বাস্তবতার নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত

মসলিনের মতো পাতলা ভোরের আলো এসে যখন জানালার পর্দায় ছুঁইছুঁই, ইহান তখন বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে। হাতের কফি কাপটা অনেকক্ষণ ধরেই ঠান্ডা হয়ে গেছে, তবুও চুমুক দেওয়ার কথা মনে নেই তার। নিচে ব্যস্ত শহরের চিরচেনা কোলাহল—রিকশার টুংটাং শব্দ, দূরে বাস-ট্রাকের হর্ন। কিন্তু ইহানের মনের ভেতরে বাজছে সম্পূর্ণ অন্য এক সুর। ঠিক কয়েক ঘণ্টা বাদেই সেই মানুষটার সাথে দেখা হওয়ার কথা, যাকে সে নিজের জীবনের একটা বিরাট অংশ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

রাইসা। নামটা শোনার সাথে সাথেই বুকের ভেতর একটা পুরোনো ক্ষত মৃদু চিনচিন করে ওঠে। কত বছর হয়ে গেল? সেই কলেজ জীবনের পাট চুকিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখা, তারপর একে একে কেটে গেছে দীর্ঘ সাতটি বছর। এর মাঝে যোগাযোগের কত সেতু ভেঙেছে, কত নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। কিন্তু রাইসার সেই কাজলকালো চোখ দুটো আর খিলখিল করে হাসার শব্দটা ইহানের স্মৃতি থেকে একটুও ম্লান হয়নি।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

দরজায় মৃদু টোকা পড়ল। ইহান সম্বিৎ ফিরে পেয়ে কফি কাপটা টেবিলে রেখে দরজা খুলল। সামনে দাঁড়িয়ে রাইসা। সময়ের সাথে সাথে রাইসার চেহারায় একটা পরিপক্বতা এসেছে, কিন্তু চোখের সেই গভীর চাউনিটা হুবহু আগের মতোই আছে। পরনে হালকা গোলাপি রঙের একটা সালোয়ার কামিজ, গায়ে সুতির ওড়না জড়ানো।

 

—‘কী রে, চিনতে কষ্ট হলো নাকি?’ রাইসা হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু সেই হাসিতে একধরনের অচেনা আড়ষ্টতা আর ক্লান্তি স্পষ্ট।

 

—‘তোকে চিনতে আমার চোখের পলকও লাগে না, রাইসা। আয় ভেতরে আয়।’ ইহান একটা স্বস্তির এবং একই সাথে ভারী নিঃশ্বাস ফেলে দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়াল।

 

অ্যাপার্টমেন্টের বসার ঘরে দুজনে বসল। চারপাশের নীরবতা যেন আরও ভারী হয়ে চেপে বসল তাদের ওপর। সাত বছর পর মুখোমুখি বসে কথা বলার মতো অনেক কথা জমানো ছিল, অথচ কারোরই গলা দিয়ে শব্দ বের হচ্ছিল না। এই নীরবতা ভাঙল রাইসাই।

 

—‘শুনলাম তুই নাকি বেশ ভালোই গুছিয়ে নিয়েছিস নিজেকে। লেখালেখি করিস, আর্কিটেকচারের কাজও তো চলল ভালোই। তাই না?’

 

—‘চলছে একরকম। জীবন তো আর থেমে থাকে না, রাইসা। চলতে হয়।’ ইহান সোফায় একটু সোজা হয়ে বসল। রাইসার মুখের দিকে সরাসরি তাকাতে তার বুক কেঁপে উঠছিল। ঠিক এই মানুষটাকেই সে নিজের সবটুকু দিয়ে ভালোবেসেছিল, অথচ সে আজ অন্য কারোর হতে চলেছে। আগামী সপ্তাহের শেষেই রাইসার বিয়ে। পাত্র দেশের বাইরে ভালো চাকরি করে, পরিবারিকভাবে ঠিক হওয়া বিয়ে।

 

—‘তুই তো আমাকে দাওয়াত দিতে আসিসনি, এসেছিস দেখা করতে। কেন বল তো?’ ইহান সরাসরি প্রশ্নটা করল, কারণ রাখঢাক করার মতো মানসিক স্থিতি তার ছিল না।

 

রাইসা মুহূর্তের জন্য চোখ নামিয়ে নিল। তার হাতের আঙুলগুলো ওড়নার কোণ নিয়ে খেলা করতে লাগল। গলার কাছে কিছু একটা আটকে যাওয়ার মতো করে সে ফিসফিস করে বলল,—‘জানি না, ইহান। সব ঠিকঠাক হয়েও কোথাও যেন একটা ভুল থেকে যাচ্ছে। তনয়ের সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে আজ আট মাস হলো। সে ভালো ছেলে, আমার খেয়াল রাখে, পরিবারও খুব আধুনিক। কিন্তু তবুও... তোর সাথে শেষ দেখা করার পর থেকে নিজেকে খুব একা মনে হচ্ছিল। মনে হলো, এই অধ্যায়টা শেষ করার আগে তোর সাথে একবার দেখা করা দরকার।’

 

—‘ভুল কিসে হচ্ছে, রাইসা? তুই তো নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিস।’ ইহানের কন্ঠস্বর কিছুটা ভারী হয়ে এল। সে উঠে গিয়ে জানালার কাছে দাঁড়াল। পেছনের রোদ এসে তার লম্বা চুলে ঠিকরে পড়ছে।

 

রাইসাও সোফা ছেড়ে উঠে ইহানের ঠিক পিঠের কাছে এসে দাঁড়াল। বাতাসের সাথে রাইসার গায়ের মিষ্টি সুবাস ইহানের নাকে এসে লাগল। এই সুবাসটা তার চেনা, বড্ড বেশি চেনা। এক সময় এই সুবাসের মাঝেই সে নিজের পৃথিবী খুঁজে পেত।

 

—‘সিদ্ধান্ত তো মানুষ পরিস্থিতির শিকার হয়েও নেয়, ইহান। তুই সেদিন যদি একটু জেদ ধরতি... সেদিন যদি আমাকে শক্ত করে ধরে বলতি যে কোথাও যাবি না, তবে কি আজ অন্যরকম হতে পারত সব?’ রাইসার গলার স্বর কেঁপে উঠল। তার ভেজা চোখ দুটো এখন ইহানের পিঠের ওপর নিবদ্ধ।

 

ইহান ঘুরে দাঁড়াল। রাইসার এত কাছাকাছি চলে আসার ফলে তাদের মাঝখানের দূরত্বটুকু নিমিষেই ঘুচে গেল। রাইসার নিঃশ্বাসের গরম ছোঁয়া এসে পড়ল ইহানের বুকে। বাইরে তখন হালকা গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বৃষ্টির ছাঁট এসে বারান্দার গ্রিল ভেদ করে তাদের গায়ে পড়ছে।

 

—‘জেদ? আমি তো সেদিন আমার সর্বস্ব হারিয়ে ফেলেছিলাম, রাইসা। তুই যখন তোর পরিবারের সিদ্ধান্তের কথা বলেছিলি, আমার তো আর কিছু বলার অধিকার ছিল না। আজ তুই অন্য কারো ঘরের গিন্নি হতে চলছিস। এখন এসব পুরোনো কথা টেনে লাভ কী?’ ইহানের কন্ঠের শক্ত ভাবটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছিল। সে রাইসার চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে জমে থাকা অজস্র না-বলা কথা আর জমাটবাঁধা কান্না ইহানের বুক চিরে ভেতরটা নাড়িয়ে দিল।

 

রাইসা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে হঠাৎ করেই এক পা এগিয়ে এসে ইহানের বুক জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। তার মাথাটা এখন ইহানের প্রশস্ত বুকের সাথে লেপ্টে আছে। ইহানের হাত দুটো মুহূর্তের জন্য শূন্যে ঝুলে রইল, তারপর সব বাঁধন ভেঙে সে নিজের দুই হাত দিয়ে রাইসার পিঠ শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কত বছর পর রাইসার এই উষ্ণতা সে ফিরে পেল। রাইসার শরীরের সুবাস আর চোখের জলের আর্দ্রতা ইহানের শার্টের বুক ভিজিয়ে দিচ্ছিল।

 

—‘আমি পারছি না, ইহান... তনয় ভালো মানুষ, কিন্তু আমার মন অন্য কোথাও আটকে আছে। প্রতিদিন নিজেকে বোঝাই, কিন্তু তোর স্মৃতিগুলো আমাকে পিষে মারছে,’ রাইসা ইহানের বুকে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে উঠল।

 

ইহান নিজের গাল রাইসার চুলে ঘষে দিল। তার চোখের কোণ থেকেও এক ফোঁটা উষ্ণ জল গড়িয়ে পড়ল রাইসার মাথার তালুতে। সে রাইসার চুলে হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে বলল,—‘কাঁদিস না, রাইসা। তুই যার কাছেই যাস না কেন, আমার হৃদয়ের একটা বিশাল অংশ শুধু তোরই থাকবে। আজ হোক বা কাল, বাস্তবতাকে তো মেনে নিতেই হবে।’

 

কিন্তু সেই মুহূর্তে দুজনের হৃদস্পন্দন জানিয়ে দিচ্ছিল অন্য কথা। এই আলিঙ্গন কোনো সাধারণ সান্ত্বনা ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘ সাত বছরের না-বলা তীব্র ভালোবাসা আর আকুলতার এক বিস্ফোরণ। বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে তখন শুধু তাদের দুজনের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। বাইরে সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে, আর ভেতরে শুরু হয়েছে এক গভীর অন্তরমন্থন।

বাইরের অবিরাম বৃষ্টির শব্দ বারান্দার কাচে এসে ধাক্কা খাচ্ছে। ঘরে তখন ঘনীভূত এক নীরবতা, যার মধ্যে শুধু ভেসে আসছে দুজনের ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ। ইহানের শক্ত বুকের সাথে লেপ্টে থাকা রাইসা ধীরে ধীরে মুখ তুলল। তার ভেজা চোখের পলকে এখনও জল জমে আছে, কিন্তু সেই চোখের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ভাষাটা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। সাত বছরের দূরত্ব, সামাজিক নিয়ম আর আসন্ন বিয়ের সমস্ত দেওয়াল মুহূর্তের জন্য ধূলিসাৎ হয়ে গেল।

 

ইহান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার ডান হাতটা আলতো করে উঠে এল রাইসার উষ্ণ গালের ওপর। বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে সে রাইসার চোখের কোণের জল মুছে দিল। সেই ছোঁয়াটুকু যেন কারেন্ট শকের মতো কাজ করল দুজনের শরীরে। রাইসা কেঁপে উঠল, কিন্তু সে সরে গেল না; বরং ইহানের হাতের তালুতে নিজের গালটা আরও একটু গুঁজে দিল।

 

—‘ইহান...’ রাইসার ফিসফিসানি বাতাসে মিলিয়ে গেল।

 

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই ইহান ঝুঁকে এল। তাদের ঠোঁটের দূরত্ব ঘুচে গেল এক পলকে। এই চুম্বনে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না, ছিল দীর্ঘ সাত বছরের না-বলা আকুলতা, তীব্র হাহাকার আর জমানো সমস্ত ভালোবাসার বিস্ফোরণ। রাইসা প্রথমে একটু আচ্ছন্ন হয়ে পড়লেও পরমুহূর্তেই নিজের দুই হাত দিয়ে ইহানের কাঁধ শক্ত করে খপ করে খামচে ধরল। তার ঠোঁটের মৃদু কাঁপন বুঝিয়ে দিচ্ছিল কতটা তৃষ্ণা নিয়ে সে এতদিন বেঁচে ছিল।

 

বাইরের ঝুম বৃষ্টির শব্দের সাথে সাথে ঘরের ভেতরের উষ্ণতা ক্রমশ বাড়তে লাগল। চুম্বনের গভীরতা বাড়ল, যেখানে সংযমের সমস্ত বাঁধ ভেঙে একাকার হয়ে গেল তাদের অস্তিত্ব। ইহান রাইসাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল, এতটাই কাছে যে তাদের মধ্যবর্তী বাতাসের কণাও যেন মিশে গেল। রাইসার নরম আঙুলগুলো ইহানের চুলের ভেতর বিলিয়ে গেল, তার হাত দুটো স্লাইড করে নেমে এল ইহানের চওড়া কাঁধ থেকে পিঠের দিকে।

 

—‘আমি তোরই ছিলাম, ইহান... আজও শুধু তোরই আছি,’ ঠোঁট সরিয়ে রাইসা যখন ফিসফিস করে কথাগুলো বলল, তার মুখটা উত্তেজনায় লাল হয়ে উঠেছে। তার বুক দ্রুত ওঠা-নামা করছে। ওড়নাটা কখন যেন কাঁধ থেকে খসে সোফার এক কোণায় পড়ে গেছে।

 

ইহান কোনো কথা বলল না। তার সমস্ত মনোযোগ তখন রাইসার শরীরের প্রতিটি স্পন্দনে। সে রাইসার মুখ থেকে চুলে চুমু খেল, তারপর গলার খাঁজে মুখ রাখতেই রাইসা শিউরে উঠল। রাইসার মুখ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল, যা ইহানের সমস্ত স্নায়ুকে যেন আরও বেশি জাগিয়ে তুলল। এই স্পর্শে ছিল এক গভীর টানাপোড়েন—একদিকে হারানোর ভীতি, অন্যদিকে চরম পাওয়ার এক অদ্ভুত উন্মাদনা।

 

তারা দুজনে সোফায় বসে পড়েছিল, কিন্তু দূরত্ব বলতে আর কিছু অবশিষ্ট ছিল না। ইহানের হাত রাইসার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের আরও কাছাকাছি টেনে নিল। রাইসার শরীর যেন মোমের মতো গলে মিশে যাচ্ছিল ইহানের সাথে। প্রতিটা নিশ্বাসে মিশে ছিল তীব্র উত্তাপ আর পুরনো দিনের চেনা গন্ধ। জানালার কাচে বৃষ্টির ফোঁটাগুলোর আছড়ে পড়ার শব্দ ছাপিয়ে তখন তাদের হৃদস্পন্দনের শব্দই একমাত্র সত্য হয়ে উঠেছিল।

 

বেশ কিছুক্ষণ পর, যখন ঝড়ের বেগ কিছুটা কমল আর তাদের দীর্ঘশ্বাসের গতিও স্বাভাবিক হলো, রাইসা এসে মাথা রাখল ইহানের কাঁধে। তার চুলগুলো ছড়িয়ে আছে ইহানের শার্টের ওপর। ইহান এক হাত দিয়ে রাইসার পিঠে বুলিয়ে দিচ্ছে, অন্য হাতটা শক্ত করে ধরে রেখেছে রাইসার ঠান্ডা আঙুলগুলোকে।

 

—‘কালকে তনয় আসবে ঢাকায়। পরশু আমাদের একটা ছোটখাটো গেটটুগেদার আছে গুলশানের একটা রেস্তোরাঁয়। তুই আসবি তো, ইহান?’ রাইসার কন্ঠস্বর এখন অনেক শান্ত, কিন্তু তাতে এক অজানা ভয়ের আভাস।

 

ইহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে জানে এই মুহূর্তগুলো কেবলই সাময়িক, এক ঝড়ের আগের ক্ষণস্থায়ী শান্তি। বাস্তবতার কঠিন পাথরগুলো ঠিক সামনেই পাহাড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবু সে রাইসার চুলে মুখ গুঁজে ফিসফিস করে বলল,—‘যেখানে তুই ডাকবি, আমি সেখানে ঠিক চলে যাব, রাইসা। সে আমার ধ্বংসের শেষপ্রান্ত হলেও না বলতে পারব না।’

 

রাইসা আর কিছু বলল না, শুধু ইহানের হাতটা নিজের বুকের কাছে টেনে নিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল। তারা জানত না আগামী দিনে তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে, কিন্তু এই দীর্ঘ রাতের গভীরতা তাদের শিখিয়ে দিল যে

গুলশানের অভিজাত রেস্তোরাঁটির মৃদু আলোয় চারপাশটা ঝকঝক করছে। মৃদু ইন্সট্রুমেন্টাল মিউজিক বাজছে ব্যাকগ্রাউন্ডে। এক কোণের টেবিলে বসে আছে তনয় আর রাইসা। তনয় দেখতে সুদর্শন, পরিপাটি করে ছাঁটা চুল আর দামি সুবাসে সে এক আত্মবিশ্বাসী যুবক। রাইসার পরনে একটি গাঢ় নীল রঙের সিল্কের সালোয়ার কামিজ, কানে ছোট পাথরের দুল। তার মুখের হাসিতে কৃত্রিমতার প্রলেপ স্পষ্ট, কারণ তার মন পড়ে আছে অন্য কোথাও।

 

ঠিক তখনই রেস্তোরাঁর কাচের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল ইহান। গায়ে একটা সাধারণ কালো রঙের শার্ট। সে যখন টেবিলের কাছে এসে পৌঁছাল, রাইসার চোখ দুটো ভয়ে এবং আকুলতায় চকচক করে উঠল।

 

—‘আরে ইহান! আসুন, বসুন!’ তনয় উচ্ছ্বসিত গলায় সোফায় একটু সরে বসল। ‘রাইসার মুখে আপনার কথা অনেক শুনেছি। ও তো বলছিল আপনারা নাকি কলেজ জীবনের ভালো বন্ধু!’

 

—‘হ্যাঁ, অনেকদিনের চেনা...’ ইহান শান্ত গলায় বলে তনয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। হাত মিলিয়ে সে রাইসার ঠিক সামনের চেয়ারটায় বসল। তাদের মাঝে দূরত্ব মাত্র কয়েক ফুটের, অথচ মনে হলো মাঝখানে পাহাড়সম ব্যবধান।

 

খাবারের অর্ডার দেওয়া হলো। কথাবার্তা চলতে লাগল মূলত তনয় আর রাইসার বিয়ের পরিকল্পনা নিয়ে। আগামী পরদিনই তাদের গায়েহলুদ, আর ঠিক তিন দিন পর আক্দ ও বিবাহোত্তর সংবর্ধনা। তনয় অত্যন্ত গুছিয়ে কথা বলছে, নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা শেয়ার করছে। কিন্তু ইহানের চোখের ভাষা শুধু রাইসার দিকে নিবদ্ধ ছিল। রাইসার হাত দুটো টেবিলের নিচে কাঁপছিল। সে কয়েকবার জল খেল, কিন্তু তার বুকের ভেতর ঝড়ের বেগ কমছিল না।

 

একসময় তনয় ফোন কলে ব্যস্ত হয়ে রেস্তোরাঁর বাইরে লবিতে চলে গেল। টেবিলে তখন শুধু ইহান আর রাইসা। ঠিক সেই সুযোগে রাইসা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার গলা কাঁপছিল।

 

—‘ইহান, তুই কি সত্যি মেনে নিতে পারবি? আমি কাল রাতেই সব শেষ করে দিতে পারি... তনয়কে সব সত্যিটা বলে দিতে পারি।’ রাইসার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল এক ফোঁটা জল, যা সে দ্রুত আঙুল দিয়ে মুছে ফেলল।

 

ইহান গম্ভীর মুখে টেবিলের ওপর রাখা রাইসার ঠান্ডা হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় তুলে নিল। তার চোখে কোনো অভিযোগ ছিল না, ছিল এক গভীর প্রজ্ঞা আর চরম আত্মত্যাগের আলো।

 

—‘না, রাইসা। সমাজ, পরিবার আর তোর এই ভবিষ্যৎকে মাঝপথে ভেঙে দিবি না। তুই যদি আজ ভুলের ওপর দাঁড়িয়ে একটা নতুন জীবন গড়তে চাস, তবে সারাজীবন অপরাধবোধে পুড়বি। আমি তোকে ভালোবাসি, তাই তোর ধ্বংস দেখতে পারব না। আমাকে হারানোর কষ্ট সহ্য করা যায়, কিন্তু নিজের পরিবারের চোখে অপরাধী হওয়ার কষ্ট তোর সহ্য হবে না।’ ইহানের কন্ঠস্বর দৃঢ় হলেও তাতে এক অদ্ভুত মায়া ঝরে পড়ছিল।

 

ঠিক তখনই তনয় হাসিমুখে টেবিলে ফিরে এল। সে খেয়াল করল না যে তাদের চোখের কোণে জমে থাকা জল বা দুই হাতের সেই শক্ত মুঠো মুহূর্তের মধ্যে আলগা হয়ে গেছে।

 

বিয়ের আগের দিন রাতে রাইসা শেষবারের মতো ইহানকে ফোন করেছিল। সেদিন কোনো অভিযোগ ছিল না, ছিল শুধু দীর্ঘ নিঃশ্বাস আর দুজনের নিঃশব্দ কান্না। রাইসা বুঝতে পেরেছিল, ইহানের এই ত্যাগই তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি ভালোবাসা উপহার দিয়েছে।

 

পর aদিন গুলশানের একটি কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ের জমজমাট আয়োজন। লাল ও সোনালী আলোয় চারপাশটা ঝলমল করছে। রাইসাকে লাল টুকটুকে লেহেঙ্গায় অসাধারণ লাগছে। কিন্তু যখন কাজি সাহেব এসে অনুমতি নিলেন এবং রাইসা কাঁপতে কাঁপতে কবুল বলল, তার চোখ দুটো খুঁজে ফিরছিল ভিড়ের মাঝে একটা পরিচিত মুখ। ইহান ভিড়ের একেবারে পেছনে দাঁড়িয়েছিল, ঠোঁটে এক চিলেমূদ্রা হাসি আর চোখে জল।

 

রাইসা যখন তনয়ের হাত ধরে মঞ্চ থেকে নামছিল, তখন শেষবারের মতো ইহানের সাথে তার চোখাচোখি হলো। কোনো কথা হলো না, কোনো ইশারাও নয়—শুধু দুটো চেনা মন চিরকালের মতো একে অপরকে বিদায় জানাল। ইহান জানত, রাইসা হয়তো অন্য কারও ঘরে চলে গেল, কিন্তু তার মনের গভীরের মন্দিরে রাইসার আসনটি চিরকাল অক্ষত থাকবে। বাস্তবতার নিষ্ঠুর নিয়মে তাদের পথ হয়তো আলাদা হয়ে গেল, কিন্তু সেই উষ্ণ রাতের স্মৃতি আর গভীর ভালোবাসার টান তাদের আজীবন বাঁচিয়ে রাখবে।

....
👁 27