তিন বছরের নীরব আগুন

আরহাম আর মায়া—এই দুটি নাম যেন দুটো জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির প্রতিচ্ছবি। ভালোবাসার গভীরতা তাদের যতটা ছিল, তার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি ছিল তাদের জেদ। কেউ কখনো নিজের ভুল স্বীকার করত না। সামান্য একটা খিটখিট বা ভুল বোঝাবুঝি হলে দুজন এমন সব কথা একে অপরকে বলে বসত, যা তিরের মতো গিয়ে বিঁধত বুকে। বুক চিরে রক্তক্ষরণ হলেও মুখ ফুটে কেউ বলত না, "আমি কষ্ট পেয়েছি।" বরং কীভাবে অন্যজনকে আরও বেশি কষ্ট দেওয়া যায়, সেই প্রতিযোগিতায় মেতে উঠত দুজন। কিছুদিন সম্পর্কের তীব্র নীরবতা চলত, তারপর আবার যখন সইতে পারত না, তখন একে অপরের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে শান্ত হতো। ভালোবাসা কোনোদিন কমেনি, কিন্তু সেই ভালোবাসাকে আঁকড়ে ধরে রাখার জন্য যে নম্রতার প্রয়োজন ছিল, তা তাদের কারোরই ছিল না।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

এমনি এক বর্ষণমুখর রাতে ছোট একটা ঘটনা থেকে শুরু হয়েছিল বিশাল এক ঝড়। আরহামের অফিসে দেরি হওয়া এবং মায়ার একটি কল মিস করাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় তর্কাতর্কি। বাকবিতণ্ডা একপর্যায়ে এত উগ্র রূপ নেয় যে, আরহাম রাগের মাথায় মায়াকে এমন কিছু তীব্র অপমানের কথা বলে বসে, যা মায়ার আত্মসম্মানে বড় আঘাত করে। মায়াও ছেড়ে কথা বলেনি; আরহামের দুর্বলতম জায়গায় আঘাত করে কথা ফিরিয়ে দেয়। ফলাফল? তীব্র ক্ষোভ আর অপমানে আরহাম ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। মায়াও নিজের অহংকার আঁকড়ে ধরে পরদিনই সমস্ত যোগাযোগ ছিন্ন করে ঢাকা ছেড়ে নিজের গ্রামের বাড়ি সিলেটে চলে যায়। মাঝখান থেকে থমকে যায় চার বছরের এক প্রবল অনুরাগের গল্প। বিচ্ছেদ ঘটার পর দুজনেই ভেবেছিল, জেদটাই বড়। কিন্তু দিনের পর দিন যখন কাটতে লাগল, তখন তারা বুঝতে পারল—যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কোনো অহংকার দিয়ে পূরণ হওয়ার নয়।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

দীর্ঘ তিন বছর পর। কাজের খাতিরে আরহামকে আসতে হয়েছে সিলেটের এক পাহাড়ি চা-বাগানের রিসোর্টে। ঝুম বৃষ্টি নামার উপক্রম হয়েছে আকাশে। আরহাম রিসোর্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিল। ঠিক তখনই রিসোর্টের রিসেপশনে একটা অতি পরিচিত কণ্ঠ শুনে থমকে যায় সে। কণ্ঠটা শুনলেই তার বুকের ভেতর আজও তোলপাড় শুরু হয়। পিছন ফিরে তাকাতেই তার চোখের সামনে মায়ায় ঘেরা সেই মুখ—মায়ায়।

 

মায়াও ঠিক সেই মুহূর্তে ঘুরে তাকিয়েছিল। চারটে চোখ এক হতেই চারপাশের সবকিছু যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, বৃষ্টির টিপটিপ শব্দ—সব হারিয়ে গেল হৃদস্পন্দনের তীব্র শব্দে। তিন বছরে মায়ার রূপ যেন আরও ফেটে পড়ছে। হালকা নীল রঙের সুতির শাড়ি পরিহিত মায়াকে দেখে আরহামের চোখের ঘুম উড়ে যাওয়ার জোগাড়। শাড়ির আঁচল সরে গিয়ে উন্মুক্ত হয়ে আছে তার মেদহীন ফর্সা কোমর, আর ভেজা চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়িয়ে আছে অগোছালোভাবে। মায়াও আরহামকে দেখে চমকে উঠল। ব্ল্যাক ফিটেড শার্টে আরহামকে আগের চেয়েও অনেক বেশি পুরুষালী ও আকর্ষণীয় দেখাচ্ছে।

 

সে রাতে রিসোর্টে প্রবল ঝড়বৃষ্টি শুরু হলো। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর পুরো রিসোর্ট অন্ধকার হয়ে গেল। শুধু মোমের হালকা লালচে আলো জ্বলছিল লম্বা করিডোরে। আরহাম নিজের ঘর থেকে বের হতেই দেখে মায়াও ঘর থেকে বের হচ্ছে—আকাশের ঘন ঘন কড়কড় শব্দে সে কিছুটা ভীত।

 

"তুমি এখনো ভয় পাও?" আরহামের ভারী কণ্ঠ অন্ধকার ভেদ করে মায়ার কানে পৌঁছায়।

 

মায়া চোখ তুলে তাকায়। তার চোখ দুটোতে তখন শুধুই ক্ষোভ আর অদম্য আকর্ষণ। "তোমার মতো মানুষকে ভয় পাওয়ার চেয়ে মেঘের ডাক অনেক ভালো," মায়া মুখ ফিরিয়ে জবাব দেয়।

 

কথাটা শুনে আরহাম আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে মায়াকে ঘরের দেয়ালের সাথে শক্ত করে চেপে ধরল। মায়ার পিঠ গিয়ে ঠেকল ঠান্ডা দেয়ালে, আর সামনে আরহামের উষ্ণ শরীর। মায়ায় কেঁপে উঠল আরহামের এত কাছাকাছি আসায়।

 

"এত বছর পরও এত তেজ তোমার, মায়া?" আরহামের নিশ্বাস মায়ার ঠোঁটের ওপর এসে আছড়ে পড়ছে। মায়ার শাড়ির ফাঁক দিয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তার বুকের দ্রুত ওঠা-নামা।

 

"ছেড়ে দাও আমাকে, আরহাম! তোমার কোনো অধিকার নেই আমার ওপর!" মায়া মিথ্যা রাগ দেখিয়ে আরহামের বুকে হাত দিয়ে ঠেলার চেষ্টা করল, কিন্তু সেই স্পর্শে কোনো জোর ছিল না। বরং ছিল পাওয়ার এক তীব্র আকুলতা।

 

"অধিকার নেই?" আরহাম একহাতে মায়ায় দুটো হাত তার মাথার ওপর ধরে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল, আর অন্য হাতটা ধীরে ধীরে মায়ার উন্মুক্ত কোমরে রেখে শক্ত করে চেপে ধরল। আরহামের তপ্ত হাতের ছোঁয়া মায়ার ফর্সা ত্বকে লাগতেই মায়ার মুখ দিয়ে একটা মৃদু সিৎকার বেরিয়ে এলো।

 

"তিন বছর ধরে প্রতিটা রাত আমি তোমার এই জেদের আগুনে পুড়েছি, মায়া। আজও তুমি আমাকে কষ্ট দেওয়ার কথা বলছ?" আরহাম নিচু স্বরে বলল, তার কণ্ঠস্বরে ভালোবাসার সাথে ছিল এক আদিম তৃষ্ণা।

 

আরহাম নিজের মুখটা মায়ার কানের কাছে নিয়ে এলো। তার ঠোঁট মায়ার কানের লতিতে আলতো স্পর্শ করতেই মায়ার শরীর শিউরে উঠল। মায়া চোখ বুজে ফেলল, তার শক্ত বাঁধ ভেঙে যেতে লাগল এক মুহূর্তেই। আরহামের উষ্ণ নিশ্বাস মায়ার গলার খাঁজে, ঘাড়ে আছড়ে পড়তে লাগল। মায়ায় নিজেকে সামলাতে না পেরে আরহামের কাঁধ চেপে ধরল।

 

"আরহাম... প্লিজ..." মায়ার গলা দিয়ে জড়িয়ে আসা শব্দ বের হলো। এটা কি বাধা দেওয়ার আকুতি, নাকি আরও গভীরে হারিয়ে যাওয়ার নিমন্ত্রণ—তা বুঝতে আরহামের বাকি রইল না।

 

আরহাম আর অপেক্ষা করল না। তার ঠোঁট নেমে এলো মায়ার তপ্ত ঠোঁটের ওপর। তিন বছরের জমানো তৃষ্ণা, রাগ, ক্ষোভ আর ভালোবাসা এক মুহূর্তে মিশে গেল সেই গভীর চুম্বনে। আরহাম খুব নিষ্ঠুরভাবে, আবার একই সাথে গভীর আবেগে মায়ার ঠোঁট দুটো নিজের ঠোঁটের বন্ধনে পিষে ফেলতে লাগল। মায়াও আর নিজের জেদ ধরে রাখতে পারল না। সেও তার দুহাত আরহামের চুলে ডুবিয়ে দিয়ে দ্বিগুণ আবেগে সেই চুম্বনের জবাব দিতে শুরু করল।

 

দেয়ালের সাথে আঁকড়ে ধরে আরহাম মায়ার শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে ফেলে দিল। মোমের ক্ষীণ আলোয় মায়ার উন্মুক্ত সুডৌল বক্ষ আর পিঠের ত্বক চকচক করে উঠল। আরহাম তার তৃষ্ণার্ত ঠোঁট মায়ার ঠোঁট থেকে সরিয়ে মায়ার গলার ভাঁজে, কলারবোনে শক্ত করে বসিয়ে দিল। মায়া মাথা পিছন দিকে হেলিয়ে দিয়ে এক তীব্র আবেশে কুঁকড়ে উঠল। আরহামের হাত তখন মায়ার নগ্ন পিঠে ঘুরে বেড়াচ্ছে, শাড়ির সায়া ও ব্লাউজের বাঁধন যেন তাদের এই অনলবর্ষী কামনার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

"তুমি এখনো শুধু আমার, মায়া। শুধু আমার," আরহাম মায়ার গলায় কামড় বসিয়ে গর্জে উঠল নিচু স্বরে।

 

মায়া তীব্র কামনায় আরহামের শার্টের বোতামগুলো একে একে ছিঁড়ে ফেলল। আরহামের চওড়া, লোমশ বুকে নিজের হাত রেখে মায়া ফিসফিস করে বলল, "তোমার এই অহংকার আর জেদ আমি আজও ঘৃণা করি, আরহাম..."

 

"তবে কেন আমার বুকে এত শক্ত করে জড়িয়ে আছ?" আরহাম মায়াকে কোলে তুলে নিল। মায়া দুপা দিয়ে আরহামের কোমর পেঁচিয়ে ধরল। তাদের শরীর তখন আগুনে জ্বলছে।

 

আরহাম মায়াকে নিয়ে সোজা বিছানায় শুইয়ে দিল। ওপর থেকে মায়ার দিকে তাকিয়ে আরহামের চোখের দৃষ্টিতে ছিল এক হিংস্র ভালোবাসা। মায়ার বুকের কাপড় ততক্ষণে অনেকটাই সরে গেছে, সুডৌল স্তনের ঊর্ধ্বাংশ মোমের আলোয় স্পষ্ট। আরহাম মায়ার ওপর নেমে এলো, তার ভারী শরীর মায়ার নরম শরীরের ওপর চেপে বসল।

 

আরহামের ঠোঁট ধীরে ধীরে নেমে যেতে লাগল মায়ার পেটে, নাভিতে। মায়ায় কামনার অতল সাগরে তলিয়ে যেতে যেতে আরহামের চুল শক্ত করে চেপে ধরল। আরহামের প্রতিটা ছোঁয়া, প্রতিটা কামড় মায়াকে এক স্বর্গীয় যন্ত্রণায় নীল করে দিচ্ছিল। তিন বছর ধরে জমে থাকা সমস্ত কামাতুর বাসনা আজ রাতে যেন আগ্নেয়গিরির লাভা হয়ে ফেটে পড়ছে।

 

কিন্তু ঠিক যখন তাদের শরীরের এই লালসা ও ভালোবাসা চরম সীমায় পৌঁছাতে যাচ্ছিল, যখন তারা একে অপরের ওপর পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাওয়ার অপেক্ষায়—ঠিক তখনই মায়ার মনে পড়ে গেল তিন বছর আগের সেই অভিশপ্ত রাতের কথা। যে রাতে আরহাম তাকে নির্মমভাবে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল।

 

হঠাৎ করেই মায়ায় আরহামের বুকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে উঠল। "থামো, আরহাম! থামো!"

 

আরহাম চমকে উঠে থামল। তার চোখ লাল, নিশ্বাস ভীষণ দ্রুত। "কী হয়েছে, মায়া?"

 

মায়া বিছানায় উঠে বসে নিজের সরে যাওয়া শাড়ি সামলে নিল। তার চোখে জল, কিন্তু মুখাবয়বে আবার সেই পুরোনো জেদ আর দেয়াল তুলে নেওয়ার রূপ। "শরীর দিয়ে তুমি আমাকে জয় করতে পারো, আরহাম। কিন্তু আমরা কি বদলেছি? কাল সকালে সূর্য উঠলেই আবার তুমি তোমার অহংকার নিয়ে আমাকে কথা শোনাবে, আর আমিও তোমাকে আঘাত করব। এই লালসা আমাদের পুরোনো ভুলগুলোকে মুছে দিতে পারে না।"

 

আরহাম স্থির দৃষ্টিতে মায়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তার বুকে তখন কামনার আগুনের চেয়েও বেশি জ্বলছিল অনুশোচনা আর ভালোবাসার জ্বালা।

 

এখনও তাদের ভালোবাসার সামনে দাঁড়িয়ে সেই বিশাল প্রশ্ন—তারা কি পারবে নিজেদের বিষাক্ত আচরণ বদলে নতুন করে শুরু করতে, নাকি রাতের এই উত্তপ্ত শারীরিক মিলন শুধুই এক ক্ষণিকের বিচ্ছেদ-যন্ত্রণা উপশমের গল্প হয়ে থেকে যাবে?

মায়ার কথাগুলো অন্ধকার ঘরে চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল। আরহাম বিছানার ওপর বসে রইল স্তব্ধ হয়ে। তার চওড়া উন্মুক্ত বুকে তখনও মায়ার নখ আঁচড়ের দাগ স্পষ্ট, আর মায়ার ঠোঁটে আরহামের শক্ত কামড়ের লাল চিহ্ন। দুজনের নিশ্বাসই ঝড়ের মতো দ্রুত, কিন্তু তাদের মাঝে হঠাৎ করেই আবার দাঁড়িয়ে পড়েছে সেই পুরোনো, বিষাক্ত জেদের দেয়াল।

 

আরহাম ধীরপায়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। শার্টের বোতাম ছিঁড়ে যাওয়ায় সে শার্টটা এক টানে শরীর থেকে খুলে দূরে ছুঁড়ে ফেলল। মোমের আলোয় আরহামের সুঠাম, পেশীবহুল শরীরটা স্পষ্ট হয়ে উঠল। সে মায়ার দিকে এগিয়ে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বিছানায় বসল, তারপর মায়ার দুই গালে শক্ত করে হাত দিয়ে মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে আনল।

 

"শরীর?" আরহামের গলায় এক অদ্ভুত গভীর ও কাঁপা কণ্ঠস্বর। "তুমি এটাকে শুধু শরীর বলছ, মায়া? তিনটে বছর আমি অন্য কোনো নারীর দিকে তাকানোর কথা ভাবতেও পারিনি। প্রতিটা রাতে যখন আমি চোখ বুজেছি, আমার মনে হয়েছে তোমার এই গায়ের মিষ্টি গন্ধটা আমার নাকে আসছে। আর তুমি বলছ এটা শুধুই লালসা?"

 

মায়া মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু আরহামের হাতের বাঁধন থেকে বের হতে পারল না। মায়ার চোখেও জ্বলজ্বল করছিল জমানো ক্ষোভের জল। "তাহলে সেদিন কেন ওভাবে সব শেষ করে দিলে, আরহাম? কেন আমার চরিত্র নিয়ে কথা তুলতে তোমার এক মুহূর্তও দ্বিধা হয়নি? আমার জেদ যদি অপরাধ হয়, তবে তোমার ওই অন্ধ সন্দেহ আর অহংকার কী ছিল?"

 

তিন বছর আগের সেই কালরাতের স্মৃতি আবার ভেসে উঠল ঘরের আবহাওয়ায়। আরহামের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সাজানো এক চক্রান্তে মায়াকে জড়িয়ে এমন একটি ভুয়া পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল, যা দেখে আরহাম তার মেজাজ হারিয়ে ফেলেছিল। আরহাম বিশ্বাস করেছিল সেই সাজানো সত্যকে, আর মায়াকে না জানিয়েই আক্রমণাত্মক কথা বলে বসেছিল। মায়াও নিজের নির্দোষ প্রমাণ দেওয়ার বদলে অহংকার দেখিয়ে বলে দিয়েছিল—'যদি তুমি আমাকে বিশ্বাস না করো, তবে তোমার সাথে থাকার কোনো অধিকার আমার নেই।' কেউ দমে যায়নি। কেউ মাথা নত করেনি।

 

"আমি ভুল করেছিলাম, মায়া," আরহাম খুব নিচু স্বরে বলল, যা মায়ার জীবনের সবচেয়ে বড় চমক ছিল। অহংকারী আরহাম কোনোদিন কারো কাছে নিজের ভুল স্বীকার করেনি।

 

আরহাম মায়ার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে বলল, "আমি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম রাগে। কিন্তু তোমার ওই তীব্র নীরবতা আর জেদ আমাকে আরও বেশি জ্বালিয়ে ছাই করে দিয়েছিল। তুমি কেন একবারও বললে না যে তুমি নির্দোষ? কেন আমাকে ছেড়ে চলে গেলে?"

 

"কারণ আমি চেয়েছিলাম তুমি আমাকে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বিশ্বাস করো!" মায়া চিৎকার করে উঠল, কিন্তু তার কণ্ঠ জড়িয়ে এলো কান্নায়।

 

আরহাম আর সহ্য করতে পারল না। মায়ার কান্না আর এই কাতরতা তার ভেতরের সমস্ত সংযমের বাঁধ ভেঙে দিল। সে মায়ায় শুইয়ে দিল বিছানায়, এবার আর কোনো রাগে নয়, এক অদম্য তৃষ্ণা ও অনুশোচনার আগুনে। আরহামের ভারী শরীর আবার মায়ার নরম শরীরের ওপর চেপে বসল।

 

"তবে আজ রাতে কোনো জেদ থাকবে না, মায়া। আজ রাতে শুধুই তুমি আর আমি," আরহাম গর্জে উঠল।

 

আরহাম মায়ার পরনের নীল শাড়িটা এক টানে শরীর থেকে আলাদা করে দিল। মায়ার সুডৌল, ফর্সা শরীর এখন মোমের লালচে আলোয় সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। তার গায়ের প্রতিটা ভাঁজ যেন এক একটি কবিতার মতো। আরহামের চোখ দুটো কামনায় আর ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে উঠল। সে মায়ার পেটে, নাভিতে নিজের মুখ গুঁজে দিল। আরহামের উষ্ণ ঠোঁট আর জিবের কামাতুর ছোঁয়ায় মায়ার পুরো শরীর ধনুকের মতো বেঁকে উঠল।

 

"আহ্... আরহাম... না..." মায়া অস্ফুট স্বরে কেঁদে উঠল, কিন্তু তার দুহাত ততক্ষণে আরহামের চুল শক্ত করে চেপে ধরেছে।

 

আরহাম ধীরে ধীরে ওপরে উঠে এলো। তার তৃষ্ণার্ত ঠোঁট দখল করে নিল মায়ার সুডৌল বক্ষের বোটা। খুব নিষ্ঠুরভাবে, আবার একই সাথে গভীর মায়ায় সে কামড় বসাল সেখানে। মায়ায় এক তীব্র সুখে আর যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠল। তার শরীর জুড়ে তখন এক উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরির লাভা বইছে। তিন বছরের ক্ষোভ, অপমান আর ভালোবাসা এক হয়ে মিশে গিয়ে তাদের দুজনকে এক আদিম আকর্ষণে পাগল করে তুলছিল।

 

"বল, তুমি কার?" আরহাম মায়ার দুই উরু শক্ত করে চেপে ধরে গভীর আবেগে তার ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে ফিসফিস করে বলল।

 

"তোমার... শুধু তোমার, আরহাম..." মায়া এবার আর নিজের ভালোবাসাকে লুকাতে পারল না। তার অহংকারের বরফ গলে জল হয়ে ভেসে গেল। সে আরহামের ঘাড়ে, পিঠে নিজের নখ বসিয়ে দিয়ে তাকে আরও গভীরে টেনে নিল।

 

ঝড়বৃষ্টির শব্দ বাইরে যতই বাড়ছে, ঘরের ভেতরের উত্তাপ যেন তার চেয়েও হাজার গুণ বেশি রূপ নিচ্ছিল। আরহাম মায়ার শরীরের প্রতিটা কোণ, প্রতিটা ভাঁজ নিজের ঠোঁট আর হাত দিয়ে চিনে নিতে লাগল। তাদের দুটো শরীর এক হয়ে মিশে গেল এক অনলবর্ষী কামনার সাগরে। ঘরের আবহাওয়া ভরে উঠল তাদের দ্রুত নিশ্বাস, চাদরের খসখস শব্দ আর সুখে ভরা মৃদু আর্তনাদে। তিন বছরের যে দূরত্ব তাদের আলাদা করে রেখেছিল, এই কালরাতের উত্তপ্ত শারীরিক মিলন যেন সেই দূরত্বের প্রতিটা ক্ষতকে পুড়িয়ে ছাই করে পাওনা আদায় করে নিচ্ছিল।

 

একপর্যায়ে ক্লান্ত, ঘর্মাক্ত হয়ে আরহাম মায়ার বুকের ওপর নিজের মাথা রেখে শুয়ে পড়ল। মায়াও তার বুকের চাদর হারিয়ে যাওয়া শরীরে আরহামকে জড়িয়ে ধরে তার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। ঘরের ভেতর এখন নীরবতা, শুধু দুজনের ঘন ঘন নিশ্বাসের শব্দ।

 

বিছানার চাদর পেঁচিয়ে মায়া সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তাদের শরীর এক হয়েছে, আত্মা আবার আগের মতো তোলপাড় করেছে, কিন্তু কাল সকালে সূর্য উঠলে কী হবে?

 

মায়া অনুভব করল, আরহাম তার বুকের ওপর মাথা রেখে শান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে, যেমনটা সে তিন বছর আগে ঘুমাত। কিন্তু জীবনের কঠিন বাস্তবতা কি শুধু এক রাতের লালসা আর গভীর চুম্বনে বদলে যেতে পারে?

 

আরহাম হঠাৎ মায়ার পেটে হাত রেখে মুখ তুলে তাকাল। তার চোখে তখন কোনো হিংস্রতা নেই, আছে এক গভীর অনিশ্চয়তা। "কাল সকালে যখন এই মেঘ কেটে যাবে, মায়া... তুমি কি আবার আমাকে ছেড়ে চলে যাবে? তোমার ওই জেদ কি আবার আমাদের মাঝখানে আসবে?"

 

মায়া উত্তর দিল না। তার চোখে জ্বলজ্বল করছিল এক অজানা সংশয়। কারণ তারা দুজনেই জানে, শরীর এক হওয়া সহজ, কিন্তু মনের বিষাক্ত আচরণ আর অহংকারকে চিরতরে বদলে ফেলা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ।

রিসোর্টের জানালার পর্দা টপকে সকালের কাঁচা রোদ এসে পড়ল বিছানায়। রাতের সেই উত্তাল ঝড়বৃষ্টি থেমে গিয়ে চারপাশ এখন একদম শান্ত, রোদে ঝলমলে। কিন্তু বিছানার ভেতরের আবহাওয়া তখনও বেশ থমথমে।

 

মায়া চোখ খুলে দেখল, আরহাম তার পাশে নেই। চাদরটা শরীরে জড়িয়ে সে বিছানায় উঠে বসল। মায়ার পুরো শরীর জুড়ে তখনও কালরাতের অনলবর্ষী কামনার দাগ—গলায়, বুকে আর কোমরে আরহামের শক্ত আঙুল ও ঠোঁটের লালচে চিহ্ন। ঘরের মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তাদের জামাকাপড়।

 

মায়ায় দ্রুত উঠে নিজের কাপড় গুছিয়ে বাথরুমে গিয়ে নিজেকে সামলে নিল। আয়নায় নিজের চেহারার দিকে তাকিয়ে মায়ার বুকের ভেতর অচেনা এক ভয় কেঁপে উঠল। কাল রাতে যা কিছু হয়েছে, তা কি শুধুই ক্ষণিকের মোহে শারীরিক আত্মসমর্পণ? নাকি সত্যিই তারা তাদের পুরোনো ভুলগুলোকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে পারবে?

 

বাথরুম থেকে বের হতেই মায়া দেখল আরহাম ঘরে ফিরেছে। গায়ে একটা সাদা ক্যাজুয়াল টি-শার্ট আর ট্রাউজার। ভেজা চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে সে মায়ার দিকে তাকাল। কাল রাতের সেই হিংস্রতা আর কামনার পর আজ আরহামের চোখের দৃষ্টিতে এক ধরনের অচেনা গাম্ভীর্য ও দ্বিধা।

 

"আমি রিসেপশনে কথা বলে এসেছি," আরহাম শান্ত গলায় বলল, তবে তার কণ্ঠস্বরে দূরত্ব স্পষ্ট। "তোমার যদি কোনো অসুবিধা না হয়, দুপুরের গাড়িতে তোমাকে ঢাকায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি।"

 

কথাটা শোনামাত্রই মায়ার ভেতরে সেই পুরোনো জেদের আগুন আবার দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। কাল রাতে যে মানুষটা তাকে বুকে চেপে ধরে নিজের অধিকার দাবি করছিল, যে মানুষটা তার শরীরের প্রতিটা খাঁজে নিজের ভালোবাসার কামড় বসিয়েছিল—সে আজ সকালে এত স্বাভাবিক আর হিসেবি হয়ে কথা বলছে?

 

"তোমার এত দরদ না দেখালেও চলবে, আরহাম," মায়ায় নিজের ব্যাগ গুছাতে গুছাতে কঠিন স্বরে বলল। "আমি কীভাবে ঢাকায় ফিরব, সেটা আমার ব্যাপার। তোমার সাথে এক রাতে শুয়েছি বলেই ভেবে নিও না যে আমার ওপর আবার তোমার হুকুম চলবে।"

 

কথাটা তিরের মতো গিয়ে বিঁধল আরহামের বুকে। আরহামের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। রগ ফুলে উঠল কপালে। সে এক ঝটকায় মায়ার সামনে এসে দাঁড়াল।

 

"তুমি নিজেকে কী ভাবো, মায়া?" আরহামের কণ্ঠ গমগম করে উঠল। "কাল রাতের পর আজও তুমি এই একই কটু কথা বলতে পারছ? আমি তোমার সুবিধার কথা ভেবে গাড়ি ঠিক করেছি, আর তুমি সেটাকেও অপমান হিসেবে নিচ্ছ? তোমার এই বিষাক্ত মুখ আর অহংকার কোনোদিন বদলাবে না!"

 

"আর তোমার ওই সন্দেহপ্রবণ মন আর পুরুষালী অহংকার?" মায়ায় আরহামের চোখে চোখ রেখে চিৎকার করে উঠল। "তুমি কাল রাতে ভুল স্বীকারের নাটক করেছিলে! এখন যেই সকাল হয়েছে, তুমি আবার সেই পুরোনো আরহাম হয়ে গেছ! কাল রাতে তুমি শুধু আমার শরীর চেয়েছিলে, ভালোবাসা নয়!"

 

"চুপ করো, মায়া! একদম চুপ!" আরহাম মায়ার দুহাত চেপে ধরে দেয়ালে সাঁটিয়ে দিল। তাদের নিশ্বাস আবার আগের মতো দ্রুত হতে লাগল।

 

মায়ার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে লাগল। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। আরহামের বুকে নিজের মাথা গুঁজে দিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। "কেন আমরা এমন, আরহাম? কেন আমরা একে অপরকে ভালোবেসেও এত কষ্ট দিই? কেন আমরা একটুও বদলাতে পারি না?"

 

মায়ার এই অঝোর কান্না আর ভেঙে পড়া দেখে আরহামের ভেতরের সমস্ত রাগ আর অহংকার এক মুহূর্তে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। সে বুঝতে পারল, এই জেদের লড়াই তাদের দুজনকে শেষ করে দিচ্ছে।

 

আরহাম মায়াকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরল। তার দুহাত দিয়ে মায়ার পিঠ চেপে ধরে সে মায়ার চুলে নিজের মুখ লুকাল।

 

"মায়া... ভুল আমারই ছিল," আরহাম একদম ভাঙা গলায় বলল, যা মায়ায় এর আগে কখনো শোনেনি। আরহামের চোখ থেকেও দু-ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল মায়ার ঘাড়ে। "আমি অহংকারী, আমি রাগের মাথায় মাথা ঠিক রাখতে পারি না। তিন বছর আগে তোমাকে না বিশ্বাস করে আমি জীবন ধ্বংস করেছি। আজও সকালেও আমি ভয় পাচ্ছিলাম—ভয় পাচ্ছিলাম পাছে তুমি আমাকে আবার প্রত্যাখ্যান করো। সেই ভয়টা লুকাতেই আমি দূরত্ব বজায় রাখার অভিনয় করছিলাম।"

 

মায়া মাথা তুলে আরহামের মুখের দিকে তাকাল। শক্তিশালী, অহংকারী আরহাম আজ তার সামনে একদম নিঃস্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, নিজের ভুল স্বীকার করছে কোনো অজুহাত ছাড়া।

 

মায়ায় আরহামের গাল দুটো দুহাতে জড়িয়ে ধরে বলল, "আমিও কম অপরাধী নই, আরহাম। আমারও প্রবল জেদ ছিল। আমি কেন তোমাকে একটু সময় দিলাম না? কেন সত্যটা না বুঝিয়ে রাগ করে চলে গেলাম? আমরা দুজনই আমাদের সম্পর্কের শত্রু ছিলাম।"

 

আরহাম মায়ার ঠোঁটে আলতো করে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। এবার সেই চুম্বনে কোনো হিংস্রতা ছিল না, ছিল না কোনো কামনার তাণ্ডব। ছিল শুধুই গভীর ক্ষমা, আত্মসমর্পণ আর নতুন করে শুরু করার এক পবিত্র অঙ্গীকার।

 

"তুমি কি আমাকে আরেকটা সুযোগ দেবে, মায়া?" আরহাম মায়ার চোখে চোখ রেখে ফিসফিস করে বলল। "এবার আমাদের মধ্যে কোনো জেদ থাকবে না, কোনো অহংকার থাকবে না। শুধু তুমি আর আমি।"

 

মায়ায় আরহামের বুকে নিজের মুখ গুঁজে দিয়ে মুচকি হাসল। "যদি এবারও তুমি ঝগড়া করো, আমি কিন্তু সত্যিই আর ফিরব না।"

 

"আর ঝগড়া হলেও..." আরহাম মায়াকে কোলে তুলে নিয়ে আবার বিছানার দিকে এগোতে এগোতে বলল, "...ঝগড়ার শেষটা কাল রাতের মতোই হবে।"

 

মায়ায় লজ্জায় আরহামের বুকে মুখ লুকাল। সকালের মিষ্টি রোদে ভিজতে ভিজতে তারা অনুধাবন করল—ভালোবাসা কোনোদিন শেষ হয়ে যায়নি। শুধু একে অপরকে বোঝার আর ছাড় দেওয়ার ক্ষমতাটুকু হারিয়ে গিয়েছিল। আজ নিজেদের পুরোনো বিষাক্ত আচরণকে বিসর্জন দিয়ে তারা দুজন আবার এক হলো, এক নতুন ভোরের হাত ধরে।

....
👁 54