ঝড়ের রাতে কুঁড়েঘর

ঈদের ছুটিতে বেশ কয়েক বছর পর গ্রামের বাড়িতে এসেছে অদ্রিশ। ইট-কাঠের শহরের ব্যস্ততা আর যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল ছেড়ে গ্রামের সবুজ আর শান্ত পরিবেশ তার কাছে এক অন্যরকম স্বস্তি এনে দেয়। ঢাকা থেকে বাসে চড়ে যখন সে তাদের পুরনো গ্রামের ভিটায় পৌঁছাল, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার মুখে। উঠানে পা দিতেই নানী ও ফুপুর সমাদর আর দূর-দূরান্তের আত্মীয়দের হাঁকডাকে পুরো বাড়ি যেন প্রাণ ফিরে পেল।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

তবে এসবের মাঝে অদ্রিশের চোখ খুঁজছিল একজনকে—নীরাকে। নীরা তার ফুফাতো বোন। ছোটবেলায় একসাথে ধুলোবালি মেখে খেলাধুলা করার স্মৃতিগুলো এখনো অদ্রিশের মনে বেশ স্পষ্ট। তবে মাঝখানে পড়াশোনা আর সময়ের ব্যবধানে দু'জনের দেখা হওয়া কমে গিয়েছিল।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

ঘর থেকে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি হাতে বের হয়ে এলো নীরা। সাধারণ এক রঙের সুতির সালোয়ার-কামিজ, খোলা চুল আর শান্ত দুটি চোখ। অদ্রিশের তাকে দেখে মনে হলো, ছোটবেলার সেই চঞ্চল মেয়েটি যেন অনেকটাই বদলে গেছে। বয়সের সাথে সাথে তার চেহারায় এক ধরনের স্নিগ্ধতা ও গাম্ভীর্য এসেছে।

 

"কখন এলে, অদ্রিশ ভাই?" নীরা গ্লাসটি বাড়িয়ে দিয়ে মৃদু হেসে বলল।

 

"এই তো কিছুক্ষণ হলো," পানি পান করতে করতে অদ্রিশ উত্তর দিল। "তোমাকে তো দেখেই চেনা দায়! একদম বদলে গেছ।"

 

নীরা হালকা হেসে নিচে চোখ নামাল। ঈদের ঠিক আগের এই সময়টাতে গ্রামের বাড়িতে এক অদ্ভুত উৎসবের মেজাজ থাকে। চারদিকে আম-কাঁঠালের সুবাস, মেঠো পথ আর দিঘির ঠান্ডা বাতাস। পরের দিনগুলোতে পরিবারের সবাই একসাথে ঈদের কেনাকাটা, রান্নাবান্নার তদারকি আর পুরনো গল্পে মেতে রইল।

 

অদ্রিশ খেয়াল করল, নীরা এখন আর আগের মতো মুক্তভাবে কথা বলে না। একটা সুন্দর দূরত্ব ও লজ্জা তাদের মাঝে চলে এসেছে। তবে অদ্রিশের উপস্থিতিতে নীরার চোখের চাহনি ও নীরব উপস্থিতি এক অন্যরকম রোমাঞ্চ তৈরি করত। দুজনের চোখ যখনই এক হতো, এক অদ্ভুত নীরবতা তাদের চারপাশ ঘিরে ধরত।

 

ঈদের আগের দিন বিকেলের দিকে বাড়ির সবাই যখন ব্যস্ত, অদ্রিশ স্থির করল সে গ্রামের দক্ষিণ পাশের মেঠো পথ ধরে একটু হাঁটতে বের হবে। গ্রামের ওই দিকটায় বড় বড় গাছপালা আর ঝোপঝাড় বেশি। হাঁটতে হাঁটতে সে বাড়ির সীমানা পেরিয়ে কিছুটা দূরে চলে আসে। পেছন থেকে হালকা পায়ের শব্দ শুনে অদ্রিশ থামল। ঘুরে তাকিয়ে দেখে নীরা দাঁড়িয়ে আছে, হাতে তার হালকা পাতলা একটা ওড়না জড়ানো।

 

"তুমিও হাঁটতে বের হলে নাকি?" অদ্রিশ জিজ্ঞেস করল।

 

"হাঁ, বাড়িতে বেশ গরম লাগছিল। তাছাড়া এদিককার হাওয়া বেশ ঠান্ডা," নীরা একটু ইতস্তত করে বলল।

 

দুইজন পাশাপাশি হাঁটা শুরু করল। গ্রামের এই অংশটি বেশ নির্জন। রাস্তার দুপাশে ঘন গাছপালা, কলাবাগান আর বাঁশঝাড়। বেশ খানিকটা দূরে গ্রামের শেষ সীমানার জঙ্গলটা দেখা যাচ্ছে। কথাবার্তার মাঝে সূর্য কখন যে পশ্চিম আকাশে ডুবে অন্ধকার নেমে আসতে শুরু করেছে, তা দুজনের কেউই টের পায়নি।

 

সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে দখিনা বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠতে শুরু করল। দূরে কোথাও মেঘের ডাক শোনা গেল। গ্রামে সন্ধ্যার পর অন্ধকার খুব দ্রুত নেমে আসে। গাছপালার কারণে চারপাশটা আরও বেশি থমথমে মনে হতে লাগল।

 

নীরা একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলল, "অদ্রিশ ভাই, চারপাশটা তো বেশ অন্ধকার হয়ে গেছে। এখন মনে হয় আমাদের ফিরে যাওয়া উচিত।"

 

অদ্রিশ চারদিকে তাকিয়ে দেখল, সত্যিই পথ চেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। আকাশে কালো মেঘ জমেছে, যা নির্দেশ করছে কিছুক্ষণ পরেই বৃষ্টি নামবে। নির্জন এই মেঠো পথে অন্ধকার আর আসন্ন ঝড়ের পরিবেশ তাদের দুজনকে হঠাৎ এক অদ্ভুত ও রোমাঞ্চকর পরিস্থিতির সামনে দাঁড় করিয়ে দিল।

অন্ধকার যেন আরও গাঢ় হয়ে চেপে বসছিল চারপাশে। গাছের পাতাগুলো বাতাসের তোড়ে গর্জন করে উঠছে, আর দূর আকাশে ঘন ঘন বিজলি চমকে রাতের অন্ধকারকে ক্ষণেকের জন্য চিরে দিয়ে যাচ্ছে। মেঠো পথ ধরে গ্রামের দিকে ফেরার চেষ্টা করতেই নীরা ভয়ে অদ্রিশের হাত চেপে ধরল। তার হাতের আঙুলগুলো ঠান্ডায় সামান্য কাঁপছিল।

 

"অদ্রিশ ভাই, পথ তো ভালো দেখা যাচ্ছে না। বাতাসে বাঁশঝাড়গুলো যেভাবে নুয়ে পড়ছে, আমার খুব ভয় করছে," নীরার কণ্ঠে স্পষ্ট আতঙ্ক।

 

অদ্রিশ তার হাতটা শক্ত করে ধরে এক পা এগিয়ে বলল, "ভয় পেও না নীরা, আমি তো সাথে আছি। চল, তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে হাঁটতে হবে।"

 

কিন্তু প্রকৃতি যেন আজ কোনো তাড়া মানতে রাজি ছিল না। হঠাৎ এক তীব্র ফোঁটায় শুরু হলো বৃষ্টি। দেখতে দেখতে তা রূপ নিল তোড়জোড় বর্ষণে। ঠাণ্ডা বাতাসের সাথে ফোটা ফোটা বৃষ্টি তাদের শরীর ভিজিয়ে দিতে লাগল। ভিজে যাওয়া সালোয়ার-কামিজ নীরার গায়ে জড়িয়ে যেতেই সে লজ্জায় ও ঠান্ডায় কুঁকড়ে গেল। ভিজা চুল থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে তার গালে ও ঘাড়ে।

 

আশেপাশে মাথা গোঁজার মতো কোনো বড় গাছ বা ছাদ দেখা যাচ্ছিল না। চারপাশটা যেন হুট করেই অচেনা ও নির্জন এক গভীর জঙ্গলের মতো রূপ নিয়েছে।

 

"এভাবে ভিজলে অসুখ করবে, নীরা। ওই যে দূরে একটা ঘরের মতো আলো ছায়ার আভাস পাওয়া যাচ্ছে, চল ওখানে গিয়ে দাঁড়ায়," অদ্রিশ অন্ধকারের ভেতর অস্পষ্ট এক কাঠ-বাঁশের কুঁড়েঘর নির্দেশ করে বলল।

 

নীরা আর দ্বিধা না করে অদ্রিশের হাত ধরে দৌড় দিল। ঝড়ের তাণ্ডব আর বৃষ্টির তোড় এড়িয়ে তারা যখন কুঁড়েঘরের বাঁশের কাঁচা দরজায় ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকল, ততক্ষণে দুজনই একদম জলকাদা মেখে একাকার।

 

কাঁচা ভিটের কুঁড়েঘরটি বেশ পুরনো, হয়তো গ্রামের কোনো রাখাল বা কৃষক দিনের বেলা একটু জিরোনোর জন্য বানিয়েছিল। ভেতরে মেঝের এক কোণে কিছু শুকনো নাড়া ও খড় রাখা ছিল। বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি নামছে, আর চালের টিনে পানির শব্দ এক অদ্ভুত নীরব ও মাখামাখি আবহ তৈরি করছিল।

 

অদ্রিশ পকেট থেকে ফোন বের করে আলো জ্বালানোর চেষ্টা করল, কিন্তু ব্যাটারি শেষ হয়ে ফোনটা নিমেষেই বন্ধ হয়ে গেল। ঘন অন্ধকারের ভেতর কেবল বিজলির আলো জানালার ফাঁক দিয়ে এসে মাঝেমধ্যে তাদের মুখ ফুটিয়ে তুলছিল।

 

ঠান্ডায় কাপুনি উঠে গিয়েছিল নীরার। সে ভেজা কাপড়ে কুঁড়েঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল। অদ্রিশ তার এত কাছাকাছি কখনো আসেনি। অন্ধকার আর নীরবতার মধ্যে নীরার ঘন ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ অদ্রিশের কানে স্পষ্ট বাজছিল।

 

"তুমি খুব বেশি কাঁপছ, নীরা," অদ্রিশ নিচু গলায় বলল।

 

"খুব... খুব ঠান্ডা লাগছে, অদ্রিশ ভাই," দাঁতে দাঁত লেগে আসা কণ্ঠে নীরা বলল।

 

অদ্রিশ ধীর পায়ে তার একদম কাছে এসে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে নীরার ভেজা কাঁধে হাত রাখতেই নীরা হালকা শিউরে উঠল, কিন্তু সরে গেল না। অন্ধকারের ভেতরেও অদ্রিশ দেখতে পাচ্ছিল নীরার ভেজা চোখের চাহনি—যেখানে ভয়ের চেয়েও বেশি ছিল গভীর এক টানের ব্যাকুলতা।

 

"ইচ্ছাপূর্বক এখানে আসি নাই আমরা, নীরা। কিন্তু এই মুহূর্তটা..." অদ্রিশের কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে এলো।

 

নীরা মুখ তুলে তাকাল। অদ্রিশের হাতের উষ্ণতা ধীরে ধীরে তার ভিজে যাওয়া কাঁধ থেকে ঘাড়ে ছড়িয়ে পড়ছিল। রক্তের ভেতর এক অজানা উত্তাপ বয়ে যেতে লাগল দুজনেরই।

 

অদ্রিশ নীরাকে নিজের বুকের সাথে টেনে নিল। ভেজা কাপড়ের অন্তরালে থাকা উষ্ণতা একে অপরের সাথে মিশে গেল। নীরা আর চোখ তুলে তাকাতে পারল না, সে তার মাথাটা অদ্রিশের শক্ত চওড়া বুকে লুকিয়ে ফেলল। বাইরে বৃষ্টি ও ঝড়ের গর্জন যত বাড়ছিল, ঘরের ভেতরের শীতলতা ভেদ করে তাদের দুজনের আকুলতা ও উত্তাপ ততটাই নিবিড় হয়ে উঠছিল।

 

অদ্রিশের হাতের স্পর্শে নীরা সব ভয় আর লজ্জা ভুলে যেতে লাগল। নিঃশ্বাসের তপ্ত বাতাস, ভিজে যাওয়া ত্বকের ঘ্রাণ আর বৃষ্টির একটানা ছন্দ—সবকিছু মিলেমিশে কুঁড়েঘরের অন্ধকারকে ভরিয়ে তুলল এক গভীর ও উদ্দাম ভালোবাসার আবেশে।

 

সেই বৃষ্টিভেজা রাতে, দুনিয়ার সব দূরত্ব ও সামাজিক লোকলজ্জা মুছে গিয়ে তারা দুজন এক হয়ে গেল এক পরম উষ্ণতায়।

ঝড় আর বৃষ্টি থামতে থামতে রাতের শেষ প্রহর গড়িয়ে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করল। বাঁশঝাড় আর গাছের পাতা বেয়ে টুপটুপ করে তখনও বৃষ্টির পানি ঝরছিল। কুঁড়েঘরের মেঝের শুকনো খড়ের ওপর শুয়ে থাকা নীরা ধীরে ধীরে চোখ মেলল। ভোরের মৃদু আলো জানালার ফাঁক দিয়ে এসে তার শান্ত মুখে পড়েছিল।

 

পাশে তাকিয়ে দেখে অদ্রিশ ঘুমিয়ে আছে। কাল রাতের প্রতিটি মুহূর্ত নীরার মনে ভেসে উঠতেই তার cheeks লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। রাতের উত্তাপ ও ব্যাকুলতার পর ভোরের এই নিস্তব্ধতায় এক অদ্ভুত শান্ত অনুভব তৈরি হলো তার মনে। সে আলতো করে অদ্রিশের হাত থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে বসার চেষ্টা করল।

 

অদ্রিশেরও ঘুম ভেঙে গেল। সে নীরাকে জড়িয়ে ধরে নিচু স্বরে বলল, "নীরা... কাল রাতের পর থেকে তুমি আর শুধু আমার ফুফাতো বোন নও। তুমি আমার জীবন।"

 

নীরা মাথা নিচু করে রইল, তবে তার মুখে ফুটে উঠল এক মিষ্টি তৃপ্তির হাসি। অদ্রিশ তার কপালে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াতেই নীরার সব লজ্জা ও সংশয় দূর হয়ে গেল।

 

দুজনে ধীরপায়ে কুঁড়েঘর থেকে বের হয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো। ভোরের তাজা বাতাসে ভিজে যাওয়া মাটির সুবাস ছড়ানো ছিল। বাড়িতে পৌঁছাতেই পরিবারের সবাই উদ্বিগ্ন মুখে ছুটে এলো। সারা রাত দুজনকে খুঁজে না পেয়ে বাড়িতে তোলপাড় পড়ে গিয়েছিল।

 

অদ্রিশের বাবা কঠোর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, "সারা রাত কোথায় ছিলি তোরা? তোদের জন্য সবাই কত চিন্তায় ছিল!"

 

অদ্রিশ আর কোনো লুকোচুরি না করে সোজা সবার সামনে দাঁড়াল। নীরার হাত নিজের হাতের মধ্যে শক্ত করে চেপে ধরে দৃঢ় কণ্ঠে বলল, "আব্বু, কাল ঝড়ের রাতে আমরা জঙ্গলের এক আশ্রয়ে আটকে গিয়েছিলাম। আর আমি নীরাকে ভালোবাসি। ওকে ছাড়া আমি অন্য কাউকে নিজের স্ত্রী হিসেবে কল্পনাও করতে পারি না। আমরা দুজনে বিয়ে করতে চাই।"

 

অদ্রিশের হঠাৎ এই ঘোষণায় উঠানে উপস্থিত নানাজান, ফুপু এবং পরিবারের সবাই কিছুটা থমকে গেলেন। কিন্তু তাদের দুজনের চোখের দিকে তাকিয়ে এবং পরিবারের ভেতরের গভীর সম্পর্কের কথা বিবেচনা করে কেউ বেশিদিন বিরোধিতা করতে পারলেন না। নানাজান এগিয়ে এসে অদ্রিশের মাথায় হাত রেখে বললেন, "ঈদের এই খুশির দিনে তোদের এই বন্ধন আরও আনন্দ নিয়ে এলো। আমরা সবাই এতে রাজি।"

 

ঈদের পরদিনই দুই পরিবারের উপস্থিতিতে অত্যন্ত সুন্দর ও আনন্দঘন পরিবেশে অদ্রিশ ও নীরার আকদ সম্পন্ন হলো। কাজী সাহেবের সামনে অদ্রিশ যখন 'কবুল' বলল, নীরার চোখের কোণে জমা হয়েছিল আনন্দের জল।

 

বিকেলের সোনাঝরা রোদে যখন তারা দুজন একান্তে নতুন জীবন শুরুর গল্প করছিল, নীরা মুচকি হেসে বলল, "ঝড়ের রাতের সেই বৃষ্টি না এলে হয়তো আমাদের মনের কথা কখনোই এভাবে বলা হতো না।"

 

অদ্রিশ নীরার হাতটি নিজের হাতে তুলে নিয়ে বলল, "ঝড় আমাদের সাময়িক পথ ভুলিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু দিনশেষে আমাদের আসল ঠিকানায় পৌঁছে দিয়েছে।"

....
👁 65