তার নীরব ত্যাগের গল্প

ঢাকা শহর যখন সন্ধ্যার যানজটে ধুঁকছে, তানভীর তখন নতুন অ্যাপার্টমেন্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাচ্ছিল। বিশালাকার এই ফ্ল্যাটটি তার এক দূরসম্পর্কের খালার, যিনি পরিবারসহ আপাতত প্রবাসে আছেন। তানভীরের একা থাকার কথা ছিল, কিন্তু দুই দিন আগে হুট করেই পুরো পরিস্থিতি উল্টে যায়। তার খালার ঘনিষ্ঠ এক পরিচিতের মেয়ে নীলা এসে ওঠে এই বাড়িতে। ঢাকা ভার্সিটিতে মাস্টার্সে ভর্তির পরীক্ষা দেবে, হোস্টেলের সিট না পাওয়া পর্যন্ত সাময়িকভাবে এখানেই থাকতে হচ্ছে তাকে।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

আর এই শুরু থেকেই দুজনের রসায়নটা অম্ল আর ক্ষারের মতো—একই পাত্রে রাখলেই বিস্ফোরণ।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

ঘরের ভেতরে নীলার পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল। তানভীর পেছন ফিরে তাকাল না। কিন্তু ঘরের নরম আলোয় বারান্দার কাঁচে প্রতিফলিত হলো নীলার প্রতিচ্ছবি। নীলার পরনে সুতির লাল রঙের সাধারণ একটি সালওয়ার কামিজ, ভেজা চুল পিঠে ছড়ানো। তানভীরের ঠোঁটের কোণে ঠাট্টার হাসি ফুটে উঠল।

 

“আমার ধোঁয়া সহ্য না হলে নিজের ঘরে গিয়ে বসতে পারো,” তানভীর না তাকিয়েই বলল, কণ্ঠে সুস্পষ্ট বিরক্তি।

 

নীলা এক পা এগিয়ে বারান্দার দরজায় এসে দাঁড়াল। তার চোখে মুখে রাগের স্পষ্ট ছাপ। “আপনাকে কায়দা শেখানো আমার কাজ নয়, তবে এতটুকু ভদ্রতা জানা উচিত যে ঘরে অন্য কেউ থাকলে মুখের ওপর বিষাক্ত ধোঁয়া ছাড়া যায় না। আর খালার বাসা বলে কি আপনি পুরো বাড়ির মালিক হয়ে বসে আছেন?”

 

তানভীর ধীরেসুস্থে সিগারেটে শেষ টান দিয়ে সেটা অ্যাশট্রেতে নিভিয়ে দিল। তারপর ঘুরে দাঁড়াল। ছয় ফুট লম্বা তানভীরের ছায়া ঢাকা পড়ল নীলার ওপর। নীলা কিছুটা নিচু হলেও একবিন্দু দমল না, বরং থুতনি উঁচু করে তানভীরের চোখের দিকে চাইল।

 

“বাড়ির মালিক আমি নই, কিন্তু তুমিও নও নীলা,” তানভীর গলার স্বর কিছুটা নিচে নামিয়ে বলল। তার কথাগুলোতে যেন হালকা ধার। “আর আমার ঘরের বা আমার আশেপাশের বাতাসে কী থাকবে, সেটা আমি ঠিক করব। মানিয়ে নিতে না পারলে বিকল্প পথ খোলাই আছে।”

 

“অপমানের সীমা থাকা উচিত, তানভীর সাহেব!” নীলা দাঁতে দাঁত চেপে বলল। “আমি বাধ্য হয়ে এই কয়েকটা দিন এখানে আছি। আপনার মেজাজ সহ্য করার জন্য নয়।”

 

“তাহলে সহ্য করছ কেন?” তানভীর আরও এক পা এগিয়ে এলো।

 

তানভীরের অনাকাঙ্ক্ষিত এই ঘনিষ্ঠতায় নীলার বুকটা হুট করেই ধক করে উঠল। তানভীরের গা থেকে দামী পুরুষালি পারফিউম আর হালকা তামাকের একটা অদ্ভুত তীব্র ঘ্রাণ আসছিল। ঘরের হালকা আলোয় তানভীরের চোয়ালের শক্ত হয়ে যাওয়া আর গভীর চোখের চাহনি দেখে নীলা এক মুহূর্তের জন্য যেন ভাষা হারিয়ে ফেলল। কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে এক পা পিছিয়ে গেল সে।

 

“আপনার মতো অহংকারী আর বেয়াদব মানুষের সাথে কথা বলাই ভুল,” মুখ ঘুরিয়ে ঘরে চলে গেল নীলা।

 

তানভীর কেবল একটু হাসল। একগুঁয়ে মেয়েটাকে রাগাতে তার বেশ আনন্দই হচ্ছে। কিন্তু একই সাথে, নীলার ঐ মায়াবী কালো চোখ আর ভেজা চুলের সুবাস যে তার স্নায়ুতে অদ্ভুত এক দোলা দিয়ে গেল, তা তানভীর নিজের মনেও স্বীকার করতে চাইল না।

 

পরদিন সকালের পরিবেশটা আরও উত্তপ্ত। ঢাকা শহরের আকাশ আজ মেঘলা, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি নামছে।

 

নীলা কিচেনে চা বানাতে গিয়েছিল। তানভীর টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে এক হাতে ল্যাপটপ নিয়ে কিচেনের দরজায় এসে দাঁড়াল। নীলার দিকে না তাকিয়েই সে বলল, “আমার জন্য এক কাপ লিকার চা দাও। চিনি ছাড়া।”

 

নীলা চুলা থেকে কেটলি নামাতে নামাতে উত্তর দিল, “আমি আপনার গৃহপরিচারিকা নই। বুয়া সকালে কাজ করে গেছে, আপনার যা লাগে নিজে বানিয়ে নিন।”

 

তানভীর ল্যাপটপটা পাশের ডাইনিং টেবিলে রাখল। তারপর বেশ ধীরে ধীরে কিচেনের ভেতরে প্রবেশ করল। কিচেনটা ছোট, দুজন মানুষের জন্য জায়গাটা বেশ সংকীর্ণ। তানভীর এসে একদম নীলার ঠিক পেছনে দাঁড়াল। নীলা কাপে চা ঢালছিল, পেছনে কারও তীব্র উপস্থিতি টের পেয়ে সে চমকে উঠে পেছনে ঘুরতে গেল।

 

আর অমনি অঘটনটা ঘটল।

 

নীলার হাতের চায়ের কাপ থেকে গরম কাপের সামান্য চা উপচে পড়ল তার নিজেরই কামিজের ওপর, আর সাথে সাথে হাত থেকে কাপটা পড়ে গিয়ে টাইলসের মেঝেতে চুরমার হয়ে গেল। গরম চায়ের ছ্যাঁকা লেগে নীলা এক হাত দিয়ে অন্য হাত চেপে ধরে ব্যথায় কোঁকড়ে উঠল, “আহ্‌!”

 

তানভীর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। সব রাগ, সব দ্বিধা নিমেষে উবে গেল। সে এক ঝটকায় নীলার হাতটা ধরে টান দিয়ে বেসিনের নিচে নিয়ে গেল এবং ট্যাপের ঠান্ডা পানি ছেড়ে দিল।

 

“পাগল নাকি তুমি? এত অমনোযোগী কেন?” তানভীরের কণ্ঠে রাগের চেয়ে বেশি ছিল এক ধরণের অচেনা আতঙ্ক।

 

“ছাড়ুন আমাকে! আপনার জন্যই তো...” নীলা ছটফট করে হাত ছাড়াতে চাইল, কিন্তু তানভীরের শক্ত গ্রিপ তাকে একচুলও নড়তে দিল না।

 

“চুপ একদম চুপ!” তানভীর গর্জে উঠল। তার স্বর নীলার কানের এত কাছে ছিল যে নীলা শিউরে উঠল।

 

ঠান্ডা পানি নীলার হাতের পোড়া জায়গায় পড়ছে। তানভীরের অন্য হাতটি ছিল নীলার কোমরের ঠিক পেছনের দেয়ালে ঠেস দেওয়া। তাদের শরীর এত কাছাকাছি ছিল যে নীলা তানভীরের বুকের দ্রুত ওঠানামা স্পষ্টভাবে অনুভব করতে পারছিল। তানভীরের শার্টের সুতি কাপড়ের ওপর দিয়ে তার শরীরের উষ্ণতা নীলার ভিজে যাওয়া কাপড়ে এসে লাগছিল।

 

নীলা হাত ছাড়ানোর চেষ্টা থামিয়ে তানভীরের মুখের দিকে তাকাল। এত কাছ থেকে তানভীরের তীক্ষ্ণ নাক, ঘন পাপড়ি আর ঠোঁটের খাঁজ দেখে তার বুকটা কেঁপে উঠল। তানভীরের সমস্ত মনোযোগ তখন নীলার হাতের পোড়া অংশটার দিকে। তার চোখে তখন কোনো তাচ্ছিল্য নেই, কেবল এক অদ্ভুত ব্যাকুলতা।

 

“ব্যথা কি খুব বেশি করছে?” তানভীর শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল, তার চোখ দুটি নীলার চোখে স্থির হলো।

 

সেই চাহনিতে এমন কিছু ছিল যা নীলাকে বাকরুদ্ধ করে দিল। পুরো ঘরের নীরবতার মাঝে শুধু বেসিনের পানির শব্দ আর দুজনের দ্রুত নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। নীলা কেবল মাথা নেড়ে না বলল, কিন্তু তার চোখ তানভীরের ঠোঁটে আটকে গেল।

 

তানভীরও যেন সাময়িক দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। সে ধীরে ধীরে নীলার ভিজে যাওয়া হাতের ওপর নিজের আঙুল বুলাল। সেই স্পর্শ ঠান্ডা পানির চেয়েও বেশি বিদ্যুৎ তরঙ্গ ছড়িয়ে দিল নীলার পুরো শরীরে। তানভীরের এক হাত নীলার পিঠ বেয়ে ওপরের দিকে উঠে এলো, তার বুড়ো আঙুল আলতো করে নীলার থুতনি স্পর্শ করল। নীলার ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁক হয়ে গেল, এক গভীর নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো তার ভেতর থেকে।

 

তানভীর ঝুঁকে এলো। তাদের ঠোঁটের মাঝের দূরত্ব তখন কয়েক মিলিমিটার। তানভীরের উত্তপ্ত নিঃশ্বাস নীলার গাল আর ঠোঁটকে ভিজিয়ে দিচ্ছিল। নীলা চোখ বন্ধ করে ফেলল, তার হৃদস্পন্দন তখন চরম সীমায়। তানভীরের ঠোঁট নীলার ঠোঁটের কাছে এসে থেমে গেল, এক অদৃশ্য আকর্ষণে দুজনই যেন নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছিল। তানভীরের হাত নীলার কোমর শক্ত করে চেপে ধরল, তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল।

 

কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে জোরে এক পশলা বৃষ্টি নামার সাথে সাথে বিকট শব্দে বিজলী চমকে উঠল।

 

সেই শব্দে দুজনেরই মোহ ভঙ্গ হলো।

 

তানভীর হুট করে দুই ধাপ পিছিয়ে গেল। সে নিজের কপাল চেপে ধরে একটা বড় নিঃশ্বাস নিল। তারপর নীলার দিকে না তাকিয়েই মেঝের ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলোর দিকে তাকাল।

 

“বাকিটা বরফ দিয়ে সেঁক দাও। সাবধানে থেকো,” বেশ যান্ত্রিক আর রুক্ষ গলায় কথাগুলো বলে তানভীর দ্রুত কিচেন থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল।

 

নীলা বেসিনের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার হাত এখনও কাঁপছে। ঠোঁটে তানভীরের উত্তপ্ত নিঃশ্বাসের স্পর্শটা তখনও তাজা। তার সারা শরীরে এক অচেনা রোমাঞ্চ আর ব্যাকুলতা ছড়িয়ে পড়েছে। সে যাকে নিজের প্রতিপক্ষ ভেবেছিল, যাকে প্রচণ্ড অপছন্দ করত, তার এক একটি স্পর্শ কেন তাকে এতটা বিহ্বল করে দিচ্ছে?

 

নিজের বুকের ভেতরের ঝড় সামলাতে না পেরে নীলা বেসিনের জলে মুখ ধুয়ে নিল। কিন্তু মনের গভীরে জমা হওয়া অদ্ভুত এক তীব্র টান সে কিছুতেই মুছে ফেলতে পারল না।

 

রাত তখন প্রায় একটা। বৃষ্টির বেগ আরও বেড়েছে। ঝোড়ো হাওয়ায় বারান্দার দরজাগুলো দাপাদাপি করছে।

 

বাড়ির ইলেকট্রিসিটি চলে গেছে একটু আগে। পুরো ফ্ল্যাট অন্ধকারে নিমজ্জিত। নীলা তার ঘরে একটা ছোট জরুরি লাইট জ্বেলে বসে ছিল। কিন্তু হুট করেই ড্রয়িং রুমের দিক থেকে কাঁচ ভাঙার বা ভারী কিছু পড়ার একটা বিকট শব্দ এল।

 

নীলা ভয় পেয়ে গেল। মোমবাতি হাতে নিয়ে সে ভয়ে ভয়ে নিজের ঘর থেকে বের হলো।

 

“তানভীর সাহেব?” নীলা ফিসফিস করে ডাকল।

 

কোনো উত্তর নেই।

 

ড্রয়িং রুমে এসে নীলা দেখল বারান্দার দরজা খোলা, প্রবল হাওয়ায় বৃষ্টি ঘরের ভেতরে চলে আসছে। আর বারান্দার ঠিক পাশেই তানভীর মেঝেতে বসে আছে। তার সোফার পাশে রাখা দামী শোপিসটা নিচে পড়ে ভেঙে গেছে।

 

নীলা মোমবাতিটা টেবিলে রেখে তানভীরের দিকে ছুটে গেল। “তানভীর সাহেব! কী হয়েছে আপনার?”

 

তানভীর দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে। তার শার্ট বৃষ্টিতে পুরো ভিজে গেছে। গায়ের চামড়া থরথর করে কাঁপছে। নীলা তানভীরের গায়ে হাত দিতেই চমকে উঠল—তানভীরের শরীর যেন ফুটন্ত পানির মতো গরম! তীব্র জ্বর এসেছে তার।

 

“তানভীর! শুনছেন? উঠুন!” নীলা এবার ভয়ে চিৎকার করে উঠল।

 

তানভীর কষ্টে চোখ খুলল। অন্ধকারের মাঝে মোমবাতির আলোয় নীলার উদ্বিগ্ন মুখটা দেখে সে দুর্বলভাবে হাসল। “তুমি... এখানে কেন? নিজের ঘরে যাও...”

 

“বাজে বকবেন না! চলুন ঘরে চলুন,” নীলা তানভীরের এক হাত নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে তাকে তোলার চেষ্টা করল।

 

তানভীরের সুবিশাল শরীরটা তোলা নীলার জন্য প্রায় অসম্ভব ছিল। তবুও সমস্ত শক্তি দিয়ে সে তানভীরকে ধরে দাঁড় করাল। তানভীর কোনো মতে পা ফেলে নীলার ওপর ভর দিয়ে নিজের ঘরের বিছানায় এসে ঢলে পড়ল।

 

নীলা দ্রুত গিয়ে বারান্দার দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে এল। তারপর তানভীরের ঘরে ফিরে এসে মোমবাতির আলোয় দেখল তানভীর ঠান্ডায় থরথর করে কাঁপছে, আর তার গায়ের ভিজে যাওয়া শার্ট শরীরের সাথে লেপ্টে আছে।

 

“এভাবে ভিজে থাকলে তো নিউমোনিয়া হয়ে যাবে!” নীলা বিড়বিড় করে বলল।

 

কোনো কিছু না ভেবেই নীলা তানভীরের শার্টের বোতাম খুলতে শুরু করল। তার হাত কাঁপছিল। অন্ধকারের মাঝে তানভীরের সুগঠিত, চওড়া বুক উন্মুক্ত হতে লাগল নীলার হাতের স্পর্শে। তানভীরের তপ্ত ত্বক যখন নীলার ঠান্ডা আঙুল স্পর্শ করছিল, তখন নীলার নিজের শরীর জুড়েই যেন আগুনের শিখা দৌড়ে যাচ্ছিল।

 

শার্টটা পুরোপুরি খুলে ফেলার পর নীলা একটি শুকনো তোয়ালে দিয়ে তানভীরের বুক, কাঁধ আর মুখ মুছে দিতে লাগল। তানভীর অর্ধচেতন অবস্থায় নীলার কবজি ধরে ফেলল।

 

“নীলা...” তানভীরের কণ্ঠটা ভারী এবং গভীর।

 

“অস্থির হবেন না, আমি আছি,” নীলা স্বান্তনা দেওয়ার ভাষায় বলল।

 

তানভীর নীলার হাতটা না ছেড়ে তাকে টান দিল। শারীরিক দুর্বলতা সত্ত্বেও তানভীরের টানটা ছিল অপ্রতিরোধ্য। নীলা সামলাতে না পেরে সরাসরি তানভীরের বুকের ওপর গিয়ে পড়ল।

 

নীলার খোলা চুল তানভীরের মুখে ও বুকে ছড়িয়ে পড়ল। ভিজে যাওয়া মোমবাতির আলোয় দুজনের চোখ মুখোমুখি। তানভীরের তপ্ত নিঃশ্বাস এখন নীলার গলায় এসে পড়ছে।

 

“তুমি এত কেন জ্বালাও আমাকে?” তানভীর নীলার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের সাথে আরও শক্ত করে চেপে ধরল।

 

নীলা সরার চেষ্টা করতে পারত, কিন্তু তানভীরের এই রূপ, তার এই দুর্বলতা আর শরীরের উত্তাপ নীলার ভেতরের সব প্রতিরোধ ভেঙে চুরমার করে দিল। নীলা নিজের অজান্তেই তানভীরের কপালে নিজের ঠোঁট রাখল জুর মাপার বাহানায়।

 

কিন্তু স্পর্শটা কপালেই থেমে থাকল না। তানভীর নীলার মাথাটা একটু নামিয়ে আনল। এবার আর কোনো দূরত্ব রইল না। তানভীরের ঠোঁট নীলার গালে, তারপর চোয়ালে আর শেষে পরম তৃষ্ণায় নীলার ঠোঁটে আছড়ে পড়ল।

ঝড়ের রাতে, আঁধার ঘরে, তানভীরের গায়ের প্রচণ্ড জ্বরের উত্তাপ আর নীলার ব্যাকুল সুবাস মিশে এক হয়ে গেল। তানভীরের হাত নীলার পিঠ বেয়ে কামিজের খাঁজ বেয়ে গভীরে হারিয়ে যাচ্ছিল। নীলা তানভীরের চুল আঁকড়ে ধরে তার এই বন্য আক্রমণকে সঁপে দিল নিজেকে। দুজনের গভীর, দীর্ঘ চুম্বন আর তপ্ত নিঃশ্বাসে পুরো ঘরটা যেন একটা আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হলো। ঘৃণার সমস্ত দেয়াল সেই উত্তাপে গলে পানি হয়ে গেল।

 

অনেকটা সময় পর, যখন তানভীরের জ্বর কিছুটা কমে এলো এবং সে ক্লান্ত হয়ে নীলার কোলেই ঘুমিয়ে পড়ল, নীলা তখন তানভীরের বুকে মাথা রেখে শুয়ে রইল। তার হৃদয় তখন এক অচেনা ঝড়ে লন্ডভন্ড।

 

সে জানত না, এই টানের শেষ কোথায়। কিন্তু সে জানত, তানভীর নামক এই লোকটাকে সে আর কখনোই নিজের জীবন থেকে মুছে ফেলতে পারবে না।

ঝড়ের রাত কেটে সকালে মেঘমুক্ত কড়া রোদ এসে পড়ল জানালার ফাঁক গলে।

 

নীলার যখন ঘুম ভাঙল, সে দেখল তানভীরের চওড়া বুকের ওপর জড়িয়ে শুয়ে আছে সে। তানভীরের এক হাত শক্ত করে ধরে আছে নীলার কোমর। তানভীরের গায়ের উত্তাপ এখন স্বাভাবিক, জ্বর ছেড়ে গেছে। কিন্তু নীলার সমস্ত শরীরে রাতের সেই পাগলপারা স্পর্শগুলোর স্মৃতি তখনও স্পষ্ট। তানভীরের উত্তপ্ত নিঃশ্বাস, ব্যাকুল চুম্বন আর গভীর আলিঙ্গনের কথা মনে পড়তেই নীলার কান লাল হয়ে উঠল।

 

সে খুব সাবধানে তানভীরের হাতটা সরিয়ে বিছানা থেকে ওঠার চেষ্টা করল। কিন্তু নড়তেই তানভীর হাতটা আরও শক্ত করে নীলার কোমর চেপে ধরল।

 

“কোথায় যাচ্ছ?” তানভীর চোখ বন্ধ রেখেই বলল। তার গলা সকালের ঘুমের ঘোরে আরও গম্ভীর ও আবেদনময়ী শোনালো।

 

নীলা থমকে গেল। “তানভীর... ছাড়ুন। সকাল হয়ে গেছে। আপনার জ্বর কমেছে কিনা দেখতে গিয়েছিলাম, আর...”

 

তানভীর ধীরে ধীরে চোখ খুলল। তার গাঢ় চোখের দৃষ্টি সরাসরি গিয়ে পড়ল নীলার ঠোঁটে। নীলা লজ্জা পেয়ে মুখ নামিয়ে নিল। তানভীর তাকে সামান্য এক টানে নিজের আরও কাছে নিয়ে এলো। এবার দুজনের বুক একে অপরের সাথে লেগে রইল।

 

“আর রাতে কী হলো, সেটা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছ?” তানভীরের বুড়ো আঙুল নীলার নিচের ঠোঁটের ওপর ঘুরে এলো আলতো করে।

 

নীলার নিঃশ্বাস আটকে গেল। সে তানভীরের শক্ত বুকের ওপর হাত রেখে তাকে সামান্য ঠেলল, কিন্তু সেই ঠেলায় কোনো শক্তি ছিল না। “তানভীর, প্লিজ... রাতের পরিবেশটা অন্যরকম ছিল। আপনি অসুস্থ ছিলেন।”

 

“আর তুমি?” তানভীর মাথা সামান্য তুলে নীলার কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “তুমিও কি কেবল আমার অসুস্থতার দয়ায় সাড়া দিয়েছিলে, নীলা? তোমার এই কাঁপতে থাকা শরীর কিন্তু অন্য কথা বলছে।”

 

তানভীরের ঠোঁট নীলার কানের লতিতে আলতো করে ছোঁয়াতেই নীলা শিউরে উঠল। এক অদৃশ্য বিদ্যুতের তরঙ্গ খেলে গেল তার মেরুদণ্ড দিয়ে। তানভীরের হাত নীলার সালওয়ারের ফাঁক দিয়ে কোমরের নরম ত্বকে গিয়ে থামল। সেই গরম হাতের স্পর্শে নীলা এক অদ্ভুত সুখে চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার মুখ থেকে একটা হালকা অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এলো।

 

তানভীর নীলাকে সম্পূর্ণ নিজের বুকের ওপর টেনে নিয়ে তার গালে আর গলায় গভীর তৃষ্ণায় ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। নীলা নিজের সমস্ত প্রতিরোধ হারিয়ে তানভীরের চুলে হাত চালিয়ে দিল। তানভীরের ঠোঁট যখন নীলার গলার খাঁজ বেয়ে আরও নিচে নেমে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই ড্রয়িং রুম থেকে নীলার ফোনের তীব্র রিংটোন বেজে উঠল।

 

হুট করেই কল্পনার জগত থেকে বাস্তবে ফিরে এলো দুজন। নীলা এক ঝটকায় তানভীরকে ঠেলে সরিয়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। তার জামাকাপড় কিছুটা এলোমেলো, শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত।

 

তানভীর বিছানায় কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে উঠে বসল। তার চোখে এক ধরণের অসম্পূর্ণ বাসনার তীব্রতা। সে একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে নিজের এলোমেলো চুল গুছিয়ে নিল।

 

নীলা দ্রুত নিজের ঘরে গিয়ে ফোনটা রিসিভ করল। কলটা ছিল তার এক বান্ধবীর। কথা শেষ করে সে আয়নার সামনে দাঁড়াল। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে নীলার বুক কেঁপে উঠল—তার গলায় আর কলারবোনের কাছে তানভীরের ঠোঁটের স্পষ্ট লাল দাগ লেগে আছে।

 

হাত দিয়ে সেই দাগ স্পর্শ করতে করতে নীলা ভাবল, এত রাগ, এত ঝগড়ার মাঝে এই কামনার আগুন কোথা থেকে এলো? তানভীরের প্রতি এই দুর্নিবার আকর্ষণ কি শুধুই শারীরিক, নাকি এর গভীরে জমে আছে অন্য কিছু?

 

পরের কয়েকটা দিন দুজনের মধ্যে এক অদ্ভুত নীরবতা বজায় রইল। কিন্তু সেই নীরবতা শান্ত ছিল না, বরং তা ছিল আগ্নেয়গিরির ভেতরের উত্তাপের মতো। তারা একে অপরের দিকে তাকালে চোখে চোখে কথা হতো, বাতাসে ভাসত এক অদৃশ্য উত্তাপ।

 

একদিন বিকেলে নীলা পড়ার টেবিলে বসে মাস্টার্স পরীক্ষার জন্য তৈরি হচ্ছিল। ফ্ল্যাটে কেবল সে-ই ছিল, তানভীর দুপুরের পর থেকে বাইরে।

 

হঠাৎ তানভীরের ঘরের ড্রয়ারের কথা নীলার মনে পড়ল। গতকাল রাতে তানভীর যখন বাইরে ছিল, তখন তার ঘর থেকে কিছু কাগজপত্রের শব্দ হয়েছিল। আর তাছাড়া, তানভীর মাঝেমধ্যেই রহস্যময় কিছু ফোন কল পায় যা নীলাকে বেশ ভাবিয়ে তুলছিল।

 

অদম্য কৌতুহল সামলাতে না পেরে নীলা তানভীরের ঘরে ঢুকলো। তানভীরের ঘরটি সবসময় পরিপাটি থাকে। টেবিলের ওপর কিছু বই আর ফাইল সাজানো। নীলা দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে ড্রয়ারটা খুলল।

 

ড্রয়ারের ভেতরে রাখা ফাইলগুলোর নিচে একটা গাঢ় নীল রঙের ডায়েরি আর কিছু আইনি কাগজপত্র ছিল। নীলা কাগজগুলো হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করল।

 

আর পড়ার সাথে সাথে নীলার পায়ের নিচের মাটি সরে গেল!

 

কাগজগুলো ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডমিশন বিভাগ এবং একটি বড় আইনজীবী ফার্মের আইনি নোটিশ। একটু ভালো করে পড়তে নীলা অনুধাবন করতে পারল যে, নীলার বাবা কয়েক বছর আগে এক জালিয়াতির মামলায় জড়িয়ে পড়েছিলেন, যার কারণে নীলার বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষা দেওয়া তো দূরের কথা, তার পরিবারের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল।

 

আর এই পুরো বিষয়টি সামলেছে তানভীর!

 

তানভীর নিজের সঞ্চিত প্রায় বিশ লাখ টাকা খরচ করে, নিজের ক্যারিয়ার বাজি রেখে নীলার বাবার নাম সেই জালিয়াতির মামলা থেকে সম্পূর্ণ নিষ্কলঙ্কভাবে বের করে এনেছে। শুধু তাই নয়, নীলা যাতে কোনো ঝামেলা ছাড়া মাস্টার্সে ভর্তি হতে পারে, তার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট বোর্ডের সাথে লড়াই করে নীলার অ্যাডমিশন কনফার্ম করেছে তানভীর নিজে!

 

নীলার চোখ থেকে টপ টপ করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল দলিলগুলোর ওপর।

 

তানভীর এমন একটি ত্যাগ করেছে, যা নীলা তার স্বপ্নেও ভাবেনি! যে লোকটাকে সে এতদিন অহংকারী, হৃদয়হীন আর রুক্ষ ভেবে এসেছে, সেই লোকটা আড়ালে থেকে নীলার পুরো পরিবারকে রক্ষা করেছে! নীলাকে রাজরানী করে রাখার জন্য নিজেকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে!

 

“তুমি ডায়েরি আর ফাইলগুলো না ধরলেই পারতে, নীলা।”

 

হঠাৎ পেছন থেকে তানভীরের রুক্ষ ও গম্ভীর গলার আওয়াজ ভেসে এলো।

 

নীলা চমকে উঠে পেছন ফিরে তাকাল। দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তানভীর। তার পরনে কালো শার্ট, হাতা কনুই পর্যন্ত গুটানো। তার চোখে কোনো রাগ নেই, কেবল এক গভীর শূন্যতা।

 

নীলা দৌড়ে গিয়ে তানভীরের বুকের ওপর আছড়ে পড়ল। হাত থেকে কাগজপত্রগুলো নিচে পড়ে গেল। সে তানভীরের কোমর জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।

 

“কেন করলে এত কিছু? কেন?” নীলা তানভীরের বুকে মুখ গুঁজে চিৎকার করে উঠল। “কেন আমাকে বললে না? আমি তোমাকে কত কী বলেছি, কত অপমান করেছি! আর তুমি আমার জন্য নিজের সব শেষ করে দিলে?”

 

তানভীর প্রথমে কিছুটা জমে গেল। তারপর ধীরেসুস্থে নীলার পিঠে নিজের শক্ত দুটি হাত জড়িয়ে ধরল। তার ঠোঁট নীলার চুলে স্পর্শ করল।

 

“কিছু জিনিস না বলাতেই সৌন্দর্য থাকে, নীলা,” তানভীর মৃদু গলায় বলল।

 

নীলা মাথা তুলে তানভীরের দিকে তাকাল। তার চোখ জলে ভাসছে। “তুমি আমাকে ভালোবাসো, তাই না? স্বীকার করো তানভীর! তুমি আমাকে ভালোবাসো!”

 

তানভীর নীলার ফোঁটা ফোঁটা জল মুছে দিল নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে। তার চোখে এক অপার যন্ত্রণা ফুটে উঠল। সে নীলার মুখটা দুই হাতে তুলে ধরল।

 

“ভালোবাসি কিনা জানি না, নীলা,” তানভীর গভীর গলায় বলল, “তবে এটুকু জানি, তোমাকে ছাড়া আমার এই জীবনের কোনো অর্থ নেই।”

 

কথাটি শেষ হওয়ার আগেই নীলা তানভীরের ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। এবার নীলা নিজেই সমস্ত দ্বিধা ঝেড়ে ফেলেছিল। তার কান্না, ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল সেই চুম্বনে।

 

তানভীরও আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে নীলাকে পাঁজা কোল করে তুলে নিয়ে সোজা বিছানায় গিয়ে শুইয়ে দিল। নীলার সালওয়ারের কামিজের ওপর তানভীরের হাত দুটো আগুনের মতো ঘুরতে লাগল। নীলা তানভীরের শার্টের বোতামগুলো একে একে ছিঁড়ে ফেলল।

 

দুজনের নগ্ন ত্বকের স্পর্শে ঘরটা যেন কেঁপে উঠল। তানভীরের প্রতিটা চুম্বন ছিল তীব্র, গভীর আর আবেগে ভরা। নীলা তানভীরের পিঠে নিজের নখ দেবে দিয়ে এক অদ্ভুত সুখে কোঁকড়ে উঠছিল। তানভীরের চওড়া শরীর নীলাকে সম্পূর্ণ ঢেকে নিয়েছিল। কামনার এক চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে দুজন দুজনকে আঁকড়ে ধরল, যেখানে কোনো অতীত নেই, কোনো ভবিষ্যৎ নেই, আছে শুধু তাদের দুজনার এক উত্তপ্ত বর্তমান।

 

পরদিন ভোর।

 

রোদের আলো পড়ার আগেই তানভীর বিছানা থেকে উঠল। পাশে শুয়ে থাকা নীলা তখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তার মুখে এক পরম তৃপ্তির হাসি, ভেজা চুলগুলো তোশকে ছড়িয়ে আছে। রাতের ভালোবাসার চিহ্ন তখনও নীলার উন্মুক্ত কাঁধে স্পষ্ট।

 

তানভীর পরম মমতায় নীলার কপালে শেষবারের মতো একটা দীর্ঘ ও গভীর চুম্বন করল। তার চোখে এক ফোঁটা জল জমে উঠল, যা সে দ্রুত মুছে ফেলল।

 

সে টেবিল থেকে একটি চিঠি তুলে নিয়ে নীলার বালিশের পাশে রাখল।

 

তানভীর জানত, যে গ্যাংস্টার আর প্রভাবশালী চক্রের হাত থেকে সে নীলার বাবাকে বাঁচিয়েছে, তারা এখন তানভীরের পিছু নিয়েছে। তানভীর যদি নীলার সাথে থাকে, তবে নীলার প্রাণ সংশয় হবে। নীলার সুন্দর ও নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য তানভীরের তার জীবন থেকে চিরতরে সরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই।

 

তানভীর তার ব্যাগটা হাতে নিল। দরজার কাছে গিয়ে শেষবারের মতো ঘুমন্ত নীলার মায়াবী মুখের দিকে তাকাল।

 

“ভালো থেকো, আমার ভালোবাসা,” ফিসফিস করে বলল তানভীর।

 

দরজাটা আস্তে করে বন্ধ হয়ে গেল। ভোরের ম্লান আলোয় ঢাকা শহরের রাজপথে পা বাড়াল তানভীর—একলা, নিঃসঙ্গ, নীলার সুরক্ষার জন্য নিজের হৃদয়কে ছিন্নভিন্ন করে।

ভোরের আলো যখন নীলার চোখে ফুটল, সে হাত দিয়ে পাশে তানভীরকে খুঁজল। কিন্তু তোশকটা ছিল একদম খালি এবং ঠান্ডা।

 

চোখ মেলে উঠে বসল নীলা। পুরো ঘরে এক নিঝুম নীরবতা। বালিশের পাশে রাখা সাদা রঙের চিঠিটা দেখে নীলার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। কাঁপতে থাকা হাতে চিঠিটা খুলে সে পড়তে শুরু করল। তানভীরের স্পষ্ট আর শক্ত হাতের লেখা:

 

    “নীলা,

    তোমাকে সত্যিটা না বলে চলে যাওয়ার জন্য ক্ষমা কোরো। যে শত্রুদের কাছ থেকে তোমার পরিবারকে মুক্ত করেছি, তারা অত্যন্ত বিপজ্জনক। আমি তোমার আশেপাশে থাকা মানেই তোমার জীবন ঝুঁকির মুখে পড়া। তুমি আমার জীবনের সেই মিষ্টি আলো, যাকে আমি অন্ধকারের অতলে তলিয়ে যেতে দিতে পারি না। তোমার পরীক্ষাটা ভালো করে দিও, নিজের যত্ন নিয়ো। আমার জন্য কোনো অপেক্ষা রেখো না। ভালো থেকো নীলা।”

 

চিঠিটা পড়ার সাথে সাথে নীলার চোখের জল গড়িয়ে পড়ে কাগজের ওপর কালি ধুয়ে দিল। নীলার বুক ফেটে কান্না এল, কিন্তু সেই সাথে তার ভেতরে জন্ম নিল এক কঠোর জেদ।

 

“বোকা লোক!” নীলা চোখের জল মুছে হুঙ্কার দিয়ে উঠল। “আমাকে ছেড়ে চলে যাওয়া এত সহজ? তোমার ভালো থাকার অজুহাতে আমাকে নিঃস্ব করে দেবে, আর আমি তা মেনে নেব?”

 

নীলা আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে জানত তানভীর কোথায় যেতে পারে। তানভীরের খালার একটা পুরোনো পৈতৃক বাড়ি আছে ঢাকার অদূরে পুবাইলে, যেখানে তানভীর তীব্র মানসিক অশান্তিতে থাকলে একা গিয়ে থাকত।

 

বৃষ্টি নামার ঠিক আগের মূহূর্তে পুবাইলের সেই পুরোনো একতলা কাঠের বাংলোটার সামনে গিয়ে পৌঁছাল নীলা।

 

বাড়ির বারান্দায় তানভীর একা বসে ছিল। হাতে ধরা অর্ধেক জ্বলতে থাকা সিগারেট, চোখ দুটো ক্লান্ত আর বিষণ্ণতায় ঢাকা। হঠাৎ গেট খোলার শব্দে সে ওপরের দিকে তাকাল।

 

বৃষ্টির পানিতে পুরো ভিজে গিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে নীলা! তার চুলগুলো মুখের ওপর লেপ্টে আছে, রাগে আর কষ্টে তার বুক দ্রুত ওঠানামা করছে।

 

তানভীর নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। সে হাতের সিগারেট ফেলে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল। “নীলা? তুমি... তুমি এখানে কীভাবে এলে? মাথা খারাপ হয়েছে তোমার?”

 

নীলা এক পা এক পা করে তানভীরের দিকে এগিয়ে এলো। তার চোখে আগুনের ঝিলিক।

 

“হ্যাঁ, মাথা খারাপ হয়েছে!” নীলা চিৎকার করে উঠল। “তুমি কী ভেবেছিলে তানভীর সাহেব? তুমি মহান সেজে চিঠি লিখে চলে আসবে, আর আমি ঘরে বসে বসে তোমার জন্য কাঁদব? তুমি নিজেকে কী মনে করো? আমার জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তোমাকে কে দিয়েছে?”

 

তানভীর চোয়াল শক্ত করল, নিজেকে কঠোর দেখানোর চেষ্টা করে বলল, “তুমি এখান থেকে চলে যাও, নীলা। আমি তোমার সাথে কোনো সম্পর্ক রাখতে চাই না। তুমি জানো না কত বড় বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে আছো—”

 

“চুপ করো! একদম চুপ!” নীলা তানভীরের বুকে দুই হাতে সজোরে ধাক্কা দিল। “বিপদ? তোমাকে ছাড়া বেঁচে থাকাটা আমার জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ! যে লোকটা আমার জন্য নিজের সব শেষ করে দিতে পারে, তাকে ছেড়ে আমি নিরাপদে থাকব? এত কা পুরুষ মনে করো আমাকে?”

 

তানভীর আর ধরে রাখতে পারল না নিজেকে। তার কঠোরতার মুখোশ খসে পড়ল। সে এক ঝটকায় নীলার হাত দুটো ধরে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল।

 

“আমি তোমাকে ভালোবাসিসুদ্ধ হারাতে চাই না, নীলা!” তানভীরের কণ্ঠে এক আর্তনাদ কেঁপে উঠল। “ওরা যদি তোমার কোনো ক্ষতি করে, আমি জ্যান্ত মরে যাব!”

 

“তাহলে চলো দুজন একসাথে বাঁচি, না হয় একসাথে মরি!” নীলা তানভীরের চোখে চোখ রেখে বলল। তার গলার স্বর এবার নরম ও ব্যাকুল হয়ে এলো। “আমাকে ছেড়ে যেও না তানভীর... আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না।”

 

কথাটি শেষ হতেই তানভীর নীলার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। সেই চুম্বনে ছিল এক তীব্র হাহাকার, ভয় আর সীমাহীন ভালোবাসা। বৃষ্টি তখন তাদের চারপাশ দিয়ে প্রলয় ছন্দে ঝরছিল। তানভীর নীলাকে কোলে তুলে নিয়ে ঘরের ভেতরে নিয়ে গেল এবং ভারী কাঠের দরজাটা সশব্দে বন্ধ করে দিল।

 

বাইরে বৃষ্টির সোঁদা গন্ধ আর তাণ্ডব, আর ঘরের ভেতরে জমে উঠল এক গভীর, উত্তপ্ত সোহাগের খেলা।

 

তানভীর নীলাকে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। নীলার ভেজা কাপড় শরীর থেকে সরিয়ে নেওয়ার সময় তানভীরের স্পর্শগুলো ছিল ভীষণ তৃষ্ণার্ত। নীলা এক বিন্দু দ্বিধা না করে নিজেকে তানভীরের অনাবৃত বুকের মাঝে উজার করে দিল।

 

তানভীরের উত্তপ্ত ঠোঁট নীলার ভেজা গাল, গলা, কলারবোন হয়ে পেটের নরম ত্বকে হারিয়ে যাচ্ছিল। নীলা তানভীরের চুল আঁকড়ে ধরে তার নাম ধরে ফিসফিস করে ডাকছিল, “তানভীর... আমার তানভীর...”

 

দুই শরীর এক হয়ে যাওয়ার সেই আদিম ও মধুর মুহূর্তে সমস্ত ভয়, শঙ্কা আর দূরত্ব ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেল। তানভীরের প্রতিটি গভীরে পৌঁছানো স্পর্শে নীলা এক অদ্ভুত স্বর্গের সন্ধান পাচ্ছিল। তাদের তীব্র নিঃশ্বাসের শব্দ আর আবেগের উত্তাপ পুরো ঘরটাকে এক মোহময় আশ্রয়ে পরিণত করল। সেখানে কোনো অতীত বা ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা ছিল না, কেবল ছিল দুই আত্মার চিরন্তন মিলন।

 

কয়েক মাস পর।

 

ঢাকার আদালতে দাঁড়িয়ে তানভীর তার আইনজীবীর পাশে হাসিমুখে কথা বলছে। যে গ্যাংস্টার চক্রের ভয় ছিল, তানভীর নিজের চতুরতা আর আইনি চালে তাদের সব অপরাধ প্রমাণ করে পুলিশে সোপর্দ করেছে। এখন আর কোনো ভয় নেই, কোনো তাড়া নেই।

 

আদালতের সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসতেই তানভীর দেখল একটু দূরে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে নীলা। তার পরনে হালকা নীল রঙের শাড়ি, ভেজা চুল পিঠে ছড়ানো।

 

তানভীর এগিয়ে গিয়ে নীলার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল।

 

“সব ঝামেলা শেষ নীলা। আমরা এখন সম্পূর্ণ স্বাধীন,” তানভীর গভীর ভালোবাসায় নীলার দিকে তাকিয়ে বলল।

 

নীলা তানভীরের বাহুতে মাথা রেখে মৃদু হাসল। “আমি তো সেদিনই স্বাধীন হয়ে গিয়েছিলাম, যেদিন তোমার এই শক্ত বুকে নিজের আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিলাম।”

 

তানভীর নীলার কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। ঢাকা শহরের ব্যস্ত রাজপথে, অনেক ঝড় আর লড়াইয়ের পর, তারা দুজন এখন এক অটুট বন্ধনে বাঁধা—যার নাম ভালোবাসা।

....
👁 61