চুক্তির ছায়ায় জীবন বদল

শীতের মিষ্টি রোদ্দুর এসে পড়েছিল পুরান ঢাকার এক ব্যস্ত গলির পুরোনো দোতলা বাড়ির জানাজলায়। জানাজার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল এলিনা। বয়স চব্বিশ কি পঁচিশ। চোখে তার একরাশ ক্লান্তি, কপালে ছোট একটা চিন্তার ভাঁজ। ছোটবোনটির কলেজ ফি, বাবার ওষুধের খরচ আর মাথার ওপর জমে থাকা দেনার পাহাড়—সব মিলিয়ে এলিনার জীবনটা তখন এক অচলায়তন। ঠিক তখনই তার জীবনে ঝড় হয়ে আসে নাভিদ চৌধুরী।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

নাভিদ চৌধুরী—শহরের এক নামকরা শিল্পপতি, ঠান্ডা মাথার এক সফল ব্যবসায়ী। কিন্তু তার ব্যক্তিগত জীবন ছিল এক বরফঘেরা দুর্গ। পারিবারিক এক জটিল আইনি মারপ্যাঁচ আর যৌথ সম্পত্তির হাতবদল থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায় ছিল এক বছরের একটি ভুয়া বা চুক্তিভিত্তিক বিবাহ। নাভিদের এক পরিচিত মাধ্যমেই এলিনার পরিবারের দুর্দশার কথা জানতে পারে সে। নাভিদ প্রস্তাব দেয় এলিনাকে। শর্ত পরিষ্কার—এক বছরের জন্য তারা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে থাকবে, চুক্তি শেষ হলেই ডিভোর্স। বিনিময়ে এলিনার পরিবারের সমস্ত ঋণ ও দায়দায়িত্ব নিয়ে নেবে নাভিদ।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

পারিবারিক ভালোবাসার টানে নিজের সর্বস্ব পণ রেখে এলিনা এই অদ্ভুত চুক্তিতে রাজি হয়। বিয়ের দিন কোনো ঢাকঢোল বা সানাই বাজেনি। স্রেফ রেজিস্ট্রি পেপারে সই আর কিছু কঠিন শর্ত।

 

যেদিন এলিনা নাভিদের বিশাল আলিশান বাড়িতে পা রাখল, সেদিনই নাভিদ তাকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিল, "এলিনা, এই সম্পর্কটা কাগজ-কলমের। এ ঘরের ড্রয়িংরুম বা ডাইনিং টেবিলে তুমি আমার স্ত্রী, কিন্তু এই সম্পর্কের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। এক বছর পর নিজের পথে চলে যেতে হবে।"

 

এলিনা মাথা নিচু করে শুধু বলেছিল, "বুঝতে পেরেছি, সাহেব।"

 

প্রথম কদিন বাড়িটা ছিল থমথমে। নাভিদ সকাল সকাল অফিস চলে যেত, ফিরত গভীর রাতে। এলিনা সারাদিন বিশাল বাড়িটায় একা একা ঘুরে বেড়াত। কাজের লোকগুলো প্রথমে এই অদ্ভুত বিয়েটাকে সহজভাবে নিতে পারেনি, কিন্তু এলিনার অমায়িক ব্যবহার খুব দ্রুত তাদের মন জয় করে নিল। এলিনা নিজের হাতে রান্না করে সবাইকে খাওয়াত, যত্ন করে গুছিয়ে রাখত নাভিদের পড়ার টেবিল, ফাইলপত্র।

 

পরিবর্তনটা শুরু হলো একটা বৃষ্টির রাতে। সেদিন অফিস থেকে ফেরার পথে তুমুল বৃষ্টিতে ফেঁসে গিয়েছিল নাভিদ। চালক ফোন করে জানাল গাড়ির ইঞ্জিন বসে গেছে। রাত তখন প্রায় দুটো। বাইরে তীব্র ঝড়-বৃষ্টি। নাভিদ যখন ক্লান্ত হয়ে ভিজে জবজবে অবস্থায় বাড়ি ফিরল, তখন দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল এলিনা। হাতে এক কাপ গরম চা আর একটা তোয়ালে।

 

নাভিদ কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলেছিল, "তোমার জেগে থাকার দরকার ছিল না।"

 

এলিনা মৃদু হেসে উত্তর দিয়েছিল, "বাইরে যা আবহাওয়া, ঘুম আসছিল না। হাত-মুখ ধুয়ে নিন, গরম স্যুপ বানিয়েছি।"

 

সেই রাতে নাভিদ লক্ষ্য করেছিল, এলিনার চোখে কোনো অভিযোগ নেই, আছে শুধু এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা। শহরের কৃত্রিম রোবটিক জীবনে অভ্যস্ত নাভিদের কাছে এই গৃহস্থালি যত্ন একদম নতুন ছিল।

 

পরের দিনগুলোতে নাভিদ কাজের ফাঁকে ফাঁকে অজান্তেই এলিনার কথা ভাবতে শুরু করল। সে দেখল, এলিনা তার সামান্য জিনিসগুলো কত নিখুঁতভাবে গুছিয়ে রাখে। নাভিদের পছন্দের কফি বা খাবারের তালিকা এলিনার মুখস্থ হয়ে গেছে। একদিন খাবার টেবিলে নাভিদ বলল, "তোমার নিজের কোনো শখ নেই, এলিনা? সারাক্ষণ শুধু পরিবার আর এই বাড়ির পেছনে ছুটে মরো?"

 

এলিনা একটু থেমে বলল, "আমার শখগুলো কবেই হারিয়ে গেছে। এখন শুধু দায়িত্বগুলো বাঁচার কারণ।"

 

নাভিদের বুকের ভেতর কেমন যেন একটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে প্রথমবার গভীরভাবে লক্ষ্য করল এলিনার মায়াবী চোখ দুটোকে। এই মেয়েটির ভেতরে এক অদ্ভুত শক্তি আছে, যা কঠিন থেকে কঠিন পাথরকেও গলিয়ে দিতে পারে।

 

কাজের চাপে প্রায়ই নাভিদের রাতে ঘুম আসত না। একদিন রাত তিনটে নাগাদ নাভিদ বসার ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল। হঠাৎ পায়ে নুপুরের মৃদু শব্দে সে ফিরে তাকাল। দেখল এলিনা একটা হালকা চাদর গায়ে জড়িয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে।

 

"ঘুমাননি এখনো?" নাভিদ জিজ্ঞেস করল।

 

"আপনার রুমের বাতি জ্বলছিল, তাই ভাবলাম..." এলিনা কথা শেষ না করেই অন্যদিকে তাকাল।

 

নাভিদ আস্তে করে তার দিকে এক পা এগিয়ে এল। চাঁদের আলোয় এলিনার মুখটা আরও মায়াবী লাগছিল। নাভিদ নিজের অজান্তেই হাত বাড়িয়ে এলিনার গালের এক গোছা অবাধ্য চুল কানের পেছনে গুঁজে দিল। ছোঁয়াটা এত অপ্রত্যাশিত ছিল যে এলিনা কেঁপে উঠল। তার হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয়ে গেল।

 

নাভিদ নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল, "কেন করছ এসব, এলিনা? কেন এত যত্ন নিচ্ছ এমন একজন মানুষের, যার কোনো ভবিষ্যৎ নেই?"

 

এলিনা নাভিদের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল, "ভবিষ্যৎ কে দেখেছে, নাভিদ? বর্তমানটাই তো সত্যি। আর আমি শুধু জানি, এই বর্তমানটাই আমার দায়িত্ব।"

 

সেই রাতে আর কথা বাড়েনি। কিন্তু তাদের মাঝখানের অদৃশ্য দেওয়ালটা যেন একটুখানি নড়ে উঠেছিল। নাভিদের শীতল হৃদয়ে প্রথমবার কোনো নারীর উষ্ণতার ছোঁয়া লাগল। সে বুঝল, এই সরল মেয়েটি তার জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে উঠছে।

সময় গড়ায় আপন গতিতে। দেখতে দেখতে কেটে গেছে বেশ কয়েকটি মাস। পুরান ঢাকার সেই জীর্ণ বাড়ির ছায়া পেরিয়ে এলিনা এখন গুলশানের এই অভিজাত প্রাসাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। কাজের লোক থেকে শুরু করে বাড়ির সবাই এখন তাকে ‘বৌমা’ বা ‘ম্যাডাম’ নয়, নিজের ঘরের মেয়ে বলেই জানে। আর নাভিদ? নাভিদের জীবনটা এখন আর আগের মতো বোরিং বা একঘেয়ে নয়। অফিসের বিশাল ফাইলপত্রে চোখ বোলাতে বোলাতেও এখন তার অবচেতন মন এলিনার একটা হাসির জন্য অপেক্ষা করে।

 

সেদিন ছিল ছুটির দিন। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছিল, যা চারপাশের পরিবেশটাকে আরও রোমান্টিক করে তুলেছিল। নাভিদ বসার ঘরের বড় সোফায় ল্যাপটপ কোলে নিয়ে জরুরি মেইল চেক করছিল। এলিনা রান্নাঘর থেকে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি আর কিছু স্ন্যাক্স নিয়ে বসার ঘরে এল। কফি কাপটা নাভিদের সামনের টেবিলে রাখতেই নাভিদ এক টানে এলিনার হাতটা নিজের মুঠোয় বন্দী করে ফেলল।

 

এলিনা চমকে উঠে বলল, "কী করছেন? কেউ দেখে ফেললে..."

 

নাভিদ মৃদু হেসে ল্যাপটপটা একপাশে সরিয়ে রেখে টান দিয়ে এলিনাকে নিজের ঠিক পাশেই সোফায় বসাল। তার চোখের গভীর দৃষ্টি এলিনার চোখে স্থির হলো। নাভিদ ফিসফিস করে বলল, "কাকে ভয় পাচ্ছ? এটা আমাদের ঘর, আর এখানে আমরা ছাড়া কেউ নেই।"

 

এলিনার বুক তখন কাঁপছে। নাভিদের এই ছোঁয়া, তার চোখের এই তীব্র চাহনি এলিনাকে সবসময় এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে ফেলে দেয়। নাভিদ তার আঙুলগুলো এলিনার আঙুলের সাথে মিশিয়ে দিল। তারপর আস্তে আস্তে হাতটা ওপরে উঠিয়ে এলিনার চিবুক ছুঁল।

 

"তুমি কি জানো, এলিনা?" নাভিদের কন্ঠস্বর ভারী হয়ে এল, "এই কয়েকমাসে তুমি আমার সমস্ত হিসাব-নিকাশ উল্টে দিয়েছ। আমি ব্যবসা বুঝি, চুক্তি বুঝি, লাভ-ক্ষতি বুঝি। কিন্তু তোমার এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসাটার কোনো লাভ-ক্ষতির হিসাব আমার জানা নেই। দিন দিন তোমাকে ছাড়া একটা মুহূর্তও আমার কাছে অসহ্য মনে হয়।"

 

এলিনা চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, "এসব বলবেন না, নাভিদ। আমাদের চুক্তি তো মাত্র কয়েক মাসের। তারপর তো আমাকে চলে যেতে হবে..."

 

কথাটা শেষ করতে দিল না নাভিদ। সে আরও একটু ঘেঁষে এল এলিনার। তার এক হাত দিয়ে এলিনার পিঠ জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের আরও কাছে টেনে নিল। নাভিদের নিশ্বাসের উত্তাপ এলিনার গালের ত্বক ছুঁয়ে গেল।

 

"কে বলেছে তোমাকে চলে যেতে হবে?" নাভিদের ঠোঁট এলিনার কানের ঠিক পাশে এসে ফিসফিস করল, "চুক্তি কাগজ-কলমে হতে পারে, কিন্তু হৃদয়ের চুক্তি তো অন্য ভাষায় লেখা হয়। আমি চাই না তুমি কোথাও যাও।"

 

এলিনা নাভিদের প্রশস্ত বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে নিজের কান্না চেপে রাখার চেষ্টা করল। কারণ সে জানে, নাভিদের এই মায়া কাটিয়ে বের হওয়া তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাভিদ তার দুই হাত দিয়ে এলিনার মুখটা ওপরে তুলে ধরল। বাইরের বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে তখন দুজনেই শুনতে পাচ্ছিল তাদের নিজেদের দ্রুত হৃদস্পন্দন। নাভিদ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে আস্তে করে তার ঠোঁট নামিয়ে আনল এলিনার নরম ঠোঁটের ওপর।

 

সে এক তীব্র, মায়াবী আর গভীর চুম্বনের মুহূর্ত। যেখানে কোনো অহংকার ছিল না, কোনো বিজনেস টাইকুন নাভিদ ছিল না—ছিল কেবল এক পুরুষ আর এক নারীর আত্মসমর্পণ। এলিনা প্রথমে কিছুটা আড়ষ্ট হয়ে থাকলেও পরমুহূর্তেই নাভিদের বাহুডোরে নিজেকে সঁপে দিল। ঘরের ভেতরের উষ্ণ আলোয় তাদের ছায়া দুটো যেন এক হয়ে মিশে গেল।

 

পর theke এই ঘটনার পর তাদের সম্পর্কের সমীকরণটা পুরোপুরি বদলে গেল। তারা আর শুধু চুক্তির স্বামী-স্ত্রী রইল না। রাতের নিঃশব্দে তারা একে অপরের আরও কাছাকাছি আসতে শুরু করল। নাভিদ তার সমস্ত ব্যস্ততা বাদ দিয়ে এলিনার সাথে সময় কাটাতে লাগল। ছুটির দিনগুলোতে তারা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে একসাথে কফি খায়, ছাদে জোছনা দেখে।

 

একদিন রাতে শোবার ঘরের নরম আলোয় নাভিদ এলিনাকে জড়িয়ে ধরে শুয়েছিল বিছানায়। এলিনার চুলে আঙুল চালাতে চালাতে নাভিদ বলল, "আর মাত্র তিন মাস বাকি এই চুক্তির মেয়াদের। এরপর আমি এই ভুয়া কাগজগুলোকে চিরতরে ছিঁড়ে ফেলে আইনিভাবে তোমাকে নিজের করে নেব। তুমি কি আমার সাথে চিরকাল থাকবে, এলিনা?"

 

এলিনা নাভিদের বুকে মাথা রেখে তার পাঞ্জাবির বোতাম নিয়ে খেলতে খেলতে মৃদু হাসল। সে জানত, এই মানুষটির ভালোবাসার উষ্ণতা ছাড়া সে আর বাঁচতে পারবে না। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস তখনও তাদের জন্য অন্য কিছু ঠিক করে রেখেছিল।

তৃতীয় পর্ব: নিখাদ ভালোবাসা ও চিরস্থায়ী বন্ধন

 

চুক্তির মেয়াদ ফুরিয়ে আসতে আর মোটে কয়েকদিন বাকি। গুলশানের এই অভিজাত প্রাসাদের প্রতিটি কোণ এখন এলিনার ছোঁয়ায় জীবন্ত। কিন্তু শেষ মুহূর্তের এই দিনগুলোতে নাভিদের মনে এক অজানা আতঙ্ক কাজ করছে। চুক্তি অনুযায়ী এক বছর পূর্ণ হলেই তো এলিনাকে আইনিভাবে মুক্তি দিতে হবে। যদিও তাদের সম্পর্কের সমীকরণ এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে, তবুও ওই এক টুকরো কাগজের চুক্তি নাভিদের বুকটা বারবার কাঁপিয়ে তুলছিল।

 

সেদিন রাতে হঠাৎ করেই নাভিদের অফিসের এক পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ও পারিবারিক শত্রু অর্ক চৌধুরী এক বিশাল চক্রান্ত নিয়ে হাজির হলো নাভিদের কর্পোরেট অফিসে। অর্ক জানত নাভিদের এই চুক্তিভিত্তিক বিয়ের আসল রহস্য। সে মিডিয়া আর আইনি নোটিশ নিয়ে হুমকি দিল যে, নাভিদের এই ভুয়া বিয়ের কথা সবার সামনে ফাঁস করে দেবে, যাতে নাভিদের কোম্পানির শেয়ার বাজারে ধস নামে এবং পারিবারিক সম্পত্তি থেকে নাভিদকে বঞ্চিত করা যায়।

 

খবরটা যখন নাভিদ বাড়ি ফিরল, তখন তার চোখ মুখ রাগে লাল। সে সোজা ড্রয়িংরুমে এসে বসল। এলিনা নাভিদের চেহারার ক্লান্তি আর উত্তেজন বুঝতে পেরে এক গ্লাস ঠান্ডা জল নিয়ে তার কাছে গেল।

 

"কী হয়েছে, নাভিদ? এত ক্লান্ত লাগছে কেন?" এলিনার কন্ঠে ছিল গভীর উৎকণ্ঠা।

 

নাভিদ গ্লাসটা টেবিলে রেখে এক টানে এলিনাকে নিজের কোলে টেনে বসল। তার দুই হাত দিয়ে এলিনার কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজের মাথা এলিনার কাঁধে গুঁজে দিল। নাভিদের ফিসফিসানি কান্নার মতো শোনাল, "সব শেষ হয়ে যেতে পারে, এলিনা। অর্ক আমাদের এই চুক্তির কথা জেনে গেছে। সে চাইছে আমাকে ধ্বংস করতে। সে বলছে তুমি নাকি আমার কেউ নও, স্রেফ একটা চুক্তির পুতুল!"

 

এলিনা বিন্দুমাত্র ভয় পেল না। সে নাভিদের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বলল, "কাগজ-কলমের চুক্তি হয়তো বা এক বছরের ছিল, নাভিদ। কিন্তু আমার মনটা তো কবেই আপনার কাছে বন্দি হয়ে গেছে। লোকে কী বলল বা ওই কাগজ কী বলে, তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। আমি আপনার পাশেই আছি, শেষ পর্যন্ত।"

 

এলিনার এই নিঃস্বার্থ কথাগুলো নাভিদের বুকের সব ভয় নিমেষে উড়িয়ে দিল। সে বুঝতে পারল, টাকা-পয়সা বা কোম্পানির শেয়ার নয়, তার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো এই মেয়েটি।

 

পরের দিন সকালে অর্ক চৌধুরী এক সংবাদ সম্মেলনের ডাক দিল এবং নাভিদের বিরুদ্ধে ভুয়া বিয়ের অভিযোগ তোলার প্রস্তুতি নিল। ঠিক তখনই নাভিদ তার আইনি টিমকে নিয়ে সেখানে হাজির হলো। কিন্তু নাটকীয় মোড় নিল তখন, যখন মিডিয়ার সামনে নাভিদ কোনো লুকোচুরি না করে সগর্বে ঘোষণা করল, "হ্যাঁ, আমাদের শুরুটা একটা চুক্তি দিয়ে হয়েছিল বটে। কিন্তু সেই চুক্তি আজ মিথ্যে হয়ে গেছে কারণ আমরা একে অপরকে ভালোবেসে ফেলেছি। এলিনা আজ শুধু আমার ঘরের বউ নয়, আমার জীবনের অর্ধাঙ্গিনী, আমার হৃদয়ের রানি।"

 

হলজুড়ে তখন পিনপতন নীরবতা। অর্কের মুখের হাসি মুহূর্তে উবে গেল। এলিনা টেলিভিশনের পর্দায় নাভিদের এই সাহসী ঘোষণা দেখছিল আর তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছিল আনন্দের জল। নাভিদ সেদিনই অর্কের সব চক্রান্ত আইনি লড়াইতে ধূলিসাৎ করে দিল।

 

সংবাদ সম্মেলন শেষ করে নাভিদ যখন বাড়ি ফিরল, তখন বাড়ির গেটেই এলিনা দাঁড়িয়ে ছিল। গাড়ি থেকে নেমেই নাভিদ সোজা এলিনার দিকে এগিয়ে গেল এবং তাকে এক টানে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরল। চারপাশের কাজের লোকগুলো খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠল।

 

রাতের বেলা শোবার ঘরের নরম আলোয়, বাইরের ছাদ থেকে আসা জোছনার আলোয় নাভিদ এলিনার সামনে হাঁটু গেয়ে বসল। পকেট থেকে বের করল একটা রত্নখচিত ডায়মন্ডের আংটি।

 

নাভিদ গভীর চোখে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "আগেরবার তো কোনো নিয়ম বা উপহার ছিল না। এবার বলো এলিনা, তুমি কি সারা জীবনের জন্য আমার এই অপূর্ণ জীবনটাকে পূর্ণ করতে রাজি আছো? আমাকে কোনোদিন ছেড়ে যাবে না তো?"

 

এলিনা মুচকি হেসে নিজের হাতটা নাভিদের বাড়িয়ে দেওয়া হাতের ওপর রাখল এবং চোখের জল মুছতে মুছতে বলল, "আর কোনোদিন আপনাকে ছেড়ে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না, নাভিদ। কারণ আমি যে আপনার মধ্যেই বেঁচে আছি।"

 

নাভিদ আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে এলিনাকে নিজের বাহুডোরে টেনে নিল। তাদের সেই দীর্ঘ চুম্বন আর ভালোবাসার গভীর উষ্ণতায় মিশে গেল এক বছরের সব না-বলা কষ্ট, দূরত্ব আর অজানা শঙ্কা। কাগজে-কলমের সেই অদ্ভুত চুক্তি আজ এক পবিত্র ও চিরস্থায়ী ভালোবাসার উপাখ্যানে রূপ নিল।

....
👁 62