গ্রীষ্মের একটা স্নিগ্ধ বিকেলে মৃণালিনীর যখন নতুন সংসার শুরু হলো, তখন তার চোখে ছিল হাজারো রঙিন স্বপ্ন। রেহানের সাথে তার বিয়েটা পারিবারিকভাবেই ঠিক হয়েছিল। রেহান শহরের স্বনামধন্য এক ব্যবসায়ী, দেখতে যেমন সুদর্শন, তেমনি মার্জিত তার আচরণ। মৃণালিনী ভেবেছিল, এই ছিমছাম সংসার আর ভালোবাসার চাদরে মোড়া জীবনটা রূপকথার মতো সুন্দর হবে। কিন্তু বিয়ের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পার হতেই সে বুঝতে পারল, রূপকথা আর বাস্তবতার আকাশ-পাতাল তফাত।
রেহান তার খেয়াল রাখে, প্রয়োজনীয় সবকিছুর অভাব রাখে না, কিন্তু সে যেন এক অদৃশ্য বৃত্তে বন্দী। বাড়ির বিশাল ড্রয়িংরুমের সোফায় কিংবা রাতের ব্রেকফাস্ট টেবিলে রেহানের উপস্থিতি থাকে শরীরী, কিন্তু তার মন যেন পড়ে থাকে অন্য কোথাও। মৃণালিনী লক্ষ্য করল, রেহানের ল্যাপটপের পাসওয়ার্ডে, তার ডায়েরির ভাঁজে কিংবা রাতের আধারে বারান্দায় দাঁড়িয়ে একাকী ধূমপান করার সময়—সবকিছুর ভেতরে একজন নারীর ছায়া লুকিয়ে আছে। সে হলো রিমঝিম। রেহানের কলেজের দিনের সেই বিশেষ মানুষটি, যাকে সে আজও ভুলতে পারেনি। পরিস্থিতির নির্মম বাস্তবতায় যাদের পথ আলাদা হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু রেহানের অন্তরে রিমঝিমের আসন কেউ কেড়ে নিতে পারেনি।
একদিন গভীর রাতে মৃণালিনী ঘুম ভাঙলে দেখল রেহান পাশে নেই। ড্রয়িংরুমের ম্লান আলোয় সে দেখল, রেহান একটা পুরোনো ডায়েরির পাতা উলটাচ্ছে আর তার মোবাইল স্ক্রিনে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। স্ক্রিনে ভেসে থাকা একটা ছবির ওপর রেহানের আঙুল ছোঁয়া—সেটা রিমঝিমের ছবি। সেই রাতে মৃণালিনীর বুকের ভেতরটা চিনচিন করে উঠল। সে কোনো চিৎকার করল না, কোনো অভিযোগ নিয়ে স্বামীর সামনে দাঁড়িয়ে ঝগড়াও করল না। সে নিঃশব্দে নিজের বিছানায় ফিরে এল এবং সেই মুহূর্তেই মনে মনে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিল। যে সম্পর্কে নিজের কোনো অধিকার বা সম্পূর্ণ অস্তিত্ব নেই, সেখানে জোর করে টিকে থাকার চেয়ে আস্তে আস্তে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া অনেক বেশি সম্মানের।
পরের দিন থেকেই মৃণালিনীর আচরণে এক অদ্ভুত পরিবর্তন এল। সে আর আগের মতো রেহানের পছন্দের খাবার রান্না করার জন্য তাগিদ দেয় না, তার শার্টের বোতাম লাগিয়ে দেওয়া বা চুল ঠিক করে দেওয়ার মতো ছোট ছোট অন্তরঙ্গ কাজগুলো থেকে নিজেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে নিল। রেহান যখন বাড়ি ফেরে, মৃণালিনী তখন নিজের বই নিয়ে বা নিজের মতো কোনো কাজে ব্যস্ত থাকে। তার মুখে মৃদু হাসি থাকে, চোখের দৃষ্টিতে থাকে এক শান্ত উদাসীনতা—যা রেহানকে ভেতর থেকে অস্বস্তিতে ফেলতে শুরু করে।
এক সন্ধ্যায় রেহান অফিস থেকে ফিরে সোফায় বসে বলল, "মৃণালিনী, তোমার কি কোনো সমস্যা হচ্ছে? ইদানিং তোমাকে কেমন যেন অচেনা লাগে।"
মৃণালিনী চায়ের কাপটা রেহানের সামনে টেবিলে রেখে স্নিগ্ধ কিন্তু দূরত্ব বজায় রাখা গলায় উত্তর দিল, "কোনো সমস্যা নেই তো! সব ঠিকই আছে। শুধু ভাবছিলাম, সম্পর্কে একটু নিজেদের মতো করে শ্বাস নেওয়ার স্বাধীনতা থাকা ভালো।"
রেহান এই কথার গভীরে পৌঁছাতে পারল না। সে ভাবল, হয়তো নতুন পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে মৃণালিনীর একটু সময় লাগছে। কিন্তু এই নীরবতা যে এক গভীর ঝড়ের পূর্বাভাস, তা সে তখনো বুঝতে পারেনি। মৃণালিনী রান্নাঘর থেকে শুরু করে শোবার ঘর—সব জায়গাতেই নিজের উপস্থিতি এমনভাবে পাতলা করে দিল যে রেহানের চারপাশটা হঠাৎ করে ফাঁকা ঠেকতে লাগল। সে দেখল, তার চায়ের কাপটা ঠিক সময়ে টেবিলে আসছে ঠিকই, কিন্তু তাতে সেই হাতের ছোঁয়া নেই, যা ভালোবাসা বোঝায়।
রাত গভীর হয়। এয়ারকন্ডিশনারের মৃদু শব্দে ভরা শোবার ঘরে রেহান বিছানায় শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। মৃণালিনী তার থেকে কয়েক ইঞ্চি দূরে শুয়ে থাকে, অথচ তাদের মাঝখানে যেন পাহাড়প্রমাণ এক অদৃশ্য দূরত্ব দাঁড়িয়ে আছে। রেহানের শরীরী উপস্থিতি মৃণালিনীর খুব কাছে হলেও, সে বুঝতে পারে এই দূরত্ব আর সাধারণ দূরত্ব নয়। মৃণালিনী এখন তার মনের ভেতর আর প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। এই অবহেলা বা দূরত্ব রেহানের অহংকারে আঘাত হানল না, বরং তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত অস্বস্তি আর শুন্যতা তৈরি করতে শুরু করল। যে মানুষটিকে সে এতদিন গুরুত্ব দেয়নি, সেই মানুষটির নীরব প্রস্থানই তাকে ভেতর থেকে নাড়া দিতে শুরু করেছিল।
দিনের পর দিন মৃণালিনীর এই শীতল দূরত্ব রেহানের মনে এক অজানা অস্থিরতা তৈরি করতে শুরু করল। আগে সে বাড়ি ফিরলে ঘরের কোণ থেকে মৃণালিনীর হাসিমুখ তাকে স্বাগত জানাত, টেবিলে গরম খাবার সাজানো থাকত। এখন ঘরটা থাকে পরিপাটি, কিন্তু তাতে কোনো প্রাণের স্পন্দন থাকে না। মৃণালিনী তার নিজের জগতের সীমানা এমনভাবে টেনে নিয়েছে যে রেহান চাইলেও সেই সীমানা সহজে পার হতে পারে না। সে খাবার টেবিলে বসে মৃণালিনীর দিকে তাকায়, কোনো অভিযোগ করতে পারে না কারণ মৃণালিনী তার কর্তব্যে চুল পরিমাণ অবহেলা করে না। তবুও এই নিখুঁত যান্ত্রিকতা রেহানকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।
সেদিন ছিল একটানা ঝুম বৃষ্টি। বাইরে বৃষ্টির শব্দে চারপাশটা যেন থমকে আছে। রেহান অফিসের জরুরি কাজ শেষ করে একটু আগেই বাড়ি ফিরে এল। ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করতেই সে দেখল, মৃণালিনী জানালার ধারে দাঁড়িয়ে বাইরে বৃষ্টির ফোঁটা দেখছে। তার পরনে একটা হালকা নীল রঙের শাড়ি, খোলা চুলগুলো পিঠের ওপর অবিন্যস্তভাবে ছড়িয়ে আছে। বৃষ্টির ছাঁটে তার মুখের কিছুটা ভিজে গেছে, যা তাকে এক অপূর্ব লাবণ্য দিয়েছে।
রেহান নিজের অজান্তেই তার দিকে এগিয়ে গেল। মৃণালিনীর ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়াল সে। বাইরের বৃষ্টির সোঁদা গন্ধের সাথে মৃণালিনীর চুলের চেনা সুবাস রেহানের নাকে এসে লাগল, যা তার বুকের ভেতরকার সব হিসাব-নিকাশ ওলটপালট করে দিল।
রেহান নিচু অথচ ভারী গলায় ডাকল, "মৃণালিনী..."
মৃণালিনী চমকে না গিয়ে অত্যন্ত শান্তভাবে ফিরে তাকাল। তার চোখের সেই উদাসীন চাহনি রেহানকে আরও বেশি ঘায়েল করে তুলল। রেহান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে হঠাৎ করেই মৃণালিনীর দু'হাতের বাহু শক্ত করে নিজের শরীরের দিকে টেনে নিল। বাইরে বৃষ্টির তীব্র গর্জনের মাঝে তাদের দুজনের ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।
রেহানের চোখের ভেতর তখন এক অসহ্য আকুলতা। সে ফিসফিস করে বলল, "কত দিন এভাবে দূরে দূরে থাকবে, মৃণালিনী? তুমি কি বুঝতে পারছ না, তোমার এই নীরবতা আমাকে ভেতর থেকে শেষ করে দিচ্ছে?"
মৃণালিনী নিজের হাত দুটো ছাড়ানোর সামান্য চেষ্টা করে মায়াবী অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল, "দূরে তো আপনিই আমাকে রেখেছেন, রেহান সাহেব। আমি শুধু নিজের জায়গাটা খুঁজে নিচ্ছি, যেখানে কারো অবহেলার ভয় থাকে না।"
এই কথাটুকুই যেন রেহানের বুকে তীরের মতো বিঁধল। সে মৃণালিনীর আরও কাছে চলে এল, তাদের মাঝখানের দূরত্বটুকু সম্পূর্ণ মুছে ফেলল। রেহানের হাত দুটো মৃণালিনীর কোমর জড়িয়ে ধরল, তার তপ্ত নিঃশ্বাস পড়তে লাগল মৃণালিনীর গ্রীবাদেশে। এই স্পর্শ আকস্মিক হলেও এর ভেতরে ছিল এক তীব্র আকুতি আর অধিকারের দাবি। রেহানের ঠোঁট ছুঁয়ে গেল মৃণালিনীর কানের লতিতে, তার গলার ভেজা ত্বকে এক রোমাঞ্চকর উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ল।
বাইরে বৃষ্টির তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে ঘরের ভেতরের পরিবেশও হয়ে উঠল আরও বেশি উষ্ণ ও আবেগঘন। মৃণালিনী যতই নিজেকে পাথর করে রাখতে চাক না কেন, রেহানের এই ছোঁয়া, তার স্পর্শের কাঁপন আর চোখে জমে থাকা অপরাধবোধ তাকে ভেতরে ভেতর নাড়া দিল। রেহান তার চিবুক ধরে মুখটা ওপরে তুলল এবং মৃণালিনীর চোখের দিকে তাকিয়ে এক আকুল চাহনিতে জানতে চাইল, "আমাকে কি একটুও ক্ষমা করা যায় না? এই দূরত্ব কি মোছা যায় না?"
মৃণালিনীর বুক তখন দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছিল। রেহানের হাতের শক্ত অথচ উষ্ণ স্পর্শ, তার শরীরের সুবাস আর এই তীব্র রোমান্টিক আবহাওয়া মৃণালিনীর জমাট বাঁধা বরফ গলাতে শুরু করল। সে রেহানের বুকের ওপর নিজের হাত রাখল, যেখানে হৃদপিণ্ডটা বন্য ঘোড়ার মতো ছুটছে। মৃণালিনীর ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল, কিন্তু তার চোখের গভীরে তখনো ঝুলে আছে এক না-বলা পরীক্ষার পালা। রেহান তার ঠোঁট নামিয়ে আনল মৃণালিনীর ঠোঁটের খুব কাছাকাছি, কিন্তু চূড়ান্ত মিলনের ঠিক আগের মুহূর্তে মৃণালিনী এক অদ্ভুত দক্ষতায় নিজেকে ছাড়িয়ে পিছিয়ে গেল।
সে নিচু অথচ ভারী গলায় বলল, "খেলা তো সবে শুরু হয়েছে, রেহান। দূরত্ব কমাতে হলে শুধু শরীর কাছে টানলে চলে না, মনটাকেও পুরোটা সঁপে দিতে হয়।"
রেহান হতভম্ব হয়ে এক দৃষ্টিতে মৃণালিনীর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তার শরীরের ভেতরে তখনো সেই উষ্ণ স্পর্শের রেশ আর চরম রোমাঞ্চের শিহরণ খেলা করছে। সে বুঝতে পারল, মৃণালিনী আর আগের সেই সরল মেয়েটি নেই; সে এখন এমন এক ধ্রুপদী রহস্য, যাকে জয় করার জন্য তাকে নিজের সব অহংকার বিসর্জন দিতে হবে।
সেই বৃষ্টির রাতের পর রেহানের জীবনের হিসাব-নিকাশ পুরোপুরি বদলে গেল। মৃণালিনীর সেই তীক্ষ্ণ অথচ সত্য কথাগুলো তার মগজে যেন হাতুড়ির মতো আঘাত করতে লাগল। "মনটাকে পুরোটা সঁপে দিতে হয়"—এই একটি বাক্য রেহানকে তার নিজের ভেতরের শূন্যতার সামনে দাঁড় করিয়ে দিল। সে বুঝতে পারল, যে অতীত কোনোদিন তার জীবনে ফিরে আসবে না, তার মোহ আঁকড়ে ধরে সে তার বর্তমানের সবচেয়ে মূল্যবান রত্নটিকে হারাতে বসেছে। রিমঝিম ছিল এক কৈশোরের আবেগ, এক না-পাওয়া গল্পের অধ্যায় মাত্র। কিন্তু মৃণালিনী? মৃণালিনী তার বাস্তব, তার জীবনের সেই শান্ত নদী, যার বুকে সে নিজের সব ক্লান্তি আর অবসাদ ভাসিয়ে দিতে পারে।
পরদিন রাতে রেহান তার স্টাডি রুমে ঢুকল। ড্রয়ার থেকে বের করল সেই পুরোনো ডায়েরি, যেটার পাতায় পাতায় লেখা ছিল এক অতীতের দীর্ঘশ্বাস। ল্যাপটপটা খুলে সেই হিডেন ফোল্ডারটাও বের করল, যেখানে সযত্নে লুকিয়ে রাখা ছিল কিছু পুরোনো ছবি। আজ আর রেহানের বুকে কোনো চিনচিনে ব্যথা বা দ্বিধা কাজ করল না। এক মুহূর্তের জন্যও তার হাত কাঁপল না। সে ল্যাপটপ থেকে ফোল্ডারটা চিরতরে ডিলিট করে দিল। তারপর বারান্দায় গিয়ে ডায়েরির পাতাগুলো ছিঁড়ে একটা পাত্রে আগুন ধরিয়ে দিল। আগুনের লেলিহান শিখায় যখন অতীতের শেষ স্মৃতিটুকু ছাই হয়ে যাচ্ছিল, রেহান তখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করল। তার মনে হলো, আজ সে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন। এবার তার সামনে কেবল একটাই লক্ষ্য—মৃণালিনীর সেই জমে থাকা বরফ গলিয়ে তার মনের প্রতিটি কোণে নিজের ভালোবাসার প্রদীপ জ্বালানো।
পরের দিন সকালে নাস্তার টেবিলে রেহান অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল, "মৃণালিনী, তোমার ব্যাগ গুছিয়ে নাও। আমরা আজ দুপুরের পরেই বের হচ্ছি। শ্রীমঙ্গলের একটা চা-বাগানের ভেতরের রিসোর্টে বুকিং দিয়েছি। কয়েকটা দিন আমরা শুধু নিজেদের মতো করে কাটাব।"
মৃণালিনী কিছুটা অবাক হলেও মুখে কিছু বলল না। সে শুধু নীরবে সম্মতি জানাল। তার ভেতরেও এক অদ্ভুত কৌতূহল কাজ করছিল। রেহানের চোখের দৃষ্টি আজ অন্যরকম—সেখানে কোনো অপরাধবোধ নেই, নেই কোনো লুকোচুরি। সেখানে আছে এক তীব্র নিশ্চয়তা আর অধিকারবোধ।
বিকেলের দিকে তাদের গাড়ি যখন শ্রীমঙ্গলের পাহাড়ি আর আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল, চারপাশের সবুজ চা-বাগান আর স্নিগ্ধ বাতাস এক অদ্ভুত রোমান্টিক আবেশ তৈরি করেছিল। গাড়ির ভেতরে পিনপতন নীরবতা। রেহান এক হাত স্টিয়ারিংয়ে রেখে অন্য হাতটা আলতো করে মৃণালিনীর সিটের ওপর রাখল। মৃণালিনী হাতটা সরিয়ে নিল না। এই ছোট ছোট স্পর্শ, নীরব সম্মতি তাদের মাঝখানের অদৃশ্য দেয়ালটাকে যেন একটু একটু করে ভাঙতে শুরু করেছিল।
রিসোর্টে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা নেমে এল। তাদের কটেজটা ছিল একদম পাহাড়ের চূড়ায়, চারপাশে ঘন গাছপালা আর জংলি ফুলের মিষ্টি সুবাস। শহরের কোলাহল থেকে যোজন যোজন দূরে এই জায়গাটা যেন শুধু তাদের দুজনের জন্যই তৈরি। রাতের খাবার শেষে তারা কটেজের বিশাল কাঠের বারান্দায় এসে দাঁড়াল। আকাশে রূপালি চাঁদের আলো, আর দূরে পাহাড়ের গায়ে জোনাকির মেলা। হালকা শীতের আমেজ চারদিকে। মৃণালিনীর পরনে একটা গাঢ় লাল রঙের পাতলা শাড়ি, চুলগুলো হাওয়ায় উড়ছে।
রেহান পেছন থেকে এসে মৃণালিনীকে একদম নিজের সাথে মিশিয়ে দাঁড়াল। তার দুহাত মৃণালিনীর কোমর পেঁচিয়ে ধরল শক্ত করে। মৃণালিনী এবার আর পিছলে গেল না, শুধু তার বুকটা দ্রুত ওঠানামা করতে লাগল। রেহান তার মুখটা মৃণালিনীর কানের কাছে নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, "আমার জীবনের সব অতীত, সব মোহ আমি পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছি, মৃণালিনী। আমার ল্যাপটপের পাসওয়ার্ড থেকে শুরু করে আমার মনের প্রতিটি কোণ এখন শুধুই তোমার। তুমি ছাড়া আর কারো কোনো অস্তিত্ব নেই সেখানে। আমাকে কি এবার তোমার মনের ওই বন্ধ দরজাটা একটু খুলে দেওয়া যায় না?"
রেহানের গলার স্বর ছিল ভারী, আবেগপূর্ণ আর চরম সত্যি। মৃণালিনী ধীরে ধীরে রেহানের দিকে ঘুরল। রেহানের চোখে তাকাল সে। চাঁদের আলোয় মৃণালিনী স্পষ্ট দেখতে পেল রেহানের চোখের কোণে জমে থাকা জল। সেই জলে কোনো অভিনয় ছিল না, ছিল নিখাদ ভালোবাসা আর অনুশোচনা। মৃণালিনীর এতদিন ধরে জমিয়ে রাখা সব অভিমান, সব কঠোরতা এক নিমিষেই গলে জল হয়ে গেল। সে তার দুহাত দিয়ে রেহানের গলা জড়িয়ে ধরল আর তার বুকে মাথা রাখল।
রেহান যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেল। সে মৃণালিনীকে শূন্যে তুলে ধরে ঘরের ভেতরের নরম বিছানায় নিয়ে এল। ঘরের মৃদু হলুদ আলোয় মৃণালিনীকে যেন কোনো এক অপ্সরার মতো লাগছিল। রেহানের হাতের আঙুলগুলো আলতো করে মৃণালিনীর মুখের ওপর দিয়ে, গলার খাঁজ বেয়ে নিচে নামতে লাগল। তার স্পর্শে ছিল এক পাগল করা শিহরণ, যা মৃণালিনীর শরীরের প্রতিটি কোষে এক দাবানল ধরিয়ে দিল।
"আজ আর কোনো দূরত্ব নয়, মৃণালিনী," বলে রেহান তার তপ্ত ঠোঁট ডুবিয়ে দিল মৃণালিনীর ঠোঁটের গভীরে। দীর্ঘদিনের তৃষ্ণার্ত এক পথিকের মতো রেহান যেন তার সবটা শুষে নিতে চাইল। মৃণালিনীও আজ কোনো বাধা দিল না, বরং সেও সমান তীব্রতায় সাড়া দিল। রেহানের হাতের নিপুণ স্পর্শে মৃণালিনীর শাড়ির বাঁধন কখন যে আলগা হয়ে গেল, তা তারা কেউই বুঝতে পারল না।
রেহানের উষ্ণ ঠোঁট মৃণালিনীর গ্রীবা থেকে শুরু করে কাঁধের উন্মুক্ত অংশে এক গভীর ভালোবাসার চিহ্ন এঁকে দিতে লাগল। মৃণালিনীর মুখ থেকে অস্ফুট এক শিহরণের শব্দ বেরিয়ে এল, সে তার আঙুলগুলো রেহানের চুলে ডুবিয়ে দিয়ে তাকে আরও কাছে, আরও গভীরে টেনে নিল। তাদের শরীরের উত্তাপ, ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ আর একে অপরের প্রতি তীব্র আকর্ষণ ঘরের ভেতরের পরিবেশকে চরম উত্তপ্ত করে তুলল। রেহান মৃণালিনীর প্রতিটি স্পর্শকাতর অঙ্গে নিজের অধিকারের সিলমোহর বসিয়ে দিচ্ছিল। তার হাতের ছোঁয়ায় মৃণালিনীর শরীর ধনুকের মতো বেঁকে যাচ্ছিল চরম পুলকে।
দুটি ক্ষুধার্ত শরীর আর তৃষ্ণার্ত আত্মা আজ যেন একাকার হয়ে গেল। সব অভিমান, সব দূরত্ব মুছে গিয়ে সেখানে জন্ম নিল এক আদিম আর পবিত্র বন্যতা। রেহানের শরীরের ভার আর তার ভালোবাসার উত্তাপে মৃণালিনী নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পণ করল। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে শুধু তাদের মিলনের ছন্দ আর ভালোবাসার ফিসফিসানি প্রতিধ্বনিত হতে লাগল কটেজের চার দেয়ালে। তারা হারিয়ে গেল এক চরম সুখের সাগরে, যেখানে শরীর আর মন মিলেমিশে এক হয়ে যায়।
পরদিন সকালে যখন ভোরের প্রথম আলো কটেজের জানালা গলে বিছানায় এসে পড়ল, মৃণালিনীর ঘুম ভাঙল। সে দেখল রেহান তাকে এখনো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে, যেন একটু ছাড়লেই সে হারিয়ে যাবে। রেহানের মুখের দিকে তাকিয়ে মৃণালিনীর ঠোঁটে এক পরম তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে রেহানের কপালে আলতো করে একটা চুমু খেল।
রেহান চোখ না খুলেই মৃণালিনীকে আরও কাছে টেনে নিয়ে ঘুম জড়ানো গলায় বলল, "সকাল হয়ে গেছে আমার জান? নাকি এখনো স্বপ্ন দেখছি?"
মৃণালিনী রেহানের বুকের লোমে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে স্নিগ্ধ গলায় বলল, "স্বপ্ন নয় রেহান, এটা আমাদের নতুন রূপকথা। যে রূপকথায় তুমি আর আমি ছাড়া আর কেউ নেই।"
বাইরে তখন পাহাড়ি পাখিদের কলকাকলি আর মিষ্টি রোদ জানান দিচ্ছিল এক নতুন সকালের, এক নতুন জীবনের, যেখানে আর কোনো অতীত নেই, কোনো দূরত্ব নেই। আছে শুধু দুজন মানুষের নিঃশর্ত আর তীব্র এক ভালোবাসা।
....