শহরের এই ব্যস্ত গলিতে যখন গোধূলির আলো এসে কাঁচের জানালার গায়ে আছড়ে পড়ে, তখন সেহরিশের বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। পুরনো ঘড়িটার টিকটিক শব্দে ঘরের নীরবতা আরও গাঢ় হয়ে যায়। ড্রয়িং রুমের এক কোণে রাখা পুরোনো কাঠের টেবিলটার ওপর ধুলোর আস্তরণ জমেছে, ঠিক যেমনটা জমেছে সেহরিশের নিজের মনের গহীনে। আজ বহু বছর পর সেই চেনা শহরের বাতাস তার গায়ে এসে লেগেছে, কিন্তু এই বাতাসের সুবাসে কোনো উষ্ণতা নেই, রয়েছে কেবল তীক্ষ্ণ এক শুষ্কতা আর পুরোনো দিনের না বলা কথার যন্ত্রণা।
সেহরিশ বারান্দার গ্রিল ধরে বাইরে তাকিয়েছিল। মেঘের রঙ আজ বড় অদ্ভুত—অঞ্চল জুড়ে গাঢ় ধূসর বিষাদের ছায়া। তার চোখে ভেসে উঠছে ছোটবেলার সেই দিনগুলো। তখন বয়স কম ছিল, মনের ভেতর জমানো কথাগুলো ঠোঁট পর্যন্ত এসেও কেমন যেন আটকে যেত। আদ্রিয়ান নামের সেই ছেলেটা যখন উঠানে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত, সেহরিশের বুক তখন দ্রুত কাঁপত। আদ্রিয়ানের একটুখানি হাসিতে সেহরিশের সারা পৃথিবী যেন আলোয় ভরে উঠত। কিন্তু সমাজের কড়া নিয়ম, নিজের ভেতরের সংকোচ আর লজ্জার দেওয়াল ভেদ করে সে কোনো দিন বলতে পারেনি, "আদ্রিয়ান, আমি তোমাকে বড্ড ভালোবাসি।"
সময় কারো জন্য থেমে থাকে না। বয়সের সিঁড়ি বেয়ে একদিন আদ্রিয়ান অন্য এক শহরে পাড়ি জমাল উচ্চশিক্ষার বা ক্যারিয়ার গড়ার টানে। যাওয়ার দিন সেহরিশ স্টেশনের ভিড়ের মাঝে লুকিয়ে কেঁদেছিল। সে চেয়েছিল ট্রেনের জানালা দিয়ে আদ্রিয়ান একবার তাকে দেখুক, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলুক—"আমি ফিরব, সেহরিশ।" কিন্তু তেমন কিছুই হয়নি। ট্রেনটা হুইল বাজিয়ে ধোঁয়া উড়িয়ে দূরে হারিয়ে গিয়েছিল, আর তার সাথে সাথে মিলিয়ে গিয়েছিল সেহরিশের কিশোরী বয়সের সব স্বপ্ন।
বহু বছর কেটে গেছে। জীবনের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আদ্রিয়ান আজ সফল এক মানুষ। তার নামের পাশে যুক্ত হয়েছে খ্যাতি আর প্রতিপত্তি। কিন্তু মনের কোনো এক কোণে আজও সেই পুরনো স্মৃতির গন্ধ তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। শহরের মাটিতে পা রাখার পর থেকেই তার মন শুধু একটা মানুষের জন্যই আকুপাকু করছিল—সেহরিশ। বহু বছর পর যখন সে পুরোনো ঠিকানায় ফিরে এলো, তখন তার চোখে ছিল একরাশ প্রত্যাশা আর বুকভরা ভালোবাসা। সে ভেবেছিল, সময় হয়তো তাদের দূরত্ব কমিয়ে দিয়েছে, পুরোনো সেই আবেগ আজ নতুন করে ডালপালা মেলবে।
কিন্তু সেহরিশের দরজায় কড়া নাড়ার পর যখন দরজাটা খুলল, আদ্রিয়ানের মুখের সেই চেনা হাসিটা নিমিষেই মিলিয়ে গেল। চোখের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নারীটি আর সেই চঞ্চল কিশোরী সেহরিশ নেই। তার চোখে এখন এক অদ্ভুত পাথরচাপা শীতলতা, চেহারায় ক্লান্তির ছাপ আর পুরো ব্যক্তিত্বে এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর। সেহরিশের পরনে ছিল সাদামাটা পোশাক, চুলে সামান্য রূপালী রেখা, আর চাহনিতে এমন এক উদাসীনতা যা আদ্রিয়ানকে স্তব্ধ করে দিল।
"কে আপনি?" সেহরিশের কন্ঠস্বর ছিল বরফের মতো ঠান্ডা।
আদ্রিয়ান থমকে গেল। সে তো এমন অভ্যর্থনা আশা করেনি। গলা পরিষ্কার করে সে বলল, "সেহরিশ... আমি আদ্রিয়ান। চিনতে পারছ না?"
সেহরিশের মুখে এক চিলতে বিদ্রূপের হাসি ফুটে উঠল। সে ঘরের দরজার চৌকাঠ শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে রইল, যাতে আদ্রিয়ান এক পা-ও ভেতরে ঢুকতে না পারে। "চিনব না কেন? খুব ভালো করেই চিনি। কিন্তু যে আদ্রিয়ানকে আমি চিনতাম, সে তো বহু আগেই হারিয়ে গেছে। এখন যার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন, সে এক আগন্তুক মাত্র।"
আদ্রিয়ান বুঝতে পারল না ঠিক কী বলবেন। সে ঘরের ভেতরে আসার চেষ্টা করতেই সেহরিশ হাত বাড়িয়ে তাকে বাধা দিল। সেই হাতের স্পর্শে কোনো কম্পন ছিল না, ছিল এক কঠিন অনীহা। সেহরিশ ঠান্ডা গলায় বলে উঠল, "যাঁরা একবার জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে যায়, তাঁদের কি জোর করে ফিরিয়ে আনা যায়, আদ্রিয়ান সাহেব? দয়া করে চলে যান। আমি আর অতীতে ফিরে যেতে চাই না।"
দরজাটা প্রায় আদ্রিয়ানের মুখের ওপর বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। কিন্তু আদ্রিয়ানের পা দুটো যেন ওই মাটিতেই গেঁথে গেছে। সে বুঝল, সেহরিশের এই বরফশীতল রূপের পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর কোনো ক্ষত, যা সময়ের সাথে আরও গভীরে গিয়ে বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। সে সহজে হার মানার পাত্র নয়। ছোটবেলার সেই না বলা ভালোবাসার ঋণ শোধ করার সময় কি তবে আজ এসে গেছে?
সন্ধ্যা নামতেই শহরের নিয়ন আলো জ্বলতে শুরু করল। সেহরিশ নিজের শোবার ঘরের অন্ধকার কোণে বসে হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে রইল। তার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া নোনা জল আজ অনেক দিনের জমানো বাঁধ ভেঙে চুইয়ে পড়ছে। সে নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে উঠল, "কেন এলে আদ্রিয়ান? কেন আবার আমার সাজানো শূন্যতায় ঝড় তুলতে এলে? আমি তোমকে ভুলতেই চেয়েছিলাম... কিন্তু কেন পারলাম না?"
বাইরে তখন ঝুমঝুম করে বৃষ্টি নামল। সেই বৃষ্টির রিমঝিম শব্দের সাথে মিশে রইল দুই হৃদয়ের এক অব্যক্ত হাহাকার। আদ্রিয়ান তখনো বাইরে, সেহরিশের জানালার ঠিক নিচেই ভিজে ভিজে দাঁড়িয়ে আছে। সে জানে, এই দূরত্ব সাময়িক। সেহরিশ যতই দূরে ঠেলে দিতে চাক না কেন, আদ্রিয়ানের বুকের ভেতর জ্বলতে থাকা আগুন আজ সমস্ত বরফ গলিয়ে দিতে প্রস্তুত। গল্পের এই ধোঁয়াশা ভরা রাতে শুরু হলো এক নতুন লড়াই—হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসাকে আবার নিজের করে নেওয়ার লড়াই।
ঝুম বৃষ্টির রিমঝিম শব্দে রাতের নীরবতা আরও ভারী হয়ে উঠেছে। সেহরিশ তার শোবার ঘরের জানালার পর্দাটা একটু সরিয়ে বাইরে তাকিয়েছিল। রাস্তার ওই ভেজা পিচ্ছিল রাস্তায় আদ্রিয়ান তখনো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঝড়ের বেগে আসা ঠান্ডা হাওয়া আর মুষলধারে পড়া বৃষ্টির ফোঁটা তার পুরো শরীর ভিজিয়ে দিয়েছে, কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্যও সেহরিশের জানালার দিক থেকে সরে যায়নি। সেহরিশের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। এত বছর পরেও মানুষটার পাগলামি এতটুকু কমেনি। বুকভরা কষ্ট আর চাপা ক্ষোভের মাঝেও কোথায় যেন এক অব্যক্ত দুর্বলতা মোচড় দিয়ে উঠল। সে নিজের অজান্তেই ফিসফিস করে বলে উঠল, "পাগল একটা... নিউমোনিয়া বাধিয়ে মরবে নাকি?"
দরজার বাইরে আদ্রিয়ানের স্থির উপস্থিতি আর ভেতরে সেহরিশের দ্বিধাদ্বন্দ্ব এক অদ্ভুত মানসিক যুদ্ধের জন্ম দিল। অবশেষে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না সে। হাতের ছাতাটা নিয়ে সে দ্রুত পায়ে নিচ নেমে এলো এবং সদর দরজার ছিটকিনি খুলে দিল।
দরজা খুলতেই এক চিলতে ঠান্ডা বাতাস ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আদ্রিয়ানকে দেখে সেহরিশের চোখ দুটো রাগে ও অভিমান লাল হয়ে উঠল। সে কঠোর গলায় বলে উঠল, "আপনার কি একটুও বুদ্ধিসুদ্ধি নেই? এই মাঝরাতে বৃষ্টির মধ্যে এখানে দাঁড়িয়ে ভিজছেন কেন? নাটক করার জায়গা পেলেন না?"
আদ্রিয়ানের ভেজা চুলগুলো কপাল জুড়ে লেপ্টে আছে। তার পরিধেয় শার্টটা বৃষ্টির জলে সম্পূর্ণ ভিজে শরীরের সাথে সেঁটে গেছে। কিন্তু সেই ক্লান্ত আর ভেজা অবস্থাতেও তার ঠোঁটে এক মায়াবী হাসি ফুটে উঠল। সে এক পা এগিয়ে সরাসরি সেহরিশের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ ভারী গলায় বলল, "নাটক তো তুমি করছ, সেহরিশ। নিজেকে পাথর বানিয়ে রাখার এই অভিনয় কত দিন চালাবে? তুমি যতই দূরে ঠেলে দিতে চাও না কেন, আমার চোখ কি দেখতে পায় না যে আজও আমার জন্য তোমার বুকের ভেতরটা পুড়ছে?"
আদ্রিয়ানের এই সরাসরি আক্রমণে সেহরিশের পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। সে ডিফেন্সিভ ভঙ্গিতে পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই আদ্রিয়ান ঝড়ের বেগে এক লাফে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল এবং আলতো করে সদর দরজাটা বন্ধ করে দিল।
ঘরের ভেতরে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার আর পিনপতন নীরবতা। বাইরে শুধু বৃষ্টির তীব্র গর্জন। আদ্রিয়ান যখন ভেজা গায়ে একদম কাছাকাছি এসে দাঁড়াল, তখন তার শরীর থেকে ভেসে আসা উষ্ণ বৃষ্টির গন্ধ আর পুরুষালী সুবাস সেহরিশের চারপাশের বাতাসকে ভারী করে তুলল। সেহরিশ পিছু হটতে হটতে সরাসরি দেওয়ালের সাথে সেঁটে গেল। তার পেছনে ঠান্ডা দেওয়াল, আর সামনে আদ্রিয়ানের উত্তপ্ত উপস্থিতি—মাঝখানে আর এক ইঞ্চি জায়গাও খালি নেই।
"কাছে আসবেন না, আদ্রিয়ান বলছি!" সেহরিশ ভয়ে এবং তীব্র আবেগে কাঁপতে কাঁপতে নিজের দুই হাত দিয়ে আদ্রিয়ানের বুক ঠেলার চেষ্টা করল। কিন্তু আদ্রিয়ানের পেশীবহুল বুক যেন লোহার এক প্রাচীর। সে এক হাত দিয়ে সেহরিশের দুটো কব্জি আলতো করে ধরে তার মাথার ওপর দেওয়ালের সাথে আটকে ফেলল, আর অন্য হাত দিয়ে সেহরিশের ভেজা চুলের রেশমি রিফনটা আলগা করে দিল।
আদ্রিয়ানের উষ্ণ নিঃশ্বাস এখন সেহরিশের গালের ঠিক ওপরে এসে পড়ছে। এত কাছে দুজন বহু বছর পর! সেহরিশের চোখের পাতা কাঁপছে, বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে। সে আর নিজেকে সামলাতে না পেরে কাঁপাকাঁপা গলায় বলে উঠল, "কেন এলে তুমি? যখন চলে গিয়েছিলে, তখন তো একবারও ফিরে তাকাওনি! জেনেশুনে কেন আমার সাজানো জীবনে আবার এই অশান্তির আগুন জ্বালাতে এলে?"
আদ্রিয়ান তার মুখটা সেহরিশের আরও কাছে নিয়ে এল। তার কণ্ঠস্বর তখন মদ্যপ আবেশের মতো ভারী আর মোহময়। সে ফিসফিস করে বলল, "চলে গিয়েছিলাম কারণ বাধ্য ছিলাম, সেহরিশ। কিন্তু প্রতিটা রাত, প্রতিটা মুহূর্ত এই বুকজুড়ে শুধু তোমার নামটাই প্রতিধ্বনিত হয়েছে। আমি তোমাকে ছাড়া এক মুহূর্তের জন্যও বাঁচিনি। আজ তোমার এই শীতলতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই ছোটবেলার ভয় আর ভালোবাসা আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। আমাকে মিথ্যে বলো না যে তুমি আমাকে ভুলে গেছ।"
কথাগুলো যেন সেহরিশের হৃদয়ের সবচেয়ে গভীরে থাকা ক্ষতস্থানে সরাসরি গিয়ে আঘাত করল। তার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া নোনা জল আদ্রিয়ানের হাতের আঙুল ছুঁয়ে গেল। সেই স্পর্শে সমস্ত রাগ, সমস্ত অভিমান নিমেষেই বাষ্প হয়ে উড়ে গেল। সেহরিশ আর নিজের কান্না ধরে রাখতে পারল না। সে তার মাথাটা আদ্রিয়ানের ভেজা বুকের সাথে গুঁজে দিয়ে সশব্দে কেঁদে ফেলল।
আদ্রিয়ান পরম যত্নে ও ভালোবাসায় তার পিঠে হাত বোলাতে লাগল। বহু বছরের জমানো বরফ গলতে শুরু করেছে। সেই অন্ধকার ঘরে বৃষ্টির শব্দকে ছাপিয়ে শোনা গেল দুই হৃদয়ের এক হয়ে যাওয়ার দীর্ঘশ্বাস। আদ্রিয়ান তার চিবুক ধরে সেহরিশের মুখটা ওপরে তুলল, আর তারপর তাদের ঠোঁটের দূরত্ব ঘুচে গেল এক গভীর, মায়াবী ও উষ্ণ চুম্বনে। সেই চুম্বনে কোনো তাড়া ছিল না, ছিল বহু বছরের জমে থাকা হাহাকার আর তীব্র ভালোবাসার পূর্ণতা।
বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টির বেগ কিছুটা কমে এসেছে, কিন্তু ঘরের ভেতরের উষ্ণতা যেন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। চারপাশের ঘুটঘুটে অন্ধকার ভেদ করে জোনাকির মতো আলো ছড়াচ্ছে দুই হৃদয়ের বহু কাঙ্ক্ষিত মিলন। আদ্রিয়ানের শক্তিশালী বাহুডোরে আবদ্ধ সেহরিশ এখন সম্পূর্ণ অন্য এক সত্তা। তার সমস্ত রাগ, সব অভিমান আর দীর্ঘ বছরের জমানো কষ্ট যেন ওই একটা নিশ্বাসে বরফ হয়ে গলে গেছে।
আদ্রিয়ান তার আঙুলগুলো সেহরিশের পিঠে আলতো করে বুলিয়ে দিচ্ছিল, যেন কোনো মূল্যবান কাচ ভেঙে যাওয়ার ভয়। সে ফিসফিস করে বলল, "আর কখনো তোমাকে চোখের আড়াল হতে দেব না, সেহরিশ। এই দূরত্ব, এই কষ্ট—সবকিছুর আজ চিরতরে অবসান হলো।"
সেহরিশ আদ্রিয়ানের বুকের ওপর মাথা রেখে ফিসফিস করে উত্তর দিল, "এত বছর শুধু একটা ভুলের ভয়ে বেঁচে ছিলাম, আদ্রিয়ান। ভেবেছিলাম তুমি আর ফিরবে না। আমার এই ছোট্ট পৃথিবীতে তুমি ছাড়া তো কেউ ছিল না, অথচ নিজেকে একা করে রেখেছিলাম।"
ঘরের মায়াবী আলোয় দুজনের চোখের ভাষা এক হয়ে গেল। আদ্রিয়ান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে আরও একবার সেহরিশের নরম ঠোঁটে নিজের ঠোঁট রাখল—এক গভীর, আবেগঘন ও অন্তহীন চুম্বনে হারিয়ে গেল দুজনে। সেই চুম্বনের তীব্রতা যেন ঘরের শীতল হাওয়াকে নিমেষেই পুড়িয়ে ছাই করে দিল। তাদের নিঃশ্বাসের সাথে মিশে গেল বহু বছরের না বলা কথার অন্তিম পরিণতি।
পরদিন সকালে যখন জানלর ফাঁক দিয়ে নরম রোদের আলো এসে ঘরে পড়ল, তখন সেহরিশের ঘুম ভাঙল আদ্রিয়ানের বাহুডোরেই। কাল রাতের সেই ঝড়ঝঞ্ঝার পর আজ বাইরের আকাশ একদম পরিষ্কার, ঝকঝকে নীল। উঠানের ভেজা গাছের পাতায় রোদ পড়ে হিরের মতো চকচক করছে।
সেহরিশ আদ্রিয়ানের বুকের ওপর মাথা রেখে অপলক তাকিয়ে দেখছিল মানুষটার ঘুমে শান্ত হয়ে থাকা মুখটার দিকে। ছোটবেলার সেই দুরন্ত আদ্রিয়ান আজ তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। আদ্রিয়ান চোখ মেলে সেহরিশের দিকে তাকাতেই তার মুখে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। সে সেহরিশকে আরও শক্ত করে বুকে টেনে নিয়ে কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে বলল, "শুভ সকাল, আমার জীবন।"
সেহরিশ লজ্জায় লাল হয়ে আদ্রিয়ানের বুকে কিল মেরে বলে উঠল, "বাজে বকবেন না তো! চলুন, এবার চা বানাতে হবে।"
আদ্রিয়ান হেসে সেহরিশের হাত ধরে এক টানে তাকে বিছানায় ফেলে জড়িয়ে ধরে বলল, "চা পরে হবে, আগে বলো পালিয়ে যাওয়ার আর কোনো রাস্তা আছে কি না?"
সেহরিশ খিলখিল করে হেসে উঠল। বহু বছর পর তার ঠোঁটে সেই ছোটবেলার নিখাদ হাসিটা ফিরে এসেছে। সমস্ত অন্ধকার পেরিয়ে তাদের জীবনে নেমে এসেছে এক নতুন সূর্যোদয়ের আলো, যেখানে আর কোনো বিচ্ছেদ নেই, আছে শুধু ভালোবাসার এক অন্তহীন সমুদ্র।
....