ছোটবেলার বন্ধু থেকে স্বামী

রুদ্রের বুকের ভেতরটা আজকাল অযথাই ভারী হয়ে থাকে। ঢাকা শহরের তীব্র যানজটে যখন লাল-সবুজের বাসগুলো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, রুদ্র তখন গাড়ির কাচে মাথা রেখে বাইরে তাকায়। তার জীবনের গতিটাও যেন ঠিক ওই আটকে থাকা বাসগুলোর মতোই স্তব্ধ। সে কোনোদিন নিজের অনুভূতি কাউকে প্রকাশ করতে পারেনি। ছোটবেলা থেকেই তার অভ্যাস সব আবেগ নিজের ভেতর চেপে রাখা। আনন্দ হোক বা কষ্ট, তার মুখের ভাব পরিবর্তন হয় না বললেই চলে। অথচ তার ঠিক উল্টো মানুষটা হলো মীরা। মীরা চঞ্চল, স্পষ্টভাষী, আর রুদ্রের জীবনের একমাত্র আলো।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

 

রুদ্র আর মীরা ছোটবেলার বন্ধু। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে দুজনই এখন কর্পোরেট জগতে ব্যস্ত। মীরা রুদ্রের এত কাছে থেকেও কখনো বুঝতে পারেনি তার মনের আসল গহীন তল। মীরার কাছে রুদ্র শুধুই একজন নীরব, নির্ভরযোগ্য 'সেরা বন্ধু'। রুদ্রও কখনো নিজের অনুভূতির কথা মুখে ফুটিয়ে তুলতে চায়নি। সে ভেবেছিল, ভালোবাসা বোধহয় নীরবতায় বেঁচে থাকে। না বলা শব্দগুলোর ভেতরেই হয়তো ভালোবাসার সবচেয়ে বেশি গভীরতা থাকে।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

 

কিন্তু মেঘ না চাইতেই যেমন হঠাৎ কালবৈশাখী নেমে আসে, তেমনই একদিন ঝড় এলো রুদ্রের শান্ত জীবনে।

 

ধানমন্ডির এক শান্ত ক্যাফেতে বসেছিল ওরা দুজন। বাইরের আকাশে তখন কালো মেঘ জমাট বাঁধছিল। মীরা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বেশ কৌতুক আর উচ্ছ্বাসের সাথে বলল, "রুদ্র, তোকে একটা কথা বলা হয়নি। ফারহানের কথা তো তোকে বলেছিলাম? ও গতকাল আমাকে প্রস্তাব দিয়েছে। আমি ভেবে দেখেছি, ফারহান মানুষ হিসেবে বেশ ভালো। আমি মনে হয় রাজি হয়ে যাব।"

 

কথাটা শোনার পর রুদ্রের হাত থেকে কফির মগটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। বুকের একপাশে একটা তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা অনুভব করল সে। যেন কেউ হাজারটা ছুড়ি একসাথে তার বুকে বিধিয়ে দিয়েছে। কিন্তু মুখে সে এক ফোটাও ভাবান্তর আসতে দিল না। নিজের ভেতরের প্রবল তোলপাড় চেপে রেখে রুদ্র স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, "তাই? ফারহান তো ভালো ছেলে। তুই যদি মনে করিস ও তোকে সুখে রাখবে, তবে এগোতে পারিস।"

 

মীরা খানিকটা আশা করেছিল রুদ্র হয়তো তাকে আটকাবে, কিছুটা ইতস্তত করবে বা অন্তত তার চোখে কোনো পরিবর্তনের রেখা দেখা যাবে। কিন্তু রুদ্রের মুখের সেই চেনা নিস্পৃহতা দেখে মীরা এক গাল হেসে বলল, "হুম, তুইও যখন বলছিস, তাহলে আর না করার কারণ নেই।"

 

সেদিন থেকেই রুদ্রের ভেতরের দিনপঞ্জি অন্যভাবে গণনা শুরু হলো। মীরা ফারহানের সাথে ডেটে যেতে শুরু করল। বিয়ের কথাবার্তাও দ্রুত এগোতে লাগল পরিবারগুলোর মাঝে। মীরা যত ফারহানের দিকে হেলে পড়ছিল, রুদ্রের নীরবতার দেয়াল ততই ভাঙতে শুরু করেছিল। সে নিজেকে সামলাতে পারছিল না। রাতের পর রাত সে ঘুমাতে পারত না। বন্ধ চোখের কোণ ঘেঁষে কেবল মীরার মিষ্টি হাসি, তার চুলের সুবাস আর তার স্পর্শের স্মৃতিগুলো ভেসে উঠত।

 

এক রাতে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামল ঢাকায়। রুদ্র তার ফ্ল্যাটের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ভিজছিল। এমন সময় মীরার ফোন এলো। ফারহানের সাথে সামান্য ভুল বোঝাবুঝি নিয়ে মীরা কাঁদছিল। রুদ্র আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে বাইক নিয়ে সোজা চলে গেল মীরার ফ্ল্যাটে।

 

মীরা দরজা খুলতেই দেখল বৃষ্টিতে ভেজা রুদ্র দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে এমন এক তীব্রতা, যা মীরা আগে কখনো দেখেনি।

 

"রুদ্র? তুই এই বৃষ্টিতে এলি? ভিজছিস কেন?" মীরা তোয়ালে নিয়ে রুদ্রের মাথা মুছে দিতে গেল।

 

মীরার নরম হাত দুটো যখন রুদ্রের ভেজা গালে স্পর্শ করল, রুদ্রের ভেতরের এতদিন চেপে রাখা সমস্ত সংযম চুরমার হয়ে গেল। সে এক ঝটকায় মীরার হাতটা শক্ত করে ধরে ফেলল। মীরা চমকে উঠে রুদ্রের চোখের দিকে তাকাল। সেখানে কোনো বন্ধুর সহানুভূতি ছিল না, ছিল এক উন্মাদ করা অধিকারবোধ আর তীব্র তৃষ্ণা।

 

"তুই আমাকে এভাবে কেন শাস্তি দিচ্ছিস, মীরা?" রুদ্রের গলার আওয়াজ কাঁপা এবং ভারী শোনালো।

 

"কী... কী বলছিস তুই?" মীরার বুকের ভেতর ধড়ফড় করে উঠল।

 

রুদ্র কোনো কথা না বলে মীরাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। তার উত্তপ্ত নিঃশ্বাস মীরার ঘাড় আর গালে এসে আছড়ে পড়তে লাগল। মীরা থমকে গেল, তার শরীরজুড়ে এক অচেনা শিহরণ খেলে গেল। রুদ্রের ভেজা শরীরের ঠাণ্ডা আর ভেতরের তীব্র উষ্ণতা মীরাকে যেন এক নেশায় আচ্ছন্ন করে ফেলল। রুদ্র তার ভেজা চুলগুলো সরিয়ে মীরার ঘাড়ে ঠোঁট স্পর্শ করল। এক ব্যাকুল, গভীর চুমু। মীরার মুখ দিয়ে আলতো একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো।

 

মীরা কাঁপতে থাকা গলায় বলল, "রুদ্র... এ... এটা ঠিক হচ্ছে না..."

 

কিন্তু রুদ্র থামল না। সে মীরার কোমরে হাত দিয়ে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল। মীরার পাতলা শাড়ির ওপর দিয়ে রুদ্রের আঙুলের স্পর্শ যেন আগুনের মতো জ্বলছিল। মীরার মনে হলো তার ভেতরের সমস্ত শক্তিমত্তা এক নিমেষে গলে জল হয়ে যাচ্ছে। সে রুদ্রের বুকে হাত রাখল, কিন্তু তাকে ঠেলে সরিয়ে দেওয়ার জন্য নয়, বরং নিজেকে আরও গভীরে সঁপে দেওয়ার জন্য। রুদ্র তার ঠোঁট নিয়ে এলো মীরার ঠোঁটের খুব কাছে। বৃষ্টিভেজা রাতে ঘরের মৃদু আলোয় দুই বন্ধুর চার দশকের চেনা সীমানা এক মুহূর্তে মুছে গেল।

 

রুদ্র মীরার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট মেলাল। সেটা কোনো মৃদু চুম্বন ছিল না; তা ছিল বছরের পর বছর ধরে জমিয়ে রাখা যন্ত্রণা, ভালোবাসা আর কামনার এক উত্তাল প্রকাশ। মীরাও প্রথমবার অনুভব করল, ফারহানের স্পর্শে সে যা কখনো অনুভব করেনি, রুদ্রের এই উন্মাদ ভালোবাসায় সে পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

 

চুম্বনের তীব্রতায় দুজনই হাঁপাতে লাগল। রুদ্র মীরার কপালে কপাল রেখে ফিসফিস করে বলল, "তুই অন্য কারো হতে পারবি না, মীরা। আমি তোকে হতে দেব না।"

 

মীরা স্তব্ধ হয়ে রুদ্রের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।

 

পরদিন সকালে যখন মীরার ঘুম ভাঙল, রুদ্র তখন চলে গেছে। কিন্তু ঘরে রেখে গেছে তার গায়ের সুবাস আর মীরার হৃদয়ে এক প্রকাণ্ড ঝড়। মীরার আকদ বা এনগেজমেন্টের আর মাত্র তিন দিন বাকি।

 

রুদ্র কি পারবে তার অহংকার আর ভয়ের প্রাচীর চিরতরে ভেঙে মীরাকে নিজের করে নিতে? নাকি এই এক রাতের তীব্র অনুভূতির আলোড়ন কেবল এক করুণ সমাপ্তির সূচনা ছিল?

সেই বৃষ্টিভেজা রাতের পর থেকে মীরার পুরো জগৎ ওলটপালট হয়ে গেল। তার শরীরে এবং মনে রুদ্রের স্পর্শের স্মৃতি এক প্রকাণ্ড তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। আগামী পরশু ফারহানের সাথে তার আকদ। ঘরের সবাই উৎসবের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, আত্মীয়স্বজনে বাড়ি গিজগিজ করছে, চারদিকে আলো ঝলমলে পরিবেশ। অথচ মীরার মনটা যেন অন্য এক জগতে পড়ে আছে। তার ঘাড়ে, ঠোঁটে এবং মনের প্রতিটি ভাঁজে কেবল রুদ্রের ভেজা স্পর্শের উত্তাপ।

 

ফারহান কাল রাতে তাকে ফোন করে অনেক ভালোবাসার কথা বলেছিল, কিন্তু মীরার বুকের ভেতর কোনো স্পন্দন সৃষ্টি হয়নি। ফারহানের সভ্য, হিসেবি ভালোবাসার পাশে রুদ্রের সেই উন্মাদ, হিংস্র আর গভীর প্রকাশটাই মীরাকে দিনরাত তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সে বুঝতে পারছে, ফারহানকে বিয়ে করলে সে হয়তো একটা গোছানো সংসার পাবে, কিন্তু রুদ্রকে ছাড়া সে বেঁচে থেকেও এক মৃতদেহে পরিণত হবে।

 

অন্যদিকে, রুদ্রের দিনগুলো কাটছিল নরকযন্ত্রণা নিয়ে। যে ভয় আর অহংকারের জন্য সে এতদিন নীরব ছিল, সেই নীরবতাই এখন তার জীবনের সবচেয়ে বড় শত্রুতে পরিণত হয়েছে। সে মীরাকে স্পর্শ করেছে, তার সত্তাকে নিজের মধ্যে অনুভব করেছে—এখন মীরাকে অন্য কারো হাতে তুলে দেওয়ার কথা ভাবলেই তার মাথার রগগুলো ফেটে যেতে চায়। কিন্তু তার নিজের ভেতরের দ্বিধা আর সামাজিক নিয়ম তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছিল।

 

আকদের আগের দিন সন্ধ্যায় মীরার পার্লারে যাওয়ার কথা ছিল। মীরা সুযোগ বুঝে রুদ্রকে ফোন দিল।

"রুদ্র... আমাকে শেষবারের মতো একবার এসে নিয়ে যাবি? আমি ধানমন্ডি ৩ নম্বরের কফি শপটার সামনে দাঁড়িয়ে আছি।" মীরার গলা কাঁপছিল।

 

দশ মিনিটের মধ্যে রুদ্র তার কালো গাড়িটা নিয়ে এসে থামাল। মীরা গাড়ির পেছনের দরজা না খুলে সোজা সামনের দরজা খুলে রুদ্রের পাশে গিয়ে বসল। দুজনই চুপচাপ। গাড়ির ভেতরের এসি চালিত ঠান্ডা বাতাসে কেবল দুজনের ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ।

 

রুদ্র গাড়ি চালিয়ে ঢাকা শহরের বাইরে, এক নির্জন রূপগঞ্জের সড়কের দিকে নিয়ে চলল। রাস্তা ফাঁকা, দুপাশে নিঝুম অন্ধকার আর সারি সারি গাছ। গাড়ি থামিয়ে রুদ্র স্টিয়ারিংয়ের ওপর মাথা রাখল।

 

"কেন ডেকেছিস আমাকে, মীরা?" রুদ্রের গলার আওয়াজ বেশ নিচু কিন্তু ভারী।

 

মীরা সিটে ঘুরে বসে সোজা রুদ্রের চোখের দিকে তাকাল। "গতকাল রাতের পর তুই একটা বারও আমাকে ফোন করিসনি কেন, রুদ্র? কাল রাতে যেটা হলো... সেটা কি তোর কাছে শুধুই একটা ভুল ছিল? নাকি সস্তা কোনো আবেগ?"

 

রুদ্র ঝটকা দিয়ে মাথা তুলল। তার চোখে রক্তের মতো লাল আভা। "ভুল? তুই ওটাকে ভুল বলছিস মীরা? তোকে আমি ছোটবেলা থেকে কীভাবে ভালোবেসেছি তুই তার একবিন্দু জানিস? তোকে হারাতে বসেছি জেনে আমার কলিজাটা পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে, আর তুই বলছিস ওটা ভুল?"

 

"তাহলে বলিসনি কেন আমাকে?" মীরা রুদ্রের শার্টের কলার চেপে ধরে চ্যাঁচামেচি করে উঠল, চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল জল। "কেন এতদিন তোর ওই অহংকার আর চুপ থাকার দেওয়াল তুলে রাখলি? কেন ফারহানকে আমার জীবনে আসতে দিলি? কাল আমার আকদ, আর তুই আজ আমাকে ভালোবাসার দোহাই দিচ্ছিস?"

 

রুদ্র আর নিজের আবেগ সামলাতে পারল না। সে এক হাত দিয়ে মীরার কোমর ধরে তাকে টেনে নিজের কোলে তুলে নিল। মীরা গাড়ির ড্যাশবোর্ডের সাথে ধাক্কা খেয়ে রুদ্রের একদম বুকের মাঝে এসে পড়ল।

 

"কারণ আমি ভয় পেতাম!" রুদ্র গর্জে উঠল, "ভয় পেতাম যদি তোকে হারানোর ভয় সত্যি হয়ে যায়! যদি তুই আমাকে স্রেফ বন্ধু ভেবে দূরে ঠেলে দিস! কিন্তু এখন আর আমার কোনো ভয় নেই, কোনো অহংকার নেই।"

 

কথাগুলো শেষ হতে না হতেই রুদ্রের ঠোঁট ঝাঁপিয়ে পড়ল মীরার ঠোঁটের ওপর। এ যেন প্রথম রাতের চেয়েও অনেক বেশি তৃষ্ণার্ত, অনেক বেশি গভীর। মীরা ক্ষণিকের জন্য প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু রুদ্রের হাত দুটি যখন তার পিঠের বাঁধন শিথিল করে দিল, তখন মীরার সব প্রতিরোধ ভেঙে ছারখার হয়ে গেল।

 

রুদ্র তার ঠোঁট সরালো না, বরং মীরার শাড়ির আঁচল সরিয়ে তার কাঁধে ও বুকে নিজের উত্তপ্ত ঠোঁটের ছাপ এঁকে দিতে লাগল। মীরার হাত দুটো রুদ্রের চুলে আটকে গেল, সে রুদ্রের বুকে মাথা গুঁজে এক তীব্র আবেশে নিজের চোখ দুটো বন্ধ করে নিল। বন্ধ গাড়ির ভেতর দুটো মানুষের উষ্ণ নিঃশ্বাস কাঁচে ধোঁয়াটে আস্তরণ তৈরি করল।

 

রুদ্রের আঙুলগুলো মীরার কোমরের ভাঁজে গভীর থেকে গভীরে প্রবেশ করছিল। মীরার মুখ দিয়ে আলতো গোঙানির শব্দ বের হয়ে আসছিল। রুদ্র তাকে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলল, "মীরা, তুই আমার। একমাত্র আমার। ফারহান তোকে স্পর্শ করবে, এই চিন্তাটা আমাকে পাগল করে দিচ্ছে। তুই কি সত্যিই কাল অন্য কারো নামে নিজেকে লিখে দিবি?"

 

মীরা কাঁপতে কাঁপতে রুদ্রের মুখে নিজের দুটি হাত রাখল। "রুদ্র... তুই আমাকে এত ভালোবাসিস, অথচ কখনো মুখ ফুটে বলিসনি। কাল সকালে আমার আকদ। তুই যদি কাল আমাকে না আটকাস, তবে আমি ফারহানেরই হয়ে যাব। তুই পারবি আমাকে থামাতে? নাকি তোর অহংকার আবার তোকে আটকে রাখবে?"

 

রুদ্র মীরার চোখে চোখ রাখল। তার চোখে তখন কোনো দ্বিধা ছিল না, ছিল কেবল এক জেদ আর অন্ধ ভালোবাসা। রুদ্র মীরার কপালে দীর্ঘ চুমু খেয়ে বলল, "কাল তুই দেখবি আমি কী করতে পারি। তুই শুধু আমার ওপর ভরসা রাখবি।"

 

রুদ্র মীরাকে তার বাড়ির কাছে নামিয়ে দিল। মীরা যখন গাড়ির বাইরে পা দিল, তার শরীর তখনও রুদ্রের গভীর স্পর্শে কাঁপছিল, তার ঠোঁট রুদ্রের চুম্বনে লাল হয়ে ফুলে ছিল। মীরা বুঝতে পারছিল, সে কালকের ঝড়ের জন্য প্রস্তুত।

 

কিন্তু পরদিন সকালে যা ঘটল, তা মীরার সব কল্পনার বাইরে ছিল। ফারহানের পরিবার বেশ সকালেই কাজী নিয়ে মীরাদের বাড়িতে উপস্থিত হলো। মীরাকে কনের সাজে সাজানো হলো। কিন্তু রুদ্রের কোনো দেখা নেই। রুদ্রের ফোন বন্ধ।

 

কাজী সাহেব রেজিস্ট্রি খাতা এগিয়ে দিলেন মীরার দিকে। ফারহান ইতোমধ্যে সই করে ফেলেছে। মীরার হাতে কলম তুলে দেওয়া হলো। চারপাশের সবাই আনন্দ করছে, "কই কনে সই করো, আলহামদুলিল্লাহ বলো।"

 

মীরার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। সে কি তবে আবার রুদ্রের নীরবতার কাছে হেরে গেল? রুদ্র কি তবে শেষ মুহূর্তেও তার ভয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করল? মীরা কাঁপতে থাকা হাতে কলমটা সইয়ের জায়গায় ছুঁইয়ে দিতে গেল...

 

ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমের মূল দরজাটা সশব্দে খুলে গেল!

ড্রয়িংরুমের দরজাটা সশব্দে খুলে যেতেই ভেতরে থাকা সবার হাসি-আড্ডা এক মুহূর্তে থমকে গেল। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে রুদ্র। তার পোশাক কিছুটা অগোছালো, ভেজা চুল কপালে এসে পড়েছে, কিন্তু তার চোখে ছিল এক অপরাজেয় জেদ আর সাহসের ঝিলিক। তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তি এবং রুদ্রের নিজের বাবা-মা।

 

মীরার হাত থেকে কলমটা ফ্লোরে পড়ে গেল। সে চোখ মেখে অবাক হয়ে রুদ্রের দিকে তাকাল।

 

মীরার বাবা রাগ সামলাতে না পেরে সামনে এগিয়ে এলেন, "রুদ্র! এটা কী ধরনের অসভ্যতা? আজ মীরার আকদ, আর তুমি এভাবে একটা বিয়ের আসরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছ?"

 

রুদ্র কাউকে কিছু না বলে সোজা এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল ফারহানের সামনে। তার কণ্ঠস্বর ছিল সম্পূর্ণ শান্ত, কিন্তু সেখানে ছিল এক অদ্ভুত দৃঢ়তা।

 

"ফারহান ভাই, আমি জানি আজ আপনি আর আপনার পরিবার এখানে এসেছেন মীরাকে নিজেদের করে নিয়ে যেতে। কিন্তু আমি ক্ষমা চেয়ে বলছি, এই বিয়েটা হতে পারে না।"

 

ফারহান স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, "মানে? রুদ্র, তুমি কী আবোলতাবোল বলছ? তুমি মীরার বন্ধু বলে যা খুশি তা-ই করতে পারো না।"

 

"আমি মীরার শুধু বন্ধু নই," রুদ্র মীরার দিকে ঘুরে তাকাল, মীরার কাঁপা চোখগুলোর দিকে চেয়ে স্পষ্ট গলায় বলল, "মীরা আমার জীবন। আমি আমার জীবনের সবটুকু দিয়ে ওকে ভালোবাসি। ছোটবেলা থেকে নিজের অনুভূতি চেপে রাখাটাই আমার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। ভেবেছিলাম নীরবতা দিয়ে ভালোবাসা রক্ষা করা যায়। কিন্তু আজ আমি বুঝতে পেরেছি, ভালোবাসাকে ধরে রাখতে হলে নিজের ভয়, অহংকার আর দ্বিধার বিরুদ্ধে গিয়ে দাঁড়াতে হয়।"

 

রুদ্র এবার মীরার বাবার সামনে এসে হাত দুটো জোড় করে দাঁড়াল। "আঙ্কেল, আমি আজ একা আসিনি। আমার বাবাকে নিয়ে এসেছি। আমি জানি আমি দেরি করে ফেলেছি, আপনাদের সম্মান নষ্ট করেছি। কিন্তু মীরাকে অন্য কারো সাথে দেখে আমি সারা জীবন তিলে তিলে মরতে পারব না। আপনি আমাকে যে শাস্তি দেবেন মাথা পেতে নেব, কিন্তু মীরাকে ফারহানের হাতে দেবেন না। মীরার মন আর প্রাণ—দুটোই কেবল আমার।"

 

পুরো ঘরে এক অবিশ্বাস্য নীরবতা নেমে এলো। মীরার চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরছিল। ফারহান মীরার দিকে তাকিয়ে বলল, "মীরা, এগুলো কী শুনছি? তুমি কিছু বলছ না কেন?"

 

মীরা ধীরে ধীরে কনের সাজে পরা ভারী শাড়িটা সামলে উঠে দাঁড়াল। সে রুদ্রের পাশে এসে দাঁড়াল এবং সবার সামনে রুদ্রের হাতটা শক্ত করে ধরে ফেলল। মীরা ফারহানের দিকে তাকিয়ে বলল, "ফারহান ভাই, আমাকে ক্ষমা করবেন। রুদ্র না বললে হয়তো আমি আজ এই বিয়েটা করে ফেলতাম। কিন্তু সত্যিটা হলো, আমি কোনোদিন রুদ্র ছাড়া অন্য কাউকে ভালোবাসতে পারিনি। আমার মন, আমার শরীর, আমার অনুভূতি—সবকিছু শুধু রুদ্রের।"

 

ফারহানের বাবা চরম অপমানিত বোধ করে উঠে দাঁড়ালেন। "যথেষ্ট হয়েছে! এমন পরিবারে আমরা আমাদের ছেলের বিয়ে দিতে পারি না, যেখানে কনের মনের ঠিকানা অন্য কোথাও।" ফারহান আর তার পরিবার ক্ষোভে আসর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

 

মীরার বাবা স্তম্ভিত হয়ে সোফায় বসে পড়লেন। রুদ্রের বাবা এগিয়ে এসে মীরার বাবার কাঁধে হাত রাখলেন, "দোস্ত, ছেলেটা ভুল করেছে দেরিতে মুখ ফুটে। কিন্তু ওদের ভালোবাসা সত্যি। আমাদের সন্তানদের সুখের চেয়ে বড় কিছু তো আর হতে পারে না।"

 

সব ঝড়ের মেঘ কাটার পর, সেদিন বিকেলে কাজী সাহেবের সামনে রুদ্র আর মীরার আকদ সম্পন্ন হলো। যে বাড়িতে সকালে ছিল এক থমথমে পরিবেশ, সেখানে সন্ধ্যায় নেমে এলো পূর্ণতার আনন্দ।

 

গভীর রাতে, অতিথিরা সব বিদায় নেওয়ার পর, রুদ্র মীরাকে নিয়ে এলো তার নিজের সাজানো ঘরে। ঘরের ভেতর গোলাপের সুবাস আর মোমের আলতো আলো।

 

মীরা খাটের একপাশে লাল বেনারসি পরে বসেছিল। রুদ্র দরজায় খিল তুলে দিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে এলো। মীরার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। সে মীরার দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আলতো করে চুমু খেল।

 

"আমাকে ক্ষমা করে দিবি, মীরা? আমার ওই চুপ করে থাকার স্বভাবটার জন্য তোকে কতটা যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হলো," রুদ্রের গলায় অনুশোচনা।

 

মীরা আলতো হেসে রুদ্রের চুলগুলো নেড়ে দিল। "তোকে ক্ষমা করব না, রুদ্র। তবে তোকে একটা শাস্তি দেব।"

 

"কী শাস্তি?"

 

মীরা রুদ্রের শার্টের কলার ধরে তাকে নিজের দিকে টেনে নিল। দুজনের ঠোঁটের দূরত্ব তখন এক ইঞ্চিরও কম। মীরা রুদ্রের চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "শাস্তি হলো—সারা জীবন তোকে আমার ভালোবাসার এই গভীর বন্দিদশায় আটকে থাকতে হবে। কোনোদিন আর নীরব হয়ে দূরে সরতে পারবি না।"

 

রুদ্র আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না। সে মীরাকে বাহুবন্ধনে জড়িয়ে নিয়ে তার ঠোঁটে ঠোঁট মেলাল। এবার সেই স্পর্শে কোনো ভয় ছিল না, কোনো হারানোর আশঙ্কা ছিল না; ছিল কেবল পূর্ণতার স্বাদ আর এক গভীর অধিকারবোধ।

 

রুদ্র মীরার বেনারসির আচল জড়িয়ে ধরে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। মোমের মৃদু আলোয় দুজন তৃষ্ণার্ত মানুষের আত্মিক ও শারীরিক মিলন ঘটল। মীরার তপ্ত নিঃশ্বাস আর রুদ্রের গাঢ় স্পর্শ ঘরের বাতাসে সৃষ্টি করল এক মাতাল করা উষ্ণতা। বছরের পর বছর জমে থাকা নীরব অভিমান আর ভালোবাসা আজ রাতে এক অখণ্ড সত্যে পরিণত হলো।

 

ভোরের প্রথম আলো যখন জানালার ফাঁক গলে ঘরে এসে পড়ল, রুদ্র দেখল মীরা তার বুকে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। রুদ্র মীরার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে মনে মনে বলল—ভালোবাসায় কখনো হার মানতে নেই, নিজের মনকে লুকিয়ে রাখতে নেই। ভালোবাসার মানুষকে জয় করতে হলে নিজের সমস্ত নীরবতার দেয়াল ভেঙে দাঁড়াতে হয়।

....
👁 67