মাঘ মাসের শেষ বিকালের নরম রোদটুকু তখন নূরায়ার পড়ার টেবিলের ওপর এসে ক্লান্ত হয়ে এলিয়ে পড়েছিল। বাইরে একটা শালিক পাখি একটানা ডেকে চলেছে, যেন কী এক অভিমান জমে আছে তার ছোট্ট বুকে। নূরায়া জানলার ধারে বসে ডায়েরির পাতায় কলম ছোঁয়াচ্ছিল। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে চমকে উঠল সে। দরজা খুলতেই দেখল, বাড়ির ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে আছে এক লম্বা, ঋজু দেহের যুবক—আভির। চোখে তার এক অচেনা ঔদ্ধত্য, অথচ ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক রহস্যময় হাসি।
পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের নির্দেশেই আভিরের এই হঠাৎ আগমন। শহরের নামকরা এক কর্পোরেট ফার্মের উর্ধতন কর্মকর্তা সে, অথচ তার চালচলনে একটা গ্রাম্য মাটির গন্ধ আর শহরের আধুনিকতার দারুণ এক মিশ্রণ রয়েছে। নূরায়া তখন সবেমাত্র তার মাস্টার্স শেষ করেছে। তার ছোট্ট, গোছানো দুনিয়াটা ছিল নিজের মতো করে গড়া। কিন্তু আভির আসার পর মুহূর্তে সেই দুনিয়ায় যেন এক তীব্র ঘূর্ণবাতাস বইতে শুরু করল।
প্রথম দেখাতেই দুজনের মধ্যে একটা অদৃশ্য স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়েছিল। আভির সোফায় বসে চা খাওয়ার সময় অবহেলায় বলেছিল, "আপনাদের এই বাড়িটার জানলাগুলোর দিক বিন্যাস একদম ভুল। আলো ঠিকমতো ঢোকে না।"
নূরায়া ভ্রু কুঁচকে জবাব দিয়েছিল, "আমার ঘরের আলো কিংবা বাতাস নিয়ে আপনার মাথা না ঘামালেও চলবে। আমরা নিজেদের মতো ভালো আছি।"
আভির মৃদু হেসেছিল, কিন্তু সেই হাসিতে কোনো উষ্ণতা ছিল না, বরং একটা খোঁচা ছিল। নূরায়া মনে মনে ভেবেছিল, এমন অহংকারী আর নাকউঁচু মানুষ সে জীবনে দেখেনি। কিন্তু কে জানত, এই প্রথম বাকবিতণ্ডাই তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় হতে চলেছে?
এর ঠিক দুসপ্তাহ পর, পারিবারিক এক চরম রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের আবর্তে পড়ে দুই পরিবারের মুরুব্বিরা একপ্রকার জোর করেই তাদের দুজনের বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। নূরায়ার তীব্র আপত্তি, চোখের জল এবং ভেতরের প্রচণ্ড ক্ষোভ—কোনো কিছুই এই আকস্মিক পরিণতি আটকাতে পারেনি। বাবা-মায়ের সম্মান আর সামাজিক চাপের বেড়াজালে বন্দি হয়ে সেদিন লাল চেলিতে মুড়ে নূরায়াকে বসতে হয়েছিল বিয়ের পিঁড়িতে। আভিরের পাশে বসার সময় নূরায়ার বুকের ভেতরটা ঘৃণায় আর অভিমানে কেঁপে উঠেছিল। সে মনে মনে পণ করেছিল, এই মানুষটাকে সে কখনোই স্বামী হিসেবে মেনে নেবে না।
বিয়ের পর আভিরের অভিজাত ফ্ল্যাটে পা রাখার প্রথম রাতটা ছিল এক থমথমে যুদ্ধক্ষেত্রের মতো। চারদিকে চন্দ্রমল্লিকা আর রজনীগন্ধার তীব্র সুবাস, অথচ দুজনে দু মেরুর বাসিন্দা। আভির নিজের কোটের বোতাম খুলতে খুলতে ঠান্ডা গলায় বলেছিল, "ভয় পাওয়ার কিছু নেই নূরায়া। এই বিয়েটা একটা সামাজিক চুক্তি মাত্র। আমার জীবনে তোমার অধিকার যেমন সীমিত, তোমার জীবনেও আমার উপস্থিতি কেবল একটা বাধ্যবাধকতা।"
নূরায়া শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে জবাব দিয়েছিল, "এই কথাটার জন্যই আমি অপেক্ষা করছিলাম। আপনার ওই কৃত্রিম অধিকার আমার বিন্দুমাত্র চাই না।"
কিন্তু মানুষের মন কি আর শুধু যুক্তির নিয়ম মেনে চলে? দিন গড়াতে লাগল। এক ছাদের নিচে থেকেও তারা যেন দুটি ভিন্ন গ্রহের বাসিন্দা। তবে আভিরের চরিত্রের অন্য একটা দিক ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে শুরু করল। নূরায়া বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর বাঁধিয়ে বসল একদিন। রাতে যখন সে তীব্র কাপুনি দিয়ে বিছানায় শুয়ে ছটফট করছে, তখন ঘুম ভেঙে দেখল—আভির তার মাথার পাশে বসে আছে। তার কপালে ঠান্ডা জলের ভেজা কাপড় বুলিয়ে দিচ্ছে সে। নূরায়ার গোঙানি শুনে আভিরের চোখের কোণে যে দুশ্চিন্তার ছায়া জমেছিল, তা কোনো অভিনয় ছিল না। পরদিন সকালে বিছানার পাশে এক কাপ গরম তুলসী চা আর প্রয়োজনীয় ওষুধ সাজিয়ে রেখে আভির অফিসে চলে গিয়েছিল। ডেস্কে একটা ছোট নোটে লেখা ছিল—"ওষুধটা সময়মতো খেয়ে নিও।"
এই ছোট্ট ছোট্ট যত্নগুলো নূরায়ার তৈরি করা দুর্ভেদ্য প্রাচীরে যেন ফাটল ধরাতে শুরু করল। সে টের পেল, আভিরের শীতল মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক পরম যত্মশীল মানুষ। যখনই নূরায়া একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে কফি কাপে চুমুক দিত, আভির নিশব্দে এসে তার কাঁধে একটা পশমিনা শাল জড়িয়ে দিত। কোনো কথা বলত না, শুধু তার উষ্ণ হাতের ছোঁয়াটুকু রেখে যেত। নূরায়া নিজের অজান্তেই আভিরের এই নীরব সান্নিধ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছিল। সে বুঝতে পারছিল না, এই দুর্বলতা কি তার একাকীত্বের ফল, নাকি তিলে তিলে জন্ম নেওয়া কোনো গভীর আকর্ষণের টান?
একদিন গভীর রাতে তুমুল ঝড় বৃষ্টি শুরু হলো। জানলা দিয়ে হু হু করে জল ঢুকে পড়ার উপক্রম হওয়ায় নূরায়া ভয়ে বিছানায় গুটিয়ে বসল। ঠিক তখনই ঘরের দরজা ঠেলে আভির ভেতরে ঢুকল। তার চুলগুলো ভেজা, শার্টের হাতা গোটানো। নূরায়ার ভয় পাওয়া মুখটা দেখে সে আর দূরত্ব বজায় রাখতে পারল না। সোজা এসে নূরায়ার বিছানার কিনারে বসল। নূরায়া কিছু বলার আগেই আভির তার চুলে আলতো করে আঙুল বুলিয়ে ফিসফিস করে বলল, "ভয় পেও না নূরায়া, আমি আছি তো।"
সেই মুহূর্তের নৈকট্য সমস্ত দূরত্ব ধুয়ে মুছে একাকার করে দিল। আভিরের চোখের গভীর চাউনি নূরায়ার হৃৎপিণ্ডের গতি বাড়িয়ে দিল। আভির ধীরে ধীরে তার মুখটা নূরায়ার আরও কাছে নিয়ে এল। জানলার বাইরে তখন বৃষ্টির জোর কমে এসেছে, কিন্তু ঘরের ভেতরে তৈরি হয়েছে এক তীব্র, মায়াবী উষ্ণতা। আভিরের হাত দুটো যখন নূরায়ার কোমর জড়িয়ে ধরল, তখন নূরায়া আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সমস্ত রাগ, অভিমান আর না-বলা কথা এক নিমেষে উবে গেল। আভিরের উষ্ণ ও গভীর চুম্বনে নূরায়া হারিয়ে ফেলল তার সমস্ত প্রতিরোধ। সেই প্রথম তারা একে অপরকে শুধু শরীর দিয়ে নয়, মন দিয়ে উপলব্ধি করল। গভীর রাতে আভিরের বুকের ওমে মাথা রেখে নূরায়া যখন চোখ বুজল, তখন তার মনে হয়েছিল—এই মানুষটাই তার একমাত্র ঠিকানা।
কিন্তু তাদের এই নিখুঁত সুখের রাজ্যে ঝড় তোলার জন্য তখন ঘড়ির কাঁটা ঠিক পথেই এগোচ্ছিল। কে জানত, পরদিন সকালেই দরজায় কড়া নাড়বে এক অতীতে ফেলে আসা ঝড়? আভিরের জীবনের এমন এক মানুষ ফিরে আসবে, যে তাদের এই সদ্য কুঁড়ি ধরা সম্পর্কটাকে একেবারে তছনছ করে দিতে উদ্যত হবে? নূরায়া তখনো জানত না, ভালোবাসার আসল পরীক্ষা তো সবেমাত্র শুরু হতে চলেছে।
প্রথম রাতের সেই গভীর মায়াবী মুহূর্তের পর নূরায়া এবং আভিরের সম্পর্কের সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছিল। যে দূরত্ব আর অহংকার তাদের আলাদা করে রেখেছিল, তা যেন এক নিমিষে বরফের মতো গলে জল হয়ে গেছে। এখন আর তাদের মধ্যে কোনো মৌনতা বা লুকোচুরি ছিল না। সকালে ঘুম থেকে জেগে নূরায়া দেখত আভির তার কপালে নরম একটা চুমু এঁকে অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। রান্নাঘরে চা বানানোর সময় আভির পেছন থেকে এসে তাকে জড়িয়ে ধরত, কানে কানে ফিসফিস করে বলত, "আজ সকালে তোমার হাতের চা না খেলে আমার দিনই শুরু হয় না, নূরায়া।"
নূরায়া লজ্জায় লাল হয়ে যেত, অথচ তার বুকের ভেতরটা এক অদ্ভুত সুখে ভরে উঠত। সে বুঝতে পেরেছিল, এই মানুষটার কঠোর ব্যক্তিত্বের নিচে রয়েছে এক অতীব কোমল সমুদ্র, যেখানে ডুব দিলে আর ফিরে আসতে ইচ্ছে করে না। ছুটির দিনগুলোতে তারা একান্তে সময় কাটাত। ছাদের ওপর বেলি ফুলের টবের পাশে পাশাপাশি বসে কফি খাওয়া, কিংবা জানলার ধারে দাঁড়িয়ে এক চাদরে মুড়ে বৃষ্টি দেখা—সব মিলিয়ে তাদের জীবনটা যেন একটা রূপকথার মতো সুন্দর হয়ে উঠছিল। আভিরের চোখেমুখে সবসময় নূরায়াকে আগলে রাখার একটা অদ্ভুত ব্যাকুলতা থাকত।
কিন্তু মানুষের এই সুখের স্থায়িত্ব বোধহয় খুব বেশি দিন থাকে না। প্রকৃতির নিয়মেই মেঘ না চাইতে কখনো কখনো প্রবল ঝড় নিয়ে হাজির হয়।
সেদিন ছিল শুক্রবার। বিকেলের দিকে আকাশটা হঠাৎ কেমন যেন গুমোট হয়ে উঠেছে। নূরায়া ড্রয়িংরুমে বসে বই পড়ছিল, ঠিক তখনই দরজায় সুমধুর কিন্তু পরিচিত একটা কলিং বেলের শব্দ হলো। নূরায়া ভাবল আভির বোধহয় অফিসের চাবি ভুলেই গেছে, তাই দরজা খুলে দিল। কিন্তু দরজা খুলতেই তার পা যেন মাটির সাথে আটকে গেল।
সামনে দাঁড়িয়ে এক পরমাসুন্দরী রমণী। পরনে দামি ডিজাইনার শাড়ি, চোখে আধুনিক রোদচশমা, আর চুলে একটা নিখুঁত পরিপাটি ভাব। তার নাম মেহবিশ। আভিরের অতীতের ছায়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাওয়ার সময় আভিরের জীবনে একাই রাজত্ব করত এই মেহবিশ। ক্যারিয়ারের মোহে আভিরের শত অনুরোধ উপেক্ষা করে মেহবিশ সেদিন বিদেশে চলে গিয়েছিল, আভিরের বুকটা ভেঙে চুরমার করে দিয়ে। আর আজ, ঠিক যখন আভির তার জীবনে নূরায়ার ছোঁয়ায় নতুন করে বাঁচতে শুরু করেছে, তখন মেহবিশ হিরের মতো দ্যুতি ছড়ায়ে ফিরে এসেছে তার জীবনে।
মেহবিশ বিন্দুমাত্র অনুমতি না নিয়েই সোজা ঘরের ভেতর পা রাখল এবং চারপাশটা একবার চোখ বুলিয়ে সোফায় বসে বসল। তার মুখে একটা অহংকারী ও চতুর হাসি। সে নূরায়ার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল, "তুমি নিশ্চয়ই নূরায়া? আভিরের বর্তমান তথাকথিত স্ত্রী? জানতাম না ও এমন সাধারণ কাউকে বিয়ে করবে।"
নূরায়ার রক্তিম মুখটা মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে গেল। সে নিজেকে সামলে নিয়ে আত্মমর্যাদার সঙ্গে বলল, "স্বাগত আপনাকে। কিন্তু আমার ঘরে এসে আমার পরিচয় নিয়ে ব্যঙ্গ না করলেই পারতেন। আভির অফিসে আছে, ফিরতে একটু দেরি হবে। আপনি বসুন, আমি চা নিয়ে আসছি।"
মেহবিশ সোফায় একটু হেলান দিয়ে বসল এবং অবজ্ঞার সুরে বলল, "চা খাওয়ার ফুরসত আমার নেই। আমি এসেছি আভিরের সঙ্গে একান্ত কথা বলতে। তোমরা জোর করে একটা পরিস্থিতির শিকার হয়ে বিয়ে করেছ ঠিকই, কিন্তু আভির আজও আমাকেই ভালোবাসে। আমাদের মাঝের সেই আট বছরের ইতিহাস এত সহজে মুছে যাওয়ার নয়।"
নূরায়ার হৃৎপিণ্ডটা যেন একমুহূর্তের জন্য থেমে গেল। মেহবিশের কথাগুলো বিষাক্ত তীরের মতো তার বুকে এসে বিঁধল। ঠিক সেই মুহূর্তে অফিসের চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল আভির। হলঘরে মেহবিশকে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আভিরের মুখের সমস্ত রঙের প্রলেপ নিমেষে উড়ে গেল। তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল, আর শরীরটা হয়ে উঠল পাথরের মতো শক্ত।
"মেহবিশ? তুমি... তুমি এখানে?" আভিরের গলা দিয়ে স্বর যেন বের হচ্ছিল না।
মেহবিশ মুচকি হেসে আভিরের আরও কাছে এগিয়ে গেল, তার কাঁধে হাত রেখে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ স্বরে বলল, "কেন, অবাক হলে নাকি, আভি? আমি ফিরে এসেছি। তোমার জন্য সব ছেড়ে ফিরে এসেছি। এতদিন যা ভুল ছিল, আজ তা শুধরে নিতে চাই।"
নূরায়া আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াতে পারল না। তার চোখের কোণে জমে থাকা জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। সে দ্রুত পায়ে শোবার ঘরে চলে গেল এবং দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে বিছানার ওপর ভেঙে পড়ল। তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। বুক ফেটে কান্না আসছে, অথচ শব্দ করে কাঁদতে তার আত্মসম্মানে বাঁধছে। সে ভাবছিল, আভির কি এখনো মেহবিশকেই চায়? মেহবিশের ওই ছোঁয়া কি আভিরের মনে পুরোনো দিনের স্মৃতি জাগিয়ে তুলেছে?
ওদিকে ড্রয়িংরুমে তখন চলছে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি। আভির এক ঝটকায় মেহবিশের হাতটা নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে দিল। তার চোখে তখন আগুন জ্বলছে। আভির কঠোর ও রূঢ় গলায় বলে উঠল, "মেহবিশ, যে অধ্যায় আমি বহু আগেই পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছি, তা আবার নতুন করে খোলার কোনো মানে হয় না। আজ আমার জীবনে নূরায়া রয়েছে। ওকে ছাড়া আমি অন্য কিছু ভাবতে পারি না। দয়া করে আমার জীবন থেকে চলে যাও।"
মেহবিশ মৃদু হেসে আত্মবিশ্বাসী সুরে বলল, "এত সহজে আমাকে তাড়াতে পারবে না, আভি। তোমার মন আজও জানে তুমি কার জন্য অপেক্ষা করতে। আমি কাল আবার আসব।" এই কথা বলেই মেহবিশ সেখান থেকে বেরিয়ে গেল।
দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ পেয়ে আভির দ্রুত শোবার ঘরের দিকে ছুটে গেল। কিন্তু শোবার ঘরের দরজা ভেতর থেকে লক করা। আভির দরজায় ধাক্কা দিয়ে অস্থির গলায় ডাকল, "নূরায়া... দরজা খোলো প্লিজ। মেহবিশ যা বলেছে, তার এক ফোঁটাও সত্যি নয়। তুমি আমার কথা শোনো।"
ভেতর থেকে নূরায়ার কাঁপাকাঁপা গলা ভেসে এল, "আমাকে একা থাকতে দিন, আভির। আপনার অতীতের এই ঝড় সামলানোর শক্তি আমার নেই।"
আভিরের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। সে বুঝল, তাদের ভালোবাসার সামনে আজ এক বিশাল দুর্ভেদ্য প্রাচীর এসে দাঁড়িয়েছে। আর এই প্রাচীর ভাঙতে না পারলে তাদের সম্পর্ক চিরকালের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে।
শোবার ঘরের ভারী দরজার ওপাশে তখন নিস্তব্ধতা, আর এপাশে আভিরের বুকের ভেতরটা পুড়ছে এক অজানা আশঙ্কায়। নূরায়া সারারাত এক ফোঁটাও ঘুমায়নি। বালিশটা তার চোখের জলে ভেজা। আভির বাইরে সারারাত ফ্লোরে পায়চারি করেছে, একবারের জন্যও ঘরে যায়নি, শুধু দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বারবার নিঃশব্দে প্রার্থনা করেছে—নূরায়া যেন তার মনের ভুল বুঝতে পারে।
পরদিন সকালেই দরজায় আবার কড়া নাড়ার শব্দ হলো। মেহবিশ এবার একা আসেনি, সাথে এনেছে তার সুচতুর পরিকল্পনা। ড্রয়িংরুমে বসে সে আভিরের সামনে একটা দামি কাগজ আর কিছু ছবি এনে রাখল। ঠান্ডা গলায় সে বলল, "আভি, ভালো করে ভেবে দেখো। বিদেশে আমাদের সেই পুরোনো প্রজেক্ট আর আমার বর্তমান কোম্পানির অংশীদারিত্ব—সবকিছু আজ তোমার হাতের মুঠোয়। এই সাধারণ মেয়েটাকে নিয়ে তোমার জীবন কি সারাজীবন একটা মফস্বলের গণ্ডির মধ্যে আটকে থাকবে? চলো, আমরা আগের মতো আবার সব ঠিক করে নিই।"
আভির এক পলক সেই কাগজগুলোর দিকে তাকাল, তারপর মেহবিশের চোখের দিকে তাকিয়ে এমন এক শীতল হাসি দিল, যা মেহবিশের মেরুদণ্ড দিয়ে এক বরফশীতল স্রোত বয়ে দিল। আভির টেবিল থেকে কাগজগুলো তুলে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ডাস্টবিনে ফেলে দিল। তার কন্ঠস্বরে ছিল এক তীব্র পাথুরে দৃঢ়তা, "মেহবিশ, তোমার ওই লোভের সাম্রাজ্য আর পুরোনো স্মৃতির কোনো মূল্য আমার কাছে এক চিলতে ধুলোর চেয়েও কম। তুমি চলে যাওয়ার পর আমি বুঝেছি ভালোবাসা মানে কী। নূরায়া আমার জীবনের সেই বৃষ্টি, যা আমার সমস্ত শূন্যতা ভিজিয়ে দিয়েছে। ওর মুখের এক ফোঁটা চোখের জলের দাম পৃথিবীর সমস্ত ঐশ্বর্যের চেয়েও অনেক বেশি। আজই এই বাড়ি থেকে চিরকালের মতো চলে যাও, আর কখনো ফিরে এসো না।"
মেহবিশের মুখের সমস্ত অহংকার মুহূর্তে ধুলিসাৎ হয়ে গেল। সে বুঝল, আভিরকে সে চিরকালের মতো হারিয়েছে। অপদার্থের মতো সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
এই সমস্ত কথা শোবার ঘরের খোলা ভেন্টিলেটর দিয়ে নূরায়ার কানে স্পষ্ট এসে পৌঁছাচ্ছিল। সে যখন শুনল আভির মেহবিশের সমস্ত প্রস্তাব এক লহমায় পায়ে ঠেলে তার প্রতি ভালোবাসার নিখাদ প্রমাণ দিয়েছে, তখন নূরায়ার বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত বরফ গলতে শুরু করল। সে বুঝতে পারল, এই মানুষটার মনে তার জন্য যে আসন পাতা হয়েছে, তা কোনো তুচ্ছ ঝড়ে নড়ার নয়।
দরজা খুলে নূরায়া যখন বাইরে বেরিয়ে এল, তখন তার চোখ দুটো সামান্য লাল, কিন্তু মুখে এক অপার্থিব স্বস্তির হাসি। আভির ক্লান্ত পায়ে সোফায় বসে হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরেছিল। নূরায়া নিঃশব্দে এগিয়ে গেল এবং আভিরের ঠিক সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।
আভির চমকে মুখ তুলল। নূরায়া তার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিয়ে নরম অথচ দৃঢ় গলায় বলল, "আমি ভুল বুঝেছিলাম, আভির। ক্ষমা করে দিও আমাকে।"
আভির আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে এক টানে নূরায়াকে নিজের বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরল। যেন বহুযুগের হারানো ধন ফিরে পেয়েছে সে। তাদের এই গভীর মিলন মুহূর্তটাকে আরও তীব্র করে তোলার জন্য আভির নূরায়ার চিবুকটা উঁচুতে তুলে ধরল। তার চোখে তখন ভালোবাসার এক উন্মাদ সমুদ্র। আভিরের ঠোঁট যখন নূরায়ার অধরে মিশে গেল, তখন ঘরের ভেতরের সমস্ত বাতাস যেন এক মায়াবী উষ্ণতায় ভারী হয়ে উঠল। সেই চুম্বনে কোনো তাড়া ছিল না, ছিল নিখাদ সমর্পণ আর গভীর রোমান্সের এক অনির্বচনীয় প্রকাশ। নূরায়া তার দুই হাত দিয়ে আভিরের ঘাড় জড়িয়ে ধরে সেই ভালোবাসার তীব্রতাকে নিজের মধ্যে শুষে নিল। সমস্ত অতীত, সমস্ত মেঘ কেটে গিয়ে তাদের জীবন এক নতুন সূর্যোদয়ের দিকে পা বাড়াল।
....