ক্যাফের কোণে হঠাৎ দেখা

ঢাকার ব্যস্ত একটি ক্যাফে। বৃষ্টির ফোঁটা জানালার কাচে এসে আলতো করে টোকা দিচ্ছে। বাইরে তখন গোধূলির আলো আর মেঘলা আকাশের এক অদ্ভুত মিতালি। তাসনীম এক কাপ কফি হাতে জানালার ধারের টেবিলে বসে আছে। তার চোখের দৃষ্টি বাইরে বৃষ্টির দিকে নিবদ্ধ, কিন্তু মনের ভেতর চলছে স্মৃতি রোমন্থনের এক গভীর ঝড়। ঠিক এই রকমই একটা বৃষ্টিভেজা বিকেলে পাঁচ বছর আগে তার জীবন থেকে চিরকালের মতো হারিয়ে গিয়েছিল অর্ণিব।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

অর্ণিব—তাসনীমের জীবনের সবচেয়ে বড় ভরসার স্থল, তার প্রথম ও একমাত্র ভালোবাসা। অথচ ছোট্ট একটা ভুল বোঝাবুঝি, কিছু না বলা কথা আর অভিমানের দেয়াল তাদের চিরতরে আলাদা করে দিয়েছিল। তাসনীম আজও মনে করতে পারে সেই শেষ বিকেলের কথা। দুজনে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল, চোখে জল ছিল দুজনেরই, কিন্তু জেদের বশে কেউ কাউকে আটকাতে পারেনি। অর্ণিব সেদিন চলে গিয়েছিল এক অজানা ঠিকানায়, আর তাসনীম নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল একাকীত্বের চাদরে।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

পাঁচটা বছর কেটে গেছে চোখের পলকে। এই দীর্ঘ সময়ে তাসনীম নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে। সে এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী, পরিপক্ব এবং একা থাকতে অভ্যস্ত। সমাজের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সে নিজের একটি আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে। কিন্তু মনের গোপন কোণে যে শূন্যতা ছিল, তা আজও কেউ পূরণ করতে পারেনি। হাজারো ভিড়ের মাঝেও সে যেন কেবল অর্ণিবেরই মুখ খুঁজে ফেরে।

 

হঠাৎ ক্যাফের দরজার ঘণ্টা বেজে উঠল। বাইরে থেকে এক দীর্ঘদেহী পুরুষ ভেতরে প্রবেশ করলেন। তার গায়ে ছাইরঙা ওভারকোট, চুলগুলো সামান্য উসকোখুসকো, চোখে চশমা। বয়স যেন তার ব্যক্তিত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি ভেতরে ঢুকে চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে সোজা হেঁটে এলেন তাসনীমের টেবিলের দিকে।

 

তাসনীম তখন অন্যমনস্ক ছিল। টেবিলে কোনো শব্দ হতেই সে মুখ তুলে তাকাল। আর তাকাতেই তার রক্ত চলাচল যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। এই মুখ সে হাজার স্বপ্নের মাঝেও চেনে। এ তো সেই অর্ণিব! কিন্তু এ কি দেখছে সে? অর্ণিবের চেহারায় বয়সের ছাপের চেয়ে অনেক বেশি জমে আছে ক্লান্তির ছায়া। তার সেই চিরচেনা দীপ্ত চোখদুটোতে এখন এক গভীর পরিপক্বতা আর অব্যক্ত আকুলতা।

 

অর্ণিব ধীর পায়ে টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। তার ঠোঁটে এক ফালি হালকা, মায়াবী হাসি। সে কোনো অনুমতি না নিয়েই সামনের চেয়ারে বসে পড়ল। তার কণ্ঠস্বর আগের চেয়ে অনেক বেশি ভারী, অথচ সেই একই উষ্ণতায় মোড়ানো।

 

"কেমন আছো, তাসনীম?"

 

অর্ণিবের এই সহজ প্রশ্নটা যেন তাসনীমের বুকের ভেতরটা তোলপাড় করে দিল। পাঁচ বছর আগের জমে থাকা সমস্ত অভিমান, কষ্ট আর দীর্ঘশ্বাস এক নিমিষে ফুঁসে উঠতে চাইল। তাসনীম নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করল, কিন্তু তার কণ্ঠ কাঁপল।

 

"তুমি... তুমি এখানে? হঠাৎ করে এভাবে কোত্থেকে হাজির হলে?" তাসনীমের গলায় স্পষ্ট বিরক্তির সুর থাকলেও চোখের কোণে জমে থাকা জল সে লুকাতে পারল না।

 

অর্ণিব একটুও বিচলিত হলো না। সে শান্ত দৃষ্টিতে তাসনীমের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। যেন এই চোখের ভাষা পড়তে সে দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে অপেক্ষা করছিল। সে টেবিলের ওপর রাখা তাসনীমের হাতটি নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় তুলে নিল।

 

মুহূর্তের জন্য বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো কেঁপে উঠল তাসনীম। অর্ণিবের হাতের সেই উষ্ণ স্পর্শ, সেই চেনা সুবাস—সবকিছু যেন এক নিমেষে তাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল অতীত দিনের সেই সোনালী মুহূর্তে। তাসনীম হাতটা ছাড়িয়ে নিতে চাইল, কিন্তু অর্ণিবের গ্রিপ শক্ত অথচ আলতো ছিল।

 

"জানি, অনেক রাগ জমে আছে তোমার মনে। কিন্তু বিশ্বাস করো তাসনীম, এক মুহূর্তের জন্যও তোমাকে ভুলে থাকিনি। প্রতিটা দিন, প্রতিটা রাত কেবল তোমার চিন্তাতেই কেটেছে," অর্ণিবের গলায় এক বুক গভীর আকুতি ঝরে পড়ল।

 

তাসনীম এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার চোখের কোণ গড়িয়ে জল গাল বেয়ে নেমে এল। সে মুখ ফিরিয়ে বলল, "ভুলে থাকোনি? তাহলে পাঁচ বছর যোগাযোগ করলে না কেন? কেন সেদিন বিনা বাক্যে চলে গিয়েছিলে? আমার কষ্টগুলো কি তোমার কাছে একটুও মূল্যহীন ছিল, অর্ণিব?"

 

অর্ণিব দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে সোজা হয়ে বসল এবং তাসনীমের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে এক অজানা সত্যের উন্মোচন করতে শুরু করল। সে জানাল, কীভাবে সে দূরে থেকেও তাসনীমের প্রতিটা পদক্ষেপের খবর রাখত। তাসনীম কোন প্রজেক্টে সফল হচ্ছে, কার সাথে তার সখ্যতা বাড়ছে, এমনকি সে মাঝেমধ্যে রাতে ঘুমাতে না পারলে ক্যাফের কোণে বসে লুকিয়ে তাকে দেখত—সবকিছু একে একে বলতে লাগল অর্ণিব।

 

তাসনীম স্তব্ধ হয়ে শুনছিল। সে ভাবতেও পারেনি যে অর্ণিব এত কাছ থেকে তাকে পর্যবেক্ষণ করেছে। এই সুদীর্ঘ প্রবাস জীবন বা ভিন্ন শহরের দূরত্ব কখনোই তাদের মাঝে ব্যবধান তৈরি করতে পারেনি। অর্ণিবের মনের গভীরে কেবল তাসনীমই রাজত্ব করছিল।

 

বাইরে তখন বৃষ্টির বেগ আরও বেড়ে গেছে। ক্যাফের ভেতরের মৃদু আলোয় দুজনের ছায়া একাকার হয়ে গেছে। ক্যাফের ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে একটি স্নিগ্ধ যন্ত্রসংগীত। সেই রোমাঞ্চকর ও আবেগঘন পরিবেশে অর্ণিব ধীরে ধীরে তাসনীমের আরও কাছাকাছি ঝুঁকে এল। টেবিলের দূরত্বটুকু নিমেষেই ঘুচে গেল।

 

অর্ণিব তার ডান হাত বাড়িয়ে তাসনীমের থুতনি ছুঁল। আলতো করে তার মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। তাসনীম আর চোখ নামাতে পারল না। অর্ণিবের সেই সম্মোহনী চাহনি তাকে সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন করে ফেলল।

 

"তাসনীম, ভুল বোঝাবুঝি যা হওয়ার হয়েছে। আজ এই বৃষ্টির রাতে সব হিসাব চুকিয়ে ফেলতে চাই। তুমি কি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে না?" অর্ণিবের মুখ থেকে এই কথাগুলো যখন বের হচ্ছিল, তখন তার ঠোঁট তাসনীমের ঠোঁটের মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরত্বে।

 

তাসনীম তার হৃদস্পন্দন শুনতে পাচ্ছিল। তার সারা শরীরে তখন এক অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ছে। অর্ণিবের সুবাসিত নিঃশ্বাস তার গালে এসে লাগছে। পাঁচ বছরের জমাট বাঁধা বরফ যেন এই একটিমাত্র স্পর্শে গলে জল হয়ে যাচ্ছে। তাসনীম কোনো কথা বলতে পারল না, কেবল তার চোখের পলকহীন দৃষ্টি আর মৃদু সম্মতিসূচক চাহনি সব বলে দিল।

 

অর্ণিব আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। সে তার দুই হাত বাড়িয়ে তাসনীমকে নিজের বুকের খুব কাছে টেনে নিল। ক্যাফের কোণের এই গোপনীয়তায় তাদের ঠোঁট দুটো যখন একে অপরকে ছুঁল, তখন বাইরের ঝোড়ো হাওয়া আর বৃষ্টির শব্দও যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। সে এক গভীর, দীর্ঘশ্বাসে মোড়ানো চুম্বন—যেখানে ছিল শুধুই হারানো সময় ফিরে পাওয়ার আকুলতা আর অফুরন্ত ভালোবাসা।

 

তাসনীম তার চোখ বন্ধ করে অর্ণিবের শার্টের কলার খামচে ধরে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সঁপে দিল এই তীব্র রোমান্টিক আবহে। দীর্ঘ পাঁচ বছরের ব্যবধান যেন নিমেষেই উবে গেল। এই গভীর চুম্বনের মধ্য দিয়ে রচিত হলো তাদের নতুন সম্পর্কের এক মোহময় অধ্যায়।

প্রথম পর্বের সেই তীব্র ও আবেগময় চুম্বনের পর ক্যাফের কোণটার পরিবেশ পুরোপুরি বদলে গিয়েছিল। বাইরের একটানা বৃষ্টির শব্দ যেন তাদের ভেতরের উত্তাপটাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। তাসনীম তখনো অর্ণিবের প্রশস্ত বুকের সাথে লেপ্টে ছিল। তার গালের রঙ লজ্জায় ও উত্তেজনায় লালচে হয়ে উঠেছে। অর্ণিবের হাতের আঙুলগুলো আলতো করে তাসনীমের পিঠের ওপর বুলিয়ে দিচ্ছিল, যেন কোনো কাচের পুতুলকে ছুঁয়ে দেখছে সে।

 

"এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে তুমি সত্যি আমার সামনে আছো," অর্ণিব ফিসফিস করে বলল, তার উষ্ণ নিঃশ্বাস তাসনীমের চুলে এসে আছড়ে পড়ল।

 

তাসনীম তার মাথাটা অর্ণিবের বুক থেকে সামান্য ওপরে তুলল। তার ভেজা চোখের পলকে তখনো এক ধরণের ঘোর কাজ করছে। সে অর্ণিবের চওড়া কাঁধে একটা মৃদু কিল বসিয়ে দিয়ে আদুরে গলায় অভিযোগ করল, "তুমি জানো, এই পাঁচটা বছর আমি কীভাবে কাটিয়েছি? প্রতিদিন প্রতিটা মুহূর্তে মনে হয়েছে তুমি আমার পাশে আছো, অথচ হাত বাড়ালেই তোকে পেতাম না।" (তুমি-তুই এর মিশ্রণ সামলে সে আবার বলল,) "হাত বাড়ালেই তোমাকে পেতাম না। কত রাত বালিশ ভিজেছে চোখের জলে, সে খবর কি রেখেছ?"

 

অর্ণিব মুচকি হাসল। তার সেই হাসিতে এক অদ্ভুত মায়াবী আকর্ষণ ছিল। সে তাসনীমের চিবুকটা ধরে আদরের সুরে বলল, "রেখেছি তো। তোমার প্রতিটা কান্নার হিসাব আমার কাছে জমা আছে। আর আজ রাতে সেই সব কান্নার ঋণ এক সুদে-মূলে শোধ করে দেব, কথা দিলাম।"

 

কথার সাথে সাথেই অর্ণিব তার হাত বাড়িয়ে দিল ক্যাফের বিল মেটানোর জন্য। তারপর তাসনীমের হাত শক্ত করে ধরে তাকে নিয়ে ক্যাফ থেকে বেরিয়ে এল। বাইরে তখন বৃষ্টি কিছুটা ধরে এসেছে, তবে পিচঢালা রাস্তায় জলের ঝিলিক আর বাতাসে এক অদ্ভুত সোঁদা গন্ধ।

 

অর্ণিবের গাড়িটা পার্ক করা ছিল একটু দূরে। তারা দুজনে পাশাপাশি হাঁটছিল। অর্ণিব তার নিজের ওভারকোটের একটা দিক দিয়ে তাসনীমকে আড়াল করে রেখেছিল, যাতে বৃষ্টির ছাঁটে তাসনীম ভিজে না যায়। এই ছোট ছোট যত্নগুলোই তো তাসনীমকে পাগল করে দিত। পুরনো সেই অভ্যাস, সেই মায়া—কিছুই বদলায়নি।

 

গাড়িতে ওঠার পর অর্ণিব এসিটা একটু বাড়িয়ে দিল। কিন্তু গাড়ির ভেতরের পরিবেশ বাইরের আবহাওয়ার চেয়ে অনেক বেশি উষ্ণ হয়ে উঠল। গাড়ি স্টার্ট না করে অর্ণিব স্টিয়ারিং হুইলে হাত রেখে একটু ঘুরে বসল তাসনীমের দিকে।

 

"কোথায় নিয়ে যাবে এখন?" তাসনীম কৌতূহলী চোখে জানতে চাইল।

 

"আমার ছাদবাগান ঘেরা সেই পুরনো অ্যাপার্টমেন্টে। যেখানে গেলে কেউ আমাদের ডিস্টার্ব করবে না। যেখানে কেবল তুমি আর আমি থাকব," অর্ণিবের গলায় একটা গভীর ইঙ্গিত ছিল।

 

তাসনীমের বুকটা আবার দুলে উঠল। সে কিছু না বলে শুধু মাথা নিচু করল, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণের মৃদু হাসিটা বুঝিয়ে দিল সে মনে মনে এই মুহূর্তের জন্যই অপেক্ষা করছিল।

 

গাড়ি চলতে শুরু করল ঢাকার ফাঁকা হয়ে যাওয়া রাতের রাস্তা দিয়ে। আধঘণ্টা পর গাড়ি এসে থামল একটি নিরিবিলি অভিজাত অ্যাপার্টমেন্টের নিচে। অর্ণিবের ফ্ল্যাটটি ছিল একেবারে ওপরে, টপ ফ্লোরে। লিফট থেকে নেমে তারা যখন ডোরবেল বাজাল, তখন ভেতরে মৃদু আলো জ্বলছিল।

 

দরজা খুলতেই ঘরের চেনা সুবাস তাসনীমের নাকে এল। অর্ণিব লাইটের মূল সুইচ অন না করে কেবল ডিম লাইটগুলো জ্বালিয়ে দিল। পুরো ঘরজুড়ে এক মোহময় হলুদ আলো ছড়িয়ে পড়ল। আর বারান্দার কাচের দরজা দিয়ে রাতের ঢাকার ঝিলমিল আলো এসে ঘরের মেঝেতে আছড়ে পড়ছিল।

 

তাসনীম ঘরের ভেতরে দাঁড়িয়ে চারপাশটা দেখছিল। পাঁচ বছর আগের সেই সাজানো ঘরটা আজও যেন অবিকল তেমনই আছে। এমনকি লিভিং রুমের কর্নারে তাদের একসাথে তোলা সেই পুরনো ছবিটাও ফ্রেমে বন্দী হয়ে ঝুলছে। তাসনীমের গলাটা আবার ধরে এল।

 

অর্ণিব পেছন থেকে এসে নিঃশব্দে তাসনীমের খুব কাছে দাঁড়িয়ে গেল। তার বুক এসে ঠেকল তাসনীমের পিঠে। অর্ণিবের দুই হাত আলতো করে জড়িয়ে ধরল তাসনীমের কোমর। তার চিবুকটা এসে বসল তাসনীমের কাঁধে।

 

"দেখছ তো? এই ঘরে তোমার প্রতিটা দীর্ঘশ্বাস আজও জীবন্ত হয়ে আছে," অর্ণিবের ভারী কণ্ঠস্বর তাসনীমের কানের লতিতে কাঁপন ধরিয়ে দিল।

 

তাসনীম অর্ণিবের হাতের ওপর নিজের হাত রাখল। সে একটু ঘুরে অর্ণিবের মুখোমুখি দাঁড়াল। তাদের মাঝখানের দূরত্ব এখন প্রায় শূন্য। ঘরের মৃদু আলোয় অর্ণিবের চোখের গভীরতা দেখে তাসনীমের মাথা যেন ঘুরে গেল।

 

অর্ণিব আর কোনো রাখঢাক রাখল না। সে তার দুই বাহু দিয়ে তাসনীমকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের ভেতরে একদম সেঁটে নিল। তাসনীমের নরম শরীরটা অর্ণিবের শক্ত শরীরের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেল। অর্ণিবের হাত দুটো ধীরে ধীরে নেমে এল তাসনীমের পিঠ বেয়ে কোমর পর্যন্ত।

 

তারপর অর্ণিব তার মুখটা নামিয়ে আনল তাসনীমের ঘাড়ের নরম ত্বকের ওপর। একটা উষ্ণ, গভীর চুম্বন এঁকে দিল তার গলার ঠিক পাশে।

 

তাসনীম সেই তীব্র রোমাঞ্চে শিউরে উঠল। তার মুখ দিয়ে একটা হালকা গোঙানির মতো শব্দ বের হয়ে এল। সে তার আঙুলগুলো দিয়ে অর্ণিবের চুলে বিলি কেটে দিতে লাগল। অর্ণিবের সেই স্পর্শে আগুন ঝরছিল, অথচ তাতে ছিল বুকভরা ভালোবাসা আর অধিকারবোধ।

 

অর্ণিব তাসনীমকে আস্তে করে সোফার দিকে নিয়ে গেল। দুজনে একসাথে সোফায় বসে পড়ল, কিন্তু তাদের শরীরের সংযোগ এক মুহূর্তের জন্যও ছিন্ন হলো না। অর্ণিব তাসনীমকে নিজের কোলের ওপর টেনে নিল। তাসনীমের দুই হাত জড়িয়ে রইল অর্ণিবের গলা জড়িয়ে।

 

বাইরের মৃদু বৃষ্টির ঝাপটা আর জানালার পর্দা ওড়ার শব্দ ছাপিয়ে তখন কেবল দুজনের ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। অর্ণিব তাসনীমের চিবুক ধরে তার মুখটা ওপরে তুলল। চোখে চোখ রাখতেই অর্ণিব আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে তার ঠোঁট নামিয়ে দিল তাসনীমের ঠোঁটের ওপর।

 

সেই চুম্বন ছিল প্রথম পর্বের চুম্বনের চেয়ে অনেক বেশি গভীর, অনেক বেশি উন্মাদনায় ভরা। জিভের সেই আলতো ছোঁয়া, ঠোঁটের সাথে ঠোঁটের মিতালি—সব মিলিয়ে ঘরটার তাপমাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিল। তাসনীম তার সমস্ত প্রতিরোধ ভুলে গিয়ে অর্ণিবের ঠোঁটের সাথে নিজের ঠোঁট মিলিয়ে দিল। তার সারা শরীরে তখন এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে যাচ্ছিল।

 

অর্ণিবের হাতগুলো তাসনীমের শাড়ির আঁচল সরিয়ে তার কোমরের উন্মুক্ত ত্বকে স্পর্শ করল। সেই ঠান্ডা আঙুলের উষ্ণ ছোঁয়ায় তাসনীমের ভেতরটা থরথর করে কেঁপে উঠল। সে অর্ণিবের শার্টের বোতামগুলো খামচে ধরতে চাইল। তাদের এই গভীর মূহূর্তে সময় যেন এক জায়গায় থেমে গিয়েছিল।

 

"ভালোবাসি তাসনীম... তোমাকে এক মুহূর্তের জন্যও ছাড়তে পারব না আর," অর্ণিব চুম্বনের মাঝে ফিসফিস করে বলল।

 

তাসনীম অর্ণিবের বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে মৃদুস্বরে উত্তর দিল, "আর কখনো কোথাও যেতে দেব না তোমাকে, অর্ণিব।"

রাত তখন গভীর। বাইরের আকাশ পরিষ্কার হয়ে আকাশে ছোট ছোট তারার মেলা বসেছে, কিন্তু এই ফ্ল্যাটের ভেতরের আবহাওয়া তখনো উত্তপ্ত ও রোমাঞ্চে ভরপুর। লিভিং রুমের সেই নরম আলোয় সোফার ওপর অর্ণিবের কোলে বসে থাকা তাসনীমের চুলগুলো কিছুটা অগোছালো। তাদের দুজনের শরীর তখনো একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে লেপ্টে আছে, যেন একটু দূরে যাওয়ার কোনো জো নেই।

 

অর্ণিবের হাত দুটো তাসনীমের কোমরের ভাজে আলতো করে রাখা। তার ছোঁয়া যেন তাসনীমের পুরো শরীরে এক অজানা বিদ্যুতের তরঙ্গ বয়ে দিচ্ছিল। তাসনীম তার দুই হাত অর্ণিবের চওড়া কাঁধের ওপর রেখে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। অর্ণিবের চোখে তখন এক ধরণের তীব্র ক্ষুধা আর বাঁধভাঙা ভালোবাসা উপচে পড়ছে।

 

"কী দেখছ এভাবে?" অর্ণিব মৃদু হেসে ফিসফিস করে জানতে চাইল।

 

"ভাবছি, এই পাঁচটা বছর কীভাবে ছাড়া কাটালাম! মনে হচ্ছে এতদিনের সব কষ্ট এক নিমিষে মুছে গেল," তাসনীমের গলায় এক ধরণের ঘোর লাগা আবেশ।

 

অর্ণিব আর কোনো কথা বলল না। সে তার মুখটা নামিয়ে এনে তাসনীমের কপালে এক দীর্ঘ, উষ্ণ চুম্বন এঁকে দিল। তারপর সেখান থেকে গাল হয়ে তার ঠোঁটে নেমে এল। সেই চুম্বনে কোনো তাড়া ছিল না, ছিল কেবল একান্ত নিজেদের করে পাওয়ার চরম তৃপ্তি। অর্ণিবের ঠোঁটের প্রবল আকর্ষণে তাসনীম নিজের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। সে তার আঙুলগুলো অর্ণিবের চুলের ফাঁকে ঢুকিয়ে দিয়ে তাকে আরও কাছে টেনে নিল।

 

চারপাশের পৃথিবী যেন এই কয়েক ইঞ্চির পরিধির মাঝে এসে থেমে গেছে। তাদের দীর্ঘশ্বাসের উষ্ণতা আর হৃদস্পন্দনের শব্দ ছাড়া ঘরের ভেতর আর কোনো আওয়াজ নেই। অর্ণিব ধীরে ধীরে তাসনীমকে সোফা থেকে তুলে সোজা দাঁড়িয়ে গেল, আর তাসনীমও তার পা দুটো অর্ণিবের কোমরের চারপাশে জড়িয়ে ধরে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে রইল।

 

অর্ণিব তাকে এভাবেই কোলে তুলে সোজা বেডরুমের দিকে এগিয়ে গেল। বেডরুমের মৃদু নীলচে ডিম লাইট পুরো ঘরটিতে এক মায়াবী ও অন্তরঙ্গ পরিবেশ তৈরি করে রেখেছিল। অর্ণিব তাসনীমকে বিছানার ওপর খুব আলতোভাবে শুইয়ে দিল। কিন্তু তার ওপর থেকে নিজের ওজন সরাল না। সে তাসনীমের দুই বাহুর মাঝখানে নিজের দুই হাত রেখে ঝুঁকে রইল তার ঠিক ওপরে।

 

বিছানার নরম গদি আর অর্ণিবের শরীরের চওড়া আড়াল তাসনীমকে সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন করে ফেলল। অর্ণিবের দৃষ্টি তখন তাসনীমের চোখের পাতার ওপর, সেখান থেকে নাক হয়ে তার চঞ্চল ঠোঁটের দিকে। সে তার তর্জনী দিয়ে তাসনীমের গালের একটা রেশমি লক কানের পেছনে গুজে দিল।

 

"আজ আর কোনো দূরত্ব থাকবে না, তাসনীম। আজ থেকে আমার প্রতিটা নিঃশ্বাসে কেবল তোমার নাম লেখা থাকবে," অর্ণিবের গলার স্বর এতটাই গভীর ও পৌরুষদীপ্ত ছিল যে তাসনীমের বুকের ভেতরটা আনন্দের কাঁপনে কেঁপে উঠল।

 

তাসনীম নিজের হাত বাড়িয়ে অর্ণিবের গাল ছুঁল। তার চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়া খুশির এক ফোঁটা জল অর্ণিবের আঙুলে এসে পৌঁছাল। অর্ণিব সেই জলবিন্দুটা নিজের ঠোঁট দিয়ে ছুঁয়ে মুছে দিল।

 

তারপর শুরু হলো তাদের ভালোবাসার চূড়ান্ত ও মোহময় অধ্যায়। অর্ণিবের ঠোঁটগুলো নেমে এল তাসনীমের গলার সংবেদনশীল ত্বকের ওপর। তার প্রতিটি চুম্বনে তাসনীমের শরীর থরথর করে কেঁপে উঠছিল। সে অর্ণিবের পিঠের শার্ট খামচে ধরে তার সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে সেই গভীর অনুভূতি অনুভব করতে লাগল। বাইরের বাতাসের শীতলতা ঘরের ভেতরের এই আদিম ও উষ্ণ ভালোবাসার কাছে সম্পূর্ণ হার মেনে গেল।

 

রাত গড়িয়ে যখন ভোর হওয়ার সময় হলো, তখনো তাদের শরীরের বাঁধন একটুও আলগা হয়নি। দুজনে একে অপরের বুকে মুখ গুঁজে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। পাঁচ বছরের দীর্ঘ অভিমান, দূরত্ব আর না পাওয়ার কষ্ট পেছনে ফেলে তারা অবশেষে খুঁজে পেল তাদের কাঙ্ক্ষিত পূর্ণতা।

 

সকালের প্রথম রোদের আলো যখন জানാലার পর্দা ভেদ করে বিছানায় এসে পড়ল, তখন তাসনীমের ঘুম ভাঙল। সে চোখ মেলে দেখাল, অর্ণিব তার একটা হাত তাসনীমের মাথার নিচে বালিশের মতো পেতে দিয়ে পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে। তার মুখের ওপর এক অদ্ভুত প্রশান্তির হাসি।

 

তাসনীম অর্ণিবের বুকের খুব কাছে আরও একটু সেঁটে গেল। সে মনে মনে ভাবল, এই তো তার পৃথিবী, তার পরম শান্তি। আর কখনো এই হাত ছেড়ে কোথাও যাওয়া হবে না।

....
👁 62