দূরত্বের প্রাচীর ভেঙে যাওয়া

রাতের নিস্তব্ধতা দ্বিগুণ হয়ে নেমে এসেছে আদ্রিয়ান আর সায়রার চারদেয়ালের মাঝে। ঘরের বাতাসে নতুন আসবাব আর ফুলের একটা হালকা ঘ্রাণ এখনো লেগে আছে, অথচ পরিবেশটা ভীষণ থমথমে। ফুলশয্যার পর থেকে আজ এক মাস হতে চলল, ওদের দুজনের মাঝে কোনো দৃশ্যমান যোগাযোগের সেতু গড়ে ওঠেনি। বিশাল এই কামড়ায় আদ্রিয়ানের অবস্থান এক প্রান্তে হলে, সায়রা যেন ধ্রুবতারার মতো অন্য প্রান্তে খসে পড়া আলো।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

সায়রা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। পরনে সাধারণ একটা সুতি শাড়ি, আঁচলটা কাঁধ থেকে খসে পড়ে মেঝে ছুঁই ছুঁই করছে। হালকা আলোয় তার শরীরের নমনীয় বাঁকগুলো ফুটে উঠছে স্পষ্ট হয়ে। সায়রা আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে চেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। পারিবারিক হঠাৎ এক পরিস্থিতিতে এই বিয়েটা হয়েছিল। সায়রা খুব ভালো করেই জানে, আদ্রিয়ান কখনো এ বিয়ে চায়নি। আদ্রিয়ানের মতো সফল, অভিজাত আর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন মানুষ হয়তো তার জীবনের সহধর্মিণী হিসেবে অন্য কাউকে কল্পনা করেছিল। সেখানে সায়রা নিছকই এক অনাহূত বাস্তবতা।

তাই সায়রা শুরু থেকেই নিজের সীমানা কেটে নিয়েছিল। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, কোনোদিন এই বাড়িতে আদ্রিয়ানের ওপর নিজের কোনো অধিকার ফলাবে না, স্বত্ব দাবি করবে না। আদ্রিয়ানও দূরত্বের প্রাচীর গড়ে তুলেছিল নিজের চারপাশে। সারাদিন অফিসের ব্যস্ততা, রাতে দেরিতে বাড়ি ফেরা—সব মিলিয়ে সে সায়রাকে এড়িয়েই চলত।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

বাইরে তখন ঝমঝম করে বৃষ্টি নামতে শুরু করেছে। জানালার কাচে জলের ফোঁটাগুলো আছড়ে পড়ার শব্দে ঘরের নীরবতা আরও ভারী হয়ে উঠল। রাত প্রায় দুটো। সায়রা ভাবল আদ্রিয়ান হয়তো আজ ফিরবে না। সে বিছানার এক কোণে গা এড়িয়ে শুয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই খটকা শব্দে ঘরের দরজাটা খুলে গেল।

ভেতরে ঢুকতেই আদ্রিয়ানের চোখে পড়ল সায়রাকে। আদ্রিয়ানের গায়ে তখনো হালকা নীল শার্ট, টাইয়ের গিঁটটা একটু আলগা করা, শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খোলা—যাতে তার চওড়া বুকের কিছুটা অংশ উন্মুক্ত হয়ে আছে। সারাদিনের ক্লান্তির পরও আদ্রিয়ানের চোখের তীব্র দৃষ্টি সায়রার ওপর এসে আটকে গেল।

সায়রা চটজলদি উঠে দাঁড়াল। সে আদ্রিয়ানের চোখের দিকে না তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল, "আপনি এত দেরিতে আসবেন ভাবিনি। খাবার গরম করে দেব?"

আদ্রিয়ান কিছু বলল না। সে ধীরে ধীরে সায়রার দিকে এগিয়ে এলো। তার জুতো খোলার মৃদু শব্দ ছাড়া ঘরে আর কোনো আওয়াজ ছিল না। সায়রার একদম কাছে এসে দাঁড়াল আদ্রিয়ান। তার গায়ের পুরুষালি পারফিউমের ঘ্রাণ আর বৃষ্টির আর্দ্র গন্ধ মিশে এক নেশা ধরানো আবহাওয়া তৈরি করল ঘরের ভেতর।

"খাবারের দরকার নেই, সায়রা," আদ্রিয়ানের কণ্ঠস্বর ছিল একদম গম্ভীর, কিন্তু তাতে একটা অন্যরকম অস্বাভাবিক নিচু টান ছিল।

সায়রা একটু পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই আদ্রিয়ান দ্রুত হাত বাড়িয়ে সায়রার নরম কবজিটা চেপে ধরল। শক্ত বাঁধন, কিন্তু তাতে আঘাত দেওয়ার কোনো ইঙ্গিত ছিল না; ছিল এক চরম আকুলতা। সায়রা চমকে উঠে আদ্রিয়ানের দিকে তাকাল। এই প্রথম সে এত কাছ থেকে আদ্রিয়ানের চোখ দুটোকে দেখল—তাতে কেমন এক প্রগাঢ়, দহনকারী তৃষ্ণা।

"আপনি... আপনি ভিজে গেছেন," সায়রা কাঁপা গলায় বলল, তার বুকের ভেতরটা দুলছিল অনিশ্চয়তার দোলায়।

আদ্রিয়ান সায়রার কথা শুনে কোনো উত্তর দিল না। সে সায়রার কবজি ছেড়ে না দিয়ে তাকে টেনে আরও একটু নিজের বুকের কাছে নিয়ে এলো। দুজনের নিঃশ্বাস এখন একসাথে মিশে যাচ্ছে। আদ্রিয়ানের শার্টের ভিজে যাওয়া অংশ থেকে ঠাণ্ডা জল অনুভূতির তরঙ্গের মতো সায়রার শাড়ির পাতলা কাপড়ে ছড়িয়ে পড়তে লাগল।

"তুমি রোজ এভাবে জেগে থাকো কেন?" আদ্রিয়ানের কণ্ঠটা যেন সায়রার কানের কাছে এক জাদুকরী গুঞ্জন তৈরি করল। তার বুড়ো আঙুলটা সায়রার কবজির নরম চামড়ায় আলতো করে ঘষতে শুরু করল।

"আমি... আমি তো শুধু..." সায়রা নিজের ভেতরের অস্থিরতা ঢাকতে পারছিল না। আদ্রিয়ানের এত কাছের উপস্থিতি, তার গায়ের উষ্ণতা সায়রার শরীরজুড়ে এক অচেনা অনুভূতির কাঁপন তুলেছিল।

"তুমি ভাবো আমি কিছুই খেয়াল করি না, তাই না?" আদ্রিয়ান এবার তার অন্য হাতটা বাড়িয়ে দিল সায়রার উন্মুক্ত কোমর ঘেঁষে। তার গরম হাতের স্পর্শ সায়রার সতেজ কোমল চামড়ায় লাগতেই সায়রার চোখ দুটো বন্ধ হয়ে এলো। একটা শিহরণ সায়রার রন্ধ্রে রন্ধ্রে বয়ে গেল।

সায়রা ব্যাকুল হয়ে বলল, "আদ্রিয়ান... ছেড়ে দিন। আপনি অসুস্থ হয়ে পড়বেন।"

"না, তুমি আমাকে দূরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা কোরো না," আদ্রিয়ান নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল। তার ঠোঁট দুটো সায়রার কানের ঠিক নিচে, ঘাড়ের উন্মুক্ত অংশে ছুঁয়ে গেল। আলতো সেই স্পর্শ সায়রার ভেতরের সমস্ত সংযমের বাঁধ ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। আদ্রিয়ানের উষ্ণ নিঃশ্বাস সায়রার চুলে, ঘাড়ে এক চরম মাতাল করা ঝড় তুলছিল।

সায়রা নিজের অজান্তেই আদ্রিয়ানের শার্টের কাপড়টা শক্ত করে চেপে ধরল। সে কখনো ভাবেনি, যে মানুষটা তার থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখত, তার স্পর্শে এতখানি আগুনের আঁচ লুকিয়ে থাকতে পারে। আদ্রিয়ান সায়রাকে একদম নিজের বুকের সাথে পিষে ধরল। তার ঠোঁটের উগ্র অথচ সুগভীর স্পর্শ সায়রার নগ্ন কাঁধের ওপর নেমে এলো। সায়রা নিজের ভেতর থেকে একটা মৃদু কোঁকানো শব্দ চেপে রাখার চেষ্টা করল, কিন্তু আদ্রিয়ানের তীব্র আকর্ষণ তাকে এক অন্য জগতে নিয়ে যাচ্ছিল।

আদ্রিয়ানের হাত এবার সায়রার পিঠের সুতি শাড়ির ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে নেমে এসে তার কোমর পেঁচিয়ে ধরল। সায়রা অনুভব করল আদ্রিয়ানের বুকের গভীর স্পন্দন। তা কেবল ক্লান্তির ছিল না, ছিল এক অগ্নিকুণ্ডের মতো সুপ্ত বাসনার। আদ্রিয়ান সায়রার চিবুক ধরে মুখটা একটু ওপরে তুলল। সায়রার অর্ধনিমীলিত চোখ আর তার ভেজা ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে আদ্রিয়ানের চোখের দৃষ্টি আরও গাঢ় হয়ে উঠল।

"তুমি কি ভেবেছ, আমাদের এই চুক্তি কিংবা জোর করে হওয়া বিয়ের সম্পর্ক আমাকে স্পর্শ করে না?" আদ্রিয়ান খুব কাছে থেকে সায়রার ঠোঁটের ঠিক ওপর ফিসফিস করে বলল। তার হাতের আঙুলগুলো সায়রার শাড়ির আঁচল থেকে গড়িয়ে তার নরম কোমরের চামড়ায় আরও শক্তভাবে চেপে বসল।

সায়রা আদ্রিয়ানের চোখের গভীরতায় হারিয়ে যেতে যেতে বলল, "আপনি তো কখনো নিজের জীবনের অংশ ভাবেননি আমাকে..."

আদ্রিয়ানের ঠোঁট সায়রার বাক্যের শেষ শব্দটা শুষে নিল। এক সুগভীর, তৃষ্ণার্ত ভালোবাসার জোয়ার যেন বয়ে গেল ঘরের ভেতরে। সায়রা নিজেকে আদ্রিয়ানের সেই প্রগাঢ় ভালোবাসার বন্যায় সঁপে দিতে বাধ্য হলো। আদ্রিয়ানের এই তীব্র স্পর্শ, তার গভীর আলিঙ্গন সায়রাকে বোঝাল—যে দেয়ালটা আদ্রিয়ান বানিয়ে রেখেছিল, তা হয়তো ভেতরে ভেতরে ভেঙে গুঁড়িয়ে যেতে শুরু করেছে।

বাইরের ঝুম বৃষ্টি আর ঘরের ভেতরের উষ্ণ ভালোবাসার তীব্রতা একাকার হয়ে গেল সেই নিঃশব্দ রাতে। আদ্রিয়ান সায়রাকে বুকের মাঝে ধরে রইল দীর্ঘক্ষণ, যেন সায়রা কেবল এক অন্য ঘরের মেয়ে নয়, তার আত্মায় মিশে যাওয়া কোনো পরম আশ্রয়। সায়রাও সব দ্বিধা ভুলে আদ্রিয়ানের বুকে মাথা গুঁজে অনুভব করল সেই গভীর অনুরাগের আঁচ, যা কোনো অধিকারের দাবিতে বাঁধা নয়, কেবল অনুভবের চরম গভীরতায় আঁকা।
রাতের সেই উত্তাল প্রহরগুলোর পর সকালের আলো যখন জানালার পর্দা চুইয়ে কামড়ায় এসে পড়ল, ঘরের বাতাস তখনও এক অদ্ভুত আবেশে ভারী হয়েছিল। সায়রা ঘুম ভাঙতেই দেখল আদ্রিয়ানের শক্ত দুটি বাহু তাকে জড়িয়ে ধরে আছে। আদ্রিয়ানের চওড়া বুকটার সাথে সায়রা একদম সেঁটে ছিল, যার উষ্ণতা সায়রার শরীরের প্রতিটি কোষে এক অদ্ভুত ভালো লাগার শিহরণ জাগাচ্ছিল। সায়রা শান্ত চোখে আদ্রিয়ানের ঘুমানো চেহারার দিকে তাকাল—অফিসের সেই গম্ভীর, কঠোর মানুষটার মুখে এখন এক নিষ্পাপ প্রশান্তি।

সায়রা খুব সাবধানে আদ্রিয়ানের বাধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেই আদ্রিয়ানের আঁকড়ে ধরা হাত দুটো আরও শক্ত হয়ে সায়রার কোমরে জড়িয়ে ধরল।

"কোথায় যাচ্ছ?" আদ্রিয়ান চোখ না খুলেই খুব নিচু, ভারী গলায় শুধাল। ঘুমজড়ানো সেই স্বরে এক গভীর মাদকতা ছিল।

সায়রা একটু চমকে উঠে বলল, "সকাল হয়ে গেছে... ছাড়ুন, আমাকে উঠতে হবে।"

আদ্রিয়ান ধীরে ধীরে চোখ খুলল। তার চোখের গহীন দৃষ্টি সায়রার ওপর স্থির হতেই সায়রার মুখ লাল হয়ে উঠল। আদ্রিয়ান সায়রাকে বুকের সাথে আরও একটু চেপে ধরে তার কপালে নিজের ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে ধরল। সে আলতো করে সায়রার গালের ওপর নেমে আসা চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিতে দিতে বলল, "আজ কোথাও যেতে হবে না। এভাবে কিছুক্ষণ থাকো।"

সায়রার বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করে উঠল। আদ্রিয়ানের এই আচরণের আকস্মিক পরিবর্তন সায়রাকে যেমন আবিষ্ট করছিল, তেমনই এক অচেনা আশঙ্কায় বুক কাঁপিয়ে তুলছিল। কারণ সায়রা মনে মনে ভালো করেই জানে, চুক্তি আর পরিবারের চাপে হওয়া এই সম্পর্কের স্থায়ীত্ব কতটুকু। আদ্রিয়ান হয়তো কেবলই মোহের টানে এমন করছে—এই ভেবে সায়রা তার ভেতরের অনুভূতিগুলোকে চেপে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করল।

কিন্তু কয়েকটা দিন পার হতে হতেই পরিস্থিতি অন্য রূপ নিতে লাগল। বর্ষার রাতটা পার হওয়ার পর থেকে আদ্রিয়ান যেন একদম বদলে যেতে শুরু করেছে। সে আর আগের মতো গভীর রাতে বাড়ি ফেরে না, বরং সন্ধ্যার আগেই কাজ শেষ করে সায়রার কাছে ছুটে আসে। সায়রার ছোট ছোট অভ্যাসগুলো সে মুখস্থ করে ফেলেছে। সায়রা কখন এক কাপ চা পছন্দ করে, চায়ে চিনি কতটুকু থাকে, কিংবা কোন বইটা পড়তে ভালোবাসে—আদ্রিয়ান কোনো কিছুই এড়িয়ে যায় না।

একদিন বিকেলে হঠাৎই সায়রার প্রচণ্ড জ্বর এলো। ঋতু পরিবর্তনের এই ঠান্ডা-জ্বরে সায়রা বিছানায় এলিয়ে পড়ল। শরীর যন্ত্রণায় কোঁকাচ্ছিল, কপাল যেন আগুনে পুড়ছিল। আদ্রিয়ান অফিস থেকে ফিরে সায়রার এই অবস্থা দেখে একমুহূর্ত সময় নষ্ট না করে সব কাজ ফেলে তার পাশে এসে বসল।

"সায়রা! তোমার কপাল তো একদম পুড়ে যাচ্ছে," আদ্রিয়ানের কণ্ঠে যে আকুলতা আর ভয় ফুটে উঠল, তা সায়রা আগে কখনো শোনেনি।

সায়রা চোখ মেলতে পারছিল না। সে দুর্বল গলায় বলল, "কিছু হয়নি... একটু শুয়ে থাকলেই ঠিক হয়ে যাবে।"

আদ্রিয়ান কোনো কথা না শুনে নিজেই একটা জলপট্টির পাত্র নিয়ে এলো। সারা রাত ধরে সে সায়রার মাথার পাশে বসে রইল। প্রতিটা মুহূর্তে জলপট্টি বদলে দেওয়া, ভিজে তোয়ালে দিয়ে সায়রার হাত-পা মুছিয়ে দেওয়া—সবই আদ্রিয়ান একা করল। সায়রা যখন জ্বরের ঘোরে অস্থির হয়ে ছটফট করছিল, আদ্রিয়ান তার কোমর পেঁচিয়ে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে রাখল, যাতে সায়রা একটু আরাম পায়।

মাঝরাতে সায়রার চোখ একটু খুলতেই সে দেখল, আদ্রিয়ান বিছানার পাশে বসে একহাতে সায়রার হাত ধরে আছে আর অন্যহাতে জলপট্টি দিচ্ছে। আদ্রিয়ানের চোখের নিচে কালচে দাগ পড়ে গেছে, ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসছে, তবুও সায়রার হাত ছাড়েনি।

সায়রা সজল চোখে ফিসফিস করে বলল, "আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন... এভাবে কষ্ট করছেন কেন?"

আদ্রিয়ান সায়রার দিকে তাকিয়ে একটা উষ্ণ, গভীর হাসি দিল। সে সায়রার মুখের ওপর ঝুঁকে এসে তার ভেজা গালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। "তুমি অসুস্থ থাকলে আমি ঘুমাব কীভাবে, সায়রা? তোমার এই কষ্টটা যেন আমার নিজের শরীরের ভেতর হচ্ছে।"

আদ্রিয়ানের সুগভীর এই স্পর্শ আর ব্যাকুলতা সায়রার মনের একদম গহীনে গিয়ে আঘাত করল। ঘরের বাতি নিভিয়ে দেওয়া ছিল, কেবল রাতের আবছা আলোয় আদ্রিয়ানের সেই উন্মুক্ত বুক আর সায়রাকে জড়িয়ে রাখা উগ্র ভালোবাসাটা ফুটে উঠছিল। আদ্রিয়ান সায়রার শাড়ির আঁচল সরিয়ে তার গলার ভাঁজে, বুকের ওপর পরম মমতায় নিজের ঠোঁট আর হাতের উষ্ণতা ঢেলে দিতে লাগল। জ্বরের তপ্ত শরীর আর আদ্রিয়ানের আকুল কামনার ছোঁয়া মিলে সায়রাকে এক নেশাগ্রস্ত সাগরে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। সায়রা বুঝতে পারছিল, আদ্রিয়ানের এই স্পর্শ নিছক শখের নয়, এর ভেতরে জমা হয়ে আছে গভীর অনুরাগ।

তবে সায়রার মনের ভেতরের সেই পুরোনো সংশয় দূর হলো না। সে ভাবতে লাগল, আদ্রিয়ান হয়তো সায়রার প্রতি দায়িত্ববোধ আর তার অসুস্থতার করুণা থেকেই এসব করছে। সায়রা তো কখনো আদ্রিয়ানের জীবনে মনের মতো মানানসই মেয়ে হতে পারবে না। সে সিদ্ধান্ত নিল, নিজের এই নীরব ভালো লাগা আর ভালোবাসাকে বেশিদূর বাড়তে দেওয়া ঠিক হবে না। আদ্রিয়ানকে তার নিজের জীবন গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত।

জ্বর কিছুটা কমতেই সায়রা মানসিকভাবে তৈরি হতে লাগল এই বাড়ি, এই ঘর এবং আদ্রিয়ানকে ছেড়ে চিরতরে দূরে চলে যাওয়ার জন্য। সে একটা চিঠি গুছিয়ে লিখতে শুরু করল, যেখানে কোনো অভিযোগ থাকবে না, থাকবে কেবল আদ্রিয়ানের প্রতি নীরব শুভকামনা।

কিন্তু সায়রা জানত না, সে যে সম্পর্ক থেকে নিঃশব্দে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, আদ্রিয়ান ততদিনে সেই সম্পর্কের জালে নিজের অস্তিত্বকে পুরোপুরি জড়িয়ে ফেলেছে।
সায়রা টেবিলের ওপর চিঠিটা রেখে নিজের ছোট ট্রাভেল ব্যাগটা হাতে তুলে নিল। কামড়াটার দিকে শেষবারের মতো ফিরে তাকাল সে। ঘরের প্রতিটা কোণে আদ্রিয়ানের ছোঁয়া, তার স্পর্শের উষ্ণতা আর গায়ের পারফিউমের মিহি গন্ধ লেগে আছে। সায়রার চোখের কোণ বেয়ে একবিন্দু জল গড়িয়ে পড়ল। সে মনে মনে বলল, ‘আপনাকে কোনো বাঁধনে বাঁধতে চাইনি আদ্রিয়ান। আপনার জীবন আপনার মতো সুন্দর হোক।’

দরজার হ্যান্ডলে হাত দিতেই সায়রা চমকে উঠল। খটকা শব্দে দরজাটা বাইরে থেকে খুলে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে আদ্রিয়ান। তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ, চুলগুলো উসকোখুসকো, পরনের শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খোলা। হাতে সায়রার প্রিয় বেলী ফুলের তোড়া। আদ্রিয়ানের দৃষ্টি সায়রার হাতের ব্যাগ আর টেবিলের ওপরের চিঠিটার দিকে যেতেই তার মুখের রঙ একমুহূর্তে বদলে গেল।

"কোথায় যাচ্ছ তুমি?" আদ্রিয়ানের কণ্ঠস্বর অসম্ভব নিচু ও কঠিন শোনালো।

সায়রা নিচু চোখে দাঁড়িয়ে রইল, "আমি... আমি চলে যাচ্ছি আদ্রিয়ান। এই বিয়েটা তো আপনার ইচ্ছায় হয়নি। আমি চাই না আমার উপস্থিতি আপনাকে কোনো বোঝা বা বাধ্যবাধকতায় ফেলে রাখুক।"

আদ্রিয়ান এক ঝটকায় হাত থেকে ফুলের তোড়াটা ফেলে দিল। কয়েকটা দ্রুত পদক্ষেপে সায়রার একদম কাছে এসে তার হাতের ব্যাগটা কেড়ে নিয়ে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। সায়রা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আদ্রিয়ান তাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। আদ্রিয়ানের দু-হাত সায়রার মাথার দুই পাশে দেয়ালে শক্ত হয়ে আটকে রইল।

"বোঝা? বাধ্যবাধকতা?" আদ্রিয়ানের নিঃশ্বাস ঝড়ের মতো আছড়ে পড়ছিল সায়রার মুখে। তার চোখের প্রকাণ্ড দহন আর গভীর ব্যাকুলতা দেখে সায়রা শিউরে উঠল।

আদ্রিয়ান সায়রার কোমর দু-হাতে শক্ত করে চেপে ধরে তাকে একদম নিজের বুকের সাথে পিষে ফেলল। সায়রা অনুভব করল আদ্রিয়ানের ভেতরের প্রচণ্ড অস্থিরতা আর বুকের খাঁচায় হূৎপিণ্ডের হাতুড়ি পেটার শব্দ।

"তুমি ভেবেছ তুমি হুট করে আমার জীবনে আসবে, আমাকে পুরোপুরি বদলে দেবে, আর তারপর নিঃশব্দে এক চিঠিতে বিদায় জানিয়ে চলে যাবে?" আদ্রিয়ানের গলার স্বর কাঁপছিল। সে সায়রার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, "যাকে আমি কখনো নিজের জীবনের অংশ ভাবিনি, সেই মেয়েটাই যে আমার পুরো অস্তিত্বজুড়ে শিকড় ছড়িয়ে বসে আছে, তা বুঝতে আমার বড্ড দেরি হয়ে গেছে সায়রা।"

সায়রা চোখ তুলে তাকাল। আদ্রিয়ানের চোখে অশ্রুর স্পষ্ট টলমল ছায়া। সায়রার বুকটা দুমড়ে-মুচড়ে গেল। "আদ্রিয়ান... আমি ভেবেছিলাম আপনি আমাকে কোনোদিন ভালোবাসতে পারবেন না..."

"ভালোবাসি না?" আদ্রিয়ান এক চরম আক্ষেপে সায়রার ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট চেপে ধরল।

সে স্পর্শ কোনো আলতো ছোঁয়া ছিল না, তা ছিল আকুল দাবির চরম প্রকাশ। আদ্রিয়ানের উগ্র এবং গাঢ় ভালোবাসায় সায়রা নিজেকে হারিয়ে ফেলতে লাগল। আদ্রিয়ানের হাত সায়রার পিঠের শাড়ির ভাঁজ পেরিয়ে উন্মুক্ত ত্বকে ছড়িয়ে পড়ল। তার বুড়ো আঙুল সায়রার কোমরের নমনীয় বাঁকে শক্ত বাঁধন তৈরি করল। সায়রা নিজের শরীর ও মনকে সম্পূর্ণ সঁপে দিল সেই অগ্নিকুণ্ডের মতো অনুরাগের আঁচে।

আদ্রিয়ান সায়রাকে শূন্যে তুলে নিয়ে সোজা বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। সায়রাকে বিছানায় নামিয়ে দিয়ে সে নিজেও সায়রার ওপর ঝুঁকে পড়ল। আদ্রিয়ানের উন্মুক্ত বুকের উষ্ণতা আর সায়রার ভেজা নিঃশ্বাস ঘরের বাতাসে এক মাতাল করা রোমান্সের জন্ম দিল। আদ্রিয়ান সায়রার কপাল, চোখ, গাল আর গলার ভাঁজে ঘন ঘন উগ্র চুমু এঁকে দিতে লাগল।

"আমায় ছেড়ে যাওয়ার কথা আর কোনোদিন ভাববে না, সায়রা। তুমি আমার একমাত্র আপন মানুষ... আমার একমাত্র তৃষ্ণা," আদ্রিয়ান সায়রার শাড়ির আঁচলটা পুরোপুরি সরিয়ে দিয়ে তার বুকে মাথা গুঁজে গভীর নিঃশ্বাস নিল।

সায়রা তার কাঁপা কাঁপা হাত দুটি বাড়িয়ে আদ্রিয়ানের ঘাড় পেঁচিয়ে ধরল। আঙুলগুলো ডুবিয়ে দিল আদ্রিয়ানের ঘন চুলে। সে বুঝতে পারল, আদ্রিয়ান তার জন্য যে আবেগ বুনেছে, তা কেবল কোনো ক্ষণিক মোহ নয়—তা জীবনের চেয়েও সুগভীর এক সত্য। সায়রা আদ্রিয়ানের বুকে নিজেকে আড়াল করে নিচু স্বরে বলল, "আমি কোথাও যাব না... কখনো না।"

ঘরের বাইরে বৃষ্টি তখন থেমে এসেছে। কিন্তু কামড়ার ভেতরের উত্তপ্ত প্রহরগুলো দুজনের ভালোবাসার নিঃশব্দ জোয়ারে ভাসতে লাগল। সব দূরত্ব, সব ভুল বোঝাবুঝি ভেঙে আদ্রিয়ান আর সায়রা এক নতুন ভোরে একে অপরের বুকে খুঁজে পেল চিরন্তন আশ্রয়।

....
👁 64