ভাঙা বিশ্বাসের শেষ পরিণতি

রূপা নিজেকে সামলে নিয়ে শক্ত গলায় বলল, "তুমি আবার কেন এসেছ সামির? আমি তো তোমাকে সব পরিষ্কার করে বলেছি।"

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

"রূপা, প্লিজ একটা মিনিট আমার কথা শোনো!" সামির ব্যাকুল হয়ে রূপার হাত ধরতে চাইল, কিন্তু রূপা এক পা পিছিয়ে গেল।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

"আমাকে স্পর্শ করবে না সামির!" রূপার গলায় সতর্কবার্তা।

 

সামির চোখ বুজে এক মুহূর্ত দম নিল, তারপর হাত দুটো জোড় করে বলল, "আমি জানি আমি অপরাধী রূপা। আমি আমার বিষাক্ত মানসিকতা দিয়ে তোমাকে প্রতিদিন কষ্ট দিয়েছি। তোমার চরিত্র নিয়ে সন্দেহ করেছি, তোমার বন্ধুদের শত্রু ভেবেছি। আমি বুঝেছি আমার ভুলটা কোথায়! প্লিজ আমাকে আরেকটা সুযোগ দাও রূপা, আমি নিজেকে পুরো বদলে ফেলব। আমি তোমাকে আর কখনো সন্দেহ করব না!"

 

সামিরের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। একজন অহংকারী মানুষের এমন কাতর আকুতি দেখে রূপার মনটাও একমুহূর্তের জন্য থমকে গেল। চার বছরের স্মৃতি, একসঙ্গে কাটানো হাজারো মুহূর্ত তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। কিন্তু তখনই তার মনে পড়ে গেল সামিরের সেই অপমানের দিনগুলোর কথা, সেই দমবন্ধ করা পরিবেশের কথা।

 

"সামির..." রূপা নিচু কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, "মানুষ স্বভাব বদলাতে পারে, কিন্তু ভেঙে যাওয়া বিশ্বাস আর কখনো জোড়া লাগে না। তুমি যখন আমাকে বারবার অপমান করছিলে, তখন আমার ভেতরের ভালোবাসাটা তিলে তিলে মরে গেছে। আজ আর সেখানে তোমার জন্য কোনো অনুভূতি অবশিষ্ট নেই।"

 

"না রূপা! তুমি মিথ্যা বলছ! তুমি ওই আরমানের জন্য আমাকে ছাড়ছ, তাই না?" সামিরের কণ্ঠে আবার সেই পুরোনো ঈর্ষার লেশ ফুটে উঠল।

 

রূপা সামিরের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকাল। তার চোখে এখন রাগ নেই, শুধুই করুণা। "দেখলে সামির? তুমি বদলাওনি, আর কোনোদিন বদলাতেও পারবে না। তুমি এখনো ভাবছ আমি অন্য কারও জন্য তোমাকে ছাড়ছি। তুমি এখনো আমার চরিত্রেই দাগ লাগাচ্ছ।"

 

সামির নিজের ভুল বুঝতে পেরে স্তব্ধ হয়ে গেল। সে নিজের অজান্তেই আবার সেই একই ভুল করে ফেলেছে।

 

রূপা একটা রিকশা ডেকে উঠে বসল। রিকশাটা চলতে শুরু করলে সামির দৌড়ে রিকশার পাশে পাশে চলতে লাগল। "রূপা, যেও না! আমি মরে যাব রূপা! প্লিজ আমাকে ছেড়ে যেও না!"

 

রিকশার হুডটা তোলা ছিল। রূপা আর পেছনের দিকে তাকাল না। তার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল, তবে তা হারানোর কষ্টে নয়, বরং একটা বিষাক্ত অধ্যায় শেষ করার স্বস্তিতে। রিকশাটা মোড় ঘুরতেই সামির রাস্তার মাঝখানে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

 

হঠাৎ করেই আকাশটা মেঘলা হয়ে এল। ধানমন্ডি লেকের দিক থেকে শীতল বাতাস বয়ে এল। সামির একা রাজপথে বসে রইল, আর তার চারপাশের পৃথিবীটা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসতে লাগল। তবে রূপার জীবনে তখন অন্য এক সিদ্ধান্তের মেঘ জমছিল—পুরোনো ভালোবাসার এই মর্মান্তিক পরিণতি কি তাকে নতুন কোনো সম্পর্কের দিকে নিয়ে যাবে, নাকি সে নিজেই নিজের ভাগ্য পুনর্নির্মাণ করবে?

ধানমন্ডি লেকের পাশের রাজপথে ঝুম বৃষ্টি নেমেছিল সেদিন। বৃষ্টির অঝোর ধারায় ভিজে সামির যখন বাসায় ফিরল, তখন তার শরীরের চেয়েও বেশি ভিজেছিল তার আত্মা। ধড়ফড় করে ওঠার মতো জ্বর আর অনুশোচনার আগুনে পুড়ে সামির বেশ কিছুদিন শয্যাশায়ী হয়ে রইল। তার বন্ধুবান্ধব ও পরিচিতরা এসে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সামির বুঝেছিল, জীবনের কিছু ভুল এমন থাকে, যার কোনো প্রায়শ্চিত্ত হয় না। আয়নায় নিজের চেহারার দিকে তাকিয়ে সে অনুভব করল, রূপাকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাকে ভালোবাসার মানুষ নয়, বরং এক ভয়ংকর শোষকে পরিণত করেছিল। রূপা চলে গিয়ে তাকে যে ধাক্কাটা দিয়েছে, তা তাকে একজন পরিপক্ক মানুষ হতে বাধ্য করল।

 

অন্যদিকে, রূপা নিজের জীবনের এক নতুন অধ্যায়ে পা রেখেছিল। সামিরের সাথে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর প্রথম কিছুদিন তার মানসিকভাবে খুব কঠিন কেটেছিল। ভালোবাসার সম্পর্ক শেষ হওয়া মানে কেবল একজন মানুষকে হারানো নয়, তার সাথে জড়িয়ে থাকা শত শত অভ্যাস ও স্মৃতিকেও বিসর্জন দেওয়া। কিন্তু রূপা ভেঙে পড়েনি। সে পড়াশোনায় মনোযোগ দিল, নিজের হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীনতাকে আবার নতুন করে খুঁজে নিতে শুরু করল।

 

এই কঠিন সময়ে আরমান সবসময় রূপার পাশে এক নিশ্চুপ শুভাকাঙ্ক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সে রূপাকে কোনোদিন কোনো বিষয়ে চাপ দেয়নি, সামিরের মতো তাকে কখনো নিজের সীমানায় বন্দি করতে চায়নি। ধীরে ধীরে আরমানের প্রতি রূপার এক গভীর শ্রদ্ধা ও স্বস্তি তৈরি হলো।

 

একদিন বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ার পেছনের শান্ত চত্বরে বসে ছিল তারা। শরতের আকাশ ছিল একদম মেঘমুক্ত, নীল ও পরিষ্কার।

 

"রূপা, তোমার অনার্স পরীক্ষার ফল তো বেশ ভালো এসেছে। এবার কী ভাবছ?" আরমান হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল।

 

রূপা এক কাপ উষ্ণ কফি হাতে নিয়ে মৃদু হাসল। "স্কলারশিপের জন্য আবেদন করেছি আরমান ভাই। জার্মানির একটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছি। হয়তো আগামী মাসেই চলে যেতে হবে।"

 

আরমান কিছুক্ষণ নীরব রইল। তার চোখে একাধারে স্বস্তি ও মৃদু বিষাদের ছায়া নেমে এল। সে রূপাকে খুব ভালোবাসত, কিন্তু সেই ভালোবাসা ছিল মুক্ত পাখির ডানা মেলে দেওয়ার মতো, তাকে খাঁচায় বন্দি করার মতো নয়।

 

"তোমার জন্য খুব খুশি হলাম রূপা। তুমি এই স্বাধীনতা আর উন্নতির যোগ্য," আরমান খুব নরম গলায় বলল।

 

ঠিক সেই মুহূর্তে ক্যাফেটেরিয়ার প্রবেশদ্বারে এসে দাঁড়াল সামির। আগের চেয়ে অনেকটাই রোগা হয়ে গেছে সে, তবে তার চোখে-মুখে আর সেই পুরোনো উগ্রতা বা ঈর্ষার আগুন নেই। সেখানে এখন এক অদ্ভুত শান্ত ও বিনীত ভাব। সামির রূপার জার্মানি যাওয়ার খবরটা তার এক বন্ধুর কাছ থেকে জানতে পেরে আজ শেষবারের মতো দেখা করতে এসেছে।

 

রূপা ও আরমান দুজনেই সামিরকে দেখে একটু চমকে উঠল। তবে রূপার চোখে এখন আর কোনো ভয় বা আতঙ্ক নেই।

 

সামির ধীরে ধীরে তাদের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। সে আরমানের দিকে তাকিয়ে খুব বিনীতভাবে মাথা নিচু করল, তারপর রূপার দিকে তাকাল।

 

"রূপা, আমি জানি আমার এখানে আসার কোনো অধিকার নেই। তবুও শেষবারের মতো শুধু একটা কথা বলতে এসেছি," সামিরের কণ্ঠস্বর কাঁপছিল, তবে তাতে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না।

 

রূপা সোজা হয়ে বসল। "বলো সামির।"

 

"আমি তোমাকে ক্ষমা চাইতে আসিনি রূপা, কারণ আমি জানি আমি যে অপরাধ করেছি, তার কোনো ক্ষমা হয় না। আমি শুধু তোমাকে ধন্যবাদ দিতে এসেছি," সামির এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। "তুমি সেদিন আমাকে ছেড়ে গিয়ে আমাকে একটা জীবনের বড় শিক্ষা দিয়েছ। তোমার চলে যাওয়াটাই আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে, কাউকে ভালোবাসা মানে তাকে বন্দি করা নয়, বরং তার মুক্তিতে আনন্দ পাওয়া। আমি আমার বিষাক্ত চরিত্রটাকে শেষ করে ফেলেছি। তোমাকে আর কোনোদিন বিরক্ত করব না।"

 

কথাগুলো বলতে বলতে সামিরের চোখে জল জমে উঠল, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। রূপা স্তব্ধ হয়ে সামিরের দিকে তাকিয়ে রইল। যে মানুষটাকে সে ভালোবেসেছিল, আজ যেন তাকে সত্যি একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মতো মনে হচ্ছে। কিন্তু এই পরিবর্তন এসেছে অনেক দেরিতে, যখন তাদের সম্পর্কের সুতো চিরতরে ছিঁড়ে গেছে।

 

সামির একটু থেমে আরমানের দিকে তাকাল। "আরমান, তুমি রূপার খুব খেয়াল রেখো। রূপা হীরের মতো এক মেয়ে, তাকে কখনো কোনো খাঁচায় রেখো না।"

 

আরমান সামিরের দিকে তাকিয়ে মৃদু মাথা নাড়ল। "রূপা নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে জানে সামির, আর আমি শুধু তার সেই সিদ্ধান্তগুলোকে সম্মান করতে জানি।"

 

সামির হালকা একটু হাসল। তারপর রূপার দিকে শেষবারের মতো তাকিয়ে বলল, "শুভকামনা রূপা। নতুন জীবন তোমার আলোয় ভরে উঠুক।"

 

সামির আর একমুহূর্ত না দাঁড়িয়ে হনহন করে হেঁটে ক্যাফেটেরিয়া থেকে বের হয়ে গেল। রূপা জানালার পাশ দিয়ে সামিরকে হেঁটে যেতে দেখল। তার বুকের ভেতর একটা ভারী পাথর যেন হালকা হয়ে গেল। পুরোনো মায়াজাল, অপরাধবোধ আর হারানোর ভয়—সবকিছুর ছাই থেকে সে আজ মুক্ত।

 

কয়েক সপ্তাহ পর...

 

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। চারপাশের কোলাহল আর যাত্রীদের ব্যস্ততার মাঝে রূপা তার ট্রলি ব্যাগটা নিয়ে ইমিগ্রেশনের দিকে এগোচ্ছিল। তার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল তার পরিবার আর আরমান।

 

বিমানের উঠে নিজের সিটে বসার পর রূপা জানালার বাইরে তাকাল। রানওয়েতে বিকেলের শেষ আলোটা পড়ে এক স্বর্ণালী আভা তৈরি করেছে। বিমানের ইঞ্জিন গর্জে উঠল, আর ধীরে ধীরে যানটি মাটির মায়া ত্যাগ করে আকাশের নীল সীমানায় ডানা মেলল।

 

রূপা চোখ বুজে এক গভীর শ্বাস নিল। জীবনের এক অন্ধকার অধ্যায় সে পেছনে ফেলে এসেছে, যেখানে ছিল বিষাক্ত হিংসা আর সন্দেহ। আর সামনে পড়ে আছে এক সুবিশাল আকাশ, যেখানে সে নিজের শর্তে বাঁচবে, নিজের স্বপ্ন পূরণ করবে। পুরোনো ভালোবাসার দহন তাকে ধ্বংস করেনি, বরং তাকে আরও শক্তিশালী এক নারীতে রূপান্তর করেছে—যে নিজের জীবনের ভাগ্য এখন নিজেই লেখে।

....
👁 48