ভেজা হাতের তীব্র স্পর্শ

ফুলশয্যার ঘরটায় তখন রজনীগন্ধার কড়া সুবাস মেখে ভারী হয়ে আছে বাতাস। ধবধবে সাদা বিছানার এককোণে লাল বেনারসি জড়ি টেনে বসে আছে মেঘলা। হাতের কানের দুলজোড়া খুলে নেয়ার মতো শক্তিও যেন তার শরীরে নেই। এই বিয়েটা তার নিজের ইচ্ছায় হয়নি। বাবার অসুস্থতা আর সমাজের দোহাই দিয়ে যৌথ পরিবারের সিদ্ধান্তকে শিরোধারে্য মেনে নিতে হয়েছে তাকে। এক অচেনা পুরুষের সাথে সারা জীবন কাটানোর চুক্তিপত্র যেন এই লাল শাড়ি আর হাতের আলতা।

¦Ëk¢xz˲Úèžé

দরজা খোলার হালকা শব্দে মেঘলা একটু কেঁপে উঠল। ভেতরে এলেন নীলয়। দীর্ঘদেহী, ধারালো চোয়াল আর গম্ভীর চেহারার একজন মানুষ। ঘরটায় ঢুকে নীলয় কিন্তু অন্য দশটা পুরুষের মতো তাড়াহুড়ো করল না। সে শেরওয়ানির বোতাম খুলতে খুলতে ওয়ার্ডরোবের দিকে এগিয়ে গেল। একটা সুতির সাধারণ পায়জামা-পাঞ্জাবি বের করে মেঘলার দিকে না তাকিয়েই শান্ত গলায় বলল, "তুমি কাপড়ে কমফোর্টেবল নও নিশ্চয়ই? চেঞ্জ করে নাও। ওয়াশরুম খালি।"

মেঘলা চমকে উঠে তাকাল। নীলয়ের গলায় কোনো আক্ষেপ বা কামনার ব্যাকুলতা ছিল না, ছিল কেবল একপ্রকার নিঃসঙ্গ পেশাদার সৌজন্য।

¦Ëk¢x/춺'ƒú

সেদিন রাতে নীলয় বিছানার একপাশে শুয়ে পড়েছিল, আর মেঘলা অন্যপাশে। মাঝখানে ছিল এক অদৃশ্য বিশাল দেয়াল। ঘুমানোর আগে নীলয় শুধু একটা কথাই বলেছিল, "পারিবারিক চাপে আমাদের এই সম্পর্ক। আমি জানি তুমি প্রস্তুত নও, আমিও নই। তবে এই বাড়িতে যতদিন আছ, তোমার কোনো সম্মান বা সামান্যতম সুবিধার অভাব হবে না। এটা আমার দায়িত্ব।"

কথাটা মেঘলার বুকে গিয়ে বিঁধেছিল। নীলয় সত্যি নিজের কথা রেখেছিল। বিয়ের পর থেকে সে মেঘলার প্রতি দায়িত্বের এক চুলও হেরফের হতে দেয়নি। মেঘলা কখন খাবে, তার পড়াশোনা বা পছন্দের জিনিসপত্রের কী অবস্থা, অসুস্থ হলে কোন ডাক্তার দেখাতে হবে—সব নীলয়ের নখদর্পণে। কিন্তু এই সমস্ত আয়োজনের ভেতরে কোথাও ভালোবাসার উষ্ম পরশ ছিল না। নীলয় যেন একটা যন্ত্রের মতো দায়িত্ব পালন করে যেত, যার ভেতর কোনো হৃদস্পন্দন শোনা যায় না।

ধীরে ধীরে দিন কাটতে লাগল। নীলয় অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকত, আর মেঘলা এ বাড়ির বিশালতার মাঝে নিজেকে গুটিয়ে রাখত। কিন্তু একটা পুরুষ যখন প্রতিদিন কোনো নারীর এত সূক্ষ্ম খেয়াল রাখে, তখন কি আর সেই নারী নিষ্প্রাণ থাকতে পারে? মেঘলাও পারেনি। নীলয়ের এই গম্ভীর নীরবতা, তার পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিত্ব, আর গভীর রাতে চোখের কোণ দিয়ে তাকে একনজর দেখে নেওয়ার ওই অস্ফুট অভ্যাস—মেঘলাকে ধীরে ধীরে আচ্ছন্ন করে ফেলল। মেঘলা অজান্তেই স্বামীর এই ঠান্ডা কিন্তু নিরাপদ আশ্রয়ে অভ্যস্ত হয়ে পড়তে শুরু করল। সে মনে মনে অপেক্ষা করত, কখন রাত হবে, কখন নীলয় ঘরে ফিরবে।

বিয়ের পাঁচ মাস পরের এক বর্ষণমুখর রাত। শহরের বুকে বৃষ্টি নামছিল মুষলধারে। বিজলির আলোয় অন্ধকার ঘরটা মাঝে মাঝেই চমকে উঠছিল। নীলয় কাজ শেষে বাড়ি ফিরেছিল বেশ দেরিতে, জামাকাপড় একদম ভেজা।

সোফায় বসে বই পড়ছিল মেঘলা। নীলয়কে ওভাবে ভিজে ঢুকতে দেখে সে আর চুপ থাকতে পারল না। দ্রুত উঠে গিয়ে তোয়ালে টেনে নিল।

"এত ভিজেছ কেন? জ্বর আসবে তো!" মেঘলার কণ্ঠে জমে থাকা শঙ্কা প্রকাশ পেয়ে গেল।

নীলয় তোয়ালেটা নিতে গিয়ে থামল। মেঘলার দিকে চোখ তুলে তাকাল সে। এই প্রথম নীলয়ের চোখে দায়িত্বের বাইরে অন্য কিছুর ছাপ দেখল মেঘলা। একটা গভীর, ধিকধিক করে জ্বলতে থাকা তৃষ্ণা।

"তোয়ালে দাও, আমি মুছে নিচ্ছি," নীলয় নিজের স্বাভাবিক গম্ভীর কণ্ঠে বলল, কিন্তু তার হাত মেঘলার তোয়ালে ধরা আঙুলগুলোকে স্পর্শ করে ফেলল।

সেই স্পর্শে মেঘলার শরীরে যেন এক আশ্চর্য বিদ্যুতের স্রোত বয়ে গেল। নীলয়ের ভিজে যাওয়া হাত থেকে উঠে আসা ঠান্ডা জল আর তার শরীরের উত্তাপ একসাথে মেশামেশি হয়ে মেঘলার নিশ্বাস ভারী করে দিল। মেঘলা সরে যেতে চাইল, কিন্তু নীলয় আজ সরতে দিল না।

নীলয় তোয়ালেটা পাশে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মেঘলার কোমর ধরে নিজের কাছে টেনে নিল। আচমকা এই শারীরিক সান্নিধ্যে মেঘলার বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করে উঠল। সে নীলয়ের বুকের ওপর দু হাত রেখে তাকে থামানোর চেষ্টা করল, কিন্তু নীলয়ের চোখের গভীরতা তাকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো স্তব্ধ করে দিল।

"আজ খুব বৃষ্টি হচ্ছে, মেঘলা..." নীলয়ের কণ্ঠ জড়িয়ে এল এক গভীর আবেগে। তার ভেজা চুল থেকে জলের ফোঁটা এসে পড়ছিল মেঘলার কপালে, ঠোঁটে।

নীলয় ধীরে ধীরে মাথা নামিয়ে আনল। মেঘলার ঘাড়ে তার উষ্ণ নিশ্বাস আছড়ে পড়তেই মেঘলার হাত দুটো নীলয়ের পিঠে চেপে বসল। এতদিন ধরে জমিয়ে রাখা দূরত্ব যেন এক মুহূর্তেই ছাই হয়ে যেতে চাইল। নীলয়ের ঠোঁট ছুল মেঘলার শাঁখের মতো সাদা ঘাড়, কানের লতি। একটা তীব্র কামনার স্রোত বয়ে গেল মেঘলার শিরদাঁড়া বেয়ে।

নীলয় তাকে সযত্নে পাঁজা কোল করে তুলে নিল বিছানায়। এতদিন যে শরীরটা ছিল দূরত্বের, আজ তা পরিণত হলো তীব্র আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে। নীলয়ের শক্ত বাঁধনে মেঘলা নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিল। নীলয় তাকে স্পর্শ করছিল এক অদ্ভুত নেশায়—যেন কোনো মহামূল্যবান ধন আবিষ্কার করেছে সে। মেঘলার পরনের সুতির শাড়ির আঁচল ধীরে ধীরে সরে গেল। নীলয়ের উন্মুক্ত ছাতি স্পর্শ করল মেঘলার উন্মুক্ত পেট আর বুকের খাঁজ।

সেই গভীর বর্ষণমুখর রাতে দুজন অচেনা মানুষের মাঝে জন্ম নিল তীব্র শারীরিক ও মানসিক এক উষ্ণতা। নীলয়ের প্রতিটি চুমন, তার হাতের প্রতিটি উষ্ণ স্পর্শ মেঘলাকে বুঝিয়ে দিচ্ছিল, এই পুরুষটির শক্ত খোলসের নিচে এক তীব্র ভালোবাসার আগ্নেয়গিরি লুকিয়ে আছে। মেঘলাও লজ্জা ও কামনার সীমানা পেরিয়ে নীলয়ের চুলে আঙুল চালিয়ে তাকে আরও গভীরে টেনে নিল। ঘরের আবহাওয়া তখন ভারী, দু জোড়া নিশ্বাসের শব্দ আর বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ একাকার হয়ে গেছে। নীলয়ের গভীর আলিঙ্গনে মেঘলা তার অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলল।

পরদিন সকালে যখন আলো ফুটল, মেঘলা ঘুম ভাঙতেই দেখল নীলয় তার পাশে নেই। কাল রাতের সেই তীব্র উন্মাদনা, সেই উত্তপ্ত স্পর্শের পর মেঘলা ভেবেছিল আজ হয়তো নীলয়ের চোখে সে অন্য রূপ দেখবে। হয়তো নীলয় তাকে আজ ভালোবেসে বুকে জড়িয়ে ধরবে।

কিন্তু টেবিলের ওপর একটা চিরকুট রেখে নীলয় আগেই অফিসে চলে গেছে। চিরকুটে লেখা, "আমার জামা কাপড় গুছিয়ে রেখো, আজ বিকেলে ক্লায়েন্ট নিয়ে চিটাগাং যেতে হবে। ফিরতে তিন দিন।"

কাল রাতের অত গভীর মিলন, অত আদর—সব কি তবে নীলয়ের জন্য শুধুই শরীরের তাগিদ ছিল? মেঘলার বুকটা হু হু করে উঠল। যে উত্তাপ দিয়ে নীলয় কাল রাতে তাকে পুড়িয়েছিল, সকালে আবার সেই বরফশীতল দায়িত্ববোধের দেওয়াল তুলে দিল কেন? মেঘলা ভাঙা মন নিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। তার মনে হতে লাগল, সে শুধুই নীলয়ের শারীরিক প্রয়োজন মেটানোর একটা মাধ্যম হয়ে উঠেছে, মনের জায়গা সে কখনোই পায়নি।
নীলয় চট্টগ্রাম চলে যাওয়ার পর থেকে মেঘলার দিনগুলো যেন আর কাটতে চাইছিল না। যে ঘরটায় গত রাতে তারা তীব্র কামনায় আর উষ্ণতায় ভেসে গিয়েছিল, সেই ঘরটাই এখন তাকে গ্রাস করতে আসছে। মেঘলার বারবার মনে পড়ছিল সেই রাতের কথা—নীলয়ের ভেজা শরীরের স্পর্শ, তার বুকের উত্তাপ, আর গভীর রাতে মেঘলার শরীরে চেপে বসা নীলয়ের শক্ত দুটো হাত। কিন্তু এত কিছুর পরেও নীলয় চলে গেল একটা ঠান্ডা চিরকুট লিখে। কোনো বিদায়বেলার ভালোবাসার স্পর্শ নয়, কোনো ব্যাকুলতা নয়।

মেঘলা নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ল। সে মনে মনে ভাবল, "তবে কি নীলয় শুধু নিজের শারীরিক চাওয়া মেটানোর জন্যই সেদিন আমাকে কাছে টেনেছিল? কোনো ভালোবাসা ছিল না সেখানে? শুধুই স্ত্রীর প্রতি শরীরের অধিকার আর দায়িত্বের সমীকরণ?"

এই ভাবনাটুকুই মেঘলার ভেতরের সবটুকু সহ্যক্ষমতা ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। যে মানুষটাকে সে নিজের অজান্তেই মন-প্রাণ সঁপে দিয়েছে, সে যদি কেবল 'দায়িত্ব' আর 'প্রয়োজন' ছাড়া তাকে আর কিছু না ভাবে, তবে এই সম্পর্কের কোনো অর্থ হয় না। মেঘলার বুকের ভেতর এক গভীর অভিমানের আগুন জ্বলতে লাগল।

তিন দিন পর নীলয় ফিরে এল। ভ্রমণক্লান্ত মুখ, কিন্তু তার চোখ দুটো ঘরের ভেতর মেঘলাকেই খুঁজছিল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নীলয় কোটের বোতাম খুলতে খুলতে বলল, "মেঘলা, খুব ক্লান্ত লাগছে। একটু এক কাপ লিকার চা দেবে?"

মেঘলা শান্ত মুখে দাঁড়িয়ে রইল। সে কোনো কথা না বলে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। চা বানিয়ে এনে নীলয়ের সামনের টেবিলে রাখল, কিন্তু নীলয়ের দিকে একবারের জন্যও চোখ তুলে তাকাল না।

নীলয় চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে মেঘলার এই অস্বাভাবিক নীরবতা লক্ষ করল। গত রাতের ঘটনার পর সে ভেবেছিল মেঘলা হয়তো তার কাছে অন্যরকম একটা দাবি রাখবে, কিন্তু মেঘলার এই পাথর-চাপা নীরবতা তাকে অস্বস্তিতে ফেলে দিল।

"তোমার শরীর ভালো আছে, মেঘলা?" নীলয় সোফা থেকে উঠে মেঘলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

মেঘলা এক পা পিছিয়ে গেল। নীলয়ের এই শারীরিক দূরত্ব তৈরি করাটা সহ্য হলো না। সে কিছুটা বাধ্য হয়েই মেঘলার কাঁধে হাত রাখল, "কী হয়েছে বল তো? এমন করছ কেন?"

নীলয়ের হাতের ছোঁয়া লাগতেই মেঘলা কেঁপে উঠল। সেই এক রাতের তীব্র ছোঁয়ার স্মৃতি আবার তার শরীরে কাঁপন ধরিয়ে দিল। কিন্তু অভিমানে তার চোখ দুটো জলে ভরে উঠল। সে নীলয়ের হাতটা ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে দিল।

"আমাকে স্পর্শ করবেন না!" মেঘলার কণ্ঠে চাপা আর্তনাদ ফুটে উঠল।

নীলয় অবাক হয়ে তাকাল, "কী বলছ এসব?"

"ঠিকই বলছি," মেঘলা জলভরা চোখে নীলয়ের সামনাসামনি দাঁড়াল। "আপনি কী ভাবেন নিজেকে? যখন ইচ্ছে হলো দায়িত্বের দোহাই দিয়ে দূরে সরে থাকবেন, আর যখন ইচ্ছে হবে নিজের শারীরিক প্রয়োজন মেটাতে আমাকে বিছানায় টেনে নেবেন? আমি কি আপনার বাসনা মেটানোর কোনো পুতুল?"

নীলয়ের মুখটা মুহূর্তে কঠিন হয়ে গেল। সে ভাবতেই পারেনি মেঘলা তার আচরণকে এইভাবে ব্যাখ্যা করবে। নীলয় নিজে লাজুক আর আবেগ প্রকাশে ভীষণ আনাড়ি। সেদিন রাতের উত্তাপ আর কামনার জোয়ারে সে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল ঠিকই, কিন্তু সকালে নিজের এই হঠাৎ বদলে যাওয়া রূপ দেখে সে নিজেই কিছুটা অপরাধবোধে ভুগছিল। তাই সে স্বাভাবিক হওয়ার ভান করে পালিয়ে গিয়েছিল অফিসে। কিন্তু মেঘলা যে সেটাকে তার কামনার প্রয়োজন হিসেবে ধরে নেবে, তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি।

"মেঘলা, তুমি ভুল বুঝছ—" নীলয় শান্ত কণ্ঠে বোঝানোর চেষ্টা করল।

"কোনো ভুল বুঝছি না আমি!" মেঘলা চিৎকার করে উঠল। "বিয়ের পর থেকে আপনি আমাকে দায়িত্ব হিসেবে বয়ে বেড়াচ্ছেন। আমি আপনার কাছে শুধুই একটা সামাজিক বাধ্যবাধকতা! আর সেদিন রাতে... সেদিন রাতে আপনি আমাকে কেবল একজন নারী হিসেবে ব্যবহার করেছেন, নিজের স্ত্রী হিসেবে ভালোবেসে নয়! এত বড় প্রতারণা আমি নিজের সাথে করতে পারব না।"

"প্রতারণা?" নীলয়ের গলাতেও এবার রাগের খাঁজ ফুটে উঠল। তার অহংকারে আঘাত লেগেছিল। "আমি তোমার সাথে প্রতারণা করেছি?"

"হ্যাঁ, করেছেন!" মেঘলা কাঁদতে কাঁদতে বলল। "আপনি যদি আমাকে একটুও ভালোবাসতে না পারেন, তবে এই বাঁধন রেখে লাভ কী? আপনার এই দায়িত্ব আর শারীরিক দয়ার ওপর ভিত্তি করে আমি বাঁচতে চাই না। আমি বাপের বাড়ি ফিরে যাচ্ছি। আপনাকে আমি এই বিয়ের বন্দিদশা থেকে মুক্তি দিচ্ছি।"

কথাটা বলেই মেঘলা নিজের ট্রলি ব্যাগটা টেনে বের করে আলমারি থেকে জামাকাপড় গুছাতে শুরু করল।

নীলয় দরজার পাশে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার ভেতরের পুরুষটি যেন এক নিমেষে বরফ হয়ে গেল। মেঘলা সত্যিই তাকে ছেড়ে চলে যেতে চায়? এই কয়টা মাসে যে মেয়েটি তার পুরো ঘরটাকে, তার জীবনটাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, সে আজ এক পলকে সব ভেঙে দিয়ে চলে যাচ্ছে?

মেঘলা ব্যাগ গুছিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হতেই নীলয় তার পথ আটকে দাঁড়াল। নীলয়ের চোখ দুটো তখন রাগে, অভিমানে আর এক অজানা আশঙ্কায় লাল হয়ে উঠেছে।

"সরুন আমার পথ থেকে," মেঘলা না তাকিয়েই বলল।

নীলয় কোনো কথা বলল না। সে এক ধাক্কায় বেডরুমের দরজা বন্ধ করে লক করে দিল। চাবির শব্দে মেঘলা চমকে উঠে তাকাল।

"আপনি কী করছেন?"

নীলয় কোনো উত্তর দিল না। সে ধীর পায়ে মেঘলার দিকে এগিয়ে এল। তার চোখে তখন এক তাণ্ডবের আভাস। মেঘলা পিছিয়ে যেতে যেতে দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকে গেল। নীলয় দুই হাত দেয়ালে রেখে মেঘলাকে তার শরীরের খাঁজে বন্দি করে ফেলল।

"তুমি বলছ আমি তোমাকে শুধুই শরীর হিসেবে ব্যবহার করেছি?" নীলয়ের গলাটা গম্ভীর আর ভারী শোনালো। তার বুকের দ্রুত ওঠানামা মেঘলার বুকে এসে ধাক্কা খাচ্ছিল।

"ছাড়ুন আমাকে..." মেঘলার নিশ্বাস আটকে আসছিল।

নীলয় কোনো কথা না শুনে মেঘলার থুতনিটা শক্ত করে ধরে উঁচিয়ে ধরল। তারপর নিজের ঠোঁট দুটো আছড়ে ফেলল মেঘলার ওপর। এ যেন কোনো সাধারণ চুম্বন নয়, এ এক আদিম অধিকারের বহিঃপ্রকাশ! নীলয়ের খিদে আর ভেতরের জমানো ক্ষোভ এক হয়ে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিতে চাইল মেঘলার সব বাধা।

মেঘলা প্রথমে ছটফট করে ওঠার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু নীলয়ের এক হাতের শক্ত বাঁধানো কোমর আর অন্য হাতের গভীর স্পর্শে তার শরীর অবশ হয়ে এল। নীলয় তার শাড়ির আঁচলটা টেন খুলে মেঝেতে ফেলে দিল।

"তুমি সত্যি ভেবেছ আমি তোমাকে ভালো না বেসে ছুঁয়েছি?" নীলয় অস্ফুটে মেঘলার ঘাড়ে কামড় বসাল, তারপর নিজের তৃষ্ণার্ত ঠোঁট দিয়ে সেই জায়গাটা চুষে নিল। মেঘলার মুখ দিয়ে এক হালকা সুড়সুড়ির মতো গোঙানি বেরিয়ে এল।

নীলয়ের হাত মেঘলার ব্লাউজের বোতামগুলো দ্রুত খুলে ফেলল। মেঘলার উন্মুুক্ত পিঠে আর পেটে নীলয়ের গরম হাতের ছোঁয়া লাগতেই মেঘলা শিউরে উঠল। নীলয় মেঘলাকে পাঁজা কোল করে তুলে নিয়ে বিছানায় আছড়ে ফেলল।

আজকের এই শারীরিক স্পর্শ কাল রাতের মতো মেলা মেশার শান্ত ভালোবাসা ছিল না। আজকের স্পর্শে ছিল এক উদগ্র অধিকারবোধ, এক উন্মত্ত আকর্ষণ। নীলয় মেঘলার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সে মেঘলার শরীরের প্রতিটি ভাঁজে, প্রতিটি ইঞ্চিতে নিজের ঠোঁট আর জিব দিয়ে এক অদ্ভুত কামনার ছাপ এঁকে দিতে লাগল। মেঘলা নীলয়ের চুল খামচে ধরল, তার বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘদিনের তৃষ্ণা আর অভিমান যেন নীলয়ের এই উত্তপ্ত আক্রমণের সামনে গলে পানি হয়ে গেল।

নীলয়ের ভেজা ছাতি, তার শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ আর মেঘলার আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়া চিৎকার ঘরে এক গভীর কামুক আবহ তৈরি করল। নীলয় মেঘলার দু হাত মাথার ওপরে চেপে ধরে তার উরুর খাঁজে নিজেকে হারিয়ে ফেলল। প্রতিটি চরম মুহূর্তে নীলয় প্রমাণ করে দিতে চাইল—মেঘলা শুধুই তার, শুধুই তার!

সেই গভীর রাতে ঝড়ের বেগে তাদের শরীরের এই পুনর্মিলন ঘটল। কামনার চরম শিখরে পৌঁছে নীলয় যখন মেঘলার বুকে মাথা রেখে হাঁফাচ্ছিল, মেঘলা তখন নীলয়ের চুলে আঙুল চালিয়ে নিঃশব্দে কাঁদছিল।

নীলয় ধীরে ধীরে মাথা তুলল। মেঘলার চোখের জল দেখে তার ভেতরের সব রাগ মুহূর্তেই উবে গেল। সে মেঘলার ভেজা কপালে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

অন্ধকার ঘরটায় নীলয়ের কণ্ঠস্বর তখন একদম নিচু, কিন্তু তীব্র আবেগে ভরা—

"মেঘলা... তুমি জানতে চেয়েছ না আমার মনের কথা? তবে শোনো..."
গভীর রাতে কামনার সবটুকু ঝড় থেমে যাওয়ার পর ঘরজুড়ে কেবল দুজনের ভারী নিশ্বাসের শব্দ। নীলয় বিছানায় পাশ ফিরে শুয়ে মেঘলাকে নিজের বাহুডোরে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। মেঘলার উন্মুক্ত পিঠে নীলয়ের উষ্ণ হাতের ছোঁয়া, আর তার বুকে মেঘলার অনুতপ্ত হৃদস্পন্দন।

নীলয় মেঘলার চিবুকটা ধরে নিজের দিকে একটু তুলে ধরল। তার শান্ত, গভীর চোখ দুটোর দিকে তাকাতেই মেঘলা দেখতে পেল সেখানে কোনো কঠোরতা নেই—বরং জমে আছে এক অপরিসীম আকুলতা আর এক ফোঁটা মুক্তোর মতো জল।

"তুমি ভেবেছ আমি তোমাকে শুধুই দায়িত্ব মনে করি, তাই না মেঘলা?" নীলয়ের গলার স্বর জড়িয়ে এলো কান্নায়। "হ্যাঁ, শুরুটা দায়িত্ব দিয়েই হয়েছিল। বাবা যখন তোমার দায়িত্ব নেওয়ার কথা বলেছিলেন, আমি মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু বিয়ের পর প্রতিদিন রাতে যখন আমি বাড়ি ফিরতাম, তোমার এই মিষ্টি মুখটা দেখে আমার সারা দিনের ক্লান্তি উবে যেত। তুমি যখন আড়ালে দাঁড়িয়ে আমার খেয়াল রাখতে, আমি সব টের পেতাম।"

নীলয় মেঘলার ভেজা কপালে নিজের ঠোঁট চেপে ধরে অস্ফুটে বলল, "কখন যে তুমি আমার জীবনে দায়িত্ব থেকে গভীর প্রয়োজন হয়ে উঠেছ, আর সেই প্রয়োজনটা কখন যে আমার নিঃশ্বাসের চেয়েও বড় ভালোবাসা হয়ে দাঁড়িয়েছে—তা আমি নিজেও টের পাইনি মেঘলা। আমি আবেগে ভীষণ আনাড়ি, কখনো কাউকে ভালোবাসার কথা গুছিয়ে বলতে পারিনি। সেদিন চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার আগে আমি চিরকুট লিখেছিলাম কারণ, তোমাকে সামনাসামনি দেখার সাহস আমার ছিল না। আমার ভয় হচ্ছিল, কাল রাতের ওই তীব্র অনুভূতির পর আমি যদি তোমাকে বুকে টেনে নিই, তবে কাজ ফেলে আমি আর কোথাও যেতে পারব না।"

কথাগুলো শুনতে শুনতে মেঘলার চোখের বাঁধ ভেঙে গেল। তার মনে জমতে থাকা সব অভিমান, সব সন্দেহ এক মুহূর্তেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। যে পুরুষটিকে সে এতদিন বরফের মতো শীতল ভেবে এসেছে, তার বুকের ভেতর তার জন্যই জ্বলছিল ভালোবাসার এক বিশাল আগ্নেয়গিরি!

"তুমি সত্যি আমাকে ভালোবাসো, নীলয়?" মেঘলা শিউরে উঠে নীলয়ের বুকে মুখ লুকাল।

"ভালোবাসি বললেও হয়তো কম বলা হবে, মেঘলা," নীলয় মেঘলার কোমর আরও শক্ত করে চেপে ধরে তাকে নিজের সাথে একবারে মিশিয়ে নিল। "তুমি ছাড়া আমার আর কোনো অস্তিত্ব নেই। তুমি যদি আজ আমাকে ছেড়ে চলে যেতে, তবে আমি জ্যান্ত লাশ হয়ে যেতাম।"

মেঘলা নিজের ভুল বুঝতে পারল। তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে নীলয়ের উন্মুক্ত বুকে গিয়ে পড়ল। সে হাত দুটো দিয়ে নীলয়ের ঘাড় পেঁচিয়ে ধরে বলল, "আমাকে ক্ষমা করে দাও, নীলয়। আমি বুঝতে পারিনি। তোমার এই নীরব ভালোবাসাটাকে আমি ভুল বুঝে কত বড় অন্যায় করে ফেলেছি..."

"আর কখনো ছেড়ে যাওয়ার কথা বলবে না তো?" নীলয়ের কণ্ঠে এবার ফিসফিস করে নেমে এলো এক গভীর মাদকতা।

"কখনো না..." মেঘলা নীলয়ের ঠোঁটের খুব কাছাকাছি গিয়ে ফিসফিস করে বলল।

নীলয় আর কোনো কথা না বলে মেঘলার ঠোঁট দুটো নিজের ঠোঁটের বন্ধনে বন্দি করে নিল। কিন্তু এবারের চুমনটা ছিল একেবারেই অন্যরকম। এতে কোনো রাগ বা তাণ্ডব ছিল না, ছিল কেবল সুগভীর ভালোবাসা আর তীব্র অনুরাগের প্রলেপ।

নীলয়ের হাত আবার নতুন করে জেগে উঠল। সে মেঘলার সুডৌল শরীরের প্রতিটি ভাঁজে নিজের ভালোবাসা আর কামনার স্পর্শ এঁকে দিতে শুরু করল। মেঘলা এবার আর নিজেকে গুটিয়ে রাখেনি; সেও নিজের সমস্ত ভালোবাসা আর ব্যাকুলতা দিয়ে নীলয়কে জড়িয়ে ধরল।

সোফায় ফেলে দেওয়া শাড়ির আঁচল, মেঝের ওপর পড়ে থাকা খুলে ফেলা জামাকাপড়—সবকিছু যেন এই প্রেমিক জুটির নতুন ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে রইল। নীলয়ের উত্তপ্ত শরীরের স্পর্শে মেঘলার ভেতরের সমস্ত লজ্জা গলে পানি হয়ে গেল। রাতের নির্জনতায় তাদের দুজনের শরীরের শারীরিক মেলবন্ধন পরিণত হলো এক স্বর্গীয় অনুভূতির উদযাপনে। নীলয়ের প্রতিটি তীব্র আর গভীর মোচড়ে মেঘলা আনন্দের চরম শিখরে পৌঁছাতে লাগল, তার উথলে ওঠা কামুক চিৎকার নীলয়ের বুকের ভেতর গিয়ে মিলিয়ে গেল।

পরদিন সকালে যখন ভোরের আলো বারান্দা ডিঙিয়ে ঘরের ভেতর এসে পড়ল, তখনো তারা একে অপরের বাহুডোরে বন্দি। মেঘলার মাথা নীলয়ের প্রশস্ত বুকের ওপর রাখা, আর নীলয় একহাতে মেঘলার খোলা চুল নিয়ে খেলা করছে।

নীলয় মেঘলার গালে আলতো করে চুমা খেয়ে বলল, "সুপ্রভাত, আমার ভালোবাসা।"

মেঘলা লজ্জা লাল হয়ে নীলয়ের বুকে আরও একটু সেঁটে গেল। ভুল বোঝাবুঝির কালো মেঘ কেটে গিয়ে তাদের জীবনে এখন কেবলই এক নতুন ভোরের সূচনা, যেখানে দায়িত্ব আর প্রয়োজন ছাপিয়ে জয় হয়েছে শুধুই গভীর ভালোবাসার।

....
👁 86