অক্টোবরের চেনা বিকেলটা হুট করেই কেমন যেন ভারী হয়ে আসল। সামির তখন নিজের অফিসের বিশাল কাচের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিল। বহুতল ভবনের বারো তলা থেকে পুরো ঢাকা শহরটাকে একটা ধোঁয়াটে ক্যানভাসের মতো মনে হয়। ঠিক এই মুহূর্তে ঘড়ির কাঁটা সাড়ে চারটার ঘরে। দরজায় দুইবার মৃদু টোকা পড়ল।
"আসুন," সামির কাচ থেকে মুখ না ফিরিয়েই গম্ভীর গলায় বলল।
দরজা খোলার শব্দ হলো, কিন্তু কোনো কথা শোনা গেল না। শুধু হালকা একটা পরিচিত সুবাস—রজনীগন্ধা আর মিষ্টি চন্দনের মিশ্রণ—বাতাসে ভেসে এল। সামির মুহূর্তে জমে গেল। এই সুগন্ধি সে সাতটি বছর ভুলে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। কিন্তু মস্তিষ্কের কোনো এক গভীর কোণে সেই স্মৃতি অমলিন রয়ে গেছে।
ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল সামির। জানালার বাইরে থেকে আসা বিকেলের ম্লান আলো এসে পড়েছে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির মুখে।
নীরা।
সাতটি দীর্ঘ বছর পর সে দাঁড়িয়ে আছে তার ঠিক সামনে। চোখের কোল কিছুটা বসে গেছে, চেহারায় আগের সেই চপলতা নেই, কিন্তু ঠোঁটের কোণের সেই পরিচিত বাঁধন আর মায়াবী দুটো চোখ বিন্দুমাত্র বদলায়নি। পরনে সাদামাটা একটা নীল রঙের সুতির শাড়ি, আঁচলটা পেঁচিয়ে জড়ানো।
সামিরের হাতের কফির কাপটা সামান্য কেঁপে উঠল। হৃদপিণ্ডের গতি একমুহূর্তে তিনগুণ বেড়ে গেলেও মুখমণ্ডল এক অদ্ভুত বরফশীতল গাম্ভীর্যে ঢেকে নিল সে।
"তুমি?" সামিরের কণ্ঠে কোনো আবেগ ছিল না, ছিল শুধুই ধাতব নীরবতা।
নীরা একপা এগিয়ে এল। তার গলা ধরে আসছিল, "সামির... কেমন আছো?"
"আমার রুমে হঠাৎ কোনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া ঢোকার দুঃসাহস কীভাবে হলো তোমার?" সামির টেবিলের দিকে এগিয়ে এসে কফির কাপটা সশব্দে নামিয়ে রাখল। "আর তুমি কেমন আছো বা আমি কেমন আছি, তা জানার কোনো অধিকার তোমার নেই। সাত বছর আগে যখন কোনো চিঠি বা শেষ বার্তা না দিয়ে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলে, তখনই সব অধিকার শেষ হয়ে গেছে।"
নীরা চোখ দুটো নিচু করল। তার হালকা পাতলা ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল। "আমি জানি আমার ওপর তোমার অনেক অভিমান, সামির। অনেক রাগ। তুমি আমাকে তাড়িয়ে দিতে পারো, গালাগাল করতে পারো। কিন্তু আজকের দিনটার জন্য অন্তত আমাকে পাঁচটা মিনিট শোনো।"
"তোমার কোনো ফালতু ওজর শোনার মতো সময় আমার নেই," সামির কঠিন স্বরে বলল। সে নীরার দিকে এগিয়ে গেল, চোখ দুটোতে আগুনের শিখা। "জানতে চাও এই সাতটা বছর আমার কীভাবে কেটেছে? প্রথম দুই বছর আমি ঢাকার প্রতিটি হাসপাতাল, প্রতিটি গলিতে তোমার ছবি নিয়ে পাগলের মতো ঘুরেছি। ভেবেছি হয়তো কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে, হয়তো কেউ তোমাকে অপহরণ করেছে। আর তারপর যখন বুঝলাম তুমি স্রেফ আমাকে ফেলে পালিয়েছ... তখন আমি কীভাবে তিল তিল করে নিজেকে নিঃশেষ করেছি, তা তুমি কল্পনাসূত্রেও টের পাবে না!"
সামির এত কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল যে নীরা তার গায়ের তপ্ত উষ্ণতা স্পষ্ট অনুভব করতে পারছিল। সামিরের সুগঠিত দীর্ঘদেহী শরীরটা রাগে কাঁপছিল। নীরা হঠাৎ কোনো কথা না বলে সামিরের শার্টের কলারটা চেপে ধরে নিজের দিকে টানল।
হঠাৎ এই টানে সামির কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিল। নীরার চোখ ভরা জল, কিন্তু সেই জলে কান্নার চেয়ে বেশি ফুটে উঠেছে এক তৃষ্ণার্ত আকুলতা।
"তুমি আমার ওপর রাগ দেখাও সামির, কিন্তু আমার শরীর জানে আমি এই সাতটা বছর কতটা আগুনে পুড়েছি," নীরা ফিসফিস করে বলল। তার শ্বাস ঘন হয়ে এল।
সামির ধাক্কা দিয়ে তাকে সরিয়ে দিতে চাইল, কিন্তু নীরার নমনীয় শরীরটা যেন আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল তার শক্ত বুককে। নীরা নিজের শরীরটাকে সামিরের সাথে সম্পূর্ণ মেলালো। তার তপ্ত নিঃশ্বাস সামিরের গলার চামড়ায় আছড়ে পড়তে লাগল।
"ছাড়ো নীরা!" সামিরের কণ্ঠে আদেশ, কিন্তু তার হাত দুটো আর নিয়ন্ত্রণ মানছিল না। সাত বছরের জমে থাকা তীব্র ক্ষোভ, অভিমান আর সুপ্ত বাসনা একসাথে আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল।
সামির নীরার দুই কোমর দুহাতে চেপে ধরল। চেপে ধরে তাকে আরও নিজের শরীরের সাথে লেপটে নিল। তার শক্ত আঙুলগুলো নীরার নরম কামড়ে বসে গেল। নীরা একটা হালকা উফ শব্দ করে চোখের পাতা বন্ধ করে ফেলল।
"তুমি আমাকে ঘৃণা করো সামির, কিন্তু তোমার এই স্পর্শ বলছে তুমি আমাকে কতটা চাও," নীরার কণ্ঠে কামনার স্পষ্ট কাঁপুনি।
সামির তার চেতনার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল। সে এক ধাক্কায় নীরাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। নীরার শাড়ির আঁচলটা খসে মেঝেই পড়ে গেল। সামির তার ভারী মুখটা নীরার উন্মাদের মতো খোলা গলায় নামিয়ে আনল। তার ঠোঁট দুটো নীরার গলার সুকোমল চামড়ায় তীব্র কামড়ে বসে গেল। নীরা মাথাটা পেছনে হেলে দিল, তার বুকটা উথলে উঠছিল তীব্র ভালোবাসায় আর কামনায়।
সামিরের হাত নীরার অনাবৃত কোমরের মসৃণ ভাঁজে নেমে এল। সে শক্ত হাতে নীরাকে আরও ওপরে তুলে এক ঝটকায় তার বিশাল কাচের টেবিলের ওপর বসিয়ে দিল। ফাইলপত্র মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ে এক বিশৃঙ্খলা তৈরি করল, কিন্তু সেদিকে কারো নজর ছিল না।
সামিরের ঠোঁট তখন নীরার উন্মুক্ত কাঁধ আর গলার ভাঁজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে যেন এক বুভুক্ষু প্রাণীর মতো এতদিনের শূন্যতা পুষিয়ে নিতে চাইছে। নীরার হাত সামিরের চুলে জড়িয়ে গেল, সে সামিরের চুলগুলো শক্ত করে আঁকড়ে ধরে তাকে আরও গভীরে টানল।
"সামির... আরও..." নীরার হাঁপানো গলায় ভেসে এল সুতীব্র আকুতি।
সামির নীরার ঠোঁট দুটোকে নিজের ঠোঁটের মধ্যে পুরে নিল। এক হিংস্র, তীব্র এবং গভীর চুমু। সেই চুমুতে কোনো করুণা ছিল না, ছিল শুধুই অধিকার আর সাত বছরের পুষে রাখা ক্ষোভের আগুন। নীরা নিজের ঠোঁট দুটো সঁপে দিল সম্পূর্ণভাবে। তাদের তপ্ত নিঃশ্বাস ঘরের বাতাসের তাপমাত্রা একধাক্কায় বাড়িয়ে দিল।
সামিরের এক হাত নীরার উন্মুক্ত পিঠের ওপর দিয়ে নেমে এসে তার শাড়ির কুঁচি শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। তার বুকের সাথে নীরার উন্নত বুকের উত্তপ্ত ঘর্ষণ দুজনের রক্তেই আগুন জ্বালিয়ে দিল। নীরার শাড়ির ব্লাউজের ওপর দিয়ে সামিরের বুড়ো আঙুলের চাপ পড়তেই নীরা কেঁপে উঠল, তার গলা দিয়ে একটা অব্যক্ত কান্নার মতো গোঙানি বের হয়ে এল।
হঠাৎ সামির থেমে গেল। সে নীরার ঠোঁট থেকে নিজের ঠোঁট সরিয়ে নিল, কিন্তু তার শ্বাস তখনো দ্রুত বইছে। সে নীরার চোখের দিকে তাকাল। নীরার চোখ দুটো কামনায় আচ্ছন্ন, ঠোঁট দুটো লাল হয়ে ফুলে উঠেছে, স্তন জোড়া দ্রুত ওঠানামা করছে।
সামির নিজেকে পিছিয়ে নিল। তার নিজের ওপরই চরম রাগ হতে লাগল। এই মেয়েটা সাত বছর পর এসে আবারও তাকে এক মুহূর্তে দুর্বল করে দিল!
"না," সামির নিজেকে সামলে নিয়ে দরজার দিকে ফেরা করল। তার কণ্ঠস্বর আবার বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে এল। "শারীরিক দুর্বলতা দিয়ে অতীত মুছে ফেলা যায় না নীরা। তুমি ভেবেছ তোমার এই রূপ, এই শরীর দিয়ে আমাকে আবার ভোলাবে? আমাকে খেলনা বানাবে?"
নীরা মেঝেই পড়ে থাকা শাড়ির আঁচলটা তুলে নিয়ে নিজের শরীর ঢাকল। তার চোখে কামনার ঘোর মিলিয়ে গিয়ে ফিরে এল এক গভীর বিষাদ। সে টেবিল থেকে নেমে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
"আমি তোমাকে ভোলানোর জন্য শরীর দিনি সামির," নীরার গলা কাঁপছিল, "আমি শুধু তোমাকে বোঝাতে চেয়েছিলাম যে এই সাত বছর ধরে আমি প্রতিদিন ঠিক এভাবে মরেছি। আমার শরীর আর আত্মা শুধু তোমার জন্যই তৃষ্ণার্ত ছিল। তুমি যদি আমাকে ক্ষমা না-ও করো, অন্তত সেই সত্যটা শোনার সুযোগ দাও, যার জন্য আমি তোমাকে ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম।"
সামির ঘড়ির দিকে তাকাল। তারপর নীরাকে এড়িয়ে গিয়ে নিজের চেয়ারে বসল।
"আমার হাতের কাজ শেষ হতে আরও এক ঘণ্টা লাগবে," সামির ফাইল খুলতে খুলতে নির্লিপ্ত গলায় বলল। "টেবিলে বোতল আছে, পানি খাও। এক ঘণ্টা পর তোমার ওই তথাকথিত 'সত্য' শুনব। আর তারপর তুমি আমার জীবন থেকে চিরতরে চলে যাবে।"
নীরা কিছু বলল না। সে গিয়ে একপাশের সোফায় বসে পড়ল। কাচের জানালার বাইরে ততক্ষণে রাতের অন্ধকার নেমে এসেছে, ঠিক যেমনটা তাদের দুজনের জীবনের ওপর সাত বছর আগে নেমে এসেছিল।
রাত সাড়ে আটটা। অফিসের বহুতল ভবনের বিশাল কাচের জানালার বাইরে ঢাকা শহরের রঙিন বাতিগুলো জ্বলছে। শহরের কোলাহল বারো তলার এই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে পৌঁছায় না। এখানে থমথম করছে এক ভারী নীরবতা।
সামির ল্যাপটপের স্কিন থেকে চোখ সরিয়ে সোফার দিকে তাকাল। নীরা একইভাবে বসে আছে, হাঁটুর ওপর দুহাত জড়ো করা, দৃষ্টি মেঝের দিকে নিবদ্ধ। তার শাড়ির আঁচলটা এখনো খানিকটা অগোছালো, গলার কাছে সামিরের কামড়ের লাল দাগটা স্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে। সেই দাগটার দিকে তাকাতেই সামিরের শরীরের ভেতর আবার এক অদ্ভুত উত্তাপ জেগে উঠল, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল।
সামির চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে নীরার মুখোমুখি অন্য একটি সোফায় বসল। টেবিলের ওপর কফির দুটো ধোঁয়া ওঠা কাপ রাখা।
"সময় শেষ," সামিরের গম্ভীর গলার শব্দে নীরা চমকে উঠে তাকাল। সামির শান্ত কিন্তু শক্ত কণ্ঠে বলল, "এবার বলো, কী এমন মহান সত্য ছিল যার জন্য আমাকে সাতটা বছর নরকযন্ত্রণা পোহাতে হলো?"
নীরা কফির কাপে হাত না দিয়ে এক গভীর শ্বাস নিল। তার চোখের কোণে পানি জমে উঠল, কিন্তু সে তা গাল বেয়ে পড়তে দিল না।
"সাত বছর আগের সেই বৃষ্টির রাতটার কথা মনে আছে সামির?" নীরার কণ্ঠস্বর কাঁপছিল। "যেদিন আমরা প্রথম এক হয়েছিলাম... যেদিন তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, তোমার এই ভালোবাসার কোনো শেষ নেই?"
সামির চোয়াল শক্ত করে চোখ ঘুরিয়ে নিল। সেই রাতের স্মৃতি সে কখনো ভুলতে পারেনি। সেই তীব্র ভালোবাসার রাতটার পরদিনই নীরা গায়েব হয়ে গিয়েছিল।
"তোমার বাবা," নীরা ফিসফিস করে বলল।
সামির ঝটকা মেরে নীরার দিকে তাকাল, "আমার বাবা? মানে?"
"হ্যাঁ, সামির। তোমার আব্বা," নীরা সোজা সামিরের চোখের দিকে তাকাল। "তুমি যখন অফিসে ছিলে, উনি আমাদের বাসায় এসেছিলেন। আমার হাতে এক কোটি টাকার একটা চেক দিয়ে বলেছিলেন তোমাকে ছেড়ে চলে যেতে। কারণ উনার মতে, আমার মতো মধ্যবিত্ত ঘরের অনাথ মেয়ে তোমার মতো প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর পরিবারের বউ হওয়ার যোগ্য নয়।"
সামির এক উপহাসের হাসি হাসল, "কী নাটকীয় গল্প! আর তুমি ওই টাকার লোভে আমাকে ছেড়ে চলে গেলে? বাহ্!"
"আমি চেকটা উনার মুখের ওপর ছিঁড়ে ফেলেছিলাম!" নীরা গর্জে উঠল। তার চোখে জমে থাকা অশ্রু এবার বাঁধ ভাঙল। "আমি কোনো টাকার লোভে যাইনি সামির। কিন্তু উনি তারপর আমাকে যে ছবিগুলো দেখিয়েছিলেন... তা দেখার পর আমার কাছে আর কোনো পথ খোলা ছিল না।"
সামির ভ্রূ কুঁচকে ফেলল, "কিসের ছবি?"
"তোমার ছোট বোন নাবিলাকে মনে আছে? তখন সে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়েছিল," নীরার গলা ধরে এল। "তোমার আব্বা আমাকে একটা ভিডিও আর কিছু ছবি দেখান। নাবিলাকে কিছু গুন্ডা তুলে নিয়ে আটকে রেখেছিল। তোমার আব্বা আমাকে স্পষ্ট ভাষায় বলেন—আমি যদি চোরের মতো তোমার জীবন থেকে সরে না যাই, তবে উনার নিজের লোক দিয়েই নাবিলাকে গণধর্ষণ করানো হবে এবং সেই ভিডিও ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়া হবে। উনি নিজের সম্মান আর বংশমর্যাদা বাঁচানোর জন্য নিজের মেয়েকে বলির পাঠা বানাতেও পিছপা হতেন না, শুধু তোমাকে আমার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য!"
সামিরের বুকের ভেতরটা যেন এক মুহূর্তে খালি হয়ে গেল। তার মাথা ঘুরতে লাগল। তার আব্বা... অত্যন্ত কঠোর আর স্বৈরাচারী একজন মানুষ ছিলেন, যিনি নিজের অহংকার ও পারিবারিক স্ট্যাটাসের জন্য যেকোনো সীমা অতিক্রম করতে পারতেন। নাবিলা সেই সময়ে হঠাৎ করে বিষ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল—যা সামির এতদিন ভেবে এসেছে অন্য কোনো কারণে হয়েছিল!
"তুমি... তুমি মিথ্যা বলছো!" সামিরের কণ্ঠস্বর কাঁপতে শুরু করল।
"আমার কাছে আজও সেই হুমকি বার্তার অডিও রেকর্ড আছে সামির," নীরা তার ব্যাগ থেকে একটা পুরোনো মেমোরি কার্ড বের করে টেবিলের ওপর রাখল। "তোমার আব্বা আমাকে চব্বিশ ঘণ্টা সময় দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আমি যদি তোমাকে একটা শব্দও বলি, তবে পরদিন সকালে তোমার বোনের লাশ পাওয়া যাবে। বলো সামির, আমি কী করতাম? নিজের ভালোবাসার জন্য তোমার নির্দোষ ছোট বোনটার জীবন ছারখার হতে দিতাম? তোমার পরিবারকে ধ্বংস করে দিতাম?"
সামির স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তার চোখ দিয়ে রক্তবর্ণের রাগ আর অনুশোচনার জল ঝরতে লাগল। যে মানুষটাকে সে সাতটা বছর ধরে বিশ্বাসঘাতক, সুযোগসন্ধানী আর প্রতারক ভেবে ঘৃণা করে এসেছে, সেই মানুষটা আসলে তার পরিবারকে বাঁচানোর জন্য নিজের সমস্ত সুখ কোরবানি দিয়ে নিঃশব্দে সরে গিয়েছিল!
"তুমি আমাকে বললে না কেন নীরা? আমরা দুজন মিলে লড়াই করতাম..." সামিরের গলা দিয়ে আর শব্দ বের হচ্ছিল না। সে সোফা থেকে উঠে নিচে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল নীরার পায়ের কাছে।
"কীভাবে বলতাম সামির? তোমার আব্বা চারপাশে লোক রেখেছিলেন। আমি শুধু নাবিলাকে বাঁচাইনি, আমি তোমাকেও বাঁচাতে চেয়েছিলাম। তুমি তোমার বাবার বিরুদ্ধে গেলে উনি তোমাকে নিঃস্ব করে দিতেন, হয়তো তোমাকেও মেরে ফেলতেন," নীরা দুহাতে সামিরের মুখটা তুলে ধরল।
দুজনের চোখেই তখন নোনা জলের জোয়ার। সাত বছরের জমে থাকা সমস্ত ক্ষোভ, অভিমান আর ভুল বোঝাবুঝি সেই অশ্রুতে ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেল। সামির নিজের দুটো হাত নীরার উরুর ওপর রাখল। নীরার শাড়ির নরম কাপড়ের ওপর দিয়ে তার তপ্ত হাতের স্পর্শ পেতেই নীরা শিউরে উঠল।
"আমাকে ক্ষমা করে দাও নীরা... আমি তোমাকে চিনতে ভুল করেছি," সামির মাথা নিচু করে নীরার কোল জুড়ে মুখ গুঁজে দিল। সে বাচ্চাদের মতো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
নীরা সামিরের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে তাকে টেনে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। সামিরের মুখ এখন নীরার উন্মাদের মতো কাঁপতে থাকা স্তন জোড়ার মাঝে চেপে আছে। নীরার গায়ের সুবাস, তার শরীরের উত্তাপ সামিরের মাথা পুরোপুরি গুলিয়ে দিল। সাত বছরের অনুশোচনা আর ভালোবাসার ক্ষুধা একসাথে আবার জেগে উঠল।
সামির মুখ তুলল। তার চোখে এখন আর রাগ নেই, আছে এক সুতীব্র কামুক আকুলতা। সে হাত বাড়িয়ে নীরার শাড়ির আঁচলটা টেনে সরিয়ে দিল। নীরার ব্লাউজের ভেতরের মসৃণ চামড়া বিকেলের ভালোবাসার ছাপে এখনো লাল হয়ে আছে।
"সাত বছর নীরা... সাতটা বছর আমি প্রতিটা রাতে মরেছি," সামির বিড়বিড় করে বলল। তার হাত নীরার উন্মুক্ত উরু বেয়ে শাড়ির ফাঁক গলে ওপরে উঠতে লাগল।
নীরা চোখ বন্ধ করে এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় আগুনের হোলি খেলা শুরু হয়ে গেছে। সে সামিরের শার্টের বোতামগুলো একে একে খুলতে শুরু করল।
"তাহলে আজ রাতে আমাকে আবার বাঁচিয়ে তোলো সামির," নীরার ফিসফিসানি ঘরে ছড়িয়ে পড়ল। "আজ আমাদের মাঝে কেউ নেই... না তোমার বাবা, না কোনো অতীত।"
সামির নীরাকে দুহাতে কোলে তুলে নিল। অফিসের ওই বিশাল সোফাটায় সে নীরাকে শুইয়ে দিল। নীরার শাড়ি পুরো খুলে নিচে পড়ে গেল। শুধু পাতলা ব্লাউজ আর পেটিকোটে আবদ্ধ নীরাকে দেখে সামিরের ভেতরের পুরুষটা কামনায় উন্মত্ত হয়ে উঠল।
সামির নীরার ওপর ঝুঁকে পড়ল। তার ঠোঁট আবার গিয়ে পড়ল নীরার ঠোঁটে, কিন্তু এবারের চুমুটা আগের চেয়ে অনেক বেশি গভীর, অনেক বেশি তৃষ্ণার্ত এবং ব্যাকুল। নীরা তার পা দুটো সামিরের কোমর জড়িয়ে ধরল। সামিরের শক্ত উন্মুক্ত বুক নীরার নরম স্তনের সাথে ঘষে যেতেই নীরা কামনার চরম শিখরে পৌঁছে একটা সুতীব্র আর্তনাদ করে উঠল।
সামিরের হাত নীরার পেটিকোটের ফিতা খুলে দিল। অন্ধকারে দুজনের দুটো নগ্ন তপ্ত শরীর এক হয়ে মিশে যেতে লাগল... সাত বছরের অপেক্ষার বরফ গলে এক উত্তাল নদীর সৃষ্টি হলো।
অফিসের আবছা আঁধারে ঘরের বাতাস এখন ভারি ও উত্তপ্ত। কামনার তীব্র আগুনে জমে থাকা সাত বছরের বরফ গলে জল হয়ে গেছে। সোফার ওপর দুটো নগ্ন শরীর একের পর এক তরঙ্গের মতো মিশে যাচ্ছিল। সামিরের প্রতিটি হাঁপানো শ্বাস আর নীরার সুতীব্র আকুলতায় ভরা গোঙানি ঘরের চার দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুলছিল।
সামির তার সমস্ত শক্তি আর গভীর ভালোবাসা দিয়ে নীরাকে নিজের করে নিচ্ছিল। তার ঘামে ভেজা শক্ত বুক নীরার সুকোমল, অনাবৃত বুকের সাথে বারবার আছড়ে পড়ছিল। নীরা তার পা দুটো দিয়ে সামিরের কোমর আরও শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল। তার হাতের নখগুলো সামিরের পিঠের চামড়ায় বিঁধে যাচ্ছিল, কিন্তু সামিরের তাতে কোনো ভ্রূক্ষেপ ছিল না। এই যন্ত্রণা তার কাছে সাত বছরের অপূর্ণতার চেয়ে অনেক বেশি মধুর।
"সামির... আরও গভীরে... আমাকে এক করে নাও তোমার সাথে," নীরা কামনার চরম শিখরে পৌঁছে ফিসফিসিয়ে উঠল, তার চোখের কোণ দিয়ে আনন্দের জল গড়িয়ে পড়ছিল।
সামির নীরার দুই উরু আরও উঁচুতে তুলে ধরে নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিল। তাদের প্রতিটি গতি যেন সাত বছরের সমস্ত কষ্ট, বিরহ আর অনুশোচনাকে পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছিল। নীরা তার মাথাটা পেছনে হেলে দিল, গলার রগগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠল। অবশেষে এক সুতীব্র, বাঁধভাঙা তৃপ্তির অনুভূতির সাথে দুজন দুজনকে আঁকড়ে ধরে নিথর হয়ে পড়ে রইল।
বাইরের শহরের কোলাহল থেমে গেছে। ঘরের ভেতর শুধু তাদের দুজনের দ্রুত চলা শ্বাসের শব্দ।
অনেকক্ষণ পর, সামির ধীরে ধীরে নীরার ওপর থেকে সরে এসে তাকে নিজের শক্ত বাহুডোরে টেনে নিল। সোফার ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শাড়িটা টেনে এনে নীরার নগ্ন শরীর ঢেকে দিল সে। নীরার মাথাটা তখন সামিরের চওড়া বুকটার ওপর রাখা, হাত দুটো সামিরের পেটে জাড়িয়ে ধরা।
সামির নীরার চুলে মৃদু চুমু এঁকে দিল। "তুমি কতটা ভুল বুঝেছ আমাকে নীরা! ভেবেছিলে আমি তোমার এই আত্মত্যাগ জানতে পারলে তোমাকে ভালো রাখতাম? নাবিলাকে বাঁচানোর জন্য তুমি নিজেকে শেষ করে দিলে, আর আমি না জেনে তোমাকে প্রতিদিন অভিশাপ দিয়েছি।"
নীরা সামিরের বুকে নিজের মুখটা আরও একটু গুঁজল। তার শরীরে এখনো সেই তীব্র মিলনের তপ্ত অনুভূতি জেগে আছে। "তুমি জানতে পারলে তোমার বাবার মুখোমুখি হতে সামির। পরিবারটা ভেঙে খানখান হয়ে যেত। নাবিলা মানসিকভাবে বাঁচত না। আমি তো অনাথ, আমার হারানোর কিছু ছিল না... শুধু তোমাকে ছাড়া।"
"না নীরা," সামির শক্ত কণ্ঠে বলল। তার আঙুল নীরার গালে গড়িয়ে পড়া এক ফোটা জল মুছে দিল। "আমার আব্বা তিন বছর আগে মারা গেছেন। মৃত্যুর আগে উনি নাবিলার কাছে নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে গেছেন। কিন্তু আমার কাছে এই সত্যটা উনি কখনো বলে যাননি। আজ যদি তুমি না আসতে, তবে আমি সারা জীবন এক ভুল সত্য নিয়ে বেঁচে থাকতাম।"
নীরা মুখ তুলে সামিরের দিকে তাকাল। তার চোখে এক অনিশ্চিত ভয়, "এখন তবে কী হবে সামির? অতীত কি আমাদের ক্ষমা করবে? আমরা কি আবার নতুন করে শুরু করতে পারব?"
সামির নীরাকে সোফায় বসিয়ে নিজে উঠে দাঁড়াল। মেঝেই পড়ে থাকা নিজের জামাকাপড়গুলো পরে নিল। তারপর নীরার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তার দুটো নরম হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল।
"অতীতকে ক্ষমা করার কিছু নেই নীরা, অতীত আমাদের শিখিয়েছে আমাদের ভালোবাসা কতটা শক্ত," সামিরের কণ্ঠে এখন আর কোনো দ্বিধা নেই, আছে এক অদম্য নিশ্চয়তা। "আমার এই সাম্রাজ্য, এই টাকা-পয়সা, সাফল্য—সবকিছুর পেছনে যে কষ্ট লুকিয়ে ছিল, তা আজ শেষ হলো। আজ রাতে আমি তোমাকে আবার বাড়ি নিয়ে যাব। আমার ঘরে, আমাদের ঘরে।"
নীরা কেঁদে ফেলল, কিন্তু এবার সেই কান্না ছিল স্বস্তির, পাওয়ার আনন্দে ভরা। সে শাড়িটা তড়িঘড়ি করে গায়ে জড়িয়ে নিয়ে সামিরের গলায় জড়িয়ে পড়ল।
"আমি আর কখনো তোমাকে ছেড়ে যাব না সামির, কখনো না।"
সামির তাকে শক্ত করে কোলে তুলে নিল। কাচের জানালার বাইরে ঢাকা শহরের পুব আকাশে তখন ভোরের হালকা আলো ফুটতে শুরু করেছে। রাতের অন্ধকার কেটে গিয়ে যেমন নতুন সূর্যের আলো ছড়াচ্ছে, তেমনি তাদের দুজনের জীবনের দীর্ঘ সাত বছরের অন্ধকার ধুয়েমুছে এক নতুন ভোর নেমে এসেছে।
পুরোনো অভিমান আর গোপন সত্যের ছাই ভস্ম করে দিয়ে ভালোবাসা আবার পুনর্জন্ম নিল—আরও তীব্র, আরও গভীর এবং চিরন্তন হয়ে।
....