বৃষ্টি পড়ছিল। কলকাতার সন্ধ্যায় সেই বৃষ্টি যেন শহরটাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরেছিল। পার্ক স্ট্রিটের একটা পুরনো ক্যাফেতে বসে ঋতু তার কফি ঠান্ডা হতে দিচ্ছিল। হাতে একটা বই, কিন্তু পাতা উল্টোচ্ছিল না। তার মন অন্য কোথাও।
তিন বছর আগেও সে এমনই বসত। তখন তার পাশে কেউ থাকত না। এখনও নেই। কিন্তু আজ সে অন্যরকম অপেক্ষা করছিল। একটা মেসেজ এসেছিল সকালে— “আজ সন্ধ্যায় পার্ক স্ট্রিটে আসব। তুমি যদি এখনও সেই ক্যাফেতে বসো…”
ঋতুর হাত কাঁপছিল। সে জানত কে লিখেছে। আর্যান।
তারা প্রথম দেখা হয়েছিল ঠিক এই ক্যাফেতেই। চার বছর আগে। ঋতু তখন মাস্টার্স শেষ করেছে, আর্যান সদ্য ফিরেছে লন্ডন থেকে। দুজনেরই চোখে একই রকম ক্লান্তি আর একই রকম ক্ষুধা—কিছু একটা খুঁজে পাওয়ার।
সেদিন ঋতু বই পড়ছিল। আর্যান এসে বসেছিল পাশের টেবিলে। তার ল্যাপটপ খোলা, কিন্তু চোখ বারবার ঋতুর দিকে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত সে উঠে এসেছিল।
“সেই বইটা… তুমি পড়ছো? আমিও পড়েছি। শেষের দিকে কান্না পেয়েছিল।”
ঋতু তাকিয়েছিল। আর্যানের চোখ গভীর, কালো, যেন কিছু গোপন করে আছে। সে হেসেছিল। সেই হাসি ঋতুর ভিতরে ঢুকে গিয়েছিল।
তারপর শুরু হয়েছিল।
তারা কথা বলত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ক্যাফে থেকে বেরিয়ে হেঁটে হেঁটে গঙ্গার ধারে যেত। রাত জেগে কথা বলত। আর্যান বলত তার মায়ের কথা, যিনি তাকে একা রেখে চলে গিয়েছেন যখন সে সাত বছরের। ঋতু বলত তার বাবার কথা, যিনি তাকে কখনো ছুঁয়ে দেখেননি। দুজনেরই ভিতরে একই রকম ফাঁকা জায়গা। আর সেই ফাঁকা জায়গায় তারা একে অপরকে ভরে দিচ্ছিল।
প্রেম এসেছিল আস্তে আস্তে। প্রথমে শুধু স্পর্শ। হাত ধরা। তারপর চুমু। আর্যানের ঠোঁট ঠান্ডা ছিল বৃষ্টিতে ভিজে। ঋতু তার বুকের ওপর মাথা রেখে শুনত তার হৃদস্পন্দন। সেই স্পন্দন যেন তাকে বলত— তুমি একা নও।
এক রাত তারা আর্যানের ফ্ল্যাটে গিয়েছিল। বৃষ্টি পড়ছিল বাইরে। জানালার কাঁচে জলের ধারা নেমে আসছিল। আর্যান ঋতুকে ধরেছিল। তার হাত ঋতুর কোমরে, চোখ চোখে।
“আমি ভয় পাচ্ছি,” ঋতু বলেছিল।
“কিসের?”
“যে তুমি একদিন চলে যাবে।”
আর্যান তার কপালে চুমু খেয়েছিল। “আমি যাব না। কখনোই।”
সেই রাতটা ছিল তাদের প্রথম রাত। আর্যানের হাত ঋতুর শরীরের ওপর দিয়ে আস্তে আস্তে নেমে গিয়েছিল। তার ঠোঁট ঋতুর গলায়, বুকে, পেটে। ঋতু কেঁপে উঠেছিল। আর্যান তাকে দেখেছিল এমনভাবে যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান কিছু। তার স্পর্শ ছিল নরম, অথচ ক্ষুধার্ত। ঋতু তার চুল আঁকড়ে ধরেছিল। আর্যান তার ভিতরে প্রবেশ করেছিল ধীরে ধীরে, যেন সময়কে থামিয়ে দিয়ে। তাদের শ্বাস মিশে গিয়েছিল। ঋতু আর্যানের নাম ডেকেছিল। আর্যান তার কানে ফিসফিস করে বলেছিল, “আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
সেই রাতের পর তারা আর আলাদা হয়নি।
কিন্তু প্রেম সবসময় সহজ হয় না।
আর্যানের বাবা চেয়েছিলেন সে লন্ডনে ফিরে যাক। একটা বড় চাকরির অফার ছিল। ঋতু জানত আর্যান যাবে। কারণ সে কখনো তার বাবাকে না বলতে পারেনি। একদিন আর্যান এসে বলেছিল, “আমাকে যেতে হবে। শুধু ছয় মাস। তারপর ফিরে আসব।”
ঋতু কেঁদেছিল। “তুমি ফিরবে না।”
“ফিরব। কথা দিচ্ছি।”
সে গিয়েছিল। প্রথম দুই মাস প্রতিদিন কল করত। তারপর কমতে শুরু করে। ঋতু অপেক্ষা করত। রাত জেগে বসত। আর্যানের ছবি দেখত। তার গলার স্বর মনে করত। একদিন আর্যান ফোন করে বলেছিল, “আমাকে এখানে থাকতে হবে আরও কিছুদিন।”
ঋতু চুপ করে গিয়েছিল।
এক বছর পর আর্যান ফিরে এসেছিল। কিন্তু সে আর আগের আর্যান ছিল না। তার চোখে একটা দূরত্ব। সে ঋতুকে জড়িয়ে ধরেছিল, কিন্তু সেই আগের উষ্ণতা ছিল না। ঋতু জিজ্ঞেস করেছিল, “কি হয়েছে?”
আর্যান মাথা নেড়েছিল। “কিছু না।”
কিন্তু কিছু ছিল। লন্ডনে সে অন্য এক মেয়ের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়েছিল। একটা ভুল। একটা রাত। আর্যান সেটা ঋতুকে বলেছিল একদিন। ঋতুর পৃথিবী ভেঙে গিয়েছিল।
সে চলে গিয়েছিল। আর্যান পিছু পিছু এসেছিল। কেঁদে কেঁদে বলেছিল, “আমি ভুল করেছি। আমি তোমাকেই চাই। শুধু তোমাকে।”
ঋতু বলেছিল, “আমি পারছি না।”
তারা আলাদা হয়ে গিয়েছিল।
দুই বছর কেটে গিয়েছিল। ঋতু অন্য শহরে চাকরি নিয়েছিল। চেষ্টা করেছিল ভুলে যেতে। কিন্তু আর্যানের স্মৃতি তাকে ছাড়ত না। রাতে সে জেগে থাকত। মনে পড়ত আর্যানের হাত, তার ঠোঁট, তার কণ্ঠস্বর। মনে পড়ত সেই রাতগুলো যখন তারা একে অপরের শরীরে হারিয়ে যেত। আর্যান ঋতুর শরীরকে চিনত এমনভাবে যেন সে তার নিজের। তার আঙুল ঋতুর ত্বকের ওপর দিয়ে ঘষে যেত, আর ঋতু কেঁপে উঠত। তারা একে অপরকে চুমু খেত এমনভাবে যেন পৃথিবী শেষ হয়ে যাচ্ছে। ঋতু আর্যানের বুকে শুয়ে শুনত তার হৃদস্পন্দন আর ভাবত— এটাই বাড়ি।
এখন, তিন বছর পর, আর্যান ফিরে এসেছে।
ঋতু ক্যাফেতে বসে আছে। বৃষ্টি পড়ছে। দরজা খুলল। আর্যান ঢুকল।
সে আগের মতোই সুন্দর। কিন্তু চোখে একটা ক্লান্তি। সে ঋতুর দিকে তাকাল। এক মুহূর্তের জন্য সময় থেমে গেল।
আর্যান এগিয়ে এল। “তুমি এসেছ।”
ঋতু মাথা নেড়েছিল। “এসেছি।”
তারা কথা বলল। আস্তে আস্তে। আর্যান বলেছিল সে কেমন করে প্রতিদিন ঋতুকে মনে করেছে। কেমন করে সেই ভুলের জন্য নিজেকে শাস্তি দিয়েছে। কেমন করে সে বুঝেছে যে ঋতু ছাড়া তার জীবন অর্থহীন।
ঋতু শুনছিল। তার চোখে জল।
“আমি তোমাকে আবার চাই,” আর্যান বলেছিল। “যদি তুমি দাও।”
ঋতু উঠে দাঁড়াল। আর্যানও উঠল। তারা বাইরে বেরোল। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে হেঁটে চলল। আর্যান ঋতুর হাত ধরল। ঋতু তার হাত চেপে ধরল।
তারা আর্যানের নতুন ফ্ল্যাটে গেল। জানালা খোলা। বৃষ্টির গন্ধ ভিতরে ঢুকছে। আর্যান ঋতুকে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড় করাল। তার হাত ঋতুর গালে।
“আমি তোমাকে হারাতে চাই না আর,” সে ফিসফিস করে বলল।
ঋতু তার ঠোঁটে চুমু খেল। প্রথমে আস্তে। তারপর ক্ষুধার্ত হয়ে। আর্যান তাকে তুলে নিয়ে বিছানায় শোয়াল। তার হাত ঋতুর জামা খুলল। ঋতুর শরীর কেঁপে উঠল তার স্পর্শে। আর্যানের ঠোঁট তার গলায়, বুকে, পেটে নেমে গেল। ঋতু তার চুল আঁকড়ে ধরল। আর্যান তার উরু দুটো আলাদা করল। তার জিভ ঋতুর সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গায় লাগল। ঋতু আর্তনাদ করে উঠল। তার শরীর টানটান হয়ে উঠল। আর্যান তাকে চুমু খেল সেখানে যতক্ষণ না ঋতু কেঁপে কেঁপে শেষ হয়ে গেল।
তারপর আর্যান উঠে এল। তার চোখে প্রেম আর ক্ষুধা। সে ঋতুর ভিতরে ঢুকল এক টানে। ঋতু তার পিঠে নখ বসিয়ে দিল। তারা একসাথে নড়তে লাগল। ধীরে ধীরে, তারপর দ্রুত। আর্যান ঋতুর কানে ফিসফিস করে বলল, “আমি তোমাকে ভালোবাসি। শুধু তোমাকে। চিরকাল।”
ঋতু তার গলা জড়িয়ে ধরল। “আমিও। আমিও তোমাকে।”
তারা একসাথে শেষ হল। তাদের শ্বাস মিশে গেল। আর্যান ঋতুর বুকে মাথা রাখল। ঋতু তার চুল আঁচড়াতে লাগল।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল। ভিতরে দুজন মানুষ একে অপরকে জড়িয়ে ধরেছিল। যেন আর কখনো ছাড়বে না।
সেই রাত থেকে তারা আবার শুরু করল। আস্তে আস্তে। বিশ্বাস গড়ে তুলল। আর্যান প্রতিদিন ঋতুকে প্রমাণ দিল যে সে পরিবর্তিত হয়েছে। ঋতু তাকে ক্ষমা করল। কারণ প্রেম মানে শুধু সুন্দর মুহূর্ত নয়। প্রেম মানে ভাঙা টুকরোগুলো জোড়া লাগানো।
একদিন আর্যান হাঁটু গেড়ে বসল। হাতে একটা রিং।
“তুমি কি আমার সাথে সারাজীবন কাটাবে?”
ঋতু কেঁদে ফেলল। আর হ্যাঁ বলল।
তাদের বিয়ে হল ছোট্ট একটা অনুষ্ঠানে। গঙ্গার ধারে। বৃষ্টি পড়ছিল সেদিনও। আর্যান ঋতুর হাত ধরে বলেছিল, “এবার আর কেউ আমাদের আলাদা করতে পারবে না।”
রাতগুলো তাদের হয়ে উঠল আরও গভীর। আর্যান ঋতুর শরীরকে ভালোবাসত এমনভাবে যেন প্রতিবারই প্রথমবার। তার হাত ঋতুর কোমরে, তার ঠোঁট ঋতুর ত্বকে। তারা একে অপরকে চিনত অন্ধকারেও। ঋতু আর্যানের ভিতরে হারিয়ে যেত। আর্যান ঋতুর নাম ডাকত যেন প্রার্থনা।
বছর চলে গেল। তাদের একটা মেয়ে হল। নাম রাখল আকাশ। কারণ তাদের প্রেম আকাশের মতোই বিশাল।
এক সন্ধ্যায় তারা বারান্দায় বসেছিল। আকাশ ঘুমাচ্ছিল ভিতরে। আর্যান ঋতুর মাথা তার কাঁধে রেখেছিল।
“তুমি কি কখনো অনুশোচনা করো?” ঋতু জিজ্ঞেস করল।
আর্যান তার কপালে চুমু খেল। “না। কারণ তুমি আছ। আর তুমি থাকলে সবকিছু ঠিক।”
ঋতু হাসল। তার চোখে জল। কিন্তু এবার সেটা সুখের।
বৃষ্টি আবার পড়তে শুরু করল। দূরে গঙ্গা বয়ে চলছিল। আর দুজন মানুষ একে অপরকে জড়িয়ে ধরেছিল। যেন সময় থেমে গেছে।
তাদের প্রেম ছিল গভীর। উত্তপ্ত। আর অমলিন। কারণ তারা জানত— প্রেম মানে শুধু শরীর নয়। প্রেম মানে আত্মাকে চেনা। আর একে অপরের ভাঙা টুকরোগুলোকে জোড়া লাগিয়ে নতুন কিছু তৈরি করা।
ঋতু আর্যানের হাত চেপে ধরল। আর্যান তার হাত ফিরিয়ে চেপে ধরল।
বাইরে বৃষ্টি। ভিতরে প্রেম। আর তাদের গল্প চলতে থাকল— অনন্তকাল।
....