মেহরিনের ভেজা চুলের সুবাস ঘরের বাতাসকে ভারী করে তুলেছিল। ড্রেসিংটেবলের সামনে দাঁড়িয়ে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছছিল সে। ঠিক তখনই পেছন থেকে একজোড়া শক্ত হাত এসে বেষ্টন করল তার সরু কোমর। মেহরিনের শরীরটা একমুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে গেলেও পরক্ষণেই আলগা হয়ে গেল। আয়নায় ফুটে উঠল রায়ানের মুখ—চোখে এক তীব্র, তৃষ্ণার্ত দৃষ্টি।
"রায়ান, ছাড়ো... চুল শুকোতে দাও," মেহরিন মৃদুস্বরে বলল, কিন্তু তার কণ্ঠে কোনো তীব্র প্রতিবাদ ছিল না।
রায়ান কোনো কথা বলল না। সে তার ঠোঁট দুটো মেহরিনের উন্মুক্ত ঘাড়ের কাছে নামিয়ে আনল। একটি তপ্ত দীর্ঘশ্বাস মেহরিনের চামড়ায় গিয়ে বিঁধল। রায়ানের হাতের বাঁধন আরও শক্ত হলো, যেন মেহরিন একটু নড়লেই বায়ুশূন্য হয়ে যাবে চারপাশ। রায়ানের ঠোঁটের উষ্ণ ছোঁয়া মেহরিনের ঘাড়ে, কানের নিচে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। মেহরিন চোখ দুটি বুজে ফেলল। রায়ানের এই এক অদ্ভুত জাদু—তার ছোঁয়ায় এমন এক তীব্র মাতলতা থাকে যা মেহরিনের সমস্ত যুক্তি, সমস্ত অভিমান নিমেষেই গলিয়ে জল করে দেয়।
রায়ান মেহরিনকে ঘুরিয়ে নিজের মুখোমুখি করল। মেহরিনের থুতনি ধরে মুখটা একটু ওপরে তুলে ধরে গভীর চোখে তাকাল।
"তুমি শুধুই আমার, মেহরিন। জানো তো সেটা?" রায়ানের কন্ঠস্বর খাদে নামা, ভারী।
মেহরিন রায়ানের শার্টের কলারটা ধরে নিজের কাছে টেনে নিল। তাদের শ্বাসের উত্তাপ একে অপরের মুখে এসে লাগছিল। "জানি, রায়ান। কিন্তু তোমার এই ভালোবাসা মাঝে মাঝে আমাকে একদম দমবন্ধ করে ফেলে।"
"দমবন্ধ লাগুক কিংবা মুক্ত, এই বাঁধন ছাড়ানোর ক্ষমতা তোমার নেই," বলেই রায়ান মেহরিনের নরম ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল।
সেই চুম্বনে কোনো কোমলতা ছিল না, ছিল এক অগাধ অধিকারবোধ আর তীব্র তৃষ্ণা। রায়ানের হাত মেহরিনের পিঠের ভাঁজে নেমে এলো, তাকে আরও শক্ত করে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। মেহরিনও ধীরে ধীরে রায়ানের চুলে হাত চালিয়ে তার টানে সাড়া দিল। ঘরের সব আলো তখন আবছা, বাইরের বৃষ্টি আর ভেতরের ভালোবাসার ওমে দুটো মন এক অজানা ঘোরের মধ্যে ডুবে যাচ্ছিল। এই গভীর রোমাঞ্চ, এই উদাম উষ্ঞতা—এটাই রায়ানের শক্তির জায়গা। সে জানত, তার শরীরের উত্তাপ আর আবেগের তীব্রতায় সে মেহরিনকে সর্বদা নিজের করে বেঁধে রাখতে পারে।
কিন্তু এই মোহময় রাতের পরদিন সকালেই ভালোবাসার সেই মিষ্টি রুপটা বিষাক্ত রূপ ধারণ করল।
পরদিন বিকেলে তারা দুজনে ধানমন্ডি লেকের পাড়ে বসেছিল। ঢাকা শহরের হালকা হাওয়ায় মেহরিনের আঁচল উড়ছিল। এমন সময় মেহরিনের ইউনিভার্সিটির বন্ধু সায়াদ তাদের সামনে এসে দাঁড়াল। সায়াদ বেশ হাসিখুশি স্বভাবের ছেলে।
"হে মেহরিন! কতদিন পর দেখা! কেমন আছিস?" সায়াদ হাসিমুখে মেহরিনের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।
মেহরিনও হেসে উত্তর দিল, "আমি ভালো আছি সায়াদ। তুই কেমন আছিস? প্রেজেন্টেশনটার কাজ কতদূর এগোলো?"
সায়াদ স্বাভাবিকভাবেই টুকটাক কথা বলছিল, কিন্তু মেহরিন খেয়াল করল পাশে বসে থাকা রায়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে। রায়ানের হাতের আঙুলগুলো মোচড় দিয়ে সোজা হয়ে বসল। সে সায়াদকে এমন এক বিষাক্ত নজরে দেখছিল, যেন সায়াদ কোনো অপরাধ করে ফেলেছে।
মেহরিন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য তাড়াতাড়ি বলল, "সায়াদ, পরে কথা বলছি তোর সাথে। আমরা এখন একটু ব্যস্ত আছি।"
সায়াদ বিষয়টি বুঝতে পেরে দ্রুত বিদায় নিয়ে চলে গেল। সায়াদ দৃষ্টিসীমার বাইরে যাওয়ার আগেই রায়ান মেহরিনের হাত শক্ত করে চেপে ধরল। এত জোরে চিপে ধরল যে মেহরিনের সস্তার চুড়িগুলো হাতে ফুটে যাওয়ার উপক্রম হলো।
"রায়ান! কী করছ? লাগছে তো!" মেহরিন যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠল।
"কে ওই ছেলে? অত হেসে হেসে কীসের কথা হচ্ছিল?" রায়ানের চোখে তখন হিংসার আগুন। কণ্ঠের মিষ্টতা উধাও হয়ে সেখানে জমেছে বরফশীতল ক্রোধ।
"ও আমার ক্লাসমেইট, রায়ান! সাধারণ একটা প্রজেক্টের ব্যাপারে কথা বলছিল। তুমি সব বিষয়ে এমন নাটক শুরু করো কেন?" মেহরিন হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল।
"আমি নাটক করছি? ওই ছেলেটা যেভাবে তোমার দিকে তাকাচ্ছিল, আমি কি অন্ধ ভাবো আমাকে? তোমার কিসের এত দরকার অন্য ছেলেদের সাথে হেসে কথা বলার?" রায়ানের গলায় এক অদ্ভুত পাগলামি ফুটে উঠল।
"তুমি কি সত্যি পাগল হয়ে গেলে রায়ান? ও শুধু একটা কথা বলতে এসেছিল! তোমার এই অতিরিক্ত সন্দেহ আর অধিকারবোধ আমাকে শেষ করে দিচ্ছে!" মেহরিন আর সহ্য করতে না পেরে রেগে উঠে দাঁড়াল।
রায়ানের মুখটা এক নিমেষে গম্ভীর হয়ে গেল। সেও উঠে দাঁড়িয়ে মেহরিনের চোখে চোখ রেখে বলল, "আমার সন্দেহ নয় মেহরিন, এটা আমার অধিকার। আমি তোমাকে কারো সাথে ভাগ করে নিতে পারব না। কোনো পুরুষের ছায়াও যেন তোমার ওপর না পড়ে।"
গাড়িতে বাড়ি ফেরার পথজুড়ে চরম নীরবতা। কেউ কোনো কথা বলল না। মেহরিন গাড়ির কাচে মাথা ঠেকিয়ে বাইরের ঝাপসা আলো দেখতে লাগল। তার চোখে পানি চলে এসেছে। এই এক মানুষ, যে রাতে তাকে অতল ভালোবাসায় ভাসিয়ে নিয়ে যায়, আবার পরদিন সকালেই পশুর মতো সন্দেহ করে তার আত্মসম্মান চুরমার করে দেয়।
বাড়ি পৌঁছে রায়ান মেহরিনের ঘরে ঢুকে সোজা দরজা লক করে দিল। মেহরিন কিছু বুঝে ওঠার আগেই রায়ান তাকে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরল। রায়ানের বুকটা হাঁপানির মতো ওঠানামা করছিল।
"তুমি আজ আমার সাথে রেগে কথা বলেছ, মেহরিন," রায়ানের গলায় রাগ আর আবেগের এক অদ্ভুত ককটেল।
"তুমি আমাকে আঘাত করেছ রায়ান..." মেহরিন ফুঁপিয়ে উঠল।
রায়ানের কঠিন চোখের দৃষ্টি হঠাৎ নরম হয়ে গেল। মেহরিনের চোখের পানি দেখে তার ভেতরের যত্নশীল পুরুষটি যেন জেগে উঠল। সে মেহরিনের গাল দুটো হাত দিয়ে ধরে আলতো করে চোখের পানি মুছে দিল। তার আঙুলের ছোঁয়া এবার পরম মমতাময়।
"আই অ্যাম সরি, পাখি... আমি চাই না তুমি কাউকে দেখো। আমি সহ্য করতে পারি না। তোমাকে অন্য কারো দিকে তাকাতে দেখলে আমার মাথা কাজ করে না," রায়ান মেহরিনের কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেল।
রায়ানের এই হঠাৎ বদলে যাওয়া আচরণ মেহরিনকে বিভ্রান্ত করে দেয়। একটু আগেই যে রায়ান তাকে কষ্ট দিচ্ছিল, সে-ই এখন তার চোখের জল মোছাতে আকুল। রায়ান মেহরিনের কাঁধের কাপড়টা একটু সরিয়ে দিয়ে সেখানে ঠোঁট ছোঁয়াল। মেহরিনের ভেতরের সব অভিমান আর রাগ আবার ভাঙতে শুরু করল।
রায়ানের যত্ন আর উষ্ণতার এই বেড়াজালটা মেহরিনকে এক অদ্ভুত অন্ধকূপে আটকে রেখেছে। সে জানে রায়ানের এই সন্দেহ করাটা ভুল, এই আচরণটা বিষাক্ত। কিন্তু রায়ানের এই অতিরিক্ত ভালোবাসা, এই গভীর শরীরী আর মানসিক নির্ভরতা ছেড়ে যাওয়ার সাহস মেহরিনের নেই।
রায়ানের ওমে নিজেকে সমর্পণ করতে করতে মেহরিন শুধু মনে মনে ভাবল, এই ভালোবাসা কি তাকে সত্যি কোনো দিন মুক্তি দেবে, নাকি এই অন্ধ ভালোবাসার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে তাদের পুরো জীবন?
আগের রাতের পর থেকে কিছুদিন রায়ান বেশ শান্ত ছিল। যেন এক ঝড়ের পর হঠাৎ থমকে যাওয়া প্রকৃতি। মেহরিনের জন্য সকালে তাজা গোলাপ ফুল আনা, তার প্রিয় খাবার অর্ডার করা, আর রাতে তাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসার মিষ্টি কথার পশরা সাজানো—রায়ানের এই রূপটায় মেহরিন সবসময় নতুন করে প্রেমে পড়ে। কিন্তু মেহরিনের মনের ভেতরের ওই হালকা আশঙ্কার মেঘটা সম্পূর্ণ কেটে যায়নি। সে জানত, রায়ানের ভেতরের বিষাক্ত রাক্ষসটা মরে যায়নি, কেবল ঘুমিয়ে আছে।
এক সপ্তাহ পর মেহরিনদের ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে এক বিশাল সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করা হলো। মেহরিন এতে সরাসরি অংশ না নিলেও প্রোগাম অর্গানাইজিং টিমে ছিল। রায়ানকে সে আগেই বলে রেখেছিল যে আজ ফিরতে একটু দেরি হতে পারে। কিন্তু রায়ানের ভেতরের সেই চিরচেনা অস্বস্তি আর অবিশ্বাসের পোকাটি আবার কিলবিল করে উঠল। রাত ৮টা বাজতেই রায়ান পর পর পাঁচবার মেহরিনকে ফোন করল।
অনুষ্ঠানের হইচই আর সাউন্ড সিস্টেমের বিকট শব্দে মেহরিনের ফোন ব্যাগে ভাইব্রেট হচ্ছিল, যা সে শুনতে পায়নি। প্রায় ঘণ্টাখানেক পর যখন মেহরিন ব্যাগ থেকে ফোন বের করল, দেখল রায়ানের ১৫টি মিসড কল! মেহরিনের বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। এক অজানা ভয়ে তার হাত ঠাণ্ডা হয়ে এলো। সে দ্রুত রায়ানকে কল ব্যাক করল।
প্রথম রিং হতেই রায়ান ফোন রিসিভ করল। কিন্তু অপর প্রান্ত থেকে কোনো অভ্যর্থনা এলো না, এলো এক বরফশীতল হুংকার।
"কোথায় তুমি মেহরিন?"
"রায়ান! সরি, আমি সাউন্ডের কারণে ফোন শুনতে পাইনি। আমি ক্যাম্পাসে আছি, আর আধা ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যাবে..." মেহরিন বোঝানোর চেষ্টা করল।
"ফোন শুনতে পাওনি, নাকি শুনতে চাওনি? কার সাথে ব্যস্ত ছিলে তুমি?" রায়ানের গলায় থমথমে রাগ।
"তুমি কি আবার শুরু করছ রায়ান? আমি কাজের মধ্যে ছিলাম! অনুষ্ঠান পরিচালনা করছিলাম!" মেহরিন একটু বিরক্ত হয়েই বলল।
"একদম মিথ্যা বলবে না। আমি ক্যাম্পাসের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। পাঁচ মিনিটের মধ্যে নিচে নামো, নয়তো আমি ভেতরে গিয়ে কী করব তুমি কল্পনাও করতে পারছ না।" রায়ান খট করে ফোনটা কেটে দিল।
মেহরিন হতভম্ব হয়ে রইল। রায়ানের কথা শুনে তার গায়ে কাঁটা দিল। সে জানে রায়ান জেদের বশে সত্যি সত্যিই ক্যাম্পাসের ভেতর ঢুকে একটা নোংরা ঝামেলা তৈরি করতে পারে। মেহরিন আর এক মুহূর্ত দেরি না করে বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দ্রুত গেটের দিকে ছুটে গেল।
ক্যাম্পাসের গেটের বাইরে কালো রঙের গাড়িটির গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল রায়ান। তার চোখের তারা দুটো ধকধক করে জ্বলছে, ঠোঁটের কোণে এক নিষ্ঠুর হাসি। মেহরিন কাছে আসতেই রায়ান তার হাতটা এক হ্যাঁচকায় ধরে গাড়ির পেছনের সিটে ধাক্কা দিয়ে বসিয়ে দিল। নিজে দ্রুত উঠে উঠে লক করে দিল দরজা।
"রায়ান, ছাড়ো! তোমার কী হয়েছে বল তো? মানুষজন দেখছে!" মেহরিন হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।
গাড়ির ভেতর অন্ধকার। রায়ান মেহরিনের দিকে ঝুঁকে এলো। তার শরীরের ভারী সুবাস আর নিঃশ্বাসের উত্তাপ মেহরিনের মুখের ওপর এসে পড়ল। কিন্তু এবার সেই উত্তাপে কোনো প্রেম ছিল না, ছিল এক ভয়াল গ্রাস করার মানসিকতা। রায়ান মেহরিনের দুটো হাত মাথার ওপরে তুলে ধরে এক হাতে চেপে ধরল। অপর হাতে মেহরিনের চুলগুলো মুঠো করে ধরে মুখটা নিজের মুখের একদম কাছে নিয়ে এলো।
"মানুষ কী দেখল তাতে আমার কিছু যায় আসে না, মেহরিন! তুমি আমার ফোন ধরোনি কেন? কার সাথে হাসাহাসি করছিলে ভেতরে? ওই সায়াদের সাথে?" রায়ানের গলা কাঁপছিল তীব্র রোষে।
"তুমি একটা উন্মাদ রায়ান! তুমি অসুস্থ! আমি কোনো ভুল করিনি, আমি কাজে ছিলাম!" মেহরিন চিৎকার করে উঠল, তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
মেহরিনের চোখের জল দেখে রায়ানের চোখ দুটো যেন আরও হিংস্র হয়ে উঠল। কিন্তু অদ্ভুতভাবে তার আক্রমণের ধরন বদলে গেল। সে ঝুঁকে এসে মেহরিনের কাঁধে আর ঘাড়ে কঠোরভাবে নিজের ঠোঁট বসিয়ে দিল। ওটা চুমু ছিল না, ছিল নিজের একাধিপত্য জাহির করার এক সহিংস প্রচেষ্টা। মেহরিন যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠল, কিন্তু রায়ানের শারীরিক শক্তির কাছে সে সম্পূর্ণ অসহায়।
"তুমি শুধুই আমার... মেহরিন, বোঝো না কেন? কেউ তোমাকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না," রায়ান মেহরিনের ঠোঁটে আবার তীব্র ক্ষোভে নিজের ঠোঁট মিলিয়ে দিল।
সেই গভীর, বিষাক্ত রোমাঞ্চের মাঝে মেহরিন একপ্রকার অবশ হয়ে পড়ল। রায়ানের শরীরের স্পর্শে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগলেও তার মনটা তখন কষ্টে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছিল। যে ছোঁয়া তাকে স্বর্গীয় অনুভূতি দেওয়ার কথা ছিল, সেই ছোঁয়াটাই আজ তার কাছে শৃঙ্খল মনে হচ্ছে। অবশেষে রায়ান তাকে ছেড়ে দিয়ে গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে বসল। তার বুকটা তখনও দ্রুত উঠানামা করছিল।
কিন্তু সত্যিকারের ঝড়টা বয়ে গেল পরদিন সকালে।
মেহরিনকে নিয়ে এক চরম ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হলো। রায়ানের এক পরিচিত লোক—যে সবসময় অন্যের ঝামেলা দেখতে ভালোবাসে—সে রায়ানকে একটি অস্পষ্ট ছবি পাঠাল। ছবিতে দেখা যাচ্ছিল মেহরিন একটি রেস্তোরাঁয় এক যুবকের খুব কাছাকাছি বসে কথা বলছে, আর ছেলেটি মেহরিনের হাত ধরে আছে। ছবিটির ভেতরের সতত্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ছেলেটি ছিল মেহরিনের মামাতো ভাই, যে বিদেশ থেকে অনেক বছর পর ফিরেছিল এবং মেহরিনের একটি ব্যক্তিগত সমস্যায় তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল।
কিন্তু হিংসা আর অবিশ্বাসে অন্ধ হয়ে থাকা রায়ানের কাছে ওই ছবির পেছনের সত্যি জানার মতো কোনো ধৈর্য ছিল না। ছবিটা দেখা মাত্রই তার মাথার রগ ফুলে উঠল। তার সমস্ত চিন্তাশক্তি মুহূর্তের মধ্যে লোপ পেল।
রায়ান ঝড়ের বেগে মেহরিনের ফ্ল্যাটে গিয়ে হাজির হলো। দরজা খোলামাত্রই সে মেহরিনের ঘরে ঢুকে সজোরে ফোনটা মেহরিনের মুখে ছুড়ে মারল।
"এই নাও তোমার সততার প্রমাণ! এবার কী অজুহাত দেবে মেহরিন? কী সাফাই গাইবে?" রায়ান গর্জনে ফেটে পড়ল।
মেহরিন ভয় পেয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে ছবিটা দেখল। সে শান্ত গলায় বলল, "রায়ান, তুমি যা ভাবছ তা নয়। ও আমার মামাতো ভাই ফুয়াদ। ও গতকালই লন্ডন থেকে এসেছে..."
"আর মিথ্যা বলবে না!" রায়ান দেওয়ালে সজোরে এক ঘুষি মারল। দেওয়ালের প্লাস্টার খসে পড়ল, তার হাতের কড়া কেটে রক্ত বের হতে লাগল। কিন্তু রায়ানের সেদিকে খেয়াল নেই। "প্রতিটি পুরুষের সাথেই তোমার কোনো না কোনো সম্পর্ক থাকে! ভাইয়ের নাটক বন্ধ করো! আমি তোমাকে চোখ বন্ধ করে ভালোবেসেছিলাম, আর তুমি আমার সাথে এই নোংরা খেলা খেললে?"
মেহরিন থমকে গেল। রায়ানের এই অন্ধ অবিশ্বাস আর কটু কথাগুলো তার হৃদয়ে তীরের মতো গিয়ে বিঁধল। এত বছর ধরে সে রায়ানের সমস্ত পাগলামি, অত্যাচার আর সন্দেহ সহ্য করে এসেছে শুধু রায়ানের ওই একটুখানি ভালোবাসার আশায়। কিন্তু আজ রায়ান তার চরিত্রের ওপর যে কলঙ্ক লেপে দিল, তা সহ্য করার ক্ষমতা মেহরিনের আর ছিল না।
"তুমি সত্যি মনে করো আমি অন্য কারো সাথে জড়িয়ে আছি?" মেহরিনের গলা হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল। সেই শান্ত কণ্ঠে ছিল এক নির্মম সত্যের বরফশীতল আমেজ।
"ছবি তো তাই বলছে!" রায়ান হুংকার দিল।
মেহরিন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখ থেকে আর এক ফোঁটা পানিও বের হলো না। চোখের জল যেন শুকিয়ে পাথর হয়ে গেছে। সে খুব ধীরস্থিরে নিজের ড্রেসিংটেবলের ওপর রাখা রায়ানের দেওয়া সব উপহার, গয়না আর আংটিগুলো একে একে খুলে টেবিলের ওপর রাখল।
"রায়ান, তুমি ভালোবাসো না। তুমি শুধু অধিকার ফলাতে চাও। তুমি আমাকে একটা মানুষ হিসেবে দেখ না, তোমার একটা খেলনা মনে করো। যে ভালোবাসায় বিশ্বাস নেই, যে ভালোবাসায় প্রতিনিয়ত নিজের চরিত্র রক্ষা করার প্রমাণ দিতে হয়—সেই ভালোবাসা আমি আর চাই না।"
মেহরিন আলমারি থেকে তার ব্যাগটা বের করে কিছু জামাকাপড় গুছিয়ে নিতে লাগল।
রায়ান অবাক হয়ে মেহরিনের কাণ্ড দেখছিল। তার রাগের পারদ তখনও চড়া, সে ভেবেছিল মেহরিন কান্নাকাটি করে তার পা ধরে ক্ষমা চাইবে। সে গর্জে উঠে বলল, "কোথায় যাচ্ছ তুমি? তুমি আমাকে ছেড়ে কোথাও যেতে পারবে না!"
মেহরিন ব্যাগের জিপার বন্ধ করে রায়ানের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন কোনো ভয় ছিল না, ছিল না কোনো ভালোবাসা। একদম শূন্য একজোড়া চোখ।
"আমি চললাম রায়ান। তোমার এই বন্দিশালা থেকে আমি আজ নিজেকে মুক্ত করলাম। আর কোনোদিন আমার সামনে আসার চেষ্টা করবে না।"
মেহরিন ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে রায়ানের পাশ কেটে দরজার দিকে হেঁটে গেল। রায়ান মেহরিনের হাতটা শক্ত করে ধরতে গেল, কিন্তু মেহরিন এক ঝটকায় হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, "আমাকে আর কোনোদিন ছোঁবে না। তোমার এই ছোঁয়া এখন আমার কাছে বিষের মতো লাগে।"
দরজাটা সজোরে বন্ধ হয়ে গেল। রায়ান স্তব্ধ হয়ে ফাঁকা ঘরটার মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল। তার হাত থেকে রক্ত চুইয়ে মেঝেতে পড়ছিল, কিন্তু তার চেয়েও বেশি রক্তক্ষরণ যেন হঠাৎ করেই তার ভেতরের শূন্যতায় শুরু হতে যাচ্ছিল—যার আভাস সে তখনও পুরোপুরি টের পায়নি।
মেহরিন চলে যাওয়ার পর প্রথম কয়েকটা দিন রায়ান এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে কাটাল। তার অহংকার আর জিদ তাকে বার বার বলছিল—মেহরিন কোথাও যেতে পারবে না। সে দু-একদিনের মধ্যেই ভুল বুঝতে পেরে নিজের ভুল স্বীকার করে ঠিকই ফিরে আসবে। কিন্তু দিন পেরিয়ে সপ্তাহ পার হতে চলল, মেহরিনের কোনো খবর এলো না। মেহরিন তার ফোন নম্বর বদলে ফেলেছে, সোশ্যাল মিডিয়ার সমস্ত অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছে, এমনকি নিজের পুরনো ফ্ল্যাট ছেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে উঠেছে।
ধীরে ধীরে রায়ানের অহংকারের পাহাড় ধসে পড়তে শুরু করল। সেই বিশাল, নীরব ঘরটায় একা বসে থাকতে থাকতে রায়ানের দম আটকে আসতে লাগল। প্রতিটা রাতে সে যখন বিছানায় এপাশ-ওপাশ করত, তখন মেহরিনের সেই ভেজা চুলের মিষ্টি সুবাস যেন বাতাসে ভেসে বেড়াত। ড্রেসিংটেবলের আয়নার সামনে দাঁড়ালে তার মনে হতো—এই তো মেহরিন দাঁড়িয়ে আছে, তোয়ালে দিয়ে চুল মুছছে। কিন্তু হাত বাড়াতেই কেবল শূন্যতা ছুঁয়ে যেত তাকে।
রায়ান পাগলের মতো মেহরিনকে খুঁজতে শুরু করল। তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, পরিচিত বন্ধুদের বাড়ি, এমনকি যে রেস্তোরাঁগুলোতে তারা একসাথে সময় কাটাত—সব জায়গায় রায়ান হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াল। কিন্তু মেহরিনের দেখা পাওয়া গেল না।
অবশেষে একদিন রায়ানের হাত পড়ল মেহরিনের মামাতো ভাই ফুয়াদের ওপর। ফুয়াদের মুখোমুখি হয়ে যখন রায়ান আগের মতোই চড়াও হতে চাইল, তখন ফুয়াদ খুব শান্ত কিন্তু কঠোর ভাষায় আসল সত্যটা প্রকাশ করল। ফুয়াদ মেহরিনকে সান্ত্বনা দেওয়ার দিনটির পেছনের পারিবারিক বিপদের সমস্ত বিবরণ আর প্রমাণ রায়ানের চোখের সামনে তুলে ধরল।
সত্যিটা জানার পর রায়ানের মাথার ওপর যেন এক রক্ত হিম করা বিজলি চমকে উঠল।
সেদিন রাতে রায়ান নিজের ঘরে ফিরে মেঝেতে বসে পড়ল। তার চোখের সামনে মেহরিনের সেই অশ্রুসজল, শান্ত কিন্তু শূন্য চোখ দুটো ভেসে উঠল। মেহরিনের শেষ কথাগুলো তার কানে ঘণ্টার মতো বাজতে লাগল—"তুমি ভালোবাসো না রায়ান, তুমি শুধু অধিকার ফলাতে চাও। তোমাকে প্রতিনিয়ত নিজের চরিত্র রক্ষা করার প্রমাণ দিতে হয়... তোমার এই ছোঁয়া এখন আমার কাছে বিষের মতো লাগে।"
রায়ানের বুকের ভেতরটা এক যন্ত্রণাদায়ক হাহাকারে মুচড়ে উঠল। সে প্রথমবারের মতো নিজের আয়নায় নিজের ভেতরের দানবটাকে দেখতে পেল। সে ভেবেছিল সে মেহরিনকে তীব্র ভালোবাসে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সে নিজের নিরাপত্তাহীনতা আর বিষাক্ত অধিকারবোধ দিয়ে মেহরিনের আত্মসম্মান ও স্বাধীনতাকে তিলে তিলে হত্যা করছিল। ভালোবাসার নামে সে যা করেছে, তা ভালোবাসা ছিল না—তা ছিল পশুতুল্য এক নিয়ন্ত্রণ করার নেশা। রায়ানের চোখ দিয়ে অঝোরে পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল। এই প্রথমবার এক কঠোর, অহংকারী পুরুষ অনুশোচনার আগুনে পুড়ে ছাই হতে লাগল।
মাস ছয়েক পর।
ধানমন্ডি লেকের ধারে একটি ছোট লাইব্রেরি কাফেতে শান্ত হয়ে বই পড়ছিল মেহরিন। তার চেহারায় এখন এক অদ্ভুত প্রশান্তি। জীবনের সেই বিষাক্ত অধ্যায়টা পেরিয়ে সে এখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে, এক নতুন উদ্যমে নিজের ক্যারিয়ার গড়ছে।
কাফের কাচের জানালা দিয়ে দুপুরের মিষ্টি রোদ এসে মেহরিনের মুখে পড়েছিল। ঠিক তখনই তার টেবিলের পাশে এসে দাঁড়াল একটি ছায়া।
মেহরিন মুখ তুলে তাকাতেই স্তব্ধ হয়ে গেল।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে রায়ান। কিন্তু এই রায়ান সেই পুরনো, দাম্ভিক, সুঠাম রায়ান নয়। মাত্র ছয় মাসে সে যেন অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। চোখের নিচে কালি, চেহারায় এক গভীর বিষাদ আর ক্লান্তি। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল তার চোখে। সেই চোখে আজ কোনো হিংসা নেই, কোনো অগ্নিকাণ্ড নেই, নেই কোনো হিংস্র অধিকারবোধের আলো—সেখানে জমে আছে শুধু এক সমূদ্র অনুশোচনা আর নিঃশব্দ আবেদন।
মেহরিন নিজেকে সামলে নিয়ে খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, "তুমি? এখানে কীভাবে এলে?"
রায়ান মেহরিনের টেবিলে বসল না। সে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকল, যেন মেহরিনের ব্যক্তিগত সীমানাকে সম্মান জানানোই তার প্রথম কাজ।
"আমি তোমাকে বিরক্ত করতে আসিনি, মেহরিন," রায়ানের কণ্ঠস্বর কাঁপছিল, বড্ড অচেনা শোনালো তাকে। "আমি কেবল... কেবল একবার তোমাকে দেখতে এসেছিলাম। আর একটা কথা বলতে এসেছিলাম।"
মেহরিন চুপ করে রায়ানের দিকে তাকিয়ে রইল।
রায়ান একটা গভীর শ্বাস নিল, তার চোখ দুটো পানিতে টলমল করছিল। "আমি সেদিন ভুল ছিলাম, মেহরিন। ফুয়াদের কাছ থেকে আমি সব সত্য জেনেছি। কিন্তু তারচেয়েও বড় সত্য হলো—আমি বুঝেছি আসল ভুলটা কোথায় ছিল। ভুল ছিল আমার মানসিকতায়, আমার ভালোবাসার উপায়ে। আমি তোমাকে ভালোবাসার নামে এক বন্দিশালায় আটকে রেখেছিলাম। তোমাকে ভালোবাসার অর্থ যে তাকে নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করা নয়, বরং তার স্বাধীনতাকে সম্মান জানানো—তা আমি তোমাকে হারানোর পর প্রথমবার বুঝতে পেরেছি।"
মেহরিনের বুকের ভেতরটা একটু মোচড় দিয়ে উঠল, কিন্তু সে শান্ত রইল।
রায়ান তার পকেট থেকে একটি ছোট খাম বের করে টেবিলে রাখল। "এটা তোমার ইউনিভার্সিটির কিছু দরকারি কাগজ, যা তুমি তাড়াহুড়োয় ফেলে গিয়েছিলে। আমি শুধুই এটা ফিরিয়ে দিতে এসেছিলাম। তোমার জীবনে আর কখনো কোনো অধিকার দাবি নিয়ে আমি দাঁড়াব না। আমি শুধু চাই, তুমি ভালো থাকো... অনেক মুক্ত আকাশে ডানামেলে বাঁচো।"
কথাগুলো শেষ করে রায়ান আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। সে পেছন ফিরে ধীরে ধীরে হেঁটে কাফের দরজার দিকে এগিয়ে গেল। তার প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল এক ভেঙে যাওয়া পুরুষের ভারী নীরবতা।
মেহরিন জানালার কাচ দিয়ে রায়ানের চলে যাওয়ার দৃশ্যটি দেখতে লাগল। রোদঝলমলে রাস্তার ভিড়ে রায়ানের একা হেঁটে যাওয়া অবয়বটি আস্তে আস্তে ঝাপসা হয়ে এলো।
মেহরিন জানে, রায়ানের ভেতরের এই পরিবর্তনটা সত্যি। অনুশোচনার আগুন তাকে বদলে দিয়েছে। কিন্তু ভাঙা কাচ জোড়া লাগলেও তার দাগ রয়ে যায়। মেহরিন আর সেই পুরনো বিষাক্ত বৃত্তে ফিরে যাবে না। তবে রায়ানের এই অনুশোচনা আর সত্য উপলব্ধি মেহরিনের ভেতরের জমে থাকা সব ক্ষোভ আর অভিমানকে ধুয়েমুছে সাফ করে দিল।
মেহরিন জানালার বাইরে তাকিয়ে এক দীর্ঘ প্রশান্তির শ্বাস ফেলল। ভালোবাসা যখন শৃঙ্খল ভেঙে মুক্তি দিতে শেখে, কেবল তখনই মানুষ হিসেবে দুজন আলাদা পথে হেঁটেও নিজের আত্মা রক্ষা করতে পারে।
....