অদৃশ্য দেয়ালের পতন

বিকেলের সোনাঝরা রোদ যখন পুরোনো ইট-পাথরের দেয়াল গলে এসে জানালার পর্দা ছুঁয়ে যেত, অদ্রিজা তখন চায়ের কাপে চামচ নাড়তে নাড়তে আনমনা হয়ে পড়ে থাকত। শহরের এই কোলাহল থেকে দূরে, নদীর পাড়ঘেঁষা পুরনো পাড়ার একটা ছিমছাম দোতলা বাড়ির চিলেকোঠায় তার বাস। এই ঘরটার প্রতিটি কোণায় যেন জমে আছে অতীতের দীর্ঘশ্বাস। টেবিলের ওপর রাখা ডায়েরির পাতাগুলো উল্টাতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে তুর্যের মুখটা। সেই গভীর, রহস্যময় চোখ—যে চোখে তাকিয়ে থাকলে মনে হতো পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল একনিমেষে থেমে গেছে।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

অথচ কী অদ্ভুত নিয়তি! যে মানুষটির সঙ্গে একসময় হৃদয়ের সবচেয়ে গভীরতম সুরগুলো বেজে উঠত, আজ সে কেবলই এক সুদূর অতীত। সম্পর্কের শেকড় এত গভীরে চলে গিয়েছিল যে, তারা একে অপরের নিঃশ্বাসের শব্দ পর্যন্ত মুখস্থ করে ফেলেছিল। অথচ মুখে কখনো ভালোবাসার কথা বলা হয়নি। অদ্রিজা ছিল অসম্ভব রকম অভিমানী আর লাজুক। নিজের মনের তীব্র আকুলতা সে সবসময় একটা শক্ত খোলসের আড়ালে লুকিয়ে রাখত। সে ভাবত, ভালোবাসা যদি প্রকাশই করতে হয়, তবে তা কেমন যেন সস্তা হয়ে যায়। তার চেয়ে নীরবতা অনেক বেশি পবিত্র।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

আর তুর্য ছিল তার ঠিক বিপরীত মেরুর মানুষ—অথচ ভেতরে ভেতরে কী যে এক অদ্ভুত মিল ছিল দুজনের! তুর্য ভালোবাসত ভীষণভাবে, কিন্তু তার সেই ভালোবাসার প্রকাশে ছিল অদ্ভুত এক জড়তা। সে কখনো সাহসে কুলিয়ে উঠতে পারেনি অদ্রিজাকে সরাসরি বলতে যে, অদ্রিজা ছাড়া তার ফুসফুসে বাতাস ঢোকে না। দুজনেই নিজেদের মনের কথা মনে পুষে রেখেছিল, এক অদ্ভুত অহংকার আর দ্বিধার দেওয়াল তুলে দিয়েছিল দুজনের মাঝে। তারা ভেবেছিল, না বললেও অপরপক্ষ ঠিকই বুঝে নেবে। কিন্তু মানুষের মনের গোলকধাঁধা বড় অদ্ভুত। না বলা কথাগুলো জমতে জমতে একসময় এমন এক পাহাড়সমান দূরত্ব তৈরি করল, যার ভার বইতে না পেরে এক বৃষ্টির বিকেলে তাদের সাজানো সম্পর্কটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল।

 

কোনো চিৎকার ছিল না, কোনো নাটকীয় দৃশ্য ছিল না। কেবল দীর্ঘ এক নিস্তব্ধতা আর চোখের কোণে জমে থাকা নোনা জলের ফোঁটা। তুর্য সেদিন ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল। সেই দীর্ঘশ্বাসের শব্দ অদ্রিজার বুকে আজও প্রতিধ্বনিত হয়।

 

বছর চারেক কেটে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ে নদীর কত জল গড়িয়ে গেছে বঙ্গোপসাগরের দিকে। অদ্রিজা নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে নানাভাবে। কাজের ব্যস্ততা, শহরের চেনা ভিড়, নতুন পরিচিতি—সবকিছু দিয়ে জীবনটাকে আবার গতিশীল করার চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু রাতের গভীরতা বাড়লেই যখন চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে আসত, তখন বুক চিরে বেরিয়ে আসত এক দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস। সে বুঝতে পারত, তুর্যের শূন্যতা ককখনো কোনো কিছু দিয়েই পূরণ হওয়ার নয়।

 

আজকের বিকেলটা যেন একটু অন্যরকম। শ্রাবণের মেঘে আকাশটা ভারী হয়ে আছে। যেকোনো মুহূর্তে মুষলধারে বৃষ্টি নামবে। অদ্রিজা কাজের সূত্রে আবার ফিরে এসেছে সেই চেনা শহরে, নদীর ধারের সেই পুরোনো পাড়ায়। চারপাশের পরিবেশটা হুবহু আগের মতোই আছে, কেবল পাল্টে গেছে সময়ের স্রোত আর তাদের বয়সের পরিধি। সন্ধ্যার ঠিক আগে সে ঠিক করল, পুরোনো পাড়ার সেই পরিচিত গলি দিয়ে একবার হেঁটে আসবে। যেখানে একসময় তুর্যের হাত ধরে সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিয়েছে, রিকশার হুড তুলে ঝমঝম বৃষ্টির গান শুনেছে।

 

হাঁটতে হাঁটতে সে এসে দাঁড়াল এক পুরোনো দোতলা বাড়ির সামনে। বাড়ির মালিক পাল্টে গেছে, কিন্তু সামনের সেই কদম গাছটা আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বাতাসে কদম ফুলের মিষ্টি সুবাস চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির বারান্দার এক কোণ থেকে এক চিলড়ে আলো এসে পড়ল সামনে। আর তখনই সে দেখতে পেল তাকে—তুর্য।

 

সময় যেন সেখানে এসেই থমকে গেল। হৃদস্পন্দন একমুহূর্তের জন্য মিস হয়ে গেল অদ্রিজার। তুর্য আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত, চুলে সামান্য বয়সের ছাপ বা পরিপক্বতার ছোঁয়া, চোখে সেই চেনা গভীরতা। তুর্যও তাকে দেখতে পেয়েছে। দুজনের দৃষ্টি যখন একে অপরের ওপর গিয়ে আটকে গেল, তখন বাতাসে ভেসে বেড়ানো বৃষ্টির ফোঁটাগুলোও যেন স্তব্ধ হয়ে গেল।

 

কোনো কথা হলো না প্রথম কয়েক সেকেন্ড। কেবল দুই জোড়া চোখের ভাষা একে অপরের সঙ্গে কথা বলে গেল। চার বছরের জমানো বরফ যেন এক পলকে গলতে শুরু করল। তুর্য ধীর পায়ে এগিয়ে এল বারান্দার সিঁড়ি বেয়ে নিচে। তার বুকের ভেতর তখন ঝড় বইছে। অদ্রিজাও পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল, নড়বার শক্তিটুকুও তার পায়ে যেন আর অবশিষ্ট ছিল না।

 

"তুমি... এখানে?" তুর্যের গলাটা একটু কাঁপল। সেই চেনা গম্ভীর কণ্ঠস্বর, যা শোনার জন্য অদ্রিজার কান এতদিন আকুল ছিল।

 

"এমনিই... কাজে এসেছিলাম," কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে অস্পষ্ট স্বরে উত্তর দিল অদ্রিজা। তার গলার স্বর কেঁপে উঠল।

 

তুর্য মুচকি হাসল। সেই হাসিতে এক অদ্ভুত বিষণ্নতা লুকিয়ে ছিল। সে পকেট থেকে হাত বাড়িয়ে একটা পুরোনো হলুদ রঙের খাম বের করল। খামের কাগজটা কিছুটা হলদে হয়ে গেছে, বহুদিনের পুরোনো মোড়ক।

 

"এটা তোমার জন্য," তুর্য শান্ত গলায় বলল। "অনেক বছর আগে লেখা। তোমাকে সেদিনই দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু সাহস হয়নি। খামে ভরার পর আর পাঠানো হয়ে ওঠেনি।"

 

অদ্রিজা ভ্রু কুঁচকে খামটার দিকে তাকিয়ে রইল। তার বুকটা হাহা করে উঠল। কী আছে এই চিঠির ভেতরে? যে কথাগুলো তুর্য মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কখনো বলতে পারেনি, তা কি এই কাগজের পাতায় বন্দি করে রেখেছে?

 

বৃষ্টি তখন নামল অঝোর ধারায়। চারপাশের প্রকৃতি যেন ধুয়েমুছে একাকার হয়ে গেল। তুর্য তাকে ঘরের ভেতরে ডেকে নিল। পুরোনো সেই কাঠের আসবাবপত্র, ঘরের কোণে রাখা টেবিল ল্যাম্প—সবকিছু যেন তাদের ফেলে আসা দিনগুলোকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। ঘরের ভেতরটা তখন একটা স্নিগ্ধ আলোয় মোড়ানো। বাইরে বৃষ্টির ছাঁট এসে পড়ছে জানালায়।

 

অদ্রিজা টেবিলের পাশে সোফায় বসল, আর তুর্য তার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে খামটা টেবিলের ওপর রাখল। ঘরের আবছা আলোয় দুজনের দীর্ঘশ্বাস বাতাসের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে গেল। অদ্রিজার আঙুলগুলো কাঁপছে। সে ধীরে ধীরে খামের মুখটা খুলল। ভেতর থেকে বের করে আনল ভাঁজ করা কয়েকটা পুরোনো কাগজ। পাতার পর পাতা জুড়ে তুর্যের সেই পরিচিত হাতের লেখা।

 

প্রথম লাইনটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই অদ্রিজার চোখ দুটো জলে ভিজে গেল। তুর্য লিখেছে—‘অদ্রিজা, তোকে ভালোবাসার কথা কখনোই মুখে বলতে পারিনি। কারণ আমার ভয় হতো, যদি তুই এই অনুভূতিকে কোনো নাম দিয়ে ছোট করে দিস! আমার কাছে তুই কোনো নামের মোহড়াবিহীন এক তীব্র আসক্তি। যখনই তোর কাছাকাছি আসি, আমার ভেতরের সব প্রতিরোধ ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।’

 

চিঠির প্রতিটি শব্দ যেন একেকটি জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো অদ্রিজার হৃদয়ে এসে আঘাত করতে লাগল। সে বুঝতে পারল, সে এতদিন যাকে দূরত্ব ভেবেছিল, তা আসলে ছিল দুজনের তীব্র অন্ধত্বের ফল। তুর্য তার সামনে এসে বসল। খুব কাছাকাছি, এত কাছে যে দুজনের নিশ্বাসের গরম ছোঁয়া একে অপরকে স্পর্শ করছে। ঘরের সেই নিস্তব্ধতার মাঝে তাদের হৃদস্পন্দনের শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।

 

তুর্য হাত বাড়িয়ে অদ্রিজার ঠান্ডা আঙুলগুলো নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিল। সেই ছোঁয়া মাত্রই অদ্রিজার শরীরের ভেতর দিয়ে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। কত বছর পর তুর্যের হাতের সেই উষ্ণতা সে ফিরে পেল! চার বছরের সমস্ত জমাট বাঁধা অভিমান, দুঃখ আর না পাওয়ার যন্ত্রণা একনিমেষে বরফ হয়ে গলে জল হয়ে গেল।

 

"কেন পাঠাওনি এই চিঠিটা?" অদ্রিজা ফিসফিস করে জানতে চাইল, তার কণ্ঠস্বর তখন কান্নায় ভেঙে আসছে।

 

তুর্য গভীর চোখে তার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে তার আরও কাছে সরে এল। তার চোখের কোণেও তখন জল চিকচিক করছে। সে খুব নিচু কিন্তু স্পষ্ট গলায় উত্তর দিল, "কারণ আমি চেয়েছিলাম আমার না বলা কথাগুলো শুধু চিঠিতে নয়, আমার স্পর্শে তুই টের পাস। কিন্তু তখন সাহস ছিল না, আজ আর সেই ভয়ের কোনো মানে নেই।"

 

বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। প্রকৃতির সেই প্রলয় কাঁপিয়ে দেওয়া শব্দের মাঝেও ঘরে নেমে এল গভীর, তীব্র এক উত্তাপ। অদ্রিজা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে সোজা হয়ে তুর্যের আরও কাছে ঝুঁকে এল। তাদের ঠোঁটের দূরত্ব তখন মাত্র এক ইঞ্চির ব্যবধানে। ঘরের আলোটা একটু কাঁপল, আর ঠিক তখনই তাদের চার বছরের সমস্ত দূরত্ব, সমস্ত না বলা কথার অবসান ঘটিয়ে একে অপরের বুকে আছড়ে পড়ল এক তীব্র, গভীর উত্তাল আবেগের ঝড়।

বাইরের অবিরাম বৃষ্টির ছাঁট ঘরের জানালা গলিয়ে এসে ভিজিয়ে দিচ্ছিল মেঝের কিছুটা অংশ। রুমের ভেতরে তখন কেবল জলীয় বাষ্পের উষ্ণতা আর দীর্ঘ চার বছরের জমে থাকা তৃষ্ণার তুরঙ্গ। অদ্রিজা আর তুর্যের মাঝখানের সমস্ত অদৃশ্য দেওয়াল চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। তুর্যের হাতের শক্ত উষ্ণ মুঠো থেকে অদ্রিজার আঙুলগুলো আরও গভীরে জড়িয়ে গেল তার তালুতে। সেই ছোঁয়া যেন এক বিদ্যুৎপ্রবাহের মতো ছড়িয়ে পড়ল অদ্রিজার সারা শরীরে। বুকের ভেতর কেমন যেন এক মিষ্টি চিনচিনে ব্যথা আর তীব্র আকুলতা মোচড় দিয়ে উঠল।

 

তুর্য আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। সে ঝুঁকে পড়ে অদ্রিজার চিবুকটা নিজের আঙুলের ডগায় আলতো করে তুলে ধরল। তার চোখের গভীরের সেই চেনা চাওনি—যা অদ্রিজাকে সবসময় বুঁদ করে রাখত, আজও একইরকম তীব্রতায় ভাস্বর।

 

"এত বছর কোথায় ছিলি অদ্রিজা?" তুর্যের গলার স্বরটা ভারী হয়ে এল, যেন ফুসফুসের সমস্ত বাতাস একবারে টেনে নিয়ে সে কথাগুলো উচ্চারণ করছে। "প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্তে তোকে ছাড়া বেঁচে থাকা যে কী নরকীয় যন্ত্রণা, তা কেবল এই বুকটাই জানে।"

 

অদ্রিজা কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার চোখের কোণ গড়িয়ে গড়িয়ে নেমে এল নোনা জলের ফোঁটা। সে নিজের মুখটা তুর্যের আরও একটু কাছে নিয়ে এল, ঠিক তার বুকের ওমে মুখটা গুঁজে দিতে চাইল। তুর্য আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে দুই বাহুর বেড়াজালে অদ্রিজাকে এক নিমিষে নিজের একদম বুকে টেনে নিল। তাদের শরীরের মায়াবী উষ্ণতা একাকার হয়ে গেল ঘরের মৃদু আলোর সাথে। চার বছরের সমস্ত দূরত্ব, সমস্ত না বলা কথা, অভিমান আর না পাওয়ার হাহাকার যেন এই একটা আলিঙ্গনের ভেতর দিয়ে ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যেতে লাগল।

 

তুর্যের ঠোঁট এসে ছোঁয়া রাখল অদ্রিজার কপালে। এক দীর্ঘ ও গভীর চুম্বনে সে যেন বুঝিয়ে দিল গত চার বছরের সমস্ত জমানো কষ্ট। সেই ছোঁয়া মাত্রই অদ্রিজার চোখের পাতা দুটো আপনাআপনি বুজে এল। সে তুর্যের শার্টের কলার খামচে ধরে নিজের সর্বস্ব দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। তাদের নিশ্বাসের গতি তখন বেশ দ্রুত, ঘরের ভেতরের বাতাস যেন আরও কিছুটা ভারী ও উষ্ণ হয়ে উঠেছে।

 

আস্তে আস্তে তাদের ঠোঁট দুটো দূরত্ব ঘুচিয়ে কাছাকাছি এল। বাইরের ঝুমঝুম বৃষ্টির শব্দের সাথে মিশে গেল এক গভীর, মায়াবী আর তীব্র আকুলতার চুম্বন। সে চুম্বনে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না, ছিল কেবল দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান আর বুকফাটা ভালোবাসার আদিম প্রকাশ। অদ্রিজার শরীরের প্রতিটি কোষে তখন এক অজানা নেশা জাঁকিয়ে বসেছে। তুর্যের হাতের স্পর্শে তার পিঠের শিড়দাঁড়া বেয়ে বয়ে গেল এক তীব্র শিহরণ। সে অনুভব করল, এই মানুষটি ছাড়া তার অস্তিত্ব সম্পূর্ণ অর্থহীন।

 

তুর্য অদ্রিজাকে আলতো করে সোফা থেকে তুলে নিয়ে জানালার ধারের নরম বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। জানালার কাচে বৃষ্টির ফোঁটাগুলোর পড়ার শব্দ আর তাদের দু'জনের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো আওয়াজ তখন তাদের কানে পৌঁছচ্ছিল না। ঘরের আবছা আলো-আঁধারি পরিবেশে তাদের দুজনের শরীরের নিখাদ ওম আর উত্তাপ এক অদ্ভুত ঘোরের সৃষ্টি করল। তুর্য তার বাহুডোরে অদ্রিজাকে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলল, "আর কখনো তোকে কোথাও যেতে দেব না অদ্রিজা। এই দূরত্ব আর সহ্য হয় না।"

 

অদ্রিজা তুর্যের বুকে হাত রেখে তার চোখের দিকে তাকাল। তার চোখের সেই কাজল ভেজা দৃষ্টি আর ঠোঁটের মৃদু কাঁপন বুঝিয়ে দিল সেও আর কোনোদিন এই বাঁধন হারাতে চায় না। তাদের শরীর ও মনের সমস্ত দেওয়াল ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। বাইরের প্রলয়ঙ্করী বৃষ্টির তোড়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ঘরের ভেতরে শুরু হলো ভালোবাসার এক গভীর, উত্তাল আর পবিত্র অধ্যায়। একে অপরের নিঃশ্বাসে মিশে যাওয়ার সেই দুর্লভ মুহূর্তে পৃথিবীর সমস্ত নিয়ম, সমস্ত অহংকার তুচ্ছ হয়ে গেল।

 

বৃষ্টি থামল রাতের দিকে। মেঘ কেটে গিয়ে আকাশে দুয়েকটা তারার মিটিমিটি আলো উঁকি দিল। ঘরের ভেতরে তখন এক অদ্ভুত শান্তি নেমে এসেছে। বিছানার ওম আর চাদরের ভাঁজে জড়িয়ে শুয়ে আছে অদ্রিজা। তার মাথাটা রাখা তুর্যের প্রশস্ত বুকের ওপর। তুর্য এক হাত দিয়ে অদ্রিজার পিঠের নরম চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে, আর অন্য হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে তার কোমর।

 

"জানি না আগামীকাল কী হবে," অদ্রিজা তুর্যের বুকের ওপর আঙুল ঘষতে ঘষতে ফিসফিস করে বলল। "আমার কাজের মেয়াদ তো প্রায় শেষের দিকে। আমাকে আবার ফিরে যেতে হবে ওই শহরে।"

 

তুর্য সঙ্গে সঙ্গে তার চুলে হাত বুলিয়ে দেওয়া থামাল। সে অদ্রিজাকে আরও একটু শক্ত করে বুকে টেনে নিয়ে তার কপালে ঠোঁট ছোঁয়াল। গম্ভীর অথচ দৃঢ় গলায় সে বলল, "আর কোথাও যাওয়ার দরকার নেই। এবার থেকে তুই আমার সাথেই থাকবি। এই ছিমছাম শহরে, এই পুরোনো বাড়ির চিলেকোঠায় আমাদের নতুন করে শুরু হবে।"

 

অদ্রিজা মুখ তুলে তুর্যের মুখের দিকে তাকাল। তার মুখে এক প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। এত বছরের জমাট বাঁধা মেঘ কেটে গিয়ে জীবনে যেন অবশেষে এক ফালি সোনালী রোদের দেখা মিলল।

সকালের নরম রোদ যখন কদম গাছের পাতা ভেদ করে ঘরের জানাজায় এসে পড়ল, তখন অদ্রিজার ঘুম ভাঙল এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে। চারপাশের চেনা পরিবেশটা আজ আর অচেনা বা বিষণ্ন মনে হচ্ছে না। বরং মনে হচ্ছে এই বাড়িটি, এই গলিটি যেন এতদিন তাদেরই ফেরার অপেক্ষায় প্রহর গুনছিল। সে পাশ ফিরতেই দেখতে পেল, তুর্য গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তার এক হাত অদ্রিজার কোমর জড়িয়ে রেখেছে, যেন অবচেতন মনেও সে হারানোর ভয়ে ভীত। অদ্রিজা আলতো হাতে তুর্যের চুলে আঙুল বুলিয়ে দিল। তুর্য মৃদু নড়ে উঠল এবং চোখ মেলে তাকাল। তার চোখে তখন ঘুম ভাঙার আলস্যের সাথে মিশে আছে একরাশ স্নিগ্ধ ভালোলাগা।

 

"শুভ সকাল," তুর্যের গলাটা ঘুম ঘুম ভারি কণ্ঠে বেরিয়ে এল।

 

"শুভ সকাল," মিষ্টি হেসে উত্তর দিল অদ্রিজা। তুর্য এক টানে তাকে আরও একটু নিজের কাছে টেনে এনে তার কাঁধে মুখ গুজল।

 

গত রাতের সেই তীব্র ঝড় আর উত্তাল আবেগের পর আজকের সকালটা তাদের জীবনে এনে দিয়েছে এক নতুন অভয় বাণী। আজ আর কোনো দ্বিধা নেই, কোনো লুকোচুরি নেই, নেই কোনো অভিমানের কালো মেঘ। দুজনে মিলে সিদ্ধান্ত নিল, অতীতের চার বছরের এই দীর্ঘ যন্ত্রণার অধ্যায়কে পেছনে ফেলে তারা এবার নতুন করে জীবন সাজাবে। অদ্রিজা তার চাকরি ও শহরের পাট পাকাপাকিভাবে গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। যে নদীর পাড় তাদের ভালোবাসার সাক্ষী, সেই পাড়েই তারা চিরদিনের জন্য নিজেদের ঘর বাঁধবে।

 

দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামল। মেঘহীন নীল আকাশে শরতের সাদা তুলার মতো মেঘ ভেসে বেড়াতে শুরু করেছে। পুরোনো পাড়ার মোড়ে রিকশা থেকে নামল তারা। স্থানীয় চায়ের দোকানে চা খাওয়ার সময় পাড়ার পুরোনো এক চা বিক্রেতা মুচকি হেসে বলল, "কী মিয়াভাই, অনেকদিন পর তো দুজনকে একসাথে দেখলাম!" তুর্য শুধু মৃদু হেসে অদ্রিজার হাতটা আরও শক্ত করে নিজের মুঠোয় চেপে ধরল। সেই হাসিতেই লুকিয়ে ছিল তাদের সমস্ত উত্তর।

 

সন্ধ্যায় তারা এসে দাঁড়াল সেই পুরোনো দোতলা বাড়ির বারান্দায়। যে বারান্দায় দাঁড়িয়ে একদিন তুর্য তার না বলা চিঠিটা অদ্রিজার হাতে তুলে দিয়েছিল, আজ সেই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে তারা দেখছে পশ্চিম আকাশে সূর্য ডোবার রক্তিম আভা।

 

অদ্রিজা তুর্যের কাঁধে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে আছে। বাতাসের সাথে কদম ফুলের গন্ধ ভেসে আসছিল। তুর্য তার ডান হাত বাড়িয়ে অদ্রিজার চিবুকটা উঁচুতে তুলে ধরল। তার চোখের গভীর চাহনিতে তখন শুধু অন্তহীন প্রেম আর অধিকারবোধ।

 

"এবার তোকে আর কোথাও যেতে দেব না," তুর্য খুব নরম কিন্তু দৃপ্ত কণ্ঠে বলল।

 

অদ্রিজা মুচকি হেসে তার বুকে হাত রেখে ফিসফিস করে উত্তর দিল, "আর কোথাও যাওয়ার ইচ্ছেও আমার নেই। যেখানে তুমি আছ, আমার পুরো পৃথিবী ঠিক সেখানেই।"

 

দুজনের ঠোঁট আবার একবার মিলে গেল এক স্নিগ্ধ, দীর্ঘ চুম্বনে। বাইরের কোলাহল, শহরের ব্যস্ততা আর অতীতের সমস্ত দীর্ঘশ্বাস পেছনে ফেলে তাদের এই ভালোবাসার গল্প অবশেষে পেল এক চিরন্তন পূর্ণতার আকাশ।

....
👁 54