বিরহের রাতের পুনর্মিলন

রাত তখন পৌনে এগারোটা। উত্তরার নির্জন গলির মুখে নিজের ফ্ল্যাটের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ছিল অর্ণব। মে মাসের গুমোট হাওয়ায় সিগারেটের ধোঁয়াটা কেমন যেন ভারী হয়ে জমে আছে বাতাসে। ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছে, কিন্তু অর্ণবের ভেতরের সময়টা যেন আজ থেকে ঠিক চার বছর আগের একটা ঝড়ো রাতে আটকে গেছে।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

চার বছর। চারটে দীর্ঘ বছর কেটে গেছে নীহারিকা তাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর। কোনো সস্তা বিদায়ের সংলাপ ছিল না, ছিল না কোনো চিত্কার-চেঁচামেছি। কেবল একটা ভুল বোঝাবুঝি, গভীর অভিমান আর দুটো অহংকারী মনের নীরব দূরত্ব। নীহারিকা যখন তার গুছিয়ে নেওয়া ট্রলি ব্যাগটা টেনে দরজার দিকে হেঁটে যাচ্ছিল, অর্ণব তাকে থামায়নি। সে দাঁড়িয়েছিল লিভিং রুমের সেই কোণায়, হাত দুটো পকেটে গুঁজে, কাঠ হয়ে। রক্তে তখন অহংকারের বিষ। সে ভেবেছিল, যে যেতে চায় তাকে আটকে রাখা মানে নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দেওয়া। কিন্তু নীহারিকা কবাটটা বন্ধ করে বেরিয়ে যাওয়ার পর যে তীব্র হাহাকার পুরো ঘরজুড়ে নেমে এসেছিল, তা আজ পর্যন্ত অর্ণবের বুকের ভেতর একটা স্থায়ী ক্ষত হয়ে রয়ে গেছে।

বাইরে থেকে অর্ণব এখন বদলে গেছে অনেক। কর্পোরেট জগতে সে সফল, তার চেহারায় পরিপক্বতার ছাপ, চালচলনে একধরনের শীতল কাঠিন্য। লোকে তাকে চেনে একজন সফল, শান্ত আর গম্ভীর মানুষ হিসেবে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে আজও সেই ভাঙা ভালোবাসার ধ্বংসস্তূপ আঁকড়ে বসে থাকা এক নিঃসঙ্গ পুরুষ।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

হঠাৎ ফোনের ভাইব্রেশনে অর্ণবের ধ্যান ভাঙল। স্ক্রিনে তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু তৌফিকের নাম।

"বল তৌফিক," অর্ণব নিচু গলায় বলল।

"অর্ণব, তুই কোথায়? কাল বিকেলের ফ্লাইটে একজন খুব স্পেশাল অতিথি আসছে আমাদের নতুন প্রজেক্টের লিড হিসেবে। তুই কি মিটিংয়ের ফাইলগুলো ডাবল চেক করেছিস?"

"হ্যাঁ, করেছি। কে আসছে বললি? নাম তো বলিসনি।"

ওপাশে একটু নীরবতা। তারপর তৌফিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "অর্ণব, নিজেকে শক্ত কর। নামটা আর্কিটেক্ট নীহারিকা চৌধুরী। লন্ডন থেকে ফিরছে। ও-ই এই মাল্টিন্যাশনাল প্রজেক্টের হেড।"

কথাটা শোনার সাথে সাথে অর্ণবের আঙুলের ফাঁকে থাকা জ্বলন্ত সিগারেটটা নিচে পড়ে গেল। মাথার ভেতর যেন একসাথে একশোটা ড্রাম বেজে উঠল। বুকটা অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে ওঠানামা করতে লাগল। নীহারিকা? নীহারিকা আবার ঢাকায় ফিরছে? তাও আবার তার সাথে কাজ করার জন্য?

"অর্ণব? শুনতে পাচ্ছিস?" তৌফিকের গলায় উদ্বেগ।

"হ্যাঁ... শুনছি। কাল বিকেল চারটায় তো? ঠিক আছে, মিটিং অন টাইম হবে।" অর্ণব কোনো মতে লাইনটা কেটে দিল।

পরের পুরো রাতটা অর্ণবের চোখে একফোঁটা ঘুম এলো না। সে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ভোরের আলো ফোটা দেখল। মনের ভেতর হাজারো প্রশ্ন ডানা মেলছিল—কেন চার বছর পর নীহারিকা ফিরছে? কেন আবার তার জীবনের চারপাশে ঘুরপাক খেতে আসছে? সে কি অর্ণবকে একদম ভুলে গেছে, নাকি এই ফেরার পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে?

পরদিন বিকেল চারটে। গুলশানের আধুনিক কাঁচের টাওয়ারের পঞ্চদশ তলার কনফারেন্স রুম। অর্ণব টেবিলের একপাশে বসে ব্ল্যাক কফি চুমুক দিচ্ছিল। বাহ্যিকভাবে সে একদম স্বাভাবিক, পরনে গাঢ় নীল স্যুট, চুল নিখুঁত আঁচড়ানো। কিন্তু তার ভেতরের হূৎপিন্ডটা যে হারে লাফাচ্ছিল, তা কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে সহ্য করা কঠিন।

ঠিক চারটে বাজার তিন মিনিটে দরজার কাঁচের হাতলটা ঘুরল। ঘরে পা রাখল নীহারিকা।

মুহূর্তের জন্য পুরো পৃথিবীর সময় যেন থমকে গেল। অর্ণব চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।

নীহারিকা অনেকটাই বদলে গেছে। আগের সেই এলোমেলো, আবেগপ্রবণ মেয়েটা আর নেই। পরনে মার্জিত অফ-হোয়াইট ফরমাল ট্রাউজার আর পার্পল সিল্কের শার্ট। কাধ পর্যন্ত ছাঁটা চুল, চোখে একধরনের প্রাজ্ঞ শীতলতা। কিন্তু তার চোখের সেই চেনা গভীরতা—যে গভীরতায় অর্ণব একসময় ডুব সাঁতার কাটত—তা এখনো অবিকল একই রকম আছে।

নীহারিকা ঘরে ঢুকেই সোজা অর্ণবের দিকে তাকাল। দুজনের চোখ মিলল। বাতাসে যেন এক অদৃশ্য বিদ্যুতের শক খেলে গেল। চার বছরের জমানো কষ্ট, রাগ, অভিমান আর তীব্র তৃষ্ণা এক মুহূর্তে একটা অদৃশ্য ঝড়ের মতো ঘরের আবহাওয়া ভারী করে তুলল।

"হ্যালো অর্ণব," নীহারিকার কণ্ঠস্বর শান্ত, পেশাদার, কিন্তু তাতে হালকা একটু কাঁপন ছিল যা কেবল অর্ণবের কানই ধরতে পারল।

"ওয়েলকাম ব্যাক, নীহারিকা," অর্ণব নিজের গলা যতদূর সম্ভব স্বাভাবিক রেখে বলল। সে হাত বাড়িয়ে দিল।

নীহারিকা কিছুক্ষণ অর্ণবের বাড়ানো হাতের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের নরম, উষ্ণ হাতটা অর্ণবের হাতের তালুতে রাখল। স্পর্শ করতেই যেন দুজনের শরীরে একসাথে আগুন জ্বলে উঠল। অর্ণব অনুভব করল নীহারিকার হাতের আঙুলগুলো মৃদু কাঁপছে। নীহারিকার ত্বক থেকে আসছে সেই একই হালকা বেলি ফুলের আতরের ঘ্রাণ—যে ঘ্রাণ চার বছর ধরে অর্ণবকে প্রতি রাতে তাড়া করে বেরিয়েছে।

অর্ণব অজান্তেই তার গ্রিপ কিছুটা শক্ত করে ফেলল। নীহারিকা চোখ তুলে তাকাল। তাদের চোখের ভাষা যেন চিৎকার করে বলছিল—আমরা যতই দূরে থাকি, আমরা একে অপরের ছাইচাপা আগুন।

মিটিং শুরু হলো। সবাই প্রজেক্টের প্রেজেন্টেশন নিয়ে ব্যস্ত, কিন্তু অর্ণবের সমস্ত খেয়াল ছিল নীহারিকার দিকে। নীহারিকা যখন কথা বলছিল, তার ঠোঁটের নাড়াচাড়া, তার হাতের সূক্ষ্ম ভঙ্গি, তার চোখের পাতা ফেলা—সবকিছু অর্ণব শোষণ করে নিচ্ছিল তৃষ্ণার্তের মতো। সে লক্ষ্য করল, নীহারিকা যতই পেশাদার থাকার চেষ্টা করুক না কেন, সে বারবার অর্ণবের দিকে তাকাচ্ছে আর খাতা কাটাকাটি করছে। নীহারিকার ফর্সা গলায় ফুটে ওঠা একটা হালকা নীল শিরা স্পন্দিত হচ্ছিল—যেটা সে কেবল তখনই হতো যখন সে ভয়ানক উত্তেজিত বা অনুভূতির চাপে থাকতো।

মিটিং শেষ হলো সন্ধ্যা সাতটায়। দলের অন্য সদস্যরা একে একে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। কিন্তু অর্ণব সরলো না। সে নিজের ল্যাপটপ গুছানোর অজুহাতে অপেক্ষা করছিল। নীহারিকাও নিজের ফাইলগুলো ধীরে ধীরে ব্যাগে ভরছিল।

অবশেষে পুরো কনফারেন্স রুমে কেবল তারা দুজন। ঘরের এসিটা গুনগুন করে শব্দ করছিল, আর বাইরে ঢাকার শহরের আলো ঝিলমিল করছিল।

অর্ণব দরজাটা লক করার মতো শব্দ করে ভিড়িয়ে দিল। তারপর ধীরে ধীরে হেঁটে নীহারিকার টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল।

"কেমন আছ নীহারিকা?" অর্ণবের কণ্ঠ এবার আর পেশাদার নয়, তাতে ফুটে উঠল চার বছরের পুঞ্জীভূত হাহাকার।

নীহারিকা গোছানো বন্ধ করে সোজা হয়ে দাঁড়াল। সে অর্ণবের চোখের দিকে তাকাতে পারছিল না। "ভালো। তুমি কেমন আছ?"

"ভালো?" অর্ণব হালকা একটু হাসল, যে হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না। "তুমি সত্যিই মনে করো আমি ভালো থাকতে পারি? চারটে বছর তুমি নিখোঁজ ছিলে নীহারিকা। একটা ফোন নয়, একটা বার্তা নয়। যেন আমি তোমার জীবনে কখনো ছিলামই না।"

"অর্ণব, প্লিজ..." নীহারিকার গলা ধরে এলো। সে একপা পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। "আমরা এখানে কাজ করতে এসেছি। পুরোনো কথা তুলে লাভ নেই।"

"লাভ নেই?" অর্ণব এক পা এগিয়ে এলো। তার পুরুষালী দেহের ছায়া ঢেকে দিল নীহারিকাকে। "তুমি ভাবছ চার বছর পর এইভাবে হুট করে আমার সামনে এসে দাঁড়াবে আর আমি সুবোধ বালকের মতো প্রজেক্ট ফাইল নিয়ে কথা বলব? তুমি জানো এই চারটে বছর আমার প্রতিটা রাত কীভাবে কেটেছে?"

অর্ণবের গলার স্বর নিচু কিন্তু চরম উত্তেজনায় কাঁপছিল। সে নীহারিকার এত কাছে চলে এলো যে তাদের নিঃশ্বাস একে অপরের মুখে লাগছিল। নীহারিকার বুকের ওঠানামা দ্রুত হয়ে গেল। তার চোখে ফুটে উঠল অদ্ভুত এক দ্বিধা—একদিকে তীব্র আকর্ষণ, অন্যদিকে ভয়ংকর কোনো এক অপরাধবোধ।

"অর্ণব, সরে দাঁড়াও... কেউ দেখে ফেলবে," নীহারিকা বিড়বিড় করে বলল, কিন্তু তার নিজের কণ্ঠে কোনো জোর ছিল না। সে অর্ণবের বুকের ওপর হাত রাখল তাকে ঠেলে দেওয়ার জন্য, কিন্তু তার আঙুলগুলো অর্ণবের শার্টের কাপড়ে আটকে রইল।

অর্ণব আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। চার বছরের ক্ষুধা, অভিমান আর তীব্র ভালোবাসার বাঁধ এক মুহূর্তে ভেঙে গেল। সে নীহারিকার কোমর ধরে এক ঝটকায় নিজের দিকে টেনে আনল। নীহারিকার শরীরটা অর্ণবের শক্ত চওড়া বুকের সাথে এসে পিষে গেল।

"আমাকে দেখতে দাও নীহারিকা, তুমি কতটা বদলেছ," অর্ণব ফিসফিস করে বলল।

সে তার ডান হাতটা নীহারিকার রেশমি চুলে ডুবিয়ে দিল, আর মাথাটা একটু নুইয়ে তার গালে ঠোঁট ছোঁয়াল। নীহারিকা একটা ছোট সিস্কার ছেড়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। অর্ণবের ঠোঁট তখন নীহারিকার কানের লতি বেয়ে নিচে নেমে আসছে, সোজা তার উষ্ণ গলায়। নীহারিকার শ্বাস-প্রশ্বাস থেমে আসার উপক্রম হলো। চার বছর ধরে যে স্পর্শের জন্য সে ব্যাকুল হয়ে কেঁদেছে, সেই স্পর্শ আজ তাকে জ্বালিয়ে ছারখার করে দিচ্ছে।

অর্ণব নীহারিকার থুতনি ধরে নিজের দিকে মুখটা তুলল। নীহারিকার ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁক হয়ে ছিল, যেন অনুরাগের তীব্রতায় সে হাঁপাচ্ছিল। অর্ণব আর কোনো কথা না বলে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল নীহারিকার রসালে ঠোঁটে।

সে এক গভীর, তীব্র আর বন্য চুম্বন। এতে ছিল চার বছরের বিরহের জ্বালা, অভিমানের বিষ আর বুভুক্ষু ভালোবাসা। নীহারিকা প্রথমে সামান্য প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলেও কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সে নিজেকে সঁপে দিল। তার দু-হাত অর্ণবের ঘাড় পেঁচিয়ে ধরে তাকে আরও কাছে টেনে নিল। তাদের জিব, ঠোঁট আর নিঃশ্বাস একে অপরের সাথে মিশে এক হয়ে গেল। কনফারেন্স রুমের সেই শীতল বাতাসে তাদের দুটি দেহের উত্তাপ এক আদিম আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল।

অর্ণবের হাত নীহারিকার পিঠ বেয়ে নিচে নেমে এসে তার কোমর আঁকড়ে ধরল, নীহারিকাকে টেবিলের ওপর সামান্য তুলে বসিয়ে দিল। তাদের দুজনের হৃদস্পন্দন যেন একসাথে একই তালে বাজছিল। নীহারিকার হাত অর্ণবের পিঠের মাংসপেশি আঁকড়ে ধরেছিল পাগলের মতো। অর্ণব নীহারিকার শার্টের প্রথম দুটো বোতাম খুলে ফেলল, তার ঠোঁট নেমে এলো নীহারিকার কলারবোনের ওপর, যেখানে রক্ত চলাচল দ্রুত হওয়ার কারণে ত্বক গরম হয়ে উঠেছিল।

"অর্ণব... ওহ অর্ণব..." নীহারিকার মুখ দিয়ে এক অস্ফুট আর্তনাদ বেরিয়ে এলো। তার চোখের কোণ দিয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে অর্ণবের গালে পড়ল।

চোখের জলের স্পর্শ পেতেই অর্ণব থমকে গেল। সে ধীরে ধীরে মুখ তুলল। নীহারিকার দিকে তাকাল। নীহারিকার ঠোঁট দুটো চুম্বনে লাল হয়ে উঠেছে, চুলগুলো এলোমেলো, বুকের শার্ট সামান্য খোলা—তার রূপ যেন এক ধ্বংসাত্মক আগুনের মতো জ্বলছে। কিন্তু তার চোখে ভাসছিল এক গভীর, তীব্র যন্ত্রণা।

অর্ণব একটু পিছিয়ে এলো, যদিও তার হাত তখনও নীহারিকার কোমরেই ছিল। সে নিজের ভারী নিঃশ্বাস সামলানোর চেষ্টা করে বলল, "তুমি কাঁদছ কেন নীহারিকা? যদি আমাকে এখনো এতই ভালোবাসো, তবে সেদিন চলে গিয়েছিলে কেন? আর আজই বা কেন ফিরে এলে?"

নীহারিকা নিজের শার্টের বোতামগুলো কাঁপাদিয়ে হাতে ঠিক করল। সে টেবিল থেকে নেমে দাঁড়াল, তার পা দুটো যেন কাঁপছিল। সে অর্ণবের চোখের দিকে তাকাতে পারছিল না।

"আমি তোমাকে ভালোবাসতে আসিনি অর্ণব," নীহারিকা ভাঙা গলায় বলল, তার কন্ঠে এক কঠিন বাস্তবতা ফিরে এলো। "আমি বাধ্য হয়ে এসেছি।"

"বাধ্য হয়ে? মানে কী?" অর্ণব ভ্রূ কুঁচকাল।

নীহারিকা তার ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল। সে দরজার দিকে এক পা বাড়িয়ে থেমে গেল, কিন্তু অর্ণবের দিকে না তাকিয়েই বলল, "সবকিছু তোমার ধারণার বাইরে অর্ণব। তুমি যা দেখছ, তা সত্যি নয়। আমি একা ফিরিনি... আমার সাথে একটা সত্যিও ফিরে এসেছে। যা জানার পর তুমি হয়তো আমাকে আর কোনোদিন ভালোবাসতে পারবে না, কেবল ঘৃণাই করবে।"

কথাটা বলেই নীহারিকা আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে দ্রুত কনফারেন্স রুম থেকে বেরিয়ে গেল। তার হাই হিলের ঠকঠক শব্দটা করিডোর ধরে দূরে মিলিয়ে গেল।

অর্ণব একা দাঁড়িয়ে রইল অন্ধকার ঘরের মাঝখানে। তার ঠোঁটে তখনও নীহারিকার মিষ্টি স্বাদ, তার শরীরে নীহারিকার উত্তাপ, কিন্তু তার মস্তিষ্কে বাজছিল নীহারিকার শেষ কথাগুলো—আমার সাথে একটা সত্যিও ফিরে এসেছে... যা জানার পর তুমি আমাকে ঘৃণা করবে।

অর্ণবের ভেতরের পৃথিবীটা যেন এক অজানা আশঙ্কায় দুলতে শুরু করল। কী সেই সত্য? নীহারিকা কী লুকাচ্ছে তার কাছে?
পরের কয়েকটা দিন অর্ণবের জন্য এক দুঃস্বপ্নের মতো কাটল। কাজ, ফাইল, মিটিং—সবকিছুর ভেতরেই তার মন পড়ে থাকত নীহারিকার সেই শেষ কথাগুলোর ওপর। “আমার সাথে একটা সত্যিও ফিরে এসেছে...” কথাটি অর্ণবের মাথার ভেতরে চাবুকের মতো আছড়ে পড়ছিল। সে হাজার চেষ্টা করেও নীহারিকার স্পর্শ, তার চুম্বনের উত্তাপ আর তার চোখের সেই সীমাহীন বেদনা ভুলতে পারছিল না।

প্রজেক্টের কাজের সুবাদে তাদের প্রায় প্রতিদিনই মুখোমুখি হতে হচ্ছিল। কিন্তু কনফারেন্স রুমের সেই ঝোড়ো সন্ধ্যার পর নীহারিকা নিজের চারপাশে একটা অদৃশ্য কাঁচের দেয়াল তুলে নিয়েছে। সে অর্ণবের সাথে একদম পেশাদার আচরণ করছে, অতিরিক্ত একটা কথা বা একটা বাড়তি নজরও অর্ণবকে দিচ্ছে না। অর্ণবের মনে হচ্ছিল নীহারিকা তাকে কাছে টানার ভয় থেকেই এত দূরত্ব তৈরি করছে।

শুক্রবার বিকেলে উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের একটা নিরিবিলি ক্যাফেতে একটা অন-সাইট আর্কিটেকচারাল ম্যাপ পর্যালোচনার জন্য তাদের দুজনকে বসতে হলো। ক্যাফের দোতলার কাঁচের জানালার পাশে আলো-আঁধারির এক মায়াবী পরিবেশ। বাইরে হালকা গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছিল।

অর্ণব ব্লুপিন্টটা টেবিলের ওপর মেলে ধরে শান্ত গলায় বলল, "নীহারিকা, সাউথ ব্লকের ডিজাইনটাতে তোমার ক্যান্টিলিভার স্ট্রাকচারটা বেশ রিস্কি মনে হচ্ছে। আরেকটু বিম সাপোর্ট দেওয়া দরকার।"

নীহারিকা ঝুঁকে ম্যাপটা দেখতে লাগল। তার রেশমি চুলের কয়েকটা গুচ্ছ সামনে গড়িয়ে পড়ে অর্ণবের হাতের তালু ছুঁয়ে গেল। সেই ক্ষণিকের স্পর্শেই অর্ণবের শরীরের রক্তে যেন আবার সেই চেনা আগুন জ্বলে উঠল। নীহারিকার বেলি ফুলের ঘ্রাণ আর তার গায়ের উষ্ণতা আবার অর্ণবের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ কাড়তে চাইল।

"না অর্ণব," নীহারিকা না তাকিয়েই নিচু স্বরে বলল, "বিম দিলে ভিউ নষ্ট হবে। আমি অ্যালুমিনিয়াম কম্পোজিট প্যানেল ব্যবহার করব, লোড ব্যালেন্স হয়ে যাবে।"

অর্ণব আর ম্যাপের দিকে তাকাল না। সে সরাসরি নীহারিকার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। নীহারিকার ঠোঁট দুটো কফির কাপে চুমুক দেওয়ার সময় হালকা ভিজে উঠেছিল। অর্ণবের ইচ্ছে হচ্ছিল ঠিক এই মুহূর্তে তাকে আবার নিজের বাহুডোরে টেনে নিয়ে সেই ঠোঁটের তৃষ্ণা মেটাতে।

"তুমি কতদিন এভাবে পালাবে নীহারিকা?" অর্ণবের কণ্ঠস্বর গভীর ও থমথমে হয়ে এলো।

নীহারিকা কফির কাপটা নামিয়ে রাখল। সে চোখের দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে বলল, "আমি পালাচ্ছি না। কাজের কথা বলো।"

"কাজের কথা?" অর্ণব হঠাৎ করে নীহারিকার একটা হাত টেবিলের ওপর চেপে ধরল। তার উষ্ণ, শক্ত আঙুলগুলো নীহারিকার নরম কবজি আঁকড়ে ধরল। "সেদিনের চুম্বনের পর তুমি আমাকে বলছ কাজের কথা বলতে? তুমি কি অনুভব করতে পারছ না তোমার শরীর, তোমার মন এখনও আমার জন্যই হাঁপায়?"

"অর্ণব, হাত ছাড়ো! লোকজন দেখছে," নীহারিকা চোখ বড় করে ফিসফিস করে উঠল, কিন্তু সে হাত ছাড়ানোর কোনো শক্ত চেষ্টা করল না। অর্ণবের স্পর্শ পাওয়ার সাথে সাথেই তার শ্বাসের গতি দ্রুত হয়ে উঠল, বুকের ভেতরের কম্পন স্পষ্ট হয়ে উঠল।

"কাউকে পরোয়া করি না আমি," অর্ণব তার হাতের গ্রিপ আরও শক্ত করল। সে নিজেকে কিছুটা সামনে ঝুঁকিয়ে নীহারিকার এত কাছে গেল যে তাদের ঠোঁটের দূরত্ব ছিল মাত্র কয়েক ইঞ্চি। "আমি দেখতে পাচ্ছি তোমার ভেতরের তৃষ্ণা নীহারিকা। চার বছর আগের সেই ভুল বোঝাবুঝি আমাদের শরীর আর মনকে আলাদা করতে পারেনি। তুমি আমাকে ভালোবাসো, আজও।"

নীহারিকার চোখ দুটো জলে ভরে উঠল। সে অর্ণবের চোখের দিকে তাকাল—সেখানে ভালোবাসার তীব্র দাবি, গভীর লালসা আর সীমাহীন ব্যাকুলতা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। নীহারিকার নিজের আত্মনিয়ন্ত্রণ আবার ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে লাগল। অর্ণবের পুরুষালী স্পর্শের উত্তাপ তার শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়ছিল।

"তুমি... তুমি ভুল ভাবছ," নীহারিকা ভাঙা গলায় অস্ফুট স্বরে বলল, কিন্তু সে নিজের নাকে অর্ণবের নিঃশ্বাসের উত্তাপ পাচ্ছিল।

অর্ণব আর নিজেকে থামাতে পারল না। ক্যাফের সেই আড়াল করা কোণায়, বৃষ্টিভেজা জানালার পাশে সে নীহারিকার ডান হাতটা টেনে নিয়ে নিজের স্যুটের ভেতরে নিজের বুকের বাঁ দিকে রাখল। "শুনতে পাচ্ছ? এই হৃদস্পন্দন চার বছর ধরে শুধু তোমার নাম জপছে। আমাকে আর শাস্তি দিও না।"

কথাটা শেষ করেই অর্ণব তার ঠোঁট আবার ডুবিয়ে দিল নীহারিকার লালচে ঠোঁটে।

এবারের চুম্বনটা আগের চেয়েও বেশি গভীর, বেশি ব্যাকুল আর কামনায় ভরপুর ছিল। ক্যাফের নির্জন কোণায় নীহারিকা নিজের সমস্ত দ্বিধা ভুলে অর্ণবের বুকে লেপ্টে গেল। অর্ণবের হাত নীহারিকার চুল আঁকড়ে ধরে তার মাথাটা আরও উঁচিয়ে ধরল, অন্য হাতটা নীহারিকার পিঠের বাঁক বেয়ে নিচে নেমে এসে তার মেদহীন কোমরটা শাড়ির আঁচলের ওপর দিয়েই শক্ত করে চিপে ধরল। নীহারিকা একটা গভীর সিস্কার ছেড়ে অর্ণবের জামার কলার আঁকড়ে ধরল। তাদের ঠোঁটের ঘর্ষণে, জিবের কামড়াকামড়িতে এক উন্মাদ উত্তাপ তৈরি হলো। অর্ণব নীহারিকার ঠোঁটের খাঁজ চুষে নিতে লাগল, তার নিঃশ্বাসের গরম বাতাস নীহারিকার গালে আর গলায় ছড়িয়ে পড়ল।

নীহারিকার দু-হাত অর্ণবের পিঠে চেপে বসল। সে অর্ণবের ঠোঁটের মিষ্টি স্বাদ শুষে নিচ্ছিল এক বুভুক্ষু তীব্রতায়। চার বছরের জমাট বাঁধা সমস্ত বিরহ আর বাসনা তাদের এই স্পর্শে বিস্ফোরিত হচ্ছিল। অর্ণব নীহারিকার কলারবোন আর গলার সংবেদনশীল অংশে নিজের ঠোঁটের গভীর চাপ দিতে লাগল, যার প্রতিটি ছোঁয়ায় নীহারিকা কেঁপে উঠছিল।

প্রায় মিনিট পাঁচেক পর, যখন দুজনেরই শ্বাসপ্রশ্বাস প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো, নীহারিকা হঠাৎ এক অদ্ভুত শক্তিতে অর্ণবকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। সে হাঁপাচ্ছিল, তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছিল অবিরল অশ্রু।

"না! এটা ভুল! অর্ণব, বন্ধ করো এটা!" নীহারিকা নিজের এলোমেলো চুল আর শাড়ির আঁচল ঠিক করতে করতে দাঁড়িয়ে পড়ল।

"নীহারিকা! কী হয়েছে তোমার? কেন তুমি বারবার নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছ?" অর্ণবও দাঁড়িয়ে পড়ল, তার গলায় তীব্র হতাশা।

"কারণ আমি আর আগের নীহারিকা নেই অর্ণব!" নীহারিকা চিৎকার করে উঠল, ক্যাফের কয়েকজন গ্রাহক চমকে তাদের দিকে তাকাল। নীহারিকা নিজের গলা নিচু করে ফেলল, তার কণ্ঠে ছিল এক বুকভাঙা করুণ আর্তনাদ। "তুমি ভাবছ আমি একা ফিরেছি? তুমি ভাবছ আমি ইংল্যান্ডে খুব আরামে ছিলাম? না, অর্ণব। আমি এই চার বছর ধরে একটা মিথ্যে আর একটা বিরাট অন্যায়ের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছি।"

অর্ণবের ভেতরের সমস্ত উত্তেজনা এক মুহূর্তে হিম হয়ে গেল। "কিসের মিথ্যে? কীসের অন্যায়ের কথা বলছ তুমি?"

নীহারিকা নিজের ব্যাগ থেকে একটা ছোট ছবি বের করল। তার হাত দুটো থরথর করে কাঁপছিল। সে ছবিটা টেবিলের ওপর অর্ণবের দিকে ঠেলে দিল।

অর্ণব সংশয়ী চোখে ছবির দিকে তাকাল।

ছবিতে একটা ফুটফুটে সাড়ে তিন বছরের ছোট্ট মেয়ে। তার কোঁকড়ানো চুল, মেটে রঙের চোখ, আর গালে একটা স্পষ্ট টোল পড়া হাসি। মেয়েটির হাসির ভঙ্গি, তার চোখের চাহনি, আর তার গালের সেই টোল—অর্ণবের নিজের ছোটবেলার ছবির অবিকল প্রতিচ্ছবি।

অর্ণবের মাথার ভেতরে যেন বজ্রপাত হলো। তার রক্ত চলাচল থমকে গেল। সে বিস্ময়ে বিস্ফারিত চোখে ছবির দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর তাকাল নীহারিকার দিকে।

"এ... এ কে, নীহারিকা?" অর্ণবের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল, শব্দগুলো বের হচ্ছিল অত্যন্ত কষ্টেসৃষ্টে।

নীহারিকা তার চোখ দুটো মুছে এক কঠিন কিন্তু ভেজা গলায় বলল, "ওর নাম অর্ণবী। সাড়ে তিন বছর বয়স তার। লন্ডনে আমার এক বন্ধুর কাছে রেখে এসেছি ওকে, আগামী সপ্তাহে ও ঢাকায় আসছে।"

অর্ণব টেবিলটা আঁকড়ে ধরল। তার চোখের সামনে পুরো ক্যাফটা যেন চক্কর দিয়ে উঠল। "সাড়ে তিন বছর? তার মানে... চার বছর আগে যখন তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলে...?"

"হ্যাঁ অর্ণব," নীহারিকা তার চোখের জল আর আটকে রাখল না, সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। "যখন আমি তোমার ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাই, তার মাত্র তিন দিন পর আমি জানতে পারি আমি গর্ভবতী। তোমার সন্তান আমার পেটে ছিল।"

অর্ণবের পা দুটো কাঁপতে লাগল। সে ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ল। সে কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল। চার বছর আগে যে ভুল বোঝাবুঝির কারণে সে নীহারিকাকে আটকে রাখেনি, সেই সামান্য অহংকারের মাশুল হিসেবে সে তার নিজের সন্তানকে একটি দিনের জন্যও দেখতে পায়নি!

"তুমি... তুমি আমাকে জানাওনি কেন?" অর্ণব গর্জে উঠতে চাইল, কিন্তু তার গলা দিয়ে কেবল একটা ভাঙা শব্দ বের হলো। "তুমি আমার সন্তানকে আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখলে কীভাবে নীহারিকা? তুমি এত বড় অপরাধ কীভাবে করলে?"

"কারণ তুমি আমাকে বিশ্বাস করোনি অর্ণব!" নীহারিকা কাঁপতে কাঁপতে বলল। "সেদিন যদি আমি ফিরে আসতাম, তুমি ভাবতে আমি হয়তো দায় এড়াতে বা বাচ্চার দোহাই দিয়ে তোমার কাছে ভিক্ষা চাইতে এসেছি। আমার অহংকার আমাকে তোমার কাছে আসতে দেয়নি। কিন্তু আমি একা ওকে বড় করেছি। প্রতিটি রাতে তোমার নাম জপতে জপতে আমি ওকে কোলে নিয়ে কেঁদেছি।"

অর্ণব মাথায় হাত দিয়ে বসে রইল। তার ভেতরে চরম অপরাধবোধ, ক্ষোভ আর ভালোবাসার এক ভয়ংকর ঝড় বইছিল। সে পিতা! সে সাড়ে তিন বছর ধরে একটি মেয়ের বাবা, অথচ সে জানতই না!

"তাহলে আজ কেন ফিরলে নীহারিকা?" অর্ণব চোখ তুলে তাকাল, তার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে। "আজ চার বছর পর হঠাৎ এই সত্যিটা নিয়ে আমার সামনে কেন এলে?"

নীহারিকা অর্ণবের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন ফুটে উঠেছে এক গভীর, অন্ধকার সত্য—যে সত্যটি কেবল এই সন্তানের জন্ম নয়, বরং তার চেয়েও ভয়াবহ কিছু প্রকাশ করার প্রতীক্ষায় ছিল।

নীহারিকা সোজা হয়ে বসল, তার গলায় নেমে এলো এক অদ্ভুত মৃত্যুর মতো শীতলতা। "কারণ অর্ণবী অসুস্থ, অর্ণব। মারাত্মক অসুস্থ। ওর বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট দরকার, যা কেবল ওর রক্তের কোনো আপনজনই দিতে পারে। আমি ওকে বাঁচানোর জন্য তোমার কাছে এসেছি... আর একটা শেষ হিসাব মেটাতে এসেছি।"

অর্ণবের বুকের ভেতরটা এক নিমেষে খালি হয়ে গেল। তার পুরো পৃথিবীটা যেন এক সেকেন্ডের মধ্যে তাসের ঘরের মতো ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল।
নীহারিকার কথাগুলো শোনামাত্র অর্ণবের মাথার ভেতরে সব ফাঁকা হয়ে গেল। বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট? সাড়ে তিন বছরের ছোট্ট বাচ্চাটা মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে? অর্ণবের চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠতে লাগল ছবির সেই মেটে রঙের চোখের টোলপড়া নিষ্পাপ মুখখানা—অর্ণবী, তার রক্ত, তার নিজের সন্তান।

অর্ণব এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না। সে টেবিল ডিঙিয়ে নীহারিকার দুটো হাত নিজের শক্ত মুঠোয় চেপে ধরল। তার চোখে তখন কোনো দ্বিধা নেই, কোনো রাগ নেই, আছে কেবল এক পৈতৃক সুরক্ষার তীব্র আকুতি।

"কখন আসছে ও? আমাকে বল নীহারিকা, ও ঢাকায় কখন পৌঁছাবে?" অর্ণবের কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল। "আমার শরীরের যা লাগবে—রক্ত, বোন ম্যারো, রক্তকণিকা—সব দেব। কিন্তু আমার মেয়েকে কিছু হতে দেব না। তুমি শুনতে পাচ্ছ নীহারিকা?"

নীহারিকা স্তব্ধ হয়ে অর্ণবের দিকে তাকিয়ে রইল। সে ভেবেছিল সত্যটা জানার পর অর্ণব তাকে তিরস্কার করবে, সন্তান লুকিয়ে রাখার জন্য হয়তো ঘৃণা ছড়াবে। কিন্তু অর্ণবের চোখে কেবল তার সন্তানের জন্য এক চরম আকুলতা আর আগলে রাখার বাসনা। নীহারিকার জমানো সমস্ত বরফ এক মুহূর্তে গলে জল হয়ে গেল। সে আর ধরে রাখতে পারল না নিজেকে, অর্ণবের বুকে মাথা রেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।

অর্ণব তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। উত্তরার সেই বৃষ্টিভেজা ক্যাফের আড়ালে দুটি আত্মা চার বছর পর আবার পুরোপুরি এক হয়ে গেল—কেবল প্রেমিক-প্রেমিকা হিসেবে নয়, তাদের সন্তানের বাবা-মা হিসেবে।

চার দিন পর। এভারকেয়ার হাসপাতালের প্রাইভেট কেবিন।

লন্ডন থেকে আসার পরদিনই অর্ণবীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। টেস্টের রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে—অর্ণবের বোন ম্যারো একদম নিখুঁতভাবে মিলে গেছে তার মেয়ের সাথে।

অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়ার আগের মুহূর্ত। ছোট্ট অর্ণবী বিছানায় শুয়ে আছে, তার হাতে স্যালাইনের চ্যানেল। কচি মুখটায় অসুস্থতার ছাপ থাকলেও চোখ দুটো একদম অর্ণবের মতো চঞ্চল।

অর্ণব হাঁটু গেড়ে বিছানার পাশে বসল। সে আলতো করে মেয়ের কপালে চুমু খেল।

"তুমি আমার বাবা না?" অর্ণবী তার কচি, তোতলা গলায় জিজ্ঞেস করল। "মামণি বলেছে তুমি নাকি সুপারম্যান, আমার ভেতরের কষ্টটা একদম তাড়িয়ে দেবে।"

অর্ণবের চোখের কোণ বেয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। সে মেয়ের ছোট্ট হাতটা নিজের গালের সাথে ঘষে বলল, "হ্যাঁ মা, আমি তোমার বাবা। আমি একদম সুপারম্যানের মতো সব কষ্ট উড়িয়ে দেব। তুমি শুধু একটু ঘুমাবে, উঠে দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে।"

নীহারিকা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছিল। তার চোখ দিয়ে অবিরল ধারায় জল পড়ছিল। চার বছরের সমস্ত ভুল, একা লড়াই করার ক্লান্তি আর অভিমান আজ এই পরম মুহূর্তের সামনে একদম তুচ্ছ হয়ে গেছে।

ট্রান্সপ্ল্যান্টের প্রক্রিয়া চলল দীর্ঘ চার ঘণ্টা ধরে।

অর্ণব যখন ক্যাবিনে ফিরে এলো, তখন তার শরীর কিছুটা দুর্বল, কিন্তু চোখে ছিল এক অদ্ভুত বিজয়ের আলো। অপারেশন সফল হয়েছে। ডাক্তার জানিয়েছেন, অর্ণবী এখন একদম বিপদমুক্ত।

রাত তিনটা। কেবিনের আলো নিভিয়ে কেবল একটা ছোট ডিম লাইট জ্বেলে রাখা হয়েছে। অর্ণবী ঘুমিয়ে আছে শান্তভাবে, তার গালের টোলটা আবার যেন মৃদু ফুটে উঠেছে।

অর্ণব গিয়ে দাঁড়াল ব্যালকনিতে। রাতের ঠান্ডা হাওয়ায় হাসপাতালের বাইরের শহরের আলো জ্বলজ্বল করছে। পিছন থেকে এসে নীহারিকা অর্ণবের কোমরে দু-হাত পেঁচিয়ে ধরল। চার বছর পর সে আবার নিজের মাথাটা রাখল অর্ণবের চওড়া পিঠে।

অর্ণব ঘুরে দাঁড়াল। সে নীহারিকাকে দুই বাহুতে জড়িয়ে এক ঝটকায় নিজের সাথে একদম শক্ত করে পিষে ধরল। নীহারিকার বুক অর্ণবের ছাতির সাথে চেপে গেল।

"আমাকে মাফ করে দাও অর্ণব..." নীহারিকা ফিসফিস করে বলল, তার ঠোঁট অর্ণবের গলার খালি চামড়ায় ছোঁয়াচ্ছিল। "আমি যদি সেদিন চলে না যেতাম, আমাদের মেয়েকে এই কষ্ট পেতে হতো না।"

"চুপ," অর্ণব তার হাত নীহারিকার গালে রাখল, বুড়ো আঙুল দিয়ে তার ঠোঁটের নিচে টিপে ধরল। "আর কোনো অতীত নয় নীহারিকা। এই চার বছর আমরা দুজনই নরক যন্ত্রণা সহ্য করেছি। এখন কেবল তুমি, আমি আর আমাদের অর্ণবী।"

অর্ণবের চোখে আবার ফুটে উঠল সেই বন্য অনুরাগের আগুন। কিন্তু এবার এতে কোনো ক্ষোভ ছিল না, ছিল পুনর্মিলনের এক চরম উদগ্র বাসনা।

সে নীহারিকাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। ব্যালকনির দেয়ালের পাশে ছায়াঘেরা কোণায় তাকে নামিয়ে এনে দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড় করাল। নীহারিকার শ্বাস আবার দ্রুত হতে শুরু করল। তার চোখের চাহনিতে ভেসে উঠল কামনার মিষ্টি মায়া।

অর্ণব নীহারিকার থুতনি ধরে তার মুখটা নিজের দিকে তুলল। সে আর এক সেকেন্ডও অপেক্ষা না করে তার ঠোঁট ডুবিয়ে দিল নীহারিকার ভিজা, লাল ঠোঁটে।

এবারের চুম্বন ছিল তীব্র, গভীর আর আদিম অনুরাগে ভরা। অর্ণব নীহারিকার ঠোঁট দুটো চুষে নিতে লাগল তৃষ্ণার্তের মতো, জিবের কামড়াকামড়িতে তাদের নিঃশ্বাস আটকে আসছিল। নীহারিকা অর্ণবের ঘাড় শক্ত করে জড়িয়ে ধরে নিজেকে তার দেহের সাথে একেবারে মিশিয়ে দিল। অর্ণবের ডান হাত নীহারিকার শাড়ির আঁচল সরিয়ে তার উন্মুক্ত কোমরে চেপে বসল। তার গরম আঙুলের ছোঁয়ায় নীহারিকার সারা শরীরে এক অদৃশ্য আগুনের ঢেউ খেলে গেল, সে শিউরে উঠে অর্ণবের ঠোঁটের ভেতর অস্ফুট সিস্কার ছেড়ে দিল।

অর্ণবের ঠোঁট নেমে এলো নীহারিকার চোয়াল বেয়ে তার কানের লতিতে, তারপর ধীরে ধীরে তার উষ্ণ গলায়। সে নীহারিকার কলারবোনে নিজের কামড়ের ছাপ রেখে দিল গভীর আবেগে। নীহারিকা অর্ণবের চুলে হাত চালিয়ে তার মাথাটা আরও জোর করে নিজের বুকের দিকে চেপে ধরল। তাদের দুজনের প্রতিটি স্পন্দন, প্রতিটি গভীর শ্বাস যেন আর্তনাদ করে বলছিল—তারা একে অপরের পরিপূরক, পৃথিবীর কোনো ভুল বোঝাবুঝি তাদের আলাদা করতে পারবে না।

"তুমি শুধুই আমার, নীহারিকা," অর্ণব নীহারিকার কানের কাছে নিচু, পুরুষালী গলায় ফিসফিস করে বলল, তার ঠোঁট তখনও নীহারিকার গলায় ঘষা খাচ্ছিল। "আর কোনো দিন আমার থেকে দূরে যাওয়ার চেষ্টা করলে আমি তোমাকে ধ্বংস করে দেব।"

নীহারিকা অর্ণবের চোখে চোখ রাখল। তার চোখে তখন ভালোবাসার চরম আত্মসমর্পণ। সে অর্ণবের ঠোঁটে আবার এক ছোট মিষ্টি চুমু খেয়ে বলল, "আমি আর কোথাও যাব না অর্ণব। তোমার বুকে আমাকে চিরকালের মতো বন্দি করে নাও।"

ব্যালকনির সেই আবছা আলোয়, ঘরের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা সন্তানের নিঃশ্বাসের শব্দের সাথে মিশে গেল দুটি ভালোবাসার মানুষের পুনর্মিলনের গভীর উত্তাপ। চার বছরের যে দীর্ঘ বিরহ আর অন্ধকারের পথ তারা হেঁটে এসেছে, তা আজ এক পরম পূর্ণতায় এসে শেষ হলো। ভুল বোঝাবুঝির ছাই সরিয়ে তাদের ভালোবাসার আগুন আবার জ্বলে উঠল নতুন এক ভবিষ্যতের আলো নিয়ে।

....
👁 67