অচেনা দেয়াল ভেঙে গেল

পুরানো ঢাকার লাল ইটের আভিজাত্য ঘেরা বাড়িটার নাম 'নবাব মঞ্জিল'। বিকেলের পড়ন্ত রোদে বারান্দার গ্রিলের ছায়াটা ঘরের মেঝেতে লম্বা রেখা টেনেছে। ইরাবী বারান্দার এক কোণে দাঁড়িয়ে আনমনে চােখ বুলিয়ে যাচ্ছিল নিচের ব্যস্ত গলির দিকে। রিকশার টুংটাং শব্দ, মানুষের কোলাহল—সব ছাপিয়ে তার বুকের ভেতর কেমন যেন এক অদ্ভুত শূন্যতা কাজ করে।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

আজ তাদের বিয়ের চার বছর পূর্ণ হলো। কিন্তু এই চার বছরে সায়ানের সাথে তার সম্পর্কের দূরত্ব একচুলও কমেছে কি না, তা ইরাবী ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। সায়ান লোকটা এমনই—পাথরের মতো কঠিন, ছিমছাম, নিয়মের ঘোপে বন্দী। কর্পোরেট অফিসের শীর্ষ পদে থাকা মানুষটার জীবনের প্রতিটি সেকেন্ড যেন ঘড়ির কাঁটায় মাপা।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

ইরাবী সবসময় মনে করত, সায়ান তাকে বিয়ে করেছে কেবল পরিবারের চাপে। সায়ানের মায়ের শেষ ইচ্ছার সম্মান রাখতে গিয়ে ছেলেটি নিজের সমস্ত ইচ্ছা-অনিচ্ছা বিসর্জন দিয়ে তাকে ঘরের বউ করে এনেছিল। এই বাড়িতে আসার পর থেকে সায়ান তাকে কখনো কোনো কষ্ট দেয়নি ঠিকই, কিন্তু কোনো উষ্ণতাও দেয়নি। একটা অচেনা দূরত্ব সবসময় তাদের মাঝখানে অদৃশ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকত।

 

সন্ধ্যায় যখন ড্রইংরুমের ঘড়িটা সাতটা বাজাল, তখন সদর দরজায় চাবি ঘোরার শব্দ হলো। সায়ান ফিরল। ক্লান্ত মুখ, শার্টের হাতা গোটানো, টাইটা একটু ঢিলে করা। ইরাবী রোজকার অভ্যাসের মতো এগিয়ে গেল এক গ্লাস ঠান্ডা পানি নিয়ে।

সম্পর্কের অচেনা দেয়াল

 

"ফিরেছেন?" ইরাবীর গলাটা খুব মৃদু ছিল।

 

সায়ান গ্লাসটা নিয়ে এক নিঃশ্বাসে পানি শেষ করল। তারপর টেবিলে রেখে ছোট করে বলল, "হ্যাঁ। আজ একটু দেরি হলো। ট্রাফিক খুব খারাপ ছিল।"

 

"খাবার কি ডাইনিংয়ে বাড়ব?"

 

"না, একটু পরে খেলেও চলবে। আগে ফ্রেশ হয়ে নিই।" সায়ান নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গেল।

 

ইরাবী দাঁড়িয়ে রইল ঠিক জায়গাটায়। প্রতিটা দিন এভাবেই কাটে। দুজনে একই ছাদের নিচে থাকে, কিন্তু তাদের মনের দূরত্ব আকাশসম। সায়ান কখনো নিজের মনের কথা মুখে আনেনি। সে কেমন মানুষ, তার চাওয়া-পাওয়া কী—এসব যেন এক দুর্ভেদ্য রহস্য। ইরাবী বহুবার চেষ্টা করেছে এই বরফ গলাতে, কিন্তু সায়ানের উদাসীনতা তাকে প্রতিবার আহত করেছে। সে মনে মনে ঠিক করে নিয়েছে, আর নয়। এই একতরফা ভালোবাসার ঘানি সে আর টানতে পারবে না। নিজের সম্মান বিসর্জন দিয়ে এমন একটা মানুষের পাশে ছায়ার মতো বেঁচে থাকা তার পক্ষে আর সম্ভব নয়।

 

রাতের খাবার টেবিলে পিনপতন নীরবতা। সায়ান প্লেটে চোখ রেখে খাচ্ছিল, হঠাৎ বলল, "আগামী সপ্তাহে একটা কাজে আমাকে দুদিনের জন্য সিলেট যেতে হতে পারে। তুমি কি গুছিয়ে নিতে পারবে?"

 

ইরাবী ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল, "আমার গোছগাছ করার কিছু নেই। আর তাছাড়া আপনার যাতায়াতের সাথে তো আমার কোনো সম্পর্ক নেই।"

 

সায়ান চামচটা নামিয়ে রাখল। তার চোখের তারায় এক পলকের জন্য একটা অদ্ভুত চমক খেলে গেল, যা পরমুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। সে শান্ত গলায় বলল, "তুমি কি এখনো ভাবো যে এই বিয়েটা শুধু একটা সামাজিক বাধ্যবাধকতা ছিল?"

 

ইরাবী ব্যঙ্গাত্মক হাসল। "তাহলে আর কী? আপনার মতো একজন গোছানো মানুষ কি নিজের ইচ্ছায় আমার মতো একটা সাধারণ মেয়েকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিত? পরিবার চেয়েছে, আপনি মেনে নিয়েছেন—গল্পটা তো এতটুকুই।"

 

সায়ান আর কোনো কথা বলল না। সে চেয়ার ছেড়ে উঠে নিজের ঘরে চলে গেল। কিন্তু তার সেই মুহূর্তের নীরবতা ইরাবীর বুকের ভেতরটাকে কেমন যেন মোচড় দিয়ে দিল।

স্মৃতির গোপন বাক্স

 

রাত তখন প্রায় আড়াইটে। ঘরের এসিটা মৃদু শব্দ করে চলছে। ইরাবীর ঘুম আসছিল না। তৃষ্ণা পাওয়ায় সে বিছানা ছেড়ে উঠে রান্নাঘরের দিকে গেল। ফেরার পথে দেখল, সায়ানের ঘরের দরজাটা সামান্য ভেজানো ভেতরে হালকা হলুদ আলো জ্বলছে।

 

ইরাবী অবাক হলো। সায়ান তো এত রাতে জেগে থাকে না। কৌতূহলবশত সে আস্তে করে দরজায় হাত রাখল। দরজাটা একটু ঠেলতেই ভেতরের দৃশ্য তার চোখ আটকে দিল।

 

সায়ান তখন বিছানায় বসা নয়, সে মেঝের একটা পুরোনো কাঠের বাক্স খুলে বসে আছে। তার হাতের মুঠোয় ধরা একটা লাল রঙের সুতোর তৈরি ছোট চাবির রিং, যা বহু বছর আগের কলেজ জীবনের কোনো এক স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। সায়ানের চোখ দুটো লাল, মুখের কোণে এক অদ্ভুত বেদনার হাসি। সে খুব যত্নে বাক্সটার ভেতর থেকে একটা পুরোনো ডায়েরি বের করল।

 

ইরাবী থমকে দাঁড়িয়ে গেল। সায়ান বিড়বিড় করে কি যেন বলছে। সে একটু এগিয়ে গিয়ে কান পাতল।

 

"ইরাবী... তুমি বুঝতেই পারলে না। এই বিয়েটা আমার কাছে কোনো চাপ ছিল না, এটা ছিল আমার বহু বছরের না পাওয়া স্বপ্নের বাস্তবায়ন।" সায়ানের গলাটা কেঁপে উঠল।

 

ইরাবীর পা দুটো যেন মাটিতে গেঁথে গেছে। সে শুনতে পেল, সায়ান ডায়েরির পাতা উল্টে বলছে, "সেদিন কলেজ ফেস্টে যখন তোমার নীল রঙের শাড়িটা ভিজে গিয়েছিল বৃষ্টির জলে, তখন থেকেই তুমি আমার অবচেতন মনের সবটা জুড়ে ছিলে। তোমার হাতের সেই গোলাপ ফুলের রিংটা আজও আমার কাছে সযত্নে রাখা। কিন্তু আমি কখনো বলতে পারিনি... ভয়ে যে যদি তুমি দূরে সরে যাও?"

 

ইরাবীর মাথার ভেতরটা ফাঁকা হয়ে গেল। বিয়ের বহু বছর আগের সেই কলেজ জীবনের ছোটখাটো ঘটনাগুলো—যা সে নিজেই হয়তো ভুলে গেছে—সায়ান সব মনে রেখেছে! সেদিন রিকশায় ওঠার সময় তার পালে যে ছোট্ট ছ্যাকা লেগেছিল, সায়ান সেটাও ডায়েরিতে লিখে রেখেছে।

 

সত্যিটা জানার পর ইরাবীর বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। এত বছর ধরে সে যাকে অবহেলা আর উদাসীনতা ভেবে এসেছে, তা আসলে ছিল এক বুক জমাট বাঁধা ভালোবাসা আর সংকোচের দেওয়াল। কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তে, যখন সব পর্দা সরে যাওয়ার কথা, তখনই বাইরে থেকে আসা একটা ফোনকল আর ভুল বোঝাবুঝির ঝড় তাদের সবকিছু ওলটপালট করে দিতে আসছে।

অনুভূতির তীব্র টান

 

সায়ান হঠাৎ টের পেল কেউ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। সে চমকে মাথা তুলে তাকাল। দেখল ইরাবী পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে, চোখের কোণে জল চিকচিক করছে।

 

"ইরাবী... তুমি এখানে?" সায়ান তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল, তার চোখে অপরাধবোধ স্পষ্ট।

 

ইরাবী এগোয়নি। সে কাঁপাপাঁপা গলায় বলল, "সব মিথ্যা ছিল? নাকি এই অভিনয়টা খুব ভালো পারতেন আপনি?"

 

"না, ইরাবী, শোনো..." সায়ান এগিয়ে আসতে চাইল।

 

"এগিয়ে আসবেন না!" ইরাবী পিছিয়ে গেল। তার বুকের ভেতর ক্ষোভ আর ভালোবাসার এক তীব্র দাবানল জ্বলছে। চার বছরের জমে থাকা অভিমান আজ বাঁধ ভেঙেছে।

 

সায়ান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে এক ঝটকায় দূরত্ব ঘুচিয়ে ইরাবীর হাত দুটো শক্ত করে নিজের মুঠোয় বন্দি করল। ঘরের মৃদু আলোয় দুজনের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো। সায়ানের হাতের উষ্ণতা ইরাবীর সমস্ত প্রতিরোধ মুহূর্তে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল।

 

"মিথ্যা নয়, ইরাবী। এক ফোঁটাও না।" সায়ানের গলাটা এবার অদ্ভুত রকমের গাঢ়, প্রায় ফিসফিসানি। সে ইরাবীর আরও কাছে টেনে নিল, এত কাছে যে দুজনের শরীরের দূরত্বটুকুও মিলিয়ে গেল।

 

ইরাবী বাধা দিতে চাইল, কিন্তু সায়ানের বাহুডোরের তীব্র আকর্ষণ তাকে অসাড় করে দিল। সায়ান তার চিবুকটা আঙুল দিয়ে ওপরে তুলে ধরল। তার চোখের সেই গভীর চাউনি ইরাবীর সমস্ত হুঁশ কেড়ে নিল।

 

"এত বছর ধরে শুধু দূর থেকে ভালোবেসে গেছি," সায়ানের ঠোঁট প্রায় ছুঁয়ে ফেলল ইরাবীর কপাল, "আর সহ্য করতে পারছি না এই দূরত্ব।"

 

বাইরে তখন ঝুমঝুম করে বৃষ্টি নামল। জানালার কাচে বৃষ্টির ফোঁটার শব্দ আর ঘরের ভেতরের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ মিলে এক অন্যরকম তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি করল। সায়ানের হাত দুটো ইরাবীর কোমরের চারপাশে শক্ত হয়ে জড়িয়ে ধরল। সমস্ত না-বলা কথা, সমস্ত ভুল বোঝাবুঝি আর চার বছরের জমজমাট আবেগ যেন এক নিমেষে ছাই হয়ে উড়ে গেল। তাদের ঠোঁটের দূরত্ব ঘুচে গেল এক তীব্র, গভীর আকর্ষণে। সেই চুম্বনে কোনো ভয় ছিল না, ছিল দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান আর এক গভীর উন্মাদনা।

বাইরের ঝুমঝুম বৃষ্টির শব্দে ঘরের ভেতরের নিস্তব্ধতা আরও যেন গাঢ় হয়ে উঠেছিল। সায়ানের বাহুডোরের উষ্ণতা আর তার চোখের গভীর চাউনি ইরাবীর সমস্ত প্রতিরোধ নিমেষে গুড়িয়ে দিয়েছিল। চার বছরের সেই ঠান্ডা দূরত্ব, জমে থাকা অভিমান আর না-বলা কথার পাহাড় এক মুহূর্তের ঝড়ে উবে গেছে।

 

চুম্বনের সেই তীব্র নেশা কেটে যাওয়ার পরও তাদের কেউ কাউকে ছেড়ে নড়েনি। সায়ানের হাত দুটো তখনো ইরাবীর কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিল, আর ইরাবীর মাথাটা সায়ানের প্রশস্ত বুকের সাথে লেপ্টে ছিল। সে শুনতে পাচ্ছিল সায়ানের বুকের ভেতর হৃদস্পন্দনের দ্রুত ও উন্মাদ লাফালাফি।

 

"এত দিন... কেন একটাও কথা বলেননি?" ইরাবীর গলাটা কাঁপছিল। তার আঙুলগুলো সায়ানের শার্টের কলার খামচে ধরেছিল।

 

সায়ান নিজের চিবুকটা ইরাবীর চুলে ছুঁইয়ে খুব মৃদু স্বরে বলল, "ভয় পেতাম, ইরাবী। মনে হতো, যদি আমার এই অতিরিক্ত ভালোবাসা তোমার দম বন্ধ করে দেয়? তুমি যখন এই বাড়িতে এলে, তোমার চোখের কোণে যে অজানা আতঙ্ক দেখেছিলাম, তা আমি সইতে পারিনি। ভেবেছিলাম, তোমাকে সময় দিই। কিন্তু সময়টাই যে আমাদের মাঝখানে একটা পাহাড় হয়ে দাঁড়াবে, তা আমি বুঝতে পারিনি।"

পুরনো ভুল বোঝাবুঝির মেঘ

 

ইরাবী সায়ানের বুক থেকে মুখ তুলে সোজা তার চোখের দিকে তাকাল। সেই আলো-আঁধারি ঘরে সায়ানের চোখের চাউনিতে কোনো রাখঢাক ছিল না—শুধু ছিল সীমাহীন আকুলতা আর অনুশোচনা।

 

"কিন্তু ওই ফোনকলটার কথা মনে আছে?" ইরাবী একটু পিছিয়ে দাঁড়িয়ে সন্দিগ্ধ গলায় বলল, "যেদিন রাতে আপনার ওই মহিলা কলিগ বারবার ফোন করছিল, আর আপনি রুম থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন? সেদিন আমি ভেবেছিলাম... আপনার জীবনে অন্য কেউ আছে।"

 

সায়ানের মুখটা এক পলকের জন্য শক্ত হয়ে গেল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "ওহ! অনন্যা? ও আমাদের অফিসের সিনিয়র ম্যানেজার। সেদিন রাতে ওর বাবার হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। হসপিটালে পেপারওয়ার্ক আর ব্লাডের ব্যবস্থার জন্য ও খুব প্যানিকড হয়ে আমাকে ফোন করেছিল। আমি তোমাকে বলতে পারতাম, কিন্তু সেদিন তোমার সাথে এমনিতেই আমার একটা কথা কাটাকাটি হয়েছিল, তাই তোমাকে বিরক্ত করতে চাইনি। ভেবেছি একা সামলে নেব। কিন্তু ওই একটা ভুল বোঝাবুঝি আমাদের মাঝের দূরত্বটাকে আরও বাড়িয়ে দিল।"

 

ইরাবী এবার বুঝতে পারল, তাদের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল যোগাযোগহীনতা। দুজনেই নিজেদের মতো করে সব ধরে নিয়েছিল, কেউ কাউকে সত্যিটা পরিষ্কার করে বলেনি।

 

সায়ান আবার ইরাবীর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিল। তার হাতের স্পর্শে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল ইরাবীর সর্বশরীরে। সায়ান খুব ধীরে ধীরে ইরাবীর আরও কাছে এগিয়ে এল। রুমের মৃদু হলুদ আলোর আভা তাদের গায়ে এসে পড়েছে। সায়ানের অন্য হাতটা আলতো করে ইরাবীর থুতনিতে ছোঁয়া লাগাল, তারপর খুব যত্নে তার মুখটা উপরে তুলে ধরল।

উত্তাল আবেগের রাত

 

"আর কোনো ভুল বোঝাবুঝি নয়, ইরাবী," সায়ানের ফিসফিসানি কানে আসতেই ইরাবীর চোখের পাতা দুটো আপনাআপনি বুজে এলো। "এবার থেকে আমার প্রতিটা নিঃশ্বাসে শুধু তোমার নাম থাকবে।"

 

সায়ানের ঠোঁটগুলো যখন আবার ইরাবীর ঠোঁটের ওপর নেমে এলো, তখন বাইরের বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে ঘরের ভেতরের আবেগ চরম রূপ নিল। সেই চুম্বনে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না, ছিল চার বছরের জমিয়ে রাখা সমস্ত ভালোবাসা, আকুতি আর তীব্র অধিকারবোধের প্রকাশ। সায়ানের হাত দুটো ইরাবীর পিঠের ওপর দিয়ে ঘুরিয়ে তাকে নিজের আরও কাছাকাছি টেনে নিল, যেন দুজনে মিলে একটা একক সত্তা হয়ে যেতে চায়।

 

ইরাবীও আর কোনো বাধা রাখল না। সে তার দুই হাত সায়ানের ঘাড়ের চারপাশে জড়িয়ে ধরল। সায়ানের হাতের প্রতিটি ছোঁয়ায় ইরাবীর ত্বকে যেন আগুনের ফুলকি ঝরছিল। তাদের মাঝের সমস্ত পর্দা, সমস্ত অহংকার আর দূরত্ব ওই একটা রাতেই ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেল। বাইরে তখনো মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে, আর ঘরের ভেতর দুজনের দীর্ঘশ্বাস আর উষ্ণ স্পর্শে সময় যেন থেমে গিয়েছিল।

সকালের সোনালী রোদের আলো যখন নবাব মঞ্জিলের বিশাল জানালার কাচ ভেদ করে ঘরের ভেতর এসে পড়ল, তখন ইরাবীর ঘুম ভাঙল। তার মাথাটা আলতো করে সায়ানের প্রশস্ত বুকের ওপর রাখা ছিল, আর সায়ানের একটা হাত পরম যত্নে জড়িয়ে ধরেছিল তার কোমর। গত রাতের সেই ঝোড়ো আবেগ আর উত্তাল ভালোবাসার রেশ যেন এখনো ঘরের বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।

 

সায়ান ইতিমধ্যেই জেগে ছিল। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল ইরাবীর ঘুমের শান্ত মুখের দিকে। ইরাবী চোখ মেলতেই সায়ানের ঠোঁটে এক ফালি মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল।

 

"শুভ সকাল, আমার জীবন," খুব নরম গলায় ফিসফিস করে বলল সায়ান।

 

ইরাবী লাজুক হাসল। সে খেয়াল করল, চার বছরের যে বরফ জমাট বেঁধে ছিল তাদের সংসারে, তা আজ পুরোপুরি গলে জল হয়ে গেছে। আর কোনো লুকোচুরি নেই, কোনো ভুল বোঝাবুঝি নেই। সবকিছু পরিষ্কার।

নবাব মঞ্জিলের নতুন বাতাস

 

নিচে নামার পর বাড়ির পরিবেশটাও কেমন যেন বদলে গেছে মনে হলো। কাজের লোকেরা লক্ষ্য করল, আজ সায়ান আর ইরাবী এক সাথে ডাইনিং টেবিলে বসেছে। শুধু তাই নয়, সায়ান নিজে হাতে চায়ের কাপ এগিয়ে দিল ইরাবীর দিকে।

 

পুরোনো ঢাকার এই পুরোনো জমিদার বাড়ির ইট-কাঠগুলো যেন আজ নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। দুপুরের দিকে সায়ান তার অফিসিয়াল কাজের জন্য সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু এবার আর সেই আগের মতো ঠান্ডা বিদায় ছিল না।

 

গাড়িতে ওঠার আগে সায়ান সদর দরজায় দাঁড়িয়ে ইরাবীকে আলতো করে নিজের বুকে টেনে নিল। কানে কানে বলল, "দুদিনের বেশি লাগবে না আমার ফিরতে। আর হ্যাঁ, এবার আর কোনো ডায়েরি লুকিয়ে রাখতে হবে না। আমার জীবনের প্রতিটা পাতা এখন তোমার সামনে খোলা।"

 

ইরাবী মৃদু হেসে সায়ানের শার্টের কটন কলারটা ঠিক করে দিয়ে বলল, "তাড়াতাড়ি ফিরবেন। আপনার ডায়েরির বাকি পাতাগুলো আমাকেও পড়তে হবে কিন্তু।"

 

সায়ান চোখ টিপে মুচকি হেসে গাড়িতে গিয়ে বসল। গাড়িটা নবাব মঞ্জিলের পুরোনো গেট পেরিয়ে যখন চোখের আড়াল হলো, তখন ইরাবীর বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শান্তির সুবাতাস বইছিল।

ভালোবাসার পূর্ণতা

 

সন্ধ্যায় বারান্দার সেই পুরনো চেয়ারে বসে ইরাবী চা খাচ্ছিল। চার বছরের জমে থাকা সমস্ত কষ্ট, অভিমান আর দূরত্ব আজ অতীত। সে বুঝতে পেরেছে, প্রকৃত ভালোবাসা কখনো চেঁচিয়ে প্রকাশ করতে হয় না; তা জমতে জমতে একসময় নদীর বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়।

 

বাইরের ব্যস্ত গলির রিকশার টুংটাং শব্দটা আজ আর তার কাছে একা লাগছিল না। সে জানত, মানুষটা দূরে গেলেও তার মনটা এখানেই পড়ে আছে। আগামী জীবনটা তাদের জন্য নতুন কোনো আশার আলো নিয়ে অপেক্ষা করছে, যেখানে আর কোনো অন্ধকার বা ভুল বোঝাবুঝির স্থান নেই।

....
👁 59