরোটা জুড়েই রয়েছে এক নিখাদ সমর্পণ আর ভালোবাসা। সে শান্ত গলায় ডাকল, "অন্বেষা..."

 

"বলুন।"

 

"আজ তোমাকে সব সত্যিটা জানতে হবে। কেন আমি প্রথম দিন তোমার সাথে অতটা খারাপ ব্যবহার করেছিলাম, কেন তোমাকে নিজের জীবন থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলাম—সব আজ বলব।"

 

অন্বেষার বুকটা দ্রুত স্পন্দিত হতে শুরু করল। সে সোফায় শাহরিয়ারের পাশে বসল। শাহরিয়ার ড্রয়ার থেকে একটা পুরোনো ডায়েরি বের করে তার পাতা উল্টাতে লাগল।

 

শাহরিয়ার বলতে শুরু করল, "আজ থেকে পাঁচ বছর আগে আমার জীবনের সবচেয়ে কাছের বন্ধু রাহাত এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। মৃত্যুর আগে রাহাত আমার হাত ধরে একটা প্রতিশ্রুতি নিয়েছিল। সে যাকে ভালোবাসত, সেই মেয়েটিকে রক্ষা করার দায়িত্ব সে আমার ওপর দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যের এমন এক পরিহাস যে, সেই মেয়েটি আর কেউ নয়—সে তুমি, অন্বেষা।"

 

অন্বেষার চোখ দুটো বিস্ময়ে বড়ো হয়ে গেল। সে ফিসফিস করে বলল, "আমি?"

 

"হ্যাঁ, তুমি," শাহরিয়ারের গলাটা একটু ভারী হয়ে এল। "রাহাত যখন মারা যায়, তখন তোমার পরিবার তোমার অন্য কোথাও বিয়ে ঠিক করার চেষ্টা করছিল। রাহাত চেয়েছিল তুমি যেন সুখে থাকো। তাই আমি আমার পরিবারকে রাজি করিয়ে তোমাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু আমার ভয় ছিল, রাহাতকে হারানোর বেদনা আর তোমার প্রতি আমার এই অদ্ভুত দায়িত্ববোধ কোথাও না কোথাও একটা বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। আমি ভেবেছিলাম তোমাকে দূরে রাখলেই তুমি ভালো থাকবে। কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি যে কখন অজান্তে তোমার এই মায়ার জালে আমি নিজে চিরতরে বন্দি হয়ে গেছি।"

 

অন্বেষার দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সে বুঝল, লোকটা তার ভালোবাসার কথা কাউকে বলতে পারেনি, শুধু একটা বন্ধুর দেওয়া দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের জীবনটাকে তার সাথে বেঁধে দিয়েছিল। কিন্তু সেই দায়িত্ব কবে যেন সত্যিকারের ভালোবাসায় রূপান্তরিত হয়ে গেছে, তা শাহরিয়ার নিজেও বুঝতে পারেনি।

 

অন্বেষা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে সোজা এগিয়ে এসে নিজের দুই হাত দিয়ে শাহরিয়ারের গলা জড়িয়ে ধরে তার বুকে মুখ গুঁজে কেঁদে ফেলল। সে ভাঙা গলায় বলল, "আপনি এত বোকা কেন? কেন প্রথম থেকেই সব খুলে বললেন না?"

 

শাহরিয়ার তার দুই বাহু দিয়ে অন্বেষাকে শক্ত করে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরল। তার বুক চিরে বেরিয়ে এল এক দীর্ঘশ্বাসের স্বস্তি। সে অন্বেষার ভেজা চুলে ঠোঁট ছুঁইয়ে ফিসফিস করে বলল, "ভয় ছিল পাছে তোমাকে হারিয়ে ফেলি। কিন্তু আজ থেকে আর কোনো ভয় নেই, অন্বেষা। আমার এই জীবনে আর কেউ নেই, শুধু তুমি আর শুধু তোমার এই ভালোবাসাটাই আমার সব।"

 

বাইরে তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। ঘরের মৃদু আলোয় দুজনের ছায়া এক হয়ে গেছে। শাহরিয়ার অন্বেষার চিবুকটা আলতো করে উঁচুতে তুলে ধরে তার চোখের জল মুছিয়ে দিল। তারপর ধীরে ধীরে তার ঠোঁট নামিয়ে আনল অন্বেষার ঠোঁটের ওপর। সেই চুম্বনে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না—ছিল বছরের পর বছর জমে থাকা সমস্ত অভিমান, যন্ত্রণা আর গভীর ভালোবাসার এক অপূর্ব প্রকাশ।

 

অন্বেষা চোখ বন্ধ করে নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিল শাহরিয়ারের বাহুডোরে। সমস্ত অদৃশ্য দেওয়াল ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। সেদিন রাতে তারা দুজনে বুঝেছিল, তাদের এই অচেনা পরিণয় আসলে ভাগ্যের এক পরম আশীর্বাদ, যা তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসের মতো চিরকালের জন্য এক করে দিয়েছে।

....
👁 49