ধানমন্ডি চার নম্বরের পুরনো মেহগনি গাছের ছায়াটা আজ বহু বছর পর দেখেও রাফির বুকের ভেতর কেমন যেন একটা মোচড় দিয়ে উঠল। গলির মোড়ের সেই ভাঙা কালভার্ট, যার ওপর বসে তারা বিকেল বেলা বরফ-জল খেলত, সেটা আজ নতুন করে ঢালাই করা হয়েছে। রূপ বদলেছে গলিটার, বদলেছে মানুষগুলোও। কিন্তু রাফির ভেতরের স্মৃতিগুলোর বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। বিশেষ করে একটা মানুষের স্মৃতি—তিশা।
ছোটবেলায় তিশাকে ডিস্টার্ব করাটা রাফির একপ্রকার অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। তিশা যখন উঠোনে বেণি দুলিয়ে ঘুরত, রাফি পেছন থেকে এসে বেণি ধরে টান দিয়ে দৌড় মারত। তিশা যখন মেঝের ওপর বই খুলে এক মনে পড়তে বসত, রাফি লুকিয়ে তিশার পড়ার টেবিলের ওপর কাঁচের মার্বেল গড়িয়ে দিয়ে পালিয়ে যেত। রাফি ভেবেছিল সে শুধু তিশাকে জাঁতাকলে ফেলে মজা পেত। সে কখনো বুঝতে পারেনি তিশার সেই রাগে লাল হয়ে যাওয়া মুখ, সেই অভিমানী চোখ দুটোর পেছনে লুকিয়ে ছিল এক গভীর গোপন অনুভূতি। তিশা রাফিকে বড্ড গোপনে, তীব্রভাবে নিজের মতো করে ভালোবাসত।
কিন্তু নিয়তির খেলা বড় অদ্ভুত। মাধ্যমিকের ঠিক পর পর তিশাদের পরিবারকে হঠাৎ করে ঢাকার পাট চুকিয়ে অন্য এক নতুন শহরে চলে যেতে হয়েছিল। চলে যাওয়ার দিন রাফি তিশাদের বাসার সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু তিশা একবারের জন্যও বারান্দায় আসেনি। রাফি জানত না, চলে যাওয়ার ঠিক আগের দিন তিশা এক অদ্ভুত হাহাকার বুকে চেপে তার জন্য একটি লম্বা চিঠি লিখে থুয়ে গিয়েছিল রাফির এক খালাতো বোনের কাছে। কিন্তু সেই চিঠিটা কখনো রাফির হাতে পৌঁছায়নি। এক অদ্ভুত বিভ্রান্তি, এক করুণ ভুল বোঝাবুঝি দুজনকে ফেলে দিয়েছিল দুই ভিন্ন মেরুতে।
আজ দশ বছর পর সেই রাফি যখন করপোরেট দুনিয়ায় নিজের পায়ের তলার মাটি শক্ত করে ঢাকারই এক অভিজাত আর্ট গ্যালারির কিউরেটর হিসেবে দাঁড়াল, তখন সে আবার মুখোমুখি হলো তিশার।
আজ গ্যালারিতে নতুন এক প্রখ্যাত আলোকচিত্রীর ছবির প্রদর্শনী ছিল। ভিড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রাফি পানীয়ের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছিল। ঠিক তখনই তার চোখ আটকে গেল গ্যালারির ঠিক মাঝখানটিতে দাঁড়ানো একটি অবয়বের দিকে।
মেহগনি রঙের ভারী সিল্কের শাড়ি পরা একটি মেয়ে। পিঠের ওপর থেকে আলতো করে নেমে এসেছে তার ঘাড় ছাপানো ঘন কালো চুলের ঢল। পিঠের অনেকটাই খোলা, সেই অনাবৃত ত্বকে গ্যালারির হলুদ আলো যেন এক অদ্ভুত মোহময়তার সৃষ্টি করেছে। রাফির হাতের গ্লাসটা কেঁপে উঠল। এই ঘাড়, এই দাঁড়ানোর ভঙ্গি—এ যে বহু বছর আগের সেই তিশা!
রাফি ভিড় ঠেলে এগোলো। বুকে ধকধক শব্দ হচ্ছে। বুক চিরে যেন বের হয়ে আসবে হৃদপিণ্ডটা।
"তিশা?" রাফির গলার আওয়াজ কাঁপছিল।
মেয়েটি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। রক্তিম দুই ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক, চোখে গাঢ় কাজলের টান। সেই ছোটবেলার হাসিখুশি, চঞ্চল তিশা আর এই তিশার মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক। এর চোখের দৃষ্টি কেমন যেন ঠাণ্ডা, শীতল এবং অপরিচিত।
মেয়েটি অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল, "দুঃখিত, আপনি কি আমাকে বলছেন?"
রাফি থমকে গেল। "তিশা, তুমি আমাকে চিনতে পারছ না? আমি রাফি! আমাদের চার নম্বরের বাসা, সেই কৃষ্ণচূড়া গাছ..."
তিশা এক মুহূর্তের জন্যও ভুরু কোঁচকালো না। তার চোখের কোণে কোনো আবেগের বিন্দুমাত্র ঝলক দেখা গেল না। সে অতি ধীরগতিতে, অত্যন্ত পেশাদার কণ্ঠে বলল, "আই থিঙ্ক আপনি ভুল করছেন। আমি তিশা মেহজাবীন, এই প্রদর্শনীর ফোটোগ্রাফার। আপনাকে হয়তো অন্য কারো সাথে মিলাচ্ছেন।"
"না, তিশা, তুমি মিথ্যা বলছ! তুমি আমাকে চিনতে পারবে না মানে?" রাফির গলা কিছুটা চড়ে গেল।
তিশা ঠান্ডা চোখে রাফির দিকে তাকাল। "এক্সকিউজ মি, মি. রাফি। এটা একটা পাবলিক প্লেস। আপনি আমাকে চেনেন না, আমিও আপনাকে চিনি না। প্লিজ ক্রিয়েট এ সীন করবেন না।"
এই বলে তিশা এক চুলও না দমে পারফিউমের এক মিষ্টি, তীব্র সুবাস বাতাসে ভাসিয়ে দিয়ে হেঁটে সামনে চলে গেল। রাফি স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার ভেতরটা এক তীব্র আগুনে পুড়তে শুরু করল। কেন তিশা এমন করছে? সেই মিষ্টি চঞ্চল মেয়েটা আজ কতটা পাষাণ, এতটা বরফের মতো শীতল কীভাবে হয়ে গেল?
রাত তখন প্রায় এগারোটা। গ্যালারির প্রদর্শনী শেষ। ভিড় একে একে ফাঁকা হয়ে গেছে। রাফি জানত তিশা এখনো পেছনের ভিআইপি প্রাইভেট লাউঞ্জে রয়েছে তার ছবিগুলো প্যাক করার জন্য। রাফির মাথায় যেন আজ এক পাগলামি চেপে বসেছে। তাকে উত্তর জানতেই হবে। এমন অপরিচিতের ভান রাফি কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না।
রাফি করিডোর দিয়ে লাউঞ্জের দিকে এগিয়ে গেল। লাউঞ্জের দরজাটা আধো খোলা ছিল। ভেতরে আবছা আলো জ্বলছে। তিশা একা দাঁড়িয়ে ছিল একটা বড় ফ্রেমের ছবির সামনে। তার সিল্কের শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে কিছুটা খসে পড়েছে। ব্যাকলেস ব্লাউজের দরুন তিশার অনাবৃত শ্যামলা মসৃণ পিঠটা আবছা আলোতে এক অপূর্ব কামনাময় সৌন্দর্য ছড়াচ্ছিল।
রাফি ভেতরে ঢুকে পেছন থেকে দরজাটা সশব্দে আটকে দিল। দরজার লক হওয়ার শব্দে তিশা চমকে ঘুরে তাকাল।
"আপনি! ভেতরে ঢোকার সাহস কীভাবে হলো আপনার?" তিশার কণ্ঠে ক্ষোভ, কিন্তু চোখের পলকে এক অচেনা ভয়ের ঝিলিক।
রাফি তিশার কোনো কথা শুনল না। সে দ্রুত পায়ে তিশার দিকে এগিয়ে গেল। রাফির চোখে তখন এক অদ্ভুত নেশা আর রাগের মিশ্রণ। তিশা পেছাতে পেছাতে একেবারে দেয়ালের সাথে গিয়ে ঠেকল। রাফি দুই হাত তিশার মাথার দুই পাশে দেয়ালে রেখে তাকে পুরোপুরি আটকে ফেলল।
দুজন এত কাছাকাছি যে তিশার বুক ওঠা-নামা করার সাথে সাথে তার শাড়ির আঁচল রাফির বুকের সাথে ঘষা খাচ্ছিল। তিশার গায়ের সেই তীব্র, মাদকতাময় পারফিউম আর তার গায়ের উষ্ণ গন্ধ রাফির সমস্ত স্নায়ু অবশ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
"তুমি সত্যি আমাকে চেনো না, তিশা?" রাফির গলা আজ ভারী, গভীর। রাফির নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছিল তিশার গালে, তার ঠোঁটের ওপর।
তিশা মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, "সরুন এখান থেকে রাফি সাহেব! আপনার সাহস বাড়াবাড়ি পর্যায়ে যাচ্ছে।"
"আমার সাহস তুমি এখনো দেখনোইনি, তিশা," রাফি ঝুঁকে এল তিশার একদম ঘাড়ের কাছে। রাফির তপ্ত নিঃশ্বাস তিশার ঘাড়ের উন্মুক্ত ত্বকে লাগতেই তিশা ভেতরে ভেতরে শিউরে উঠল। তার চোখ দুটো আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে এল, ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁক হলো।
রাফির তপ্ত ঠোঁট হালকা করে স্পর্শ করল তিশার কানের লতি, তারপর ধীরে ধীরে নেমে এল তার নরম, ফর্সা ঘাড়ের ভাঁজে। এক অদ্ভুত, তীব্র কামনার আলোড়ন খেলে গেল দুজনের শরীর জুড়ে। বহু বছর ধরে জমা থাকা আকুলতা, অধিকারবোধ যেন এক নিমেষে বাঁধ ভাঙতে চাইল। তিশা শক্ত করে ধরে ফেলল রাফির শার্টের কলার, তার নখ রাফির পিঠে দেবে যেতে চাইল। এক মুহূর্তে মনে হলো তিশাও যেন এই স্পর্শেরই অপেক্ষায় ছিল বহু জন্ম ধরে।
রাফি হাত বাড়িয়ে তিশার কোমরের ভাঁজে হাত রাখল। তিশার সিল্কের শাড়ির ওপর দিয়ে তার কোমরের উষ্ণতা রাফির তালুতে আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল। রাফি তিশার চিবুকটা উঁচিয়ে তুলে নিজের দিকে ফেরাল। তিশার চোখের কোণে তখন চকচক করছে দুই ফোঁটা জল, কিন্তু তার ঠোঁটে এক উন্মাদ তীব্রতা। রাফি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তিশার রক্তিম ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল সে। এক গভীর, তীব্র আর তৃষ্ণার্ত চুম্বন। যেন দশ বছরের সমস্ত বিচ্ছেদ, সমস্ত রাগ আর আকুলতা এক নিমিষেই শুষে নিতে চায় রাফি।
তিশা প্রথমে থরথর করে কাঁপছিল, কিন্তু পরের মুহূর্তেই সে রাফির শার্ট আঁকড়ে ধরে চুম্বনে সাড়া দিল। লাউঞ্জের নীরবতায় দুজনের ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ আর ঠোঁটের উষ্ণ ছোঁয়া এক গভীর, মাদকতাময় পরিবেশ তৈরি করল। রাফির হাতের স্পর্শে তিশার শাড়ির আঁচলটা পুরোপুরি খসে নিচে পড়ে গেল। রাফির হাত তিশার ব্যাকলেস পিঠ ঘেঁষে কোমরে নেমে এল, তিশাকে আরো গভীরে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল সে।
হঠাৎ তিশার সচেতনতা ফিরে এল। সে যেন এক লহমায় সম্বিত ফিরে পেল। নিজের ওপর হিংসা হলো তার, কেন সে আবার এই রাফির কাছে নিজেকে সঁপে দিচ্ছে? যে রাফি তার চিঠির কোনো উত্তর দেয়নি, যে রাফি তাকে অবহেলা করে একলা ফেলে রেখেছিল!
তিশা সমস্ত শক্তি দিয়ে রাফির বুকে ধাক্কা দিল।
রাফি পিছিয়ে গেল কিছুটা। তিশা হাপাচ্ছিল, তার বুকের ওঠানামা অত্যন্ত দ্রুত। তার লিপস্টিক কিছুটা লেপ্টে গেছে, চোখের কাজল ঘেঁটে গেছে।
তিশা চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লেও চড় চড় করে উঠে যাওয়া রাগে বলল, "নিজের সীমারেখা মনে রাখবেন, রাফি সাহেব! আজ যা হলো, তা আপনার ভুল আর আমার দুর্বলতা। এর বেশি কিছু নয়।"
"তুমি কেন মিথ্যা বলছ তিশা? তোমার শরীর, তোমার এই কাঁপন বলছে তুমি এখনো আমাকে ভালোবাসো!" রাফি চিৎকার করে উঠল।
"ভালোবাসা?" তিশা এক তিক্ত হাসি হাসল। "ভালোবাসা বহু আগেই মরে গেছে রাফি। আপনি যে তিশাকে খুঁজছেন, সে দশ বছর আগে মারা গেছে। আমার সামনে আর কখনো আসবেন না।"
তিশা মেঝেতে পড়ে থাকা শাড়ির আঁচলটা তুলে নিয়ে দ্রুত পায়ে লাউঞ্জ ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
রাফি হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল লাউঞ্জের মেঝের ওপর। তার হাতে এখনো লেগে আছে তিশার গায়ের সেই উষ্ণ গন্ধ। রাফি বুঝতে পারছে না, কোথায় ভুল হয়েছিল? কেন তিশা তাকে এতটা ভালোবাসার পরও আজ বিষের মতো উগড়ে দিচ্ছে নিজেকে? রাফি শপথ করল, এই রহস্যের শেষ সে দেখেই ছাড়বে। তিশার এই বরফ শীতল রূপের পেছনের সত্য তাকে জানতেই হবে।
লাউঞ্জের মেঝেতে বসে থাকা রাফির মাথায় তখন হাজারটা প্রশ্নের ঝড়। তিশার ওই চোখে জমা জল আর তার পরমুহূর্তেই বিষ ছড়ানো বিষাদের কারণ কী? সে রাতে বাসায় ফিরে রাফি একটুও ঘুমোতে পারল না। তিশার সেই উষ্ণ ঠোঁটের ছোঁয়া, তার অনাবৃত পিঠের স্পর্শ আর তার প্রদেয় চরম আঘাত—সব মিলে রাফির ভেতরটাকে ছারখার করে দিচ্ছিল।
পরদিন সকালেই রাফি বেরিয়ে পড়ল। তার প্রথম গন্তব্য ছিল তার খালাতো বোন নিয়মার বাসা। বহু বছর আগে তিশা যখন ঢাকা ছেড়ে চলে যায়, তখন নিয়মা ছিল তিশার সবচেয়ে কাছের বান্ধবী।
নিয়মার বাসার ড্রয়িংরুমে বসে রাফি যখন তিশার কথা তুলল, নিয়মার মুখটা মুহূর্তেই মলিন হয়ে গেল।
"তুই তিশাকে পেয়েছিস রাফি?" নিয়মা নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল।
"হ্যাঁ পেয়েছি। কিন্তু সে আমাকে চেনে না বলে উড়িয়ে দিচ্ছে! নিয়মা, আমাকে বল, চলে যাওয়ার সময় ঠিক কী হয়েছিল? ও আমাকে এত ঘৃণা করে কেন?" রাফির গলায় আকুলতা আর ক্ষোভ ঝরে পড়ল।
নিয়মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভেতরের ঘর থেকে একটা পুরোনো কাঠের বাক্স নিয়ে এল। ধুলো জমা বাক্সের তালা খুলে ভেতর থেকে বের করল একটা ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া খাম।
"তিশা তোকে ঘৃণা করে না রাফি, ও তোকে ভালোবেসে নিঃস্ব হয়ে গেছে। চলে যাওয়ার আগের রাতে তিশা কাঁদতে কাঁদতে এই চিঠিটা আমার হাতে দিয়েছিল। বলেছিল তোকে পৌঁছে দিতে। চিঠিতে ও লিখেছিল, তোকে ছাড়া ও অন্য শহরে বেঁচে থাকতে পারবে না, তোকে যেন আমি চিঠিটা দিই যাতে তুই ওকে আটকে রাখিস..."
রাফির বুকটা ধক করে উঠল। "তাহলে চিঠিটা আমার কাছে পৌঁছায়নি কেন?"
নিয়মা অপরাধীর মতো চোখ নিচু করে বলল, "সেই রাতে চিঠিটা টেবিলেই ছিল। কিন্তু পরের দিন সকালে আমার মা... মানে তোর মামী চিঠিটা পড়ে ফেলেন। আমাদের পরিবারের বড়রা তোদের সম্পর্কটা মেনে নিতে চাননি। মামী আমাকে কসম দিয়ে চিঠিটা লুকিয়ে রাখতে বলেন। আমি ভয়ে তোকে কিছু বলতে পারিনি রাফি। তিশা ভেবেছিল তুই চিঠিটা পেয়েও ওকে আটকাসনি, তুই তাকে অবহেলা করে ছেড়ে দিয়েছিস।"
রাফির চোখের সামনে সব কিছু যেন অন্ধকার হয়ে গেল। হাতের চিঠিটা কাঁপতে কাঁপতে খুলল সে। হলদেটে হয়ে যাওয়া কাগজে তিশার কাঁচা হাতের স্পষ্ট লেখা—
*'রাফি, আমি জানি তুই আমাকে কত ডিস্টার্ব করতিস। কিন্তু তুই কি জানিস, তোর ওই বিরক্ত করার ভেতরেই আমি আমার পুরো পৃথিবীটা খুঁজে পেয়েছিলাম? কাল সকালে বাবা আমাদের চিরতরে অন্য শহরে নিয়ে যাচ্ছে। আমি যেতে চাই না রাফি। তুই কি আসবি না আমাকে আটকাতে? একবার এসে শুধু বলবি, "তিশা যাস না"? তুই এলে আমি সব ছেড়ে তোর কাছে রয়ে যাব...' *
চিঠিটা পড়তে পড়তে রাফির চোখ থেকে দু-ফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে পড়ল কাগজের ওপর। দশটা বছর! দীর্ঘ দশটা বছর তিশা এই নির্মম মিথ্যাটা বুকে চেপে বেঁচে আছে যে রাফি তাকে অবহেলা করে চলে যেতে দিয়েছিল! কত বড় ভুল বোঝাবুঝির পাহাড়ে চাপা পড়ে ছিল তাদের ভালোবাসা!
এক মুহূর্তও দেরি করল না রাফি। চিঠির কাগজটা পকেটে নিয়ে সে উন্মাদের মতো ছুটে গেল তিশার গুলশানের স্টুডিওর উদ্দেশ্যে। আজ আর কোনো নীরবতা নয়, আজ সব সত্যি উগড়ে দিতে হবে।
দুপুরের পর তিশার ফোটোগ্রাফি স্টুডিওতে যখন রাফি পা রাখল, তখন ভেতরে কোনো ক্লায়েন্ট ছিল না। স্টুডিওর ডার্করুমে তিশা এক মনে কিছু ছবির প্রিন্ট ওয়াশ করছিল। ডার্করুমের লালচে আলোয় পুরো পরিবেশটা এক অদ্ভুত মায়াবী রূপ ধারণ করেছিল।
রাফি ডার্করুমের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে ভেতর থেকে ছিটকিনি আটকে দিল।
তিশা চমকে উঠে পেছন ফিরল। লাল আলোয় তার ফর্সা মুখটা আরো মোহনীয় লাগছিল। তার গায়ে জড়িয়ে থাকা পাতলা সুতির কুরুশ কাজের শার্টের ফাঁক দিয়ে ভেতরের কালো স্তনবন্ধনী আর মেদহীন পেটের অংশ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।
"আপনি আবার এখানে? কীভাবে ঢুকলেন? বের হন এখান থেকে!" তিশা চিত্কার করে ওঠার চেষ্টা করল।
রাফি এক পা এক পা করে তিশার দিকে এগোলো। তার চোখে কোনো হিংস্রতা ছিল না, ছিল এক গভীর আকুলতা আর একরাশ সত্যি উন্মোচনের উন্মাদনা।
"বের তো হব তিশা, কিন্তু আজ তোর সব মিথ্যে অভিমানের ইতি টেনে তবেই বের হব," রাফি ঠান্ডা কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল।
"আমার কোনো অভিমান নেই আপনার ওপর! আপনি আমার কেউ নন!" তিশা পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইল, কিন্তু রাফি এক ঝটকায় তিশার কোমর ধরে তাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল।
তিশার শার্টের বোতাম কিছুটা খুলে গেল রাফির টানে। ডার্করুমের আবছা লাল আলোয় তিশার বুক দ্রুত উঠানামা করছিল। তার উরুর সাথে রাফির উরু ঘষে যাচ্ছিল। রাফি তিশার দুটো হাত মাথার ওপর ধরে দেয়ালের সাথে আটকে রাখল।
"আমাকে ছাড়ুন রাফি! আপনি আমার সাথে জোর করছেন!" তিশা ছটফট করে উঠল, কিন্তু তার কণ্ঠে যতটা রাগ ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল দুর্বলতা।
"হাঁ, আজ জোরই করব। তুই আমাকে না চেনার ভান করবি, আর আমি চুপচাপ মেনে নেব?" রাফি তিশার একদম কাছে মুখ নিয়ে এলো। তাদের নাকের ডগা স্পর্শ করল একে অপরকে।
"দশ বছর আগে তুই চিঠি দিয়েছিলি না নিয়মাকে? বলেছিলি আমি যেন তোকে আটকে রাখি?" রাফি তিশার কানের কাছে ফুসফুস করে বলল।
তিশা মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখের মণি দুটো কেঁপে উঠল। "আপনি... আপনি কী বলছেন?"
"চিঠিটা আমার কাছে পৌঁছায়নি তিশা! মামী চিঠিটা লুকিয়ে রেখেছিলেন! আমি জানতামই না তুই আমার জন্য অপেক্ষা করছিলি! আমি ভেবেছিলাম তুই আমাকে ছেড়ে চলে গেছিস!" রাফির কণ্ঠে কান্নার সুর ফুটে উঠল।
তিশার চোখে পানি জমে উঠল। সে বিশ্বাস করতে পারছিল না। "না... আপনি বানিয়ে বলছেন! আমাকে দুর্বল করার জন্য..."
"আমি বানিয়ে বলছি?" রাফি পকেট থেকে সেই পুরোনো চিটা বের করে তিশার চোখের সামনে ধরল। "দেখ! এই তোর হাতের লেখা না? এই জলছাপ তোর চোখের জলের না?"
তিশা চিঠিটার দিকে তাকাল। তার নিজের হাতের লেখা দশ বছর পর দেখে তার ভেতরের সমস্ত বাঁধ ভেঙে গেল। তার বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘ দশ বছরের বরফ এক নিমেষে বাষ্প হয়ে উবে গেল। সে বুঝতে পারল, রাফি তাকে কোনোদিন অবহেলা করেনি! তাদের মাঝখানে ছিল এক নিদারুণ মিথ্যা!
"রাফি..." তিশার গলার আওয়াজ বুজে এল। তার চোখের কোণ বেয়ে ঝরঝর করে জল পড়তে লাগল।
রাফি আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে তিশার হাত দুটো ছেড়ে দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল নিজের বুকে। তিশাও আর দমে রইল না। নিজের সমস্ত অভিমান, যন্ত্রণা আর তীব্র কামনাকে মুক্ত করে দিয়ে সে রাফির ঘাড়ে মুখ গুঁজে ফোঁপাতে লাগল। তিশার হাত দুটো রাফির চুলে জড়িয়ে গেল, তার নখ রাফির স্ক্যাল্পে চেপে বসল।
"তুই আসিসনি কেন রাফি... তুই জানিস আমি কত কেঁদেছি?" তিশা আক্ষেপের সুর তুলে রাফির বুকে কিল মারতে লাগল।
রাফি তিশার চিবুক ধরে মুখটা ওপরে তুলে আনল। লাল আলোয় তিশার চোখে কান্না আর ঠোঁটে কামনার এক অদ্ভুত মেলবন্ধন। রাফি নিচু হয়ে তিশার ভেজা চোখে ও গালে চুমু দিতে লাগল। তিশার সিক্ত গাল বেয়ে রাফির ঠোঁট নেমে এল তিশার খোলা ঘাড়ের দিকে।
তিশা মাথাটা পেছনের দিকে হেলিয়ে দিল, এক অদ্ভুত আনন্দের সুড়সুড়ি আর তীব্র কামনার শিহরণ তার মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে গেল। রাফি তিশার শার্টের বাকি বোতামগুলো খুলে ফেলল। অনাবৃত শ্যামলা মসৃণ ত্বকে রাফির উষ্ণ হাতের স্পর্শ লাগতেই তিশা এক হালকা হাঁপ ছেড়ে উঠল, "রাফি... প্লিজ..."
"আজ কোনো মানা শুনব না তিশা," রাফি ভারী গলায় বলল।
রাফি তিশাকে উঁচিয়ে তুলে ডার্করুমের কাঠের বড় টেবিলটার ওপর বসিয়ে দিল। তিশার দুই পায়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রাফি তার ঠোঁট ডুবিয়ে দিল তিশার ঠোঁটে। এ চুম্বন আগের রাতের মতো রাগের ছিল না, এ ছিল এক গভীর তৃষ্ণা মেটানোর চুম্বন। তিশাও সমানে সাড়া দিল, তার জিভ আর ঠোঁটের উষ্ণতায় রাফিকে ভরিয়ে দিল।
তিশার হাত রাফির শার্টের বোতাম খুলতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই রাফির খালি বুক তিশার স্তনের উষ্ণতায় চেপে বসল। তিশা রাফির পিঠে নিজের হাত ঘষে এক অনাবিল তৃপ্তি পাচ্ছিল। ডার্করুমের আবছা আলো, কেমিক্যালের তীব্র গন্ধ আর তাদের দুজনের ঘন নিঃশ্বাসের শব্দে বাতাস ভারী হয়ে উঠল।
রাফির হাত তিশার নাভি পেরিয়ে তার স্কার্টের ভেতরের নরম উরুতে স্পর্শ করল। তিশা আঁতকে উঠে রাফির কাঁধ আঁকড়ে ধরল। তার চোখ বুজে এল, ঠোঁট থেকে বের হয়ে এল এক মৃদু কোঁকানি।
"তুই এখনো শুধুই আমার, তাই না তিশা?" রাফি তিশার উরুর মসৃণ ত্বকে হাত বোলাতে বোলাতে বলল।
"হ্যাঁ রাফি... চিরকাল তোরই ছিলাম... শুধু তোর," তিশা রাফির কানে কানে ফুসফুস করে বলল, তার নিঃশ্বাসের উত্তাপ রাফির কানের লতিতে নতুন আগুনের জোগান দিল।
তাদের শরীরী আকুলতা যখন চরম সীমানায় পৌঁছাতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই স্টুডিওর বাইরে কারো পায়ের শব্দ আর দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ পাওয়া গেল।
"তিশা ম্যাডাম? ভেতরে আছেন? অ্যাসিস্ট্যান্ট এসে গেছে ছবির প্রিন্ট নেওয়ার জন্য।"
ঝড় থামল এক লহমায়। তিশা আর রাফি দুজনেরই চোখ মেলা হলো। তিশা ধড়ফড় করে রাফির বুক থেকে সরে দাঁড়াল। তার জামাকাপড় এলোমেলো, বুকের ওঠা-নামা থামেনি এখনো।
তিশা দ্রুত শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে রাফির দিকে তাকাল। তার চোখে এখন আর কোনো অচেনা ভাব নেই, আছে এক গভীর অনুশোচনা আর ভালোবাসার নতুন আলো।
রাতের ঢাকা শহরটা আজ অন্যদিনের চেয়ে একটু বেশিই নীরব। বৃষ্টি ভেজা রাস্তায় সোডিয়াম বাতির আলো কাঁচের মতো চকচক করছে। রাত তখন সাড়ে এগারোটা। রাফির ফ্ল্যাটের ড্রয়িংরুমে জ্বলছে হালকা নীল রঙের ডিওন আলো। টেবিলে মোমবাতির মিষ্টি সুবাস।
রাফি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অস্থিরভাবে পাঁয়চারি করছিল। বুকটা দুরুদুরু কাঁপছে। আজ আর কোনো ভুল বোঝাবুঝি নেই, নেই কোনো অচেনা মান-অভিমানের দেয়াল। আজ শুধু প্রাপ্তি আর আত্মসমর্পণের রাত।
ঠিক পৌনে ১২টায় কলিংবেলটা বেজে উঠল।
রাফি দ্রুত গিয়ে দরজা খুলল। দরজায় দাঁড়িয়ে তিশা। বৃষ্টিতে হালকা ভিজেছে সে। পরনে একখানি গাঢ় লাল রঙের শিফন শাড়ি, তার সাথে হাতকাটা ব্ল্যাক ব্লাউজ। ভিজে যাওয়া চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়িয়ে আছে। কপালে ছোট একটি কালো টিপ আর ঠোঁটে গভীর লাল লিপস্টিক। বৃষ্টিতে ভেজা তার অনাবৃত কাঁধ আর পিঠে আলোর প্রতিফলন এক মাতাল করা সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে।
রাফি কোনো কথা না বলে তিশার হাত ধরে এক টানে তাকে ভেতরে এনে দরজা আটকে দিল।
"ভিজে গেছিস তো পুরোপুরি," রাফি ভারী গলায় বলল।
তিশা লাজুক হেসে রাফির দিকে তাকাল। সেই ছোটবেলার চেনা চোখ দুটো আজ আবার ফিরে এসেছে, কিন্তু তাতে যোগ হয়েছে এক গভীর নারীত্ব আর অপরিসীম কামনার আলো।
"ভিজতে তো চেয়েছিলাম তোর এই ভালোবাসার বৃষ্টিতেই রাফি," তিশার কণ্ঠে এক অদ্ভুত আদিম আকুলতা।
রাফি আর কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না। সে তিশার কোমর পেঁচিয়ে এক ঝটকায় নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে নিল। ভিজে যাওয়া শাড়ির হিম শীতলতা রাফির খালি গায়ের উষ্ণতায় মিশে এক অপূর্ব অনুভূতির জন্ম দিল। তিশার ঠোঁটে জমে থাকা জলের কণা রাফির ঠোঁটের স্পর্শে বাষ্প হয়ে যেতে চাইল।
রাফি তিশাকে কোলে তুলে নিয়ে সোজা চলে গেল বেডরুমে। ঘরে শুধু জ্বলছিল এক কোণে থাকা একটা হালকা লাল শেডের নাইট ল্যাম্প। নরম বিছানার ওপর তিশাকে শুইয়ে দিয়ে রাফি তার ওপর ভর দিয়ে ঝুঁকে পড়ল।
তিশা দু-হাত বাড়িয়ে রাফির গলা জড়িয়ে ধরল। "আজ আমাকে আর ছেড়ে যাস না রাফি... দশটা বছরের তিয়াস আজ মেটাতে হবে তোকে।"
"তোকে ছেড়ে যাওয়ার ক্ষমতা আমার কোনোদিন ছিল না, আর কোনোদিন হবেও না তিশা," রাফি নরম গলায় তিশার কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালো।
তারপর শুরু হলো এক জাদুকরী রাত। রাফির ঠোঁট নেমে এল তিশার ভেজা চিবুক হয়ে তার সুগঠিত ঘাড়ের ভাঁজে। তিশা এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে মাথাটা তোশকের দিকে চেপে ধরল। তার ব্যাকলেস ব্লাউজের ফিতে খুলতেই রাফির হাত তিশার মসৃণ পিঠে এক ঝড়ের মতো খেলে গেল। অনাবৃত পিঠের প্রতিটি শিহরণে তিশার শরীর থরথর করে কাঁপছিল।
রাফি ধীরে ধীরে তিশার শাড়ির বাঁধন আলগা করে দিল। আবছা লাল আলোয় তিশার শ্যামলা শরীরটা যেন এক অনন্য শিল্পকর্মের মতো ফুটে উঠল। রাফির প্রতিটি স্পর্শে তিশা আবেশে চোখ বুজে নিচ্ছিল, আর কখনো বা আকুলতায় রাফির পিঠের চামড়া আঁকড়ে ধরছিল। রাফির তপ্ত নিঃশ্বাস যখন তিশার নাভির কাছে এসে পৌঁছাল, তিশা আর ধরে রাখতে পারল না নিজেকে।
"রাফি... আঃ..." তিশার বুক চিরে বের হয়ে এল এক তৃষ্ণার্ত কোঁকানি।
রাফি তিশার নাভিতে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। কামনার তীব্র আলোড়নে দুজনের শরীর একসূত্রে গাঁথা হয়ে গেল। বিচ্ছেদের আগুনে এতদিন যে তুষের জ্যৈষ্ঠ জ্বলছিল, তা আজ এক চূড়ান্ত সমর্পণে শীতল হতে শুরু করল। রাফি ও তিশার ঘন নিঃশ্বাস, ত্বকের সাথে ত্বকের উষ্ণ ঘর্ষণ আর কামনার বুনো শব্দে বেডরুমের রাতটা এক অদ্ভুত মোহময়তায় ভরে উঠল। তিশা তার সমস্ত শক্তি দিয়ে রাফিকে নিজের ভেতরে চেপে ধরল, যেন আর কোনো কালবৈশাখী ঝড় এসে তাদের আলাদা করতে না পারে।
রাত যখন শেষ হয়ে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে, তখন ঘরের আবহাওয়া একদম শান্ত।
মেঝেতে এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে শাড়ি, ব্লাউজ আর রাফির জামাকাপড়। পাতলা সাদা চাদরের নিচে দুজন দুজনের খুব কাছাকাছি শুয়ে আছে। তিশার মাথা রাফির চওড়া বুকে, আর রাফির এক হাত তিশার অনাবৃত কোমর পেঁচিয়ে রাখা।
জানালা দিয়ে ভোরের স্নিগ্ধ আলো এসে পড়েছে তিশার ঘুমন্ত মুখে। তার মুখে এখন আর কোনো বিষাদের ছাপ নেই, আছে এক পরম তৃপ্তি আর শান্তির হাসির রেখা।
রাফি আঙুল দিয়ে তিশার মুখের ওপর থেকে চুলের গাছি সরিয়ে দিল। তিশা ধীরে ধীরে চোখ মেলা শুরু করল। রাফিকে এত কাছে দেখে সে মৃদু হেসে আরো কিছুটা সেঁটে এল রাফির বুকে।
"এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না রাফি... তুই সত্যি আমার পাশে আছিস," তিশা রাফির বুকে একটা ছোট চুমু দিয়ে বলল।
"বিশ্বাস কর তিশা। কালকের সন্ধ্যা পর্যন্ত যে রাতটা আঁধার ছিল, আজ সেই আঁধার কেটে গেছে। আমাদের জীবনের মাঝখানে যে মিথ্যার দেয়ালটা ছিল, সেটা কাল রাতেই ছাই হয়ে গেছে," রাফি তিশার চিবুকটা উঁচিয়ে ধরে বলল।
তিশা রাফির চোখের দিকে তাকাল। সেই শৈশবের দুষ্টু ছেলেটা আজ তার পূর্ণাঙ্গ পুরুষ, তার আশ্রয়ের শেষ ঠিকানা।
"তোর মনে আছে রাফি, ছোটবেলায় তুই বলতিস আমি নাকি বড্ড ঝগড়াটে? সবসময় তিলকে তাল বানাই?" তিশা দুষ্টুমির সুরে বলল।
"এখনো বলি! তুই কালকেও তো জাঁদরেল বাঘিনীর মতো আমাকে গ্যালারি থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছিলি!" রাফি হেসে উঠল।
তিশা রাফির বুকে আলতো করে একটা কিল মেরে বলল, "সে তো তোর ওপর অভিমান ছিল রে বোকা! কিন্তু এখন আর কোনো অভিমান নেই। তুই এখন আমার চিরদিনের বন্দি।"
রাফি তিশাকে হাত দিয়ে আরো শক্ত করে চেপে ধরল। "এই বন্দিদশা থেকে আমি কোনোদিন মুক্তি চাই না তিশা।"
ভোরের মৃদু হাওয়ায় পর্দার ফাঁক দিয়ে সুবাসিত বাতাস ভেসে এল। শহরের কোলাহল এখনো শুরু হয়নি। ঢাকা শহরের এক কোণে দুটো হৃদয় দশ বছরের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আবার এক হয়ে গেল। ছোটবেলার সেই দুষ্টুমি, কৈশোরের গোপন ভালোবাসা আর যৌবনের তীব্র বিচ্ছেদ পেরিয়ে তারা অবশেষে খুঁজে পেল তাদের নিজেদের ঠিকানা—যেখানে শুধুই ভালোবাসা, বিশ্বাস আর পূর্ণতার এক নতুন ভোর।
....