গভীর অন্ধকার রাত তখন সারা শহরটাকে গ্রাস করেছে। বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল আরশি। বাইরের হিমশীতল হাওয়া তার চুলে দোল দিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু তার ভেতরের ঝড়টাকে কোনোভাবেই শান্ত করতে পারছিল না। জীবন তার সাথে সবসময়ই একধরনের নিষ্ঠুর খেলা খেলে এসেছে। খুব অল্প বয়সে বাবাকে হারানোর পর থেকেই সংসারের সব ভার তার ওপর এসে পড়ে। সম্পর্কের প্রতি তার তৈরি হয়েছিল এক চরম তিক্ততা। আরশি সবসময় বিশ্বাস করত, ভালোবাসা নামক আবেগের কোনো অস্তিত্ব তার জীবনে নেই। ভালোবাসা মানেই তো অধিকারবোধ, আর অধিকারবোধ মানেই দিনশেষে এক বুক যন্ত্রণা।
হঠাৎই পেছন থেকে দুটি বলিষ্ট ও উষ্ণ হাত এসে জড়িয়ে ধরল তার কোমর। কোনো আগাম শব্দ না করে, অত্যন্ত কাছে এসে দাঁড়াল আদিব। আরশি চমকে উঠলেও সরতে পারল না, কারণ আদিবের বুকের স্পন্দন সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল তার পিঠে। আদিব তার চিবুকটা আরশির কাঁধে রাখল। তার উত্তপ্ত নিঃশ্বাস আরশির ঘাড়ের সংবেদনশীল ত্বকে লাগতেই এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল আরশির সারা শরীরে।
"এত রাতে একা একা কী ভাবছ, আরশি?" আদিবের গভীর, গম্ভীর কণ্ঠস্বর ঘরের নিরবতাকে এক নিমেষে ভেঙে দিল।
"কিছু না, আদিব। তুমি এখনো ঘুমাওনি?" আরশি নিজের কণ্ঠ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো। তার কণ্ঠ বুজে আসছিল।
আদিব কোনো উত্তর দিল না। সে ধীরগতিতে আরশিকে নিজের দিকে ঘোরাল। ঘরের ডিম লাইটের আবছা আলোয় আরশির ফর্সা মুখখানি যেন কোনো এক রূপকথার প্রতিমার মতো জ্বলজ্বল করছিল। তার কাজলা চোখে জমে থাকা জমানো অন্ধকার আদিবের নজর এড়াল না। আদিব ডান হাতের এক আঙুল দিয়ে আরশির ভেজা ঠোঁটজোড়া আলতো করে ছুঁয়ে দিল।
"তোমার এই চোখের ভেতরে যে অতীতটা লুকিয়ে আছে, সেটাকে আমি মুছে দিতে চাই, আরশি," আদিব ফিসফিস করে বলল। তার স্বরের মাঝে ছিল এক অমোঘ আকর্ষণ।
"তুমি পারো না আদিব! আমার অতীত কোনো সহজ গল্প নয়। আমি ছাই হয়ে গেছি, আর তুমি নিজের হাত পোড়াতে এসেছ," আরশি মাথা নিচু করে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল।
কিন্তু আদিব তাকে সেই সুযোগ দিল না। এক ঝটকায় আরশিকে আরও কাছে টেনে নিয়ে সে জড়িয়ে ধরল নিজের বুকের সাথে। আদিবের এক হাত আরশির পিঠের নীচের অংশে দৃঢ় হয়ে চেপে বসল, অন্য হাত চেপে ধরল তার চুল। তাদের দুজনের মাঝে কোনো দূরত্ব অবশিষ্ট রইল না। আরশির বুকের ধুকপুকানি আর আদিবের দ্রুত নিঃশ্বাস একাকার হয়ে গেল।
"তুমি যদি ছাই হয়ে যাও, তবে আমি সেই ছাইতেই নিজেকে মেশাতে চাই। আমি তোমাকে কোনো আকাশ-কুসুম প্রতিশ্রুতির বন্ধনে বাঁধব না, আরশি। কিন্তু আমি তোমার পাশে থাকব। সবসময়।"
আদিবের কথাগুলো শেষ হতেই তার ঠোঁট নেমে এলো আরশির নরম ঠোঁটের ওপর। প্রথমে এক পরম আকুলতায়, তারপর এক অনদম্য তপ্ত আবেগে আদিব গ্রাস করে নিল আরশির ঠোঁট দুটো। আরশি কেঁপে উঠল এক অজানা শিহরণে। তার মনের ভেতরের সব শক্ত দেয়াল এক নিমেষে বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়তে লাগল। যে মানুষটা কোনো দাবি প্রকাশ করেনি কখনো, সে আজ এত অধিকার নিয়ে তাকে নিজের করে নিচ্ছে কীভাবে?
আরশির হাত দুটো স্বতঃস্ফূর্তভাবেই আদিবের চওড়া পিঠ আকড়ে ধরল। আদিবের কামনার উত্তাপ আরশির পুরো শরীরে এক অদ্ভুত আগুন জ্বেলে দিল। আদিব এবার আরশির ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে তার গলার নিচে, কলারবোনের ওপর নিজের উত্তপ্ত ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। আরশির মুখ থেকে এক হালকা অস্ফুট শব্দ বের হয়ে এলো, সে চোখ বন্ধ করে নিজেকে সঁপে দিতে লাগল সেই অচেনা স্বর্গের আনন্দে।
আদিব আরশিকে শূন্যে তুলে নিল। কোনো বাধা না দিয়ে আরশিও আদিবের গলায় নিজের দুই হাত শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল। বিছানায় আরশিকে শুইয়ে দিয়ে আদিব তার ওপর ঝুঁকে পড়ল। ঘরে তখন শুধু তাদের ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ আর ভালোবাসার তীব্র উত্তাপ। আদিবের হাত আরশির শাড়ির আঁচল সরিয়ে তার নগ্ন ত্বকে এক অলৌকিক অনুভূতি তৈরি করতে লাগল। তার প্রতিটি ছোঁয়া যেন আরশিকে নতুন করে ভালোবাসতে বাধ্য করছিল।
"আদিব... প্লিজ..." আরশির কণ্ঠস্বর হারিয়ে যাচ্ছিল অনুভূতির গভীরতায়।
"ভয় পেও না, আরশি। আমার কাছে নিজেকে পুরোপুরি ছেড়ে দাও," আদিব তার ভেজা ঠোঁটে আবার আরশির ঠোঁট বন্দি করে নিল।
সেই রাতে আদিব কোনো বাঁধনে না বেঁধেও আরশিকে চিরদিনের মতো জয় করে নিল। আরশি এতদিন ধরে নিজের চারপাশে যে বরফের দেয়াল তুলে রেখেছিল, আদিবের তপ্ত ভালোবাসা আর ভালোবাসার তীব্র টানে তা এক রাতে গলে জল হয়ে গেল। আরশি বুঝতে পারল, জীবনের কঠিন বাস্তবতার মাঝেও এমন কিছু মানুষ আসে, যারা কোনো বড় চুক্তি না করেও সারাজীবনের আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়। আদিব তেমনই একজন, যে আরশিকে কোনো শর্ত ছাড়াই ভালোবেসে চলেছে।
পরদিন সকালে জানালার ফাঁক গলে সূর্যের আলো যখন বিছানায় এসে পড়ল, আরশি আবিষ্কার করল সে আদিবের শক্ত বুকের মাঝে নিরাপদে শুয়ে আছে। আদিব এক হাতে তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে পরম শান্তিতে। আরশির মনে হলো, কত বছর পর সে এত শান্তিতে একটা রাত পার করল। আদিবের মুখটার দিকে তাকিয়ে তার মনে এক অজানা মায়ায় ভরে উঠল।
কিন্তু মানুষের জীবনে সুখ কি এত সহজে স্থায়ী হয়?
বিকেলের দিকে আদিব এক জরুরি কাজে অফিসে চলে গেলে ঘরে একাই ছিল আরশি। দরজায় এক চেনা কিন্তু বিষাক্ত কড়া নাড়ার শব্দ শুনতে পেল সে। আরশি এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলতেই তার পা জোড়া যেন মাটির সাথে আটকে গেল। রক্তের গতি থমকে গেল যেন এক মুহূর্তে।
দরজায় দাঁড়িয়ে আছে তার অতীতের সেই ভয়ংকর মানুষটি—আফতাব। যার কারণে আরশির পুরো জীবনটা তছনছ হয়ে গিয়েছিল, যে মানুষটা তাকে পশুর মতো নির্যাতন করেছিল এবং ভালোবাসার নামে শুধু ধোঁকা দিয়েছিল।
আফতাব ঠোঁটের কোণে এক কুৎসিত হাসি ফুটিয়ে ভেতরে পা বাড়াল।
"কেমন আছ, আরশি? ভাবলে কী করে আমাকে ছেড়ে এত শান্তিতে সুখে থাকবে?" আফতাবের বিকৃত কণ্ঠস্বর আরশির কান স্তব্ধ করে দিল।
আরশির ভেতরের সব পুরোনো আতঙ্ক মুহূর্তের মধ্যে সজাগ হয়ে উঠল। তার শরীর কাঁপতে শুরু করল ভয়ে। কিন্তু সে জানত না, এই ঝড় তাদের সদ্য গড়ে ওঠা সুন্দর ভালোবাসার নীড়টাকে কোন দিকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।
আফতাবের বিষাক্ত উপস্থিতি আরশির রক্ত হিম করে দিল। ঘরের নীরবতা ভেঙে আফতাব এক পা এক পা করে ভেতরে প্রবেশ করল। তার চোখ দুটোতে এক কুৎসিত বিজয়ের হাসি। আরশি পিছাতে পিছাতে দেয়ালের সাথে ঠেকে গেল। বহু বছর আগে যে লোকটা তার আবেগ, অনুভূতি আর জীবনকে পশুর মতো দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছিল, আজ আবার সে হঠাৎ করে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
"তুমি... তুমি এখানে কী করছ? বের হও আমার ঘর থেকে!" আরশি নিজের কাঁপা কণ্ঠস্বরকে যতটা সম্ভব শক্ত করার চেষ্টা করল।
আফতাব একটি শয়তানি হাসি দিয়ে এগিয়ে এসে আরশির খুব কাছাকাছি দাঁড়াল। তার নোংরা নিঃশ্বাস আরশির মুখে এসে লাগতেই আরশির গা গুলিয়ে উঠল। আফতাব এক হাত বাড়িয়ে আরশির চিবুকটা শক্ত করে চেপে ধরল।
"এত বড় সাহস তোমার, আরশি? আমার হাত ছাড়িয়ে তুমি এখানে এসে অন্য পুরুষের সাথে সংসার সাজাচ্ছ? তুমি কী ভেবেছ, আফতাব তোমাকে এত সহজে ছেড়ে দেবে? তোমার এই মিষ্টি শরীর আর সুন্দর মুখটা শুধুই আমার। আদিব নামের ওই চোকরাকে বলে দাও, সে যেন নিজের পথ মাপে। নাহলে তার আর তোমার পরিণতি কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তুমি তো ভালো করেই জানো।"
আরশি আফতাবের হাতটা এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে চিৎকার করে উঠল, "চুপ করো আফতাব! তোমার কোনো অধিকার নেই আমার ওপর! আদিব তোমার মতো নীচ আর কাপুরুষ নয়। তুমি এখান থেকে চলে যাও, না হলে আমি পুলিশ ডাকব!"
আফতাব হা-হা করে হেসে উঠল। "পুলিশ? তুমি পুলিশ ডাকবে? ডেকে দেখো। কিন্তু মনে রেখো, আমার কাছে তোমার এমন কিছু পুরোনো ছবি আর গোপন তথ্য আছে, যা বাজারে ছড়িয়ে দিলে তোমার ওই আদিব আর তার তথাকথিত সম্মান সমাজে মুখ দেখানোর মতো থাকবে না। আমি তোমাকে ধ্বংস করে দেব, আরশি।"
কথাগুলো বলেই আফতাব আরশির মুখে একটি থাপ্পড় বসিয়ে দিল। আঘাতের তীব্রতায় আরশি মেঝিতে পড়ে গেল। আফতাব বিজয়ের হাসি হেসে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। "আমি আবার আসব। আর তখন যদি দেখি তুমি ওই আদিবের কাছে আছ, তবে পরিণতি শুভ হবে না।"
আফতাব চলে যাওয়ার পর আরশি মেঝিতে বসে ফুপিয়ে কেঁদে উঠল। তার পুরোনো ক্ষতের যন্ত্রণাদায়ক অতীত যেন আবার জীবন্ত হয়ে উঠেছে। জীবনের যে কালো অতীতকে সে পেছনে ফেলে এসেছিল, তা আজ আবার এক রাক্ষসের মতো তাকে গিলে খেতে এসেছে। সে কীভাবে আদিবকে রক্ষা করবে? সে যদি আদিবের জীবনে থাকে, তবে আদিবও যে আফতাবের চক্রান্তে ধ্বংস হয়ে যাবে!
সন্ধ্যায় আদিব যখন ঘরে ফিরল, তখন ঘরের আলো নেভানো ছিল। সে বারান্দায় গিয়ে দেখতে পেল আরশি হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে নিঃশব্দে কাঁদছে। আদিব দ্রুত এগিয়ে এসে আরশির সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।
"আরশি! কী হয়েছে তোমার? কাঁদছ কেন?" আদিব উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।
আরশি কিছু না বলে শুধু আদিবের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে জমাট বাঁধানো রক্তের দাগ দেখে আদিবের চোখ দুটো মুহূর্তের মধ্যে লাল হয়ে উঠল। ক্রোধ আর ভালোবাসার তীব্র দাবানল জ্বেলে উঠল তার চোখে।
"কার এত বড় সাহস যে তোমার গায়ে হাত তুলেছে? কে করেছে এটা?" আদিব গর্জে উঠল।
আরশি আদিবের গলা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। "আদিব, তুমি আমাকে ছেড়ে দূরে চলে যাও! আমি অভিশপ্ত! আমার সাথে থাকলে তুমিও ধ্বংস হয়ে যাবে। আফতাব ফিরে এসেছে... সে আমাদের কোনোদিন শান্তিতে বাঁচতে দেবে না।"
আদিব আরশিকে বুক থেকে একটু সরিয়ে তার চোখের দিকে তাকাল। আদিবের ফর্সা মুখ রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। সে আরশির গাল দুটো দুই হাতে চেপে ধরে ভেজা ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়াল। তবে এবার সেই ছোঁয়ায় শুধু কামনা ছিল না, ছিল এক পরম সুরক্ষার অঙ্গীকার। আদিব আরশিকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিয়ে ঘরের ভেতরে নিয়ে এলো।
বিছানায় আরশিকে বসিয়ে আদিব তার সামনে বসে পড়ল। "তুমি কি মনে করো আমি এতই দুর্বল, আরশি? তোমাকে ছেড়ে পালিয়ে যাব? ভালোবাসা মানে শুধু সুখে একসাথে থাকা নয়, বিপদে আগলে রাখাও ভালোবাসা। আফতাব কে, তা আমি জানি। সে একটা পশুর চেয়েও অধম।"
"কিন্তু আদিব... সে তোমাকে মেরে ফেলবে! আমার পুরোনো জীবন তোমাকে গ্রাস করে নেবে!" আরশি ব্যাকুল হয়ে বলল।
আদিব কিছু বলল না। সে সোজা আরশির ওপর ঝুঁকে পড়ল। তার গরম নিঃশ্বাস আরশির গলায় আছড়ে পড়ল। আদিব আরশির ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল অত্যন্ত কামাতুর আর হিংস্র ভালোবাসায়। আরশি নিজেকে সামলাতে না পেরে আদিবকে আঁকড়ে ধরল। আদিবের এক হাত আরশির জামার ভেতর ঢুকে তার নগ্ন পিঠের ওপর দিয়ে নেমে গেল নিচে। আরশির নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠল, তার শরীর আদিবের সোহাগে ধিকধিক করে জ্বলতে লাগল।
আদিব আরশির ভেজা ঠোঁটে কামড় বসিয়ে ফিসফিস করে বলল, "শোনো আরশি, তুমি শুধু আমার। পৃথিবীর কোনো শক্তি তোমাকে আমার কাছ থেকে আলাদা করতে পারবে না। আফতাব তোমার অতীতের ভয় হতে পারে, কিন্তু আমি তোমার বর্তমান আর ভবিষ্যৎ। আজ রাতে আমি তোমাকে আবার প্রমাণ করে দেব, তোমার ওপর শুধু আমারই অধিকার।"
আদিব পরম আবেশে আরশির পোশাক আলগা করে দিতে লাগল। ঘরের তীব্র অন্ধকারে তাদের দুটি শরীর এক অনন্য উত্তাপে মিশে যেতে লাগল। আদিবের তীব্র সোহাগ আর শারীরিক কামনার গভীরে আরশি নিজের সব ভয় আর দ্বিধাকে বিসর্জন দিল। আদিবের প্রতিটি স্পর্শ যেন আরশির মনের ভেতরের জমাট বাঁধা ভয়কে পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছিল। প্রেমের চরম শিখরে পৌঁছে আদিব যখন আরশির শরীরে নিজেকে বিলীন করে দিচ্ছিল, তখন আরশির মুখ থেকে ফুটে বের হলো ভালোবাসার এক চরম আকুতি।
সেই উত্তপ্ত রাতে তাদের দুটি আত্মা আরও গভীরভাবে এক হয়ে গেল। কিন্তু আরশি জানত, এই মধুর রাতের পর আসবে এক মহাপ্রলয়ের সকাল। আফতাব চুপ করে বসে থাকার পাত্র নয়। আগামী কাল কি সে পারবে আদিবের এই ভালোবাসার মর্যাদা রক্ষা করতে? নাকি সে নিজেই আদিবকে বাঁচাতে দূরে সরে যাবে?
পরদিন সকালের আলো যখন পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়ল, আদিব তখনো গভীর ঘুমে মগ্ন। তার এক হাত আরশির অনাবৃত কোমরে দৃঢ়ভাবে জড়িয়ে রাখা। আরশি আস্তে করে আদিবের হাতটি সরিয়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। আদিবের শান্ত, নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে আরশির চোখে জল চলে এলো। সে মনে মনে বলল, "আমাকে মাফ করে দিও আদিব। তোমাকে বাঁচানোর জন্য আমার দূরে চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তুমি আমার জীবনে আসা সবচেয়ে সুন্দর উপহার, কিন্তু আমি তোমাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারি না।"
আরশি একটি চিঠি লিখে টেবিলের ওপর রেখে দিল। দ্রুত নিজের কিছু প্রয়োজনীয় পোশাক একটি ব্যাগে ভরে নিয়ে সে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল। কিন্তু আরশি জানত না, আফতাব বাইরেই তার জন্য অপেক্ষা করছিল।
আরশি যখন গলির মুখে পৌঁছাল, একটি কালো গাড়ি এসে তার সামনে থামল। গাড়ি থেকে আফতাব বের হয়ে আরশির মুখ চেপে ধরে জোর করে গাড়িতে তুলে নিল।
"চালাকি করার চেষ্টা করছিলে, তাই না?" আফতাব পৈশাচিক হেসে বলল। "ভাবলে এভাবে আদিবের হাত থেকে বেঁচে আমার কাছ থেকে পালিয়ে যাবে? আজ তোমাকে এমন জায়গায় নিয়ে যাব, যেখান থেকে ওই আদিব তো দূরের কথা, কোনো জ্বীন-পরীও তোমাকে খুঁজে পাবে না।"
গাড়িটি শহরের এক পরিত্যক্ত গুদামের সামনে এসে থামল। আফতাব আরশিকে টেনে-হিঁচড়ে ভেতরে নিয়ে গেল এবং একটি চেয়ারের সাথে শক্ত করে বেঁধে ফেলল।
অন্যদিকে, ঘুম থেকে উঠে আদিব আরশিকে পাশে না পেয়ে অস্থির হয়ে উঠল। টেবিলে রাখা চিঠিটি পড়ে তার বুকটা কেঁপে উঠল। চিঠিতে আরশি লিখেছে সে আদিবের সুরক্ষার স্বার্থে চিরতরে দূরে চলে যাচ্ছে। আদিব মুহূর্তের মধ্যে বুঝতে পারল, এটা আরশির নিজের ইচ্ছে নয়, আফতাবের ভয় তাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে।
আদিব আর সময় নষ্ট না করে নিজের কিছু বিশ্বস্ত লোক এবং পুলিশকে খবর দিল। তবে তার আগেই সে নিজে আফতাবের সম্ভাব্য আস্তানাগুলোর দিকে রওনা হলো। আদিব জানত আফতাবের পুরোনো ঘাঁটি কোথায়।
পরিত্যক্ত গুদামে আফতাব আরশির খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। সে আরশির গালে হাত বুলিয়ে কুৎসিত ভঙ্গিতে বলল, "অনেক তো হলো আদিবের সাথে খেলা। এবার আমার কথা শোনো। আজ রাতে তুমি আবার আমার হবে।"
আফতাব আরশির জামায় হাত দিতেই আরশি নিজের সর্বশক্তি দিয়ে আফতাবের মুখে থুথু ছিটিয়ে দিল। "ঘৃণা করি তোকে আমি! তুই একটা পশুর চেয়েও নীচ! আদিব তোকে কখনো ছাড়বে না!"
আফতাব রেগে গিয়ে আরশিকে আবার আঘাত করতে চাইল, কিন্তু ঠিক তখনই গুদামের ভারী লোহার দরজাটা এক বিকট শব্দে ভেঙে পড়ল।
ধোঁয়ার মধ্য থেকে বেরিয়ে এলো আদিব। তার চোখে রক্তক্ষয়ী রাগ, চেহারায় এক হিংস্র মূর্তি। আদিবকে দেখে আফতাব খানিকটা চমকে গেলেও সামলে নিয়ে নিজের পকেট থেকে একটি ধারালো ছুরি বের করল।
"ওহ, তো রাজকুমার এসে গেছে নিজের রানীকে বাঁচাতে!" আফতাব উপহাস করল।
আদিব কোনো কথা না বলে বাঘের মতো আফতাবের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। দুজনের মধ্যে তীব্র লড়াই শুরু হলো। আফতাব ছুরি দিয়ে আদিবের হাতে আঘাত করার চেষ্টা করল এবং আদিবের বাহু কেটে রক্ত বের হয়ে এলো। কিন্তু আদিব সেই ব্যথার তোয়াক্কা না করে আফতাবের পেটে তীব্র লাথি মারল। আফতাব ছিটকে গিয়ে মেঝিতে পড়ল। আদিব তার ওপর চেপে বসে একের পর এক কিল-ঘুষি মারতে লাগল। আফতাবের মুখ থেকে রক্ত বের হতে লাগল।
আদিব আফতাবের হাত থেকে ছুরিটি কেড়ে নিয়ে তার গলায় চেপে ধরল। "তোর এত বড় সাহস তুই আমার আরশির গায়ে হাত তুলিস? তোকে আজ আমি মেরেই ফেলব!"
ঠিক তখনই পুলিশ বাহিনীর সাইরেনের শব্দ শোনা গেল। আরশি চিৎকার করে বলল, "আদিব, থামো! প্লিজ ওকে মেরো না! তুমি নিজের হাত রক্তে রাঙিও না! আমাদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য ওকে আইনের হাতে তুলে দাও!"
আরশির আকুল আহ্বানে আদিব থেমে গেল। সে আফতাবকে ছুঁড়ে ফেলে দিল মেঝিতে। পুলিশ ভেতরে ঢুকে আফতাবকে গ্রেপ্তার করল। আফতাব রক্তাক্ত অবস্থায় আদিব ও আরশির দিকে হিংস্র চোখে তাকিয়ে রইল, কিন্তু এবার তার আর কিছু করার ছিল না।
পুলিশ আফতাবকে নিয়ে যাওয়ার পর আদিব দ্রুত আরশির বাঁধন খুলে দিল। বাঁধন মুক্ত হতেই আরশি আদিবের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আদিবের বাহুর জখম থেকে রক্ত ঝরছিল, কিন্তু সে সেদিকে খেয়াল না করে আরশিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
"তুমি কেন আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছিলে, আরশি? তুমি কি বিশ্বাস করোনি যে আমি তোমাকে রক্ষা করতে পারি?" আদিব অভিমানী কণ্ঠে বলল।
আরশি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে আদিবের রক্তাক্ত হাতে নিজের মুখ গুজল। "আমি ভয় পেয়েছিলাম আদিব। তোমার কিছু হয়ে গেলে যে আমি বাঁচতাম না। আমি বুঝতে পেরেছি, অতীতের ভয় থেকে পালিয়ে বেঁচে থাকা যায় না। আজ আমি প্রথমবার নিজের মনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি—আমি আর কখনো তোমার হাত ছাড়ব না।"
আদিব আরশির থুতনি ধরে তার মুখটা ওপরে তুলল। তারপর তার ভেজা, রক্তাক্ত ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। সেই চুম্বনে ছিল জয়ের আনন্দ, সুরক্ষার আশ্বাস আর ভালোবাসার পূর্ণতা। আরশিও আজ আর কোনো বাধা না রেখে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দিল আদিবের প্রেমে।
তারা দুজনে গুদাম থেকে বের হয়ে এলো। সকালের সূর্য তখন মাথার ওপর ঝলমল করছে। অতীতের অন্ধকার মেঘ কেটে গিয়ে আরশি আর আদিবের জীবনে ফুটে উঠেছে এক নতুন ভোর—যেখানে ভয় নেই, শুধু আছে একে অপরকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার এক অনন্ত ভালোবাসা।
....