বিকেলের মৃদু রোদ্দুরটা কাঁচের জানলা গলে এসে মেহরাবীর লেখার টেবিলের ওপর লুটিয়ে পড়েছে। টেবিলে ছড়ানো ছিটানো কিছু কাগজ, একটা আধ-খালি চায়ের কাপ আর ল্যাপটপের স্ক্রিনটা জ্বলজ্বল করছে। মেহরাবী গভীর মনযোগে একটা নতুন উপন্যাসের প্লট সাজাচ্ছিল, কিন্তু মনের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসগুলো বারবার তার মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছিল। গত তিন বছর ধরে সে রাফিনের সাথে সংসার করছে। বাইরের পৃথিবীর কাছে তাদের জুটির প্রশংসার শেষ নেই। সবাই বলে, রাফিন যেন তার জন্য এক পরম প্রাপ্তি—শান্ত, ধীরস্থির এবং দায়িত্বশীল একজন মানুষ। কিন্তু মেহরাবীর নিজের ভেতরটা কেমন যেন শূন্যতায় মোড়ানো।
তার বারবার মনে হয়েছে, রাফিন তাকে মানসিকভাবে কোনো দিনই গুরুত্ব দেয়নি। এই ব্যস্ত শহরে রাফিনের দুনিয়াটা যেন কেবল তার অফিস, ফাইলপত্র, মিটিং আর কিছু অপ্রয়োজনীয় বোরিং মিটিংয়ের মাঝেই সীমাবদ্ধ। মেহরাবী বহুবার চেয়েছে একটু গভীর আড্ডা, একটু দীর্ঘ সময় একসাথে কাটানো, কিংবা হাত ধরে গোধূলাবেলায় রিকশায় ঘুরে বেড়ানো। কিন্তু রাফিনের মুখ থেকে সবসময় একটা কথাই শোনা গেছে—"মেহরাবী, তুমি তো জানোই প্রজেক্টের চাপটা কেমন। একটু বোঝো প্লিজ।"
এই "একটু বোঝো" শব্দটা শুনতে শুনতে মেহরাবীর কান পচে গিয়েছিল। তার মনে হতো, রাফিনের কাছে তার আবেগ, তার ইচ্ছা, তার লেখক হয়ে ওঠার গোপন স্বপ্নগুলো একটা অবান্তর ব্যাপার ছাড়া আর কিছু নয়। রাফিন হয়তো তাকে ছাদের তলায় আশ্রয় দিয়েছে, ভালো শাড়ি কিনে দিয়েছে, দামি রেস্তোরাঁয় ডিনারে নিয়ে গেছে—কিন্তু যে উষ্ণতা একটা সম্পর্কের প্রাণ, তার বিন্দুমাত্র ছোঁয়া সে পায়নি। গত কয়েক মাস ধরে এই ক্ষোভটা জমা হতে হতে একটা পাথরের আকার ধারণ করেছিল। মেহরাবী ঠিক করে নিয়েছিল, আর নয়। এই একতরফা মানসিক নিঃসঙ্গতা সে আর সহ্য করবে না।
ঠিক সেই মুহূর্তেই রুমের দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকল রাফিন। তার পরনে একটা নেভি ব্লু শার্ট, কলারটা সামান্য খোলা, চোখে ক্লান্তির গাঢ় ছাপ। হাতে একটা ফাইল। মেহরাবীকে একদৃষ্টিতে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে মৃদু হেসে বলল, "এখনো লেখালেখি চলছে? বাইরে কী সুন্দর একটা বৃষ্টিভেজা বিকেল, চলো একটু ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে চা খাই।"
মেহরাবী ল্যাপটপের স্ক্রিনটা সশব্দে বন্ধ করে খাড়া হয়ে বসল। তার চোখের চাহনিতে জমে থাকা বরফ শীতল কাঠিন্য। সে ঠোঁট কামড়ে ধরে শীতল গলায় বলল, "চা খাওয়ার সময় আমার নেই, রাফিন। আর তোমার তো এমনিতেই কাজের শেষ নেই। আমার এই ছোটোখাটো আবদারগুলোর জন্য তোমার টাইম নষ্ট না করলেই খুশি হব।"
রাফিনের মুখের মৃদু হাসিটা নিমিষে মিলিয়ে গেল। সে একটু থমকে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বলল, "মেহরাবী, সারাদিন অফিসে একটা চরম মানসিক ধকলের পর বাড়ি ফিরে যদি তোমার এই ঠান্ডা ব্যবহার দেখতে হয়, তবে সত্যি খুব ক্লান্তি লাগে। আমি তো কোথাও পালিয়ে যাচ্ছি না। একটু সময় দাও আমাকে।"
"সময়? গত তিন বছর ধরে আমি শুধু সময়ই দিয়ে যাচ্ছি, রাফিন!" মেহরাবী চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার গলাটা সামান্য কেঁপে উঠল অভিমানে, "তোমার জীবনে আমার স্থান কোথায়? আমি কি তোমার বাড়ির একটা আসবাবপত্র ছাড়া আর কিছু? আমার কোনো নিজস্ব সত্তা নেই? তুমি কি কখনো জানতে চেয়েছ আমার মনের ভেতরে কী ঝড় বয়ে যায়? আমার উপন্যাসটা নিয়ে তোমার কোনো দিন এক ফোঁটা আগ্রহ দেখেছ? তুমি শুধু তোমার নিজের দুনিয়ায় মগ্ন। আমার এই দমবন্ধ করা জীবন আর ভালো লাগছে না।"
রাফিন আর কোনো কথা বলল না। সে শুধু দীর্ঘক্ষণ মেহরাবীর চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার সেই দৃষ্টির গভীরে কী ছিল, মেহরাবী পড়তে চাইল না। সে তার জেদ আর অভিমানের চাদরে নিজেকে এমনভাবে মুড়ে নিয়েছিল যে, রাফিনের চোখের সেই গভীর বেদনা তার চোখে ধরা পড়ল না। রাফিন ক্লান্ত পায়ে নিজের ড্রয়িং রুমের সোফায় গিয়ে বসল এবং চুপচাপ ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
পরের দিন সকালবেলা। রাফিন অফিসে চলে যাওয়ার পর মেহরাবী তার ব্যক্তিগত ড্রয়ারটা পরিষ্কার করতে বসল। কিছু পুরনো ফাইলপত্র আর কাগজপত্র সরাতে গিয়ে তার হাত গিয়ে ঠেকল একটা ভারী কাঠের বাক্সে। বাক্সটা সাধারণত রাফিন বা সে বিশেষ কোনো কাজে খোলে না। কৌতূহলবশত মেহরাবী সেটার লকটা খুলল। আর বাক্সের ঢাকনাটা তুলতেই তার চোখের পলক আটকে গেল।
ভেতরে সুন্দর করে সাজানো রয়েছে মেহরাবীর প্রথম প্রকাশিত বইটির একটি কপি, যার প্রথম পাতায় খোদাই করা আছে তার নিজের হাতের একটি বিশেষ নোট। কিন্তু তার চেয়েও বড় চমক লুকিয়ে ছিল তার ঠিক নিচে। সেখানে স্তূপীকৃত হয়ে আছে কিছু ডায়েরি আর নোটবুক। মেহরাবী একটা নোটবুক তুলে পাতা উল্টাতে শুরু করল। আর পড়তে পড়তে তার পা দুটো যেন আর ঠিকমতো কাজ করছিল না।
সেটা কোনো সাধারণ নোটবুক ছিল না। সেটা ছিল রাফিনের ডায়েরি, যেখানে গত পাঁচ বছরের প্রতিটি দিন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লেখা। মেহরাবী আবিষ্কার করল, তার জীবনের এমন কোনো স্বপ্ন নেই যা রাফিন একা একা গোপনে পূরণ করার চেষ্টা করেনি। মেহরাবীর আজীবন স্বপ্ন ছিল তার নিজের লেখা একটি বই প্রকাশ পাবে, কিন্তু প্রকাশকরা বারবার ফিরিয়ে দিয়েছিল। মেহরাবী ভেবেছিল রাফিন এ নিয়ে উদাসীন। কিন্তু ডায়েরির পাতা বলছে, রাফিন নিজে গোপনে প্রকাশকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছে, নিজের জমানো টাকা থেকে প্রকাশনা সংস্থাকে অনুদান দিয়ে মেহরাবীর বই ছাপানোর সমস্ত ব্যবস্থা পাকা করেছে। প্রকাশক যেন কোনোভাবেই বুঝতে না পারে যে এটা রাফিনের টাকা, সেটার জন্য রাফিন এক অচেনা ছদ্মনামে সমস্ত চুক্তি সই করেছিল।
শুধু তাই নয়, মেহরাবীর মায়ের চিকিৎসার জন্য যখন আকাশছোঁয়া খরচের প্রয়োজন হয়েছিল, তখন রাফিন নিজের পৈতৃক জমিটুকু পর্যন্ত কারোর ঘুণাক্ষরেও না জানিয়ে বিক্রি করে দিয়েছিল। অথচ মেহরাবীকে সে বলেছিল, ব্যাংক থেকে লোন পাস হয়েছে। মেহরাবীর পছন্দের একটা ছোট্ট ক্যাফে দেওয়ার স্বপ্ন ছিল, যা নিয়ে সে বহুবার রাফিনের সাথে কথা বলেছিল। রাফিন তখন হয়তো শুধু হু-হা করে এড়িয়ে গেছিল, কিন্তু ডায়েরির পাতার হিসেব বলছে—শহরের প্রাণকেন্দ্রে একটা সুন্দর ক্যাফের জন্য রাফিন গত দুবছর ধরে একটি প্রপার্টি বুক করে রেখেছিল, যার সমস্ত কাগজপত্র মেহরাবীর নিজের নামে রেজিস্ট্রি করা।
পাতার পর পাতা উল্টে মেহরাবীর বুকটা কেঁপে উঠল। সে এতদিন যাকে ভেবেছিল এক উদাসীন, পাথরপ্রতিম মানুষ, সেই মানুষটাই গোপনে তার প্রতিটি কান্নার সাক্ষী ছিল। রাফিন কখনো মুখে বলত না, কারণ সে ভালোবাসাকে জাহির করায় বিশ্বাসী ছিল না। সে বিশ্বাস করত কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করায়। কিন্তু সে বুঝতে পারেনি যে তার এই নীরবতা মেহরাবীর মনে ভালোবাসার বদলে এক গভীর ভুল বোঝাবুঝির পাহাড় তৈরি করে দিয়েছে।
ডায়েরির শেষ পাতার লেখাগুলো দেখে মেহরাবীর গলা দিয়ে একটা কান্নার শব্দ বেরিয়ে এল। সেখানে রাফিন লিখেছে—"মেহরাবী আজ আবার আমার ওপর রেগে গেল। সে মনে করে আমি তাকে গুরুত্ব দিই না। আমার খুব ইচ্ছে করে তাকে জড়িয়ে ধরে সব সত্যিটা বলে দিই, কিন্তু আমার বুক চিরে বেরিয়ে আসে কেবল অসহায়ত্ব। আমি হয়তো শব্দ দিয়ে ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারি না, কিন্তু আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে কেবল মেহরাবী বেঁচে আছে। যেদিন সে আমার এই নিঃশব্দ ভালোবাসাটা বুঝতে পারবে, সেদিন হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।"
ডায়েরিটা বুক জড়িয়ে ধরে মেহরাবী ফ্লোরে বসে পড়ল। তার চোখের জল গলে গলে পড়তে লাগল কাগজের পাতার ওপর। সে রাফিনকে কতটা ভুল বুঝেছে! সে ভেবেছিল রাফিনের জীবনে তার কোনো মূল্য নেই, অথচ রাফিনের পুরো জীবনটাই তো আবর্তিত হচ্ছিল কেবল মেহরাবীকে ভালো রাখার তাগিদে।
ঠিক তখনই তার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল রাফিনের অফিসের এক সহকর্মীর নাম্বার। ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে একটা আতঙ্কিত গলা ভেসে এল, "ম্যাডাম, আপনি কি একটু দ্রুত সিটির সেন্ট্রাল হসপিটালে আসতে পারবেন? স্যার অফিস থেকে বের হওয়ার সময় হঠাৎ রাস্তায় একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে..."
মেহরাবীর হাতের ফোনটা খসে পড়ে গেল ফ্লোরে। তার সারা পৃথিবী যেন একটা তীব্র ঘূর্ণিপাকে উল্টে গেল। যে মানুষটিকে সে একটু আগে বুকফাটা অভিমান নিয়ে মনের ভেতরে তিরস্কার করছিল, সেই মানুষটির জীবন আজ মৃত্যুর মুখোমুখি। মেহরাবী আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। তার সমস্ত অহংকার, সমস্ত জেদ এক নিমেষে ধূলিস্যাত হয়ে গেল। সে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির দিকে দৌড় দিল।
হাসপাতালের করিডোরটা এখন গাঢ় নীরবতায় মোড়ানো। ব্লিচিং পাউডারের একটা তীব্র গন্ধ চারপাশের বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। মেহরাবী হসপিটালের মূল দরজায় এসে যখন পৌঁছাল, তখন তার পা দুটো থরথর করে কাঁপছে। সে রিসেপশন কাউন্টারে গিয়ে কোনোমতে রাফিনের কেবিনের নাম্বারটা জেনে নিয়ে ছুটতে ছুটতে করিডোর পার হলো।
ডাক্তার কেবিন থেকে বেরিয়ে আসার সময় মেহরাবী তার পথ আটকে ধরল, রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করল, "ডাক্তার সাহেব, রাফিন... রাফিন কেমন আছে? ও কি ঠিক আছে?"
ডাক্তার মৃদু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সান্ত্বনার সুরে বললেন, "ভয়ের কোনো বড় কারণ নেই এখন, তবে মাথায় বেশ জোরে আঘাত লেগেছে। উনি এখনো সেন্সলেস আছেন। জ্ঞান ফিরতে একটু সময় লাগবে। আপনারা একটু সাবধানে রাখবেন, মানসিক কোনো ধকল যেন না পায়।"
ডাক্তার চলে যাওয়ার পর মেহরাবী ধীরে ধীরে কেবিনের ভেতরে প্রবেশ করল। কেবিনের ঠান্ডা আলোটা সরাসরি রাফিনের ফ্যাকাশে মুখের ওপর পড়ছে। তার কপালে একটা সাদা ব্যান্ডেজ জড়ানো, ডান হাতটায় স্যালাইনের নিডেল গোঁজা। বিছানার পাশে একটা ছোট্ট টুল টেনে মেহরাবী বসে পড়ল। সে রাফিনের নিষ্প্রাণ ঠান্ডা হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় তুলে নিল এবং নিজের গালে সেটার ছোঁয়া রাখল।
তার চোখের জল গলে রাফিনের হাতের ওপর পড়তে লাগল। সে ফিসফিস করে কাঁপাকাঁপা গলায় বলে উঠল, "উঠে পড়ো, রাফিন... প্লিজ চোখ খোলো। আমি সব জেনে গেছি। তোমার ওই ডায়েরিটা আমি পড়েছি। আমি কত বড় ভুল করেছি, তা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। আমাকে শাস্তি দাও, যা খুশি তাই বলো, কিন্তু এভাবে চুপ করে থেকো না..."
বাইরে তখন মেঘ জমে আকাশটা অন্ধকার হয়ে এসেছে। বৃষ্টি পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে কাঁচের জানালায়। মেহরাবী বুঝতে পারল, ভালোবাসার আসল অর্থ কেবল মুখে মিষ্টি কথা বলা নয়; ভালোবাসার অর্থ হলো নিঃশব্দে ছায়ার মতো পাশে থাকা। কিন্তু এই সত্যটা উপলব্ধি করতে গিয়ে সে আজ এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছেছে, যেখানে রাফিনের সাথে দূরত্ব ঘুচিয়ে সম্পর্কটাকে বাঁচাতে হলে কেবল কথায় নয়, নিজের সর্বস্ব দিয়ে কাজ করে প্রমাণ করতে হবে যে সেও রাফিনকে কতটা ভালোবাসে।
হাসপাতালের কেবিনের সেই স্নিগ্ধ অথচ থমথমে পরিবেশটার মধ্যে মেহরাবী যেন প্রতি মুহূর্তে নিজের ভেতর ভেঙে পড়ছে। রাফিনের শিয়রে বসে কাটানো প্রতিটা সেকেন্ড তার কাছে একটা যুগের মতো দীর্ঘ মনে হচ্ছিল। তার হাতের তালুতে রাফিনের হাতটা এখনো ঠান্ডা। মনিটরের একটানা মৃদু শব্দটা ছাড়া কেবিনের ভেতর আর কোনো শব্দ নেই। নার্স এসে স্যালাইনের বোতলটা বদলে দিয়ে যাওয়ার সময় সান্ত্বনার সুরে বলে গেছেন, "ভয়ের কিছু নেই ম্যাডাম, ইনশাআল্লাহ রাতের মধ্যেই জ্ঞান ফিরে আসবে।" কিন্তু মেহরাবীর মন সেই সান্ত্বনায় মানতে চাইছে না। তার বুকের ভেতর অপরাধবোধের একটা তীব্র দাবানল জ্বলছে।
যে মানুষটা তার প্রতিটি সুপ্ত ইচ্ছে, প্রতিটি গোপন আবদারকে নিজের জীবনের ব্রত বানিয়ে নিয়েছিল, সে তাকে কিনা স্বার্থপর আর উদাসীন বলে গালি দিয়েছে! মেহরাবী তার নিজের মুঠোয় রাফিনের আঙুলগুলোকে আরও শক্ত করে চেপে ধরল। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, রাফিনের এই নিঃশব্দ আত্মত্যাগের ঋণ সে জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে শোধ করবে। এতদিন রাফিন একা সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে টেনে নিয়েছিল, এবার মেহরাবী নিজের হাতে এই সম্পর্কের হাল ধরবে। সে শুধু কথায় নয়, তার প্রতিটি কাজের মাধ্যমে রাফিনকে বুঝিয়ে দেবে যে সেও এই ভালোবাসার ঠিক ততটাই যোগ্য দাবিদার।
রাত তখন প্রায় দুটো। কেবিনের জানলার কাঁচ ভেদ করে বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ার শব্দ আসছে। হঠাৎ করেই রাফিনের আঙুলগুলো একটু কেঁপে উঠল। মেহরাবী তৎক্ষণাৎ সোজা হয়ে বসে উৎকণ্ঠিত গলায় ডাকল, "রাফিন... রাফিন শুনতে পাচ্ছো আমাকে?"
রাফিন আস্তে আস্তে চোখের পাতা দুটো খোলার চেষ্টা করল। মাথার তীব্র ব্যথায় তার কপাল কুঁচকে গেল। সে ক্ষীণ ও শুকনো গলায় অস্পষ্ট স্বরে বলল, "মেহ... মেহরাবী?"
"হ্যাঁ, আমি এখানে আছি রাফিন। একদম নড়াচড়া কোরো না," মেহরাবীর গলাটা কান্নায় জড়িয়ে এল। সে দ্রুত গ্লাস থেকে একটু জল নিয়ে রাফিনের শুষ্ক ঠোঁটে সামান্য ছোঁয়া দিল।
রাফিন চোখ মেলে তাকাল। তার ক্লান্ত দৃষ্টিতে এক ধরণের বিস্ময় আর ভয়ের ঝিলিক খেলে গেল। সে হয়তো ভেবেছিল এটা কোনো স্বপ্ন। সে দুর্বল গলায় ফিসফিস করে বলল, "তুমি... তুমি এখানে? হসপিটালে এলে কেন? তোমার তো আবার অফিসের ওই নতুন প্রজেক্টের কাজগুলোর জন্য কত চাপ ছিল..."
মেহরাবী আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে রাফিনের বুকের ওপর মাথা রেখে ভেঙে পড়ল কান্নায়। তার উষ্ণ চোখের জল রাফিনের হাসপাতালের গাউনের বুকটা ভিজিয়ে দিতে লাগল। সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল, "সব শেষ, রাফিন... তোমার সব জার্নাল, তোমার ওই গোপন ডায়েরি আমি সব দেখেছি। কেন করলে এমনটা? কেন আমাকে একটুও বোঝাতে পারলে না যে তুমি আমাকে কতটা ভালোবাসো? আমি কত বড় অন্যায় করেছি তোমার সাথে! তোমাকে স্বার্থপর ভেবেছি, অথচ তুমি নিজের সব সুখ বিসর্জন দিয়ে কেবল আমার স্বপ্নগুলোকে বাঁচিয়ে রেখেছিলে।"
রাফিন সামান্য অবাক হলো। তার ফ্যাকাশে ঠোঁটে এক ফোঁটা মৃদু, ক্লান্ত হাসি ফুটে উঠল। সে তার ভারী হাতটা ধীরে ধীরে বাড়িয়ে মেহরাবীর মাথার চুলে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল। বড় স্নিগ্ধ সেই ছোঁয়া। রাফিন খুব ধীর ও নরম গলায় বলল, "পাগলি একটা... ভালোবাসার জন্য কি হিসাব-কিতাব করতে হয়, মেহরাবী? তোমার চোখে জল দেখতে আমার একেবারেই ভালো লাগে না। তুমি লেখক মানুষ, তোমার মনটা আকাশের মতো পরিষ্কার। তুমি আমাকে ভুল বুঝেছিলে ঠিকই, কিন্তু আমার ভালোবাসা তো কোনো শর্তের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না।"
"না, রাফিন! এবার আর শুধু মুখে ভালোবাসার কথা বললে চলবে না," মেহরাবী মাথা তুলে রাফিনের চোখে চোখ রাখল। তার চোখের দৃষ্টিতে এখন এক অদ্ভুত জেদ আর দৃঢ় প্রতিজ্ঞা চিকচিক করছে, "তুমি এতদিন আমার জন্য যা করেছ, তার সিকিভাগ প্রমাণ এবার আমাকেও করতে হবে। আমি কথা দিচ্ছি, তোমার এই নিঃশব্দ একাকীত্ব আমি আর থাকতে দেব না। আমাদের এই ভাঙা সম্পর্কটাকে জোড়া লাগাতে আমি নিজের সব অহংকার বিসর্জন দেব।"
পরের দিন সকালেই ডাক্তার রাফিনকে রিলিজ করে দিলেন, তবে কড়া নির্দেশ দিলেন সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকার জন্য। মেহরাবী রাফিনকে বাড়ি ফিরিয়ে আনল অত্যন্ত যত্নে। কিন্তু সে আগের মেহরাবী আর নেই। তার ভেতরে একটা বিরাট পরিবর্তন এসে গেছে। এতদিন সে কেবল নিজের উপন্যাস লেখা আর নিজের জগৎ নিয়ে ব্যস্ত থাকত, ঘরের কোনো ছোটোখাটো কাজের দায়িত্বও সেভাবে নিত না। ভেবেছিল গৃহস্থালির সব কাজ তো রাফিন বা অন্যরাই সামলাবে। কিন্তু আজ সে নিজেই রাফিনের জন্য নিজ হাতে ব্রেকফাস্ট তৈরি করল, তার ওষুধপত্র ঠিক সময়ে খাইয়ে দিল, আর তার ল্যাপটপ বা অফিসের ফাইলগুলো থেকে রাফিনের সমস্ত মনোযোগ দূরে সরিয়ে তাকে একটু আরাম দেওয়ার চেষ্টা করল।
বিকেলে বসার ঘরের সোফায় বসে রাফিন একটা ফাইল দেখছিল। মেহরাবী এসে সরাসরি রাফিনের হাত থেকে ফাইলটা নিয়ে টেবিলের ওপর রেখে দিল। তারপর মিষ্টি অথচ দৃঢ় গলায় বলল, "আজ আর কোনো অফিসিয়াল ফাইল নয়। ডাক্তার সাহেব পরিষ্কার বলেছেন রেস্ট নিতে। চলো, আজ বিকেলে তোমার সাথে আমার একটা জরুরি কথা আছে।"
রাফিন একটু অবাক হয়ে সোফায় একটু সোজা হয়ে বসে জিজ্ঞেস করল, "কী কথা বলো তো?"
মেহরাবী ড্রয়ার থেকে একটা নতুন দলিল এনে রাফিনের সামনে মেলে ধরল। সেটা দেখে রাফিনের চোখ দুটো কপালে ওঠার উপক্রম হলো। সেটা আর কিছু নয়, শহরের প্রাণকেন্দ্রে মেহরাবীর নিজের জমানো টাকা এবং তার প্রথম বইয়ের রয়্যালটির সমস্ত অর্থ দিয়ে বুক করা সেই ক্যাফেটির চূড়ান্ত রূপায়ণের দলিল, যা সে গোপনে রাফিনের নামে রেজিস্ট্রি করিয়েছে। মেহরাবী রাফিনের চোখের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল, "তুমি এতদিন আমার ক্যাফে গড়ার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য নিজের পৈতৃক জমি পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছিলে, রাফিন। আজ আমি তোমার সেই আত্মত্যাগের প্রতিদানে তোমার নামে এই ক্যাফের একটা অংশ উৎসর্গ করলাম। নাম দিয়েছি—'রাফিনের চায়ের আড্ডা'। বলো, কেমন হলো?"
রাফিনের বুকটা যেন কেমন করে উঠল। সে কোনো দিন কল্পনাও করেনি যে মেহরাবী এত দ্রুত তার মনের গভীরতা বুঝতে পারবে এবং নিজের কাজের মাধ্যমে এমন এক অসাধারণ সারপ্রাইজ দিয়ে তাকে একেবারে স্তব্ধ করে দেবে। তার চোখ দুটো আনন্দের জল চিকচিক করে উঠল। সে আর নিজেকে সামলাতে না পেরে মেহরাবীর দুহাত নিজের মুঠোয় তুলে নিয়ে বলল, "তুমি সত্যিই পাগল, মেহরাবী... একদম আস্ত একটা পাগলি!"
"পাগল তো তোমার জন্যই হয়েছি," মেহরাবী রাফিনের কাঁধে মাথা রেখে খুব নরম সুরে ফিসফিস করে বলল। তাদের এই গভীর রোমান্টিক মুহূর্তে ঘরের চারপাশের বাতাস যেন আরও উষ্ণ হয়ে উঠল। রাফিনের এক হাত মেহরাবীর পিঠের ওপর দিয়ে জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল। তাদের মধ্যেকার দীর্ঘদিনের সেই বরফ-শীতল দূরত্ব আজ পুরোপুরি গলে জল হয়ে গেছে। একে অপরের নিঃশ্বাসের উত্তাপে তারা যেন নতুন করে আবিষ্কার করল তাদের ভালোবাসার গভীরতাকে।
কিন্তু এই মধুর মুহূর্তের মাঝেই দরজায় একটা কড়া নাড়ার শব্দ হলো। মেহরাবী একটু বিরক্ত হয়ে দরজা খুলতেই দেখল বাইরে দাঁড়িয়ে আছে রাফিনের অফিসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, যার হাতে একগাদা জরুরি আইনি কাগজ আর প্রজেক্টের রিউইজুয়াল প্রপোজাল। সেই কর্মকর্তার গম্ভীর মুখ দেখে বোঝা গেল, কোম্পানির এক বিরাট সংকটময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা সামলানোর জন্য একমাত্র রাফিনের উপস্থিতিই এখন অপরিহার্য।
রাফিন সোফায় দাঁড়িয়ে পড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মেহরাবীর মুখের দিকে তাকিয়ে সে সংকোচভরে বলল, "মেহরাবী... অফিস থেকে এই জরুরি প্রজেক্টটা... আমাকে মনে হয় আজ রাতে একবার অফিসে যেতে হবে।"
মেহরাবীর চোখের পলক একবার নড়ে উঠল। সে বুঝতে পারল, রাফিনের এই দায়িত্ববোধই তার চরিত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি। সে রাফিনের কাঁধে আলতো করে হাত রেখে এক চিলতে মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল, "যাও, তোমার কাজ তুমি শেষ করে এসো। কিন্তু এবার একা নয়, আজ তোমার সাথে আমিও অফিসে যাব। দেখি তোমার ওই বোরিং অফিসটা কেমন, আর তুমি কীভাবে সেখানে একা একা কষ্ট করো!"
রাফিন অবাক চোখে মেহরাবীর দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে হলো, আজ সে কেবল তার ভালোবাসার মানুষটিকে ফিরে পায়নি, বরং পেয়েছে এমন একজন জীবনসঙ্গী যে তার প্রতিটি কাজের সমান অংশীদার হতে প্রস্তুত। বাইরে তখন গোধূলির আলো মিলিয়ে গিয়ে রাতের অন্ধকার নামতে শুরু করেছে, আর তাদের জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে এক গভীর উষ্ণতার সাথে।
রাতের সেই নিস্তব্ধ ও ছিমছাম কর্পোরেট অফিসটার বড় বড় কাঁচের জানলা দিয়ে শহরের নিয়ন আলোর বিচ্ছুরণ চারপাশটাকে এক মায়াবী রূপ দিয়েছিল। রাফিনের কেবিনের ভেতর এয়ার কন্ডিশনারের মৃদু শব্দ আর পেপার কাটার পাতার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। রাফিন তার ল্যাপটপের স্ক্রিনের সামনে ঝুঁকে অত্যন্ত মনোযোগের সাথে জরুরি প্রজেক্টের ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টগুলো রিভাইজ করছিল। তার কপালে ক্লান্তির হালকা ভাঁজ, যা বুঝিয়ে দিচ্ছে গত কয়েকদিনের ধকল তার শরীরের ওপর দিয়ে বেশ ভালোই গেছে।
কেবিনের এক কোণে সোফায় বসে মেহরাবী একদৃষ্টিতে রাফিনের দিকে তাকিয়েছিল। সে নিজের চোখে দেখল মানুষটা কীভাবে নিজের আরাম, নিজের ঘুমকে বিসর্জন দিয়ে কেবল নিখুঁতভাবে কাজ করে চলেছে। এতদিন সে এই পরিশ্রমগুলোকে অবহেলা বা উদাসীনতা মনে করেছিল, অথচ আজ বুঝতে পারছে এর পেছনে কতটা দায়িত্ববোধ আর নিঃশব্দ ভালোবাসা লুকিয়ে আছে।
মেহরাবী নিজের সিট থেকে উঠে দাঁড়াল। সে ক্যাফেটেরিয়া থেকে রাফিনের জন্য নিজ হাতে এক কাপ কড়া গরম কফি বানিয়ে নিয়ে এসেছিল। রাফিনের টেবিলের সামনে এসে সে নিঃশব্দে কফির কাপটা রাখল এবং নিজে গিয়ে রাফিনের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আলতো হাতে তার চওড়া কাঁধের পেশিগুলোতে ম্যাসাজ করতে শুরু করল।
রাফিন চমকে গিয়ে মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল। তার চোখে একরাশ ক্লান্তি আর সাথে অদ্ভুত এক স্বস্তির ছোঁয়া। সে অবাক হয়ে বলল, "মেহরাবী, তুমি এখনো ঘুমাওনি? রাত প্রায় আড়াইটা বাজে। এখানে এভাবে বসে থেকে কেন নিজের কষ্ট বাড়াচ্ছো?"
মেহরাবী রাফিনের কাঁধে ঝুঁকে এসে তার কানের কাছে খুব নরম আর উষ্ণ গলায় ফিসফিস করে বলল, "কষ্ট তো আমি এতদিন তোমাকে একা একা দিয়েছি, রাফিন। আজ আর একা নয়। তুমি যেমন গোপনে আমার সব স্বপ্নকে আগলে রেখেছিলে, আজ থেকে তোমার এই ক্লান্তির সমস্ত ভাগ আমি আমার নিজের করে নেব।"
কথাটা বলেই মেহরাবী ঝুঁকে এসে রাফিনের ঠোঁটে নিজের উষ্ণ ঠোঁটের একটা গভীর ও মায়াবী ছোঁয়া দিল। সেই চুম্বনটা কোনো সাধারণ ছোঁয়া ছিল না; সেটা ছিল দীর্ঘদিনের জমে থাকা ভুল বোঝাবুঝি, কষ্ট, অনুশোচনা আর নতুন করে ভালোবাসার এক তীব্র বহিঃপ্রকাশ। রাফিন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে ল্যাপটপের স্ক্রিনটা এক ঝটকায় বন্ধ করে নিজের চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল এবং মেহরাবীর কোমর জড়িয়ে তাকে নিজের বুকের সাথে একেবারে মিশিয়ে ধরল।
কেবিনের সেই আধা-অন্ধকার ও একান্ত পরিবেশে তাদের চারপাশের পৃথিবী যেন সম্পূর্ণ থেমে গেল। রাফিনের হাতের শক্ত ও উষ্ণ স্পর্শ মেহরাবীর সারা শরীরে এক অজানা শিহরণ জাগিয়ে তুলল। সে রাফিনের শার্টের কলার খামচে ধরে তার বুকে মুখ লুকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রাফিনের হাত দুটো মেহরাবীর পিঠের ওপর দিয়ে এমনভাবে জড়িয়ে ধরল যেন সে পৃথিবীর সবটুকু নিরাপত্তা আর ভালোবাসা দিয়ে তাকে আগলে রাখতে চায়। তাদের গাঢ় নিঃশ্বাসের উত্তাপে কেবিনের ভেতরের বাতাস আরও ভারী হয়ে উঠল। বহুদিনের দূরত্ব, না বলা কথা আর জমাট বাঁধা অভিমান সব যেন গলে একাকার হয়ে গেল এই একটিমাত্র গভীর আলিঙ্গনের মাঝে।
রাফিন মেহরাবীর চুলে মুখ গুঁজে অত্যন্ত আবেগঘন ও কাঁপাকাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলল, "আমি আর কখনো তোমাকে দূরে ঠেলে দেব না, মেহরাবী। তুমিই আমার একমাত্র পৃথিবী, আমার জীবনের সবথেকে সুন্দর উপহার।"
মেহরাবী রাফিনের বুকে মুখ রেখেই মৃদু হেসে ফিসফিস করে জবাব দিল, "জানি, রাফিন। আর কখনো আমাদের মাঝে কোনো ভুল বোঝাবুঝি আসবে না। আজ থেকে আমাদের এই ভালোবাসার গল্পটা শুধুই একসাথে বেঁচে থাকার গল্প হবে।"
এর ঠিক এক সপ্তাহ পর। শহরের প্রাণকেন্দ্রে সেই জাঁকজমকপূর্ণ ক্যাফেটার গ্র্যান্ড ওপেনিং হলো, যার নাম দেওয়া হয়েছিল—'রাফিনের চায়ের আড্ডা'। উদ্বোধনী দিনে ক্যাফেতে উপচে পড়া ভিড়। চারপাশের দেওয়ালে সুন্দর করে সাজানো মেহরাবীর প্রকাশিত উপন্যাসের কিছু মনোমুগ্ধকর লাইন, আর ক্যাফের এক কোণে কাঠের বোর্ডে সুন্দর ক্যালিগ্রাফিতে লেখা রাফিনের সেই ডায়রির শেষ পাতাটির কথাগুলো।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কেক কাটার পর রাফিন সবার সামনে এসে মাইক্রোফোনে মেহরাবীর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে মৃদু হেসে উপস্থিত সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল, "আজ এই ক্যাফে শুধু একটা ব্যবসা নয়, এটা আমাদের দুজনের না বলা ভালোবাসার এক নীরব সাক্ষী। আজ থেকে আমার সমস্ত স্বপ্ন আর আমার লেখার জগতের মাঝের সব দূরত্ব ঘুচে গেছে।"
মেহরাবী রাফিনের কাঁধে মাথা রেখে ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে মিষ্টি হাসল। তার দুচোখে তখন আনন্দের জল চিকচিক করছে। জীবনে এই প্রথম সে উপলব্ধি করল যে ভালোবাসা মানে কেবল মুখে ভালোবাসার বুলি আওড়ানো নয়; ভালোবাসা হলো এমন এক অদৃশ্য শক্তি, যা সমস্ত বাধা বিপত্তি পেরিয়ে দুটি মানুষকে নিঃশব্দে এক সুতোয় বেঁধে রাখে। বাইরে তখন বিকেলের সোনালী রোদ এসে ক্যাফের কাঁচের জানলায় এক নতুন সোনালী ভবিষ্যতের আলোর ছোঁয়া বুলিয়ে দিচ্ছে, আর তাদের ভালোবাসার এই চিরন্তন গল্পটা এক নতুন পূর্ণতার ছন্দে এগিয়ে চলেছে।
....