ঝুম বৃষ্টি নামার আগের আকাশটার মতো ভার হয়ে আছে মায়ার মন। মেঘনা নদীর কূলঘেঁষা ছোট্ট শহর মেঘনাপুরের বাতাসে এখন শুধুই ভিজে মাটির সোঁদা গন্ধ আর বিয়ের সানাইয়ের আবছা সুর। পুরো বাড়ি জুড়ে উৎসবের আমেজ, রঙিন আলোর রোশনাই, আর মেহেন্দির সুবাস। কিন্তু এই সমস্ত কোলাহলের মাঝে মায়া বসে আছে তার ঘরের জানালায়, একা। দৃষ্টি সামনের বিশাল দীঘিটার দিকে, যেখানে বৃষ্টির প্রথম ফোঁটাগুলো পড়ে গোল গোল তরঙ্গ তৈরি করছে।
আগামী সপ্তাহে মায়ার আকদ। পাত্র তানভীর—সুদর্শন, প্রতিষ্ঠিত এবং পরিবারে সবার পছন্দের। মায়াও অমত করেনি। জীবন তো আর থেমে থাকে না, সময় তার নিজস্ব নিয়মে বয়ে চলে। কিন্তু আজ বিকেলে একটা ছোট্ট ঘটনার পর মায়ার থমকে যাওয়া পৃথিবীটা আবার এলোমেলো হয়ে গেছে।
কয়েক ঘণ্টা আগেই সে জানতে পেরেছে—আরিয়ান ফিরে এসেছে। দীর্ঘ সাতটি বছর পর সে দেশে ফিরেছে, একদম বদলে যাওয়া এক মানুষ হয়ে।
আরিয়ান আর মায়া। একসময় এই দুটো নাম একসাথে ছাড়া উচ্চারণ করা যেত না। মেঘনাপুরের অলিতে-গলিতে, নদীর পাড়ে, কিংবা বটতলার ছায়ায় তাদের শৈশব আর কৈশোরের হাজারো স্মৃতি জমে আছে। আরিয়ান ছিল মায়ার সবচেয়ে কাছের বন্ধু, তার একমাত্র আশ্রয়। কিন্তু কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা দিতেই মায়া বুঝতে পেরেছিল, তাদের এই বন্ধুত্বের আড়ালে তার বুকের ভেতর অন্য এক অনুভূতির জন্ম হয়েছে। প্রতিটি বর্ষায় আরিয়ানের সাথে ভিজে একাকার হওয়া, তার দিকে আরিয়ানের একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা, কিংবা গভীর রাতে ফোনের ওপাশে আরিয়ানের শ্বাসের শব্দ—সবকিছুই মায়াকে এক অদৃশ্য মায়াজালে জড়িয়ে ফেলেছিল। মায়া বুঝতে পেরেছিল, সে আরিয়ানকে ভালোবেসে ফেলেছে। গভীর, তীব্র, উন্মাদ এক ভালোবাসায়।
কিন্তু মায়া যখন সেই অনুভূতির গভীরতায় হাবুডুবু খাচ্ছে, ঠিক তখনই একদিন আচমকা সব ওলটপালট হয়ে গেল। আরিয়ান হঠাৎ করেই উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়। যাওয়ার আগে মায়াকে একটি খাম বন্ধ চিঠি দিয়ে বলেছিল, "মায়া, এই চিঠিটা তোর জন্য। আমি চলে যাওয়ার পর খুলবি।"
কিন্তু মায়া সেই চিঠি কখনো খোলেনি। তার অভিমান হয়েছিল। বুকফাটা কষ্টে, রাগে আর অভিমানে সে চিঠিটা তার পুরনো এক ডায়েরির পাতায় বন্দি করে রেখেছিল। তার মনে হয়েছিল, যে মানুষটা তাকে একা ফেলে এক নিমেষে এত দূরে চলে যেতে পারে, তার কোনো ব্যাখ্যা শোনার প্রবৃত্তি তার নেই। মায়া ভেবেছিল, আরিয়ান তাকে ছেড়ে চলে গেছে, তাদের সম্পর্কের কোনো মূল্য হয়তো তার কাছে ছিল না।
আজ এত বছর পর যখন শুনল আরিয়ান ফিরেছে, তখন বুকটা এক অজানায় কেঁপে উঠল। আরিয়ান এখন আর সেই সাধারণ ছেলেটি নেই। শুনল বিদেশে ব্যবসা করে সে এখন বড় ব্যবসায়ী, গম্ভীর, কঠোর আর একাকী এক মানুষ।
হঠাৎ দরজায় হালকা টোকা পড়ল। মায়ার ছোট ফুপু ফুফু মনি ভেতরে ঢুকলেন।
"মায়া রে, নিচে আয়। কত মেহমান এসেছে, আর তুই এখানে একা বসে আছিস? আর শোন, তোর ফুফা আরিয়ানের বাবা-মাকেও নিমন্ত্রণ করেছিলেন। ওরা এসেছেন, সাথে আরিয়ানও এসেছে।"
কথাটা শুনেই মায়ার বুকের ভেতর একটা তীব্র ঢেউ আছড়ে পড়ল। হৃদস্পন্দন যেন স্তব্ধ হয়ে যেতে চাইল।
"তুই একটু শাড়িটা ঠিক করে নিচে আয়," ফুফু মনি চলে গেলেন।
মায়া আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার পরনে একটা নীল রঙের সুতির শাড়ি, চুলে আলগা খোঁপা। চোখে কাজলের কালো রেখা। আয়নায় নিজেকে দেখে সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হাত দুটো থরথর করে কাঁপছে। নিজেকে সামলে নিয়ে সে আস্তে আস্তে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল।
ড্রয়িংরুমে প্রবীণদের আড্ডা জমে উঠেছে। সেখানে সোফায় বসে আছে একজন পুরুষ। তার পরনে গাঢ় নীল রঙের শার্ট, হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটানো। চওড়া কাঁধ, ধারালো চিবুক, আর চোখের দৃষ্টিতে এক ধরনের গভীর, শান্ত আভিজাত্য। এই সেই আরিয়ান! কিন্তু আগের সেই চঞ্চল, হাসিখুশি আরিয়ানের সাথে এই পুরুষের কোনো মিল নেই। সে এখন পুরোদস্তুর এক প্রাপ্তবয়স্ক, আকর্ষণীয় পুরুষ, যার ব্যক্তিত্বে এক ধরনের তীব্র চুম্বকত্ব আছে।
মায়াকে নিচে নামতে দেখে আরিয়ান হঠাৎ চোখ তুলল। দুটো জোড়া চোখ একে অপরের মুখোমুখি হলো।
এক মুহূর্তের জন্য যেন পুরো পৃথিবীর সমস্ত শব্দ থেমে গেল। বাতাসের প্রবাহ থমকে গেল। আরিয়ানের গাঢ়, কালো চোখের গভীরে এমন এক তীব্রতা ছিল, যা মায়ার পুরো শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগিয়ে তুলল। সে দৃষ্টিতে কেবল পুরোনো স্মৃতি নয়, ছিল এক তৃষ্ণার্ত ব্যাকুলতা, যা মায়াকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিল।
"এসো মায়া, এখানে বসো," আরিয়ানের মা তাকে ডেকে তুললেন।
মায়া কোনোমতে গিয়ে অন্য একটা সোফায় বসল। আরিয়ান তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। সে দৃষ্টি এতই প্রখর যে মায়ার মনে হচ্ছিল সে তার চামড়া ভেদ করে একেবারে আত্মার গভীরে পৌঁছে যাচ্ছে। মায়ার গায়ের চামড়ায় কাঁটা দিয়ে উঠল।
ক কিছুক্ষণ পর সবাই যখন গল্পে মশগুল, আরিয়ান আস্তে করে উঠে দাঁড়িয়ে পেছনের বারান্দার দিকে হেঁটে গেল। বারান্দাটি একটু নিরিবিলি, চারপাশটা গাঢ় অন্ধকারে আচ্ছন্ন আর বৃষ্টির ছাঁট আসছে সেখানে।
মায়ার পা দুটো যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই আরিয়ানের পিছু নিল। সে জানে এটা ভুল, সে এখন অন্য কারো বাগদত্তা, কিন্তু তার মন আর মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ সে হারিয়ে ফেলেছিল। এক অদৃশ্য টান তাকে বারান্দার দিকে টেনে নিয়ে গেল।
বারান্দায় গাঢ় অন্ধকার। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। আরিয়ান রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল।
মায়া পা টিপে টিপে বারান্দায় ঢুকতেই আরিয়ান পেছন না ফিরেই বলে উঠল, "জানি তুই আসবি, মায়া।"
তার কণ্ঠস্বর আগের চেয়ে অনেক বেশি গমগমে, গম্ভীর এবং বুনো এক উন্মাদনায় ভরা।
মায়া থমকে দাঁড়াল। "তুমি... তুমি কেমন আছ, আরিয়ান?"
আরিয়ান আস্তে করে ঘুরে দাঁড়াল। অন্ধকারে তার মুখটা অস্পষ্ট হলেও তার চোখের জ্বলজ্বলে মনি দুটো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। সে ধীরপায়ে মায়ার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। প্রতি পদক্ষেপে মায়ার বুকের ভেতরে রক্তক্ষরণ হতে লাগল।
আরিয়ান মায়ার এত কাছাকাছি এসে দাঁড়াল যে মায়া তার গায়ের দামী পারফিউমের গন্ধ আর শরীরের উষ্ণতা অনুভব করতে পারছিল। আরিয়ানের শ্বাসের উষ্ণ বাতাস মায়ার কপালে এসে পড়ছিল।
"কেমন আছি?" আরিয়ানের গলাটা নিচু কিন্তু ভীষণ শক্ত। "তুই সত্যি জানতে চাস আমি গত সাত বছর কেমন ছিলাম?"
মায়া একপা পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু আরিয়ান নিমেষের মধ্যে তার ডান হাতটা বাড়িয়ে মায়ার কোমর চেপে ধরল। শক্ত, বলিষ্ঠ এক হাত। মায়াকে নিজের একদম গা ঘেঁষে টেনে নিল সে। মায়ার বুকটা আরিয়ানের চওড়া ছাতির সাথে মিশে গেল।
"আরিয়ান! ছাড়ো... কেউ দেখে ফেলবে!" মায়া ফিসফিস করে উঠল, তার গলা কাঁপছিল তীব্র উত্তেজনায় আর ভয়ে।
"কাউকে ডরাই না আমি," আরিয়ানের অন্য হাতটা উঠে এল মায়ার গলায়। তার গরম আঙুল মায়ার নরম স্পর্শকাতর গলায় ধীরে ধীরে বুলিয়ে নামতে লাগল। মায়ায় চোখ দুটো বন্ধ হয়ে এল, তার শরীর এক অজানা আবেশে শিহরিত হয়ে উঠল। আরিয়ানের এই স্পর্শটা কত পুরোনো, অথচ কত নতুন! কত তীব্র!
আরিয়ান তার মুখটা মায়ার কানের কাছে নিয়ে এল। তার উষ্ণ ঠোঁট মায়ার কানের লতিতে আলতো করে ছোঁয়াতেই মায়ার বুক থেকে একটা ছোট নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল।
"তোর শরীরে এখনও আমার জন্য সেই একই স্পন্দন," আরিয়ান ফিসফিস করে বলল, তার ঠোঁট মায়ার ঘাড়ের ওপর দিয়ে স্লাইড করে নিচে নামছে। "তোর কি মনে হয়, মায়া? অন্য কোনো পুরুষের হতে পারবি তুই? এই শরীর, এই মন... এ তো শুধুই আমার ছিল।"
মায়া দু'হাতে আরিয়ানের বুক ঠেলে সরানোর চেষ্টা করল, কিন্তু সেই চেষ্টা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। আরিয়ানের শরীরের পুরুষালী সুবাস, তার মাংসপেশির দৃঢ়তা মায়াকে এক নেশাতুর জগতে নিয়ে যাচ্ছিল। আরিয়ানের ঠোঁট এখন মায়ার উন্মুক্ত স্কন্ধের ওপর, সেখানে সে এক গভীর, তীব্র চুমু আঁকল। মায়ায় শরীরটা দুমড়ে মুচড়ে উঠল পেষণে।
"আরিয়ান... দয়া করে... আমার সামনে আকদ..." মায়া কোনোমতে বলতে পারল, তার শ্বাস দ্রুত হয়ে উঠেছে।
আরিয়ান থামল না। সে মায়ার চিবুকটা শক্ত করে ধরে তার মুখটা ওপরে তুলল। তারপর তার তৃষ্ণার্ত, উত্তপ্ত ঠোঁট দুটো মায়ার ভেজা ঠোঁটের ওপর চেপে বসাল।
এক নিমেষে যেন পৃথিবীর সব বাঁধ ভেঙে গেল। সেই চুমুটা কোনো সাধারণ চুমু ছিল না—ওতে ছিল সাত বছরের জমে থাকা বিরহ, রাগ, ব্যাকুলতা আর এক উদাম কামনার জোয়ার। আরিয়ান মায়ার নিম্নাংশের ওপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে ঠোঁট দুটোকে চুষে নিতে লাগল অতি গভীরে। মায়ার সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে নিজের অজান্তেই আরিয়ানের চুল মুঠো করে ধরল, তার ঠোঁটে সঁপে দিল নিজেকে। বারান্দার গাঢ় অন্ধকারে, ঝুম বৃষ্টির শব্দের মাঝে দুটো তপ্ত শরীর একাকার হয়ে গেল এক নিষিদ্ধ, গভীর ভালোবাসার আলিঙ্গনে।
কয়েক মুহূর্ত পর, যখন দুজনই শ্বাসের জন্য হাঁপাচ্ছে, আরিয়ান মায়াকে ছাড়ল। কিন্তু তার চোখ থেকে আগুন ঝরছিল।
"তুই আমাকে ছেড়ে অন্য কারো হতে পারবি না, মায়া। তুই ভুল করেছিস," আরিয়ান ধীরেসুস্থে বলল, তার কণ্ঠস্বরে এক ভয়ঙ্কর প্রত্যয়।
"তুমিই তো আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলে, আরিয়ান!" মায়া কেঁদে ফেলল, তার ঠোঁট দুটো তখন আরিয়ানের কামড়ে লাল হয়ে ফুলে উঠেছে। "তুমি চলে গিয়েছিলে!"
আরিয়ান মায়ার দিকে এক অদ্ভুত চোখে তাকাল। তারপর এক পা পিছিয়ে গিয়ে বলল, "আমি কখনো তোকে ছেড়ে যাইনি। কিন্তু তুই... তুই কোনোদিন আমার মনটাকে বোঝার চেষ্টা করিসনি।"
আরিয়ান আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে অন্ধকারেই হেঁটে বের হয়ে গেল।
মায়া বারান্দার দেয়ালে ভর দিয়ে নিচে বসে পড়ল। তার পুরো শরীর তখনও আরিয়ানের তীব্র স্পর্শে কাঁপছে, ঠোঁটে জ্বলছে কামনার আগুন। হৃদস্পন্দন থামছেই না। আরিয়ানের শেষ কথাগুলো তার মাথায় হাতুড়ির মতো বাজতে লাগল—আমি কখনো তোকে ছেড়ে যাইনি...
হঠাৎ মায়ার মনে পড়ল সেই খামটার কথা। সেই সাত বছর পুরোনো খাম, যা সে ডায়েরির ভেতর বন্দি করে রেখেছিল। আজ পর্যন্ত যা সে খোলেনি।
মায়া উন্মত্তের মতো নিজের ঘরের দিকে ছুটে গেল। আজ তাকে জানতেই হবে, কী লেখা ছিল সেই চিঠিতে!
ঝড়ো হাওয়া ঘরের পর্দাগুলোকে উগ্রভাবে উড়াচ্ছে। মায়ার ঘরের আলোটা আবছা। সে কাঁপতে থাকা হাতে আলমারির একদম পেছনের তাক থেকে বের করল সেই পুরনো, ধূলোপড়া লাল ডায়েরিটা। ডায়েরির পাতায় বন্দি থাকা সেই সাত বছর আগের হলুদ হয়ে যাওয়া খামটি এখন তার হাতে।
মায়ার বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় ধড়ফড় করছে। আরিয়ানের সেই শেষ কথাগুলো মাথার ভেতর প্রতিনিয়ত ধাক্কা মারছে—“আমি কখনো তোকে ছেড়ে যাইনি।”
সে কি তবে সত্যি কোনো ভুল বোঝাবুঝির সাগরে সাঁতার কেটেছে এতদিন?
মায়া ধীরহাতে খামটি ছিঁড়ল। ভেতরে থাকা কাগজটা বের করে আনতেই দেখতে পেল আরিয়ানের পরিচিত সেই হাতের লেখা। প্রতিটি অক্ষর যেন রক্তের কালিতে লেখা, প্রতিটি শব্দে ঝরে পড়ছে এক বুক হাহাকার।
“মায়াবতী,
আমি জানি এই চিঠিটা যখন তুই পড়বি, আমি তখন আকাশপথে তোকে ছেড়ে হাজার মাইল দূরে। তুই হয়তো ভাবছিস আমি তোকে ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছি, তুই হয়তো আমাকে স্বার্থপর ভাবছিস। কিন্তু সত্যিটা যে কী, তা যদি তুই জানতিস!
আমার বাবা যে হঠাৎ বড় লোকসানের মুখে পড়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন, তা তোকে বলিনি। পাওনাদারদের হুংকার আর দেনার দায়ে আমাদের পুরো পরিবার যখন ধ্বংসের মুখে, তখন আমার সামনে দুটো পথ খোলা ছিল—নয়তো এখানে থেকে তিলে তিলে শেষ হয়ে যাওয়া, না হয় বিদেশের সেই কঠিন চাকুরির অফারটা গ্রহণ করে নিজেকে বিসর্জন দেওয়া। আমি দ্বিতীয়টা বেছে নিয়েছি, শুধু আমাদের ভবিষ্যৎ আর পরিবারকে বাঁচানোর জন্য।
মায়া, তুই আমার শৈশব, তুই আমার কৈশোর, আর তুই-ই আমার বেঁচে থাকার একমাত্র তৃষ্ণা। তোকে ছেড়ে যাওয়ার প্রতিটা মুহূর্ত আমার কাছে মৃত্যুর সমান। কিন্তু আমি কথা দিচ্ছি, আমি ফিরে আসব। নিজেকে তৈরি করে, তোকে নিজের করে পাওয়ার যোগ্য হয়ে আমি ফিরে আসব। তুই শুধু আমার জন্য অপেক্ষা করিস। অন্য কাউকে তোর এই পবিত্র মনে জায়গা দিস না। তোর ওই নরম শরীর, তোর ওই মায়াবী চোখ, তোর ঠোঁটের ওই মিষ্টি হাসি—সবকিছুর ওপর একমাত্র আমার অধিকার। আমি ফিরে এসে তোকে আমার বউ করে বুকে টেনে নেব। তোকে খুব ভালোবাসি, মায়া। বড্ড বেশি ভালোবাসি।”
চিঠিটা পড়া শেষ হতেই মায়ার হাত থেকে কাগজটা মেঝেতে খসে পড়ল। তার চোখ থেকে অঝোর ধারায় জল গড়িয়ে নামতে লাগল। মায়ার পুরো পৃথিবী যেন এক মুহূর্তে ওলটপালট হয়ে গেল।
সাতটি বছর! দীর্ঘ সাতটি বছর সে আরিয়ানকে ভুল বুঝে এসেছে! ভেবেছে সে তাকে অবহেলা করে চলে গেছে, তাকে ছেড়ে দিয়েছে। অথচ আরিয়ান তার জন্য যুদ্ধ করতে গিয়েছিল, একাকী সেই প্রবাসে ঘাম আর রক্ত জল করে লড়াই করেছে শুধু তার কাছে ফিরে আসার জন্য!
মায়া দুই হাতে নিজের মুখ ডেকে বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়ল। সে কী করল? সে কেন সেদিন চিঠিটা খুলল না? সামান্য অভিমান আর রাগের বশে সে নিজের আরিয়ানের ভালোবাসাকে পদদলিত করল? আর এখন সে অন্য কারো হতে চলেছে!
হঠাৎ ঘরের জানালার কাচে ঠকঠক শব্দ হলো।
মায়া চমকে উঠে চোখের জল মুছে জানালার দিকে তাকাল। দোতলার এই জানালা ঘেরা বিশাল কদম গাছটার দিকে সে অবাক হয়ে চাইল। ডাল বেয়ে কেউ একজন ওপরে উঠে আসছে!
পরমুহূর্তেই জানালার সাটার ঠেলে ভেতরে ঢুকলো এক দীর্ঘাঙ্গী কৃষ্ণবর্ণ মানব অবয়ব। আরিয়ান!
তার গায়ের শার্ট ভিজে গায়ের সাথে সেঁটে আছে। চুল থেকে জলের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে তার সুগঠিত চোয়ালে। তার চোখে সেই একই উন্মাদনা, একই বুনো কামনা।
মায়া অতর্কিত এই ঘটনায় পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু আরিয়ান তার বাঘের মতো ক্ষিপ্রতায় এগিয়ে এসে মায়ার কোমর জড়িয়ে ধরল। এক হেঁচকায় মায়াকে টেনে নিজের বুকের মাঝে আছড়ে ফেলল।
"আ-আরিয়ান! তুমি... তুমি এখানে? দোতলায় বেয়ে কীভাবে উঠলে? তুমি পাগল হয়ে গেছ?" মায়া থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে ফিসফিস করে বলল।
"হ্যাঁ, পাগল হয়ে গেছি! তোর জন্য পাগল হয়ে গেছি, মায়া!" আরিয়ানের গলা থমথমে, তার চোখ দুটো যেন গিলে খাবে মায়াকে।
আরিয়ানের নজর গেল মেঝেতে পড়ে থাকা চিঠিটার দিকে। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিষাদময় হাসি। "অবশেষে পড়ার সময় হলো মহারানীর? সাতটা বছর লেগে গেল আমার অনুভূতির মূল্য বুঝতে?"
"আরিয়ান... আমাকে ক্ষমা করে দাও..." মায়া হাউমাউ করে কেঁদে উঠল, তার দু'হাত আরিয়ানের ভেজা শার্ট চেপে ধরল। "আমি জানতাম না! আমি ভাবতাম তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গেছ! আমি বুঝতে পারিনি..."
আরিয়ান মায়ার কথা শেষ করতে দিল না। সে মায়ার মুখে হাত চাপা দিল। তার আঙুলের উষ্ণতা মায়ার ঠোঁট স্পর্শ করতেই মায়ার শরীরের ভেতর দিয়ে বিদ্যুত তরঙ্গ বয়ে গেল।
"ক্ষমা?" আরিয়ান নিচু স্বরে গর্জে উঠল, "সাতটা বছর আমি তোকে ছাড়া এক একটা রাত নরক যন্ত্রণা ভোগ করেছি, মায়া! প্রতিটা রাতে তোকে বুকে জড়ানোর জন্য ছটফট করেছি। আর তুই... তুই অন্য একজনের সাথে বিয়ের পিরিতে বসতে যাচ্ছিস?"
আরিয়ান মায়াকে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে চেপে ধরল। তার শরীরের সমস্ত ভার আর উত্তাপ মায়ার ওপর চাপিয়ে দিল। মায়াও আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। অপরাধবোধ, ক্ষোভ আর সাত বছরের চেপে রাখা ভালোবাসার আগ্নেয়গিরি এক নিমেষে ফেটে পড়ল।
"আমি অন্য কারো নই, আরিয়ান! আমি শুধুই তোমার!" মায়া আরিয়ানের গলার পেছনে হাত রেখে তাকে নিজের দিকে টেনে নিল।
সেই মুহূর্তে তাদের দুজনের মাঝে কোনো দূরত্ব অবশিষ্ট রইল না। আরিয়ানের শক্ত ঠোঁট দুটো মায়ার ঠোঁটের ওপর আছড়ে পড়ল এক অনিয়ন্ত্রিত ঝড়ের মতো। এবারের চুমুটা কেবল আকুলতার ছিল না, ছিল অধিকার আদায়ের গভীর ও তীব্র এক পেষণ। আরিয়ান মায়ার ভেতরের সমস্ত মধু শুষে নিতে লাগল অতি অসভ্যভাবে। মায়াও নিজের শরীরটাকে সঁপে দিল সেই উদাম উন্মাদনায়।
আরিয়ানের এক হাত মায়ার শাড়ির আঁচল সরিয়ে দিল। তার গরম স্পর্শ মায়ার উন্মুক্ত নাভি আর কোমরের খাঁজে ছড়িয়ে পড়ল। মায়ায় বুকটা কামনার তাপে ওঠানামা করছিল। আরিয়ানের ঠোঁট মায়ার ঠোঁট ছেড়ে নেমে এল তার থুতনি, গলার নিচে, এবং স্তনবৃন্তের ওপর শাড়ির ওপর দিয়েই তার কামড় বসাল।
"উফফ... আরিয়ান!" মায়া সুখে আর যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল। সে তার নখ দিয়ে আরিয়ানের পিঠ চেপে ধরল।
আরিয়ান মায়াকে কোলে তুলে নিয়ে সোজা বিছানায় শুইয়ে দিল। মায়ার ওপর সে নিজের ভারী শরীরটা নিয়ে ঝুঁকে পড়ল। বৃষ্টিধারার তোড়ের মতো আরিয়ানের চুমু আর স্পর্শ মায়ার শরীরের প্রতিটা কোণায় ছড়িয়ে পড়তে লাগল। মায়ার শাড়ি আর ব্লাউজের বাঁধন আরিয়ানের চতুর হাতের ছোঁয়ায় আলগা হয়ে গেল।
অন্ধকার ঘরে বাইরে বিদ্যুতের আলো ক্ষণে ক্ষণে তাদের দুটো খালি ও কামার্ত শরীরকে আলোকিত করে তুলছিল। আরিয়ানের বুকের পশম মায়ার নরম বুকের চামড়ায় ঘষা খেয়ে এক আসুরিক অনুভূতির জন্ম দিচ্ছিল। আরিয়ান মায়ার পেটে, উরুর ভাঁজে তার উত্তপ্ত মুখ ডুবিয়ে দিল। মায়া দু দুহাতে বিছানার চাদর খামচে ধরল, তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে অস্পষ্ট গোঙানির শব্দ।
"তুই শুধুই আমার, মায়া... এই শরীর, এই নিঃশ্বাস সব আমার!" আরিয়ান ফিসফিস করে বলল, তার ঠোঁট মায়ার নাভির ওপর গভীর থেকে গভীরতর স্পর্শ দিয়ে যাচ্ছে।
"হ্যাঁ... আরিয়ান... আমি তোমার... শুধুই তোমার..." মায়া নিজের সবটুকু সমর্পণ করে দিল সেই গভীর অনুরাগের দাবানলে।
দীর্ঘ সাত বছরের বিরহ এক তীব্র, মাতাল করা রতিসুখে রূপ নিল। ঘরে শুধু তাদের দুজনের দ্রুত শ্বাসের শব্দ, চামড়ায় চামড়া ঘষা লাগার সুতীব্র সুর আর বাইরের মুষলধারে বৃষ্টির তাণ্ডব। তারা দুজন যেন ভুলে গেল কাল কী হতে চলেছে, ভুলে গেল সমাজের নিয়ম-কানুন। সেই রাতে তারা শুধু বেঁচে রইল একে অপরের তৃষ্ণার্ত শরীরে।
ভোরের আবছা আলো যখন জানালার পর্দা চুইয়ে ভেতরে ঢুকল, মায়া চোখ মেলল। সে দেখল সে আরিয়ানের চওড়া বুকের ওপর মাথা রেখে শুয়ে আছে। আরিয়ানের এক হাত এখনও তার কোমর শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে আছে, যেন একটু আলগা করলেই সে হারিয়ে যাবে।
কিন্তু সুখের এই মায়াজাল স্থায়ী হলো না।
হঠাৎ নিচে সোরগোল শোনা গেল। দরজা ধাক্কানোর বিকট শব্দ!
"মায়া! মায়া দরজা খোল! তানভীরের বাড়ির লোক চলে এসেছে, আজই তোদের আকদ আর রুকসতী একসাথে হবে! তাড়াতাড়ি কর!" নিচে থেকে মায়ার মায়ের চিৎকার শোনা গেল।
মায়ায় বুকের ভেতরটা বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে গেল। সে আরিয়ানের দিকে তাকাল। আরিয়ানের চোখেও ঘুম ভাঙার পর সেই একই কঠোরতা আর অস্থিরতা।
আজই তবে সেই চূড়ান্ত পরীক্ষা? মায়া কীভাবে এই বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করবে, নাকি আরিয়ান আবার তাকে ছিনিয়ে নেবে?
মায়ের গলার আওয়াজ শুনে মায়ার পুরো শরীর হিম হয়ে গেল। বিছানা থেকে দ্রুত উঠে বসতে গিয়ে সে বুঝতে পারল তার গা উন্মুক্ত, সারা শরীরে আরিয়ানের গভীর স্পর্শের লালচে দাগ ফুটে আছে। সে দ্রুত শাড়িটা গায়ে জড়িয়ে নিল।
আরিয়ান বিছানায় উঠে বসেছে। তার চোখের মনি দুটো এখনও কামনায় আর ক্ষোভে লাল। সে ধীরপায়ে মায়ার কাছে এসে দাঁড়াল, হাত বাড়িয়ে মায়ার থুতনিটা ওপরে তুলল।
"ওদের বলে দে, তুই এই বিয়ে করবি না," আরিয়ানের কণ্ঠস্বরে কোনো তোতলামি নেই, আছে ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা।
"আরিয়ান, তুমি বোঝো না কেন? হুট করে এভাবে না বললে আমার বাবার সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে! তানভীর ভাইদের পরিবার অত্যন্ত সম্মাননীয়..." মায়ার চোখে আকুল জল।
আরিয়ান মায়াকে এক টানে কাছে টেনে নিয়ে তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, "সম্মান? কাল রাতে যখন তুই আমার বুকের ওপর নিজের নিঃশ্বাস বিসর্জন দিচ্ছিলি, তখন ওই সম্মানের কথা মনে ছিল না? কাল রাতের পর তুই যদি অন্য কারো ঘরে যাস, তবে মায়া... আমি নিজেকে আর তোকে—দুটোকেই শেষ করে দেব।"
আরিয়ানের চোখে এক ভয়াবহ উন্মাদনা দেখে মায়ায় বুক কেঁপে উঠল। সে জানে, আরিয়ান যা বলে, তা করতে পারে।
"তুমি এখন যাও, আরিয়ান। দয়া করে জানালা দিয়ে নেমে যাও। আমি... আমি সব সামলে নেব," মায়া অনুনয় করল।
আরিয়ান মায়ার ঠোঁটে শেষবারের মতো একটা গভীর, অধিকারবোধের চুমু এঁকে দিল। তারপর এক নিমেষে খোলা জানালা দিয়ে কদম গাছের ডাল ধরে গা ঢাকা দিল রাতের আবছায়াতে।
নিচে নেমে মায়া দেখল তুলকালাম কাণ্ড।
ড্রয়িংরুমে বসে আছেন পাত্র তানভীর এবং তার বাবা-মা। সাথে মায়ার বাবা, মা এবং অন্যান্য আত্মীয়রা। মায়ার উপস্থিতি টের পেয়ে তানভীর উঠে দাঁড়াল। তানভীর দেখতে বেশ মার্জিত, কিন্তু তার চোখে আজ কেমন এক সন্দেহ আর বিরক্তির ছাপ।
মায়ার বাবা গম্ভীর গলায় বললেন, "মায়া, এখানে বোসো। তানভীরের বাবা একটা বিশেষ কথা বলতে এসেছেন।"
মায়া কোনোমতে গিয়ে সোফায় বসল। তার হাত দুটো শাড়ির আঁচলের ভেতর শক্ত হয়ে জড়ো করা।
তানভীরের বাবা খুকখুক করে কেশে বললেন, "দেখুন বেয়াই সাহেব, আমরা সম্মানী মানুষ। কিন্তু কাল রাতে আপনার বাড়ির বারান্দায় আর পরে ওপরের ঘরে যে দৃশ্য আমাদের লোক দেখেছে... তা দেখার পর এই বিয়ে হওয়া সম্ভব নয়।"
পুরো ঘরে যেন বজ্রপাত হলো!
মায়ার বাবা স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। "মানে? আপনি কী বলছেন এসব?"
"সোজা কথায়, আপনার মেয়ে অন্য কারো সাথে লিপ্ত," তানভীরের বাবা বিষোদ্গার করে উঠলেন। "কাল রাতে আরিয়ান নামের ছেলেটি আপনার মেয়ের ঘরে ঢুকেছিল। শুধু তাই নয়, সারা রাত সে ওখানেই ছিল। এমন এক কলঙ্কিত মেয়েকে আমার ছেলের বউ করে নেওয়া সম্ভব নয়।"
মায়ার মায়ের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। তিনি মায়ার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, "মায়া! এসব কী শুনছি? বল, এরা মিথ্যা বলছে!"
মায়া মাথা নিচু করে রইল। তার চোখ দিয়ে অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু মুখে কোনো অস্বীকার নেই। সে মিথ্যা বলতে পারবে না। কাল রাতের প্রতিটি মুহূর্ত তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যি, তার ভালোবাসার চরম আত্মপ্রকাশ।
"তুমি চুপ করে আছ কেন, মায়া?" মায়ার বাবা ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লেন, তার হাত বুকের ওপর চলে গেল। "আমার মুখটা এভাবে পোড়ালি তুই? ওই ছেলের জন্য?"
ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমের দরজায় এসে দাঁড়াল এক দীর্ঘদেহী পুরুষ। আরিয়ান!
তার পরনে এখন পরিচ্ছন্ন পাঞ্জাবি, চুল আঁচড়ানো। সে সটান ভেতরে ঢুকে এসে দাঁড়াল মায়ার বাবার সামনে। তারপর সোজা হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল মায়ার বাবার পায়ের কাছে।
"চাচাজী," আরিয়ানের কণ্ঠে এখন কোনো অহংকার নেই, আছে বুকফাটা অনুনয়। "সব দোষ আমার। মায়াকে দয়া করে ভুল বুঝবেন না।"
সবাই স্তম্ভিত হয়ে গেল।
আরিয়ান হাতের পকেট থেকে বের করল একটা পুরোনো চিঠি এবং কিছু চেকে লেখা দলিল। সে সেগুলো মায়ার বাবার দিকে বাড়িয়ে দিল।
"সাত বছর আগে আমি আপনাদের ছেড়ে পালিয়ে যাইনি, চ্যাচাজী। আমার বাবার দেনা মেটাতে আর মায়াকে নিজের করে পাওয়ার উপযুক্ত হতে আমি প্রবাসে রক্ত জল করেছি। কিন্তু মায়া ভুল বুঝে চিঠিটা খোলেনি। কাল রাতে আমি ওর ঘরে গিয়েছিলাম শুধুই আমার অধিকার ভিক্ষা চাইতে। মায়া নিষ্পাপ, যা পাপ করার আমি করেছি। আপনারা যদি ওর বিয়ে অন্য কোথাও দিতে চান, তবে আমাকে খুন করে দিতে হবে। কারণ মায়াকে ছাড়া আমি বাঁচব না।"
আরিয়ানের চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল।
তানভীর কিছুক্ষণ চুপচাপ আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল। সে তার বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলল, "বাবা, চলো এখান থেকে। যে ভালোবাসায় এত তীব্রতা আর আত্মত্যাগ আছে, সেখানে আমার জোর করে ঢোকার কোনো অধিকার নেই।"
তানভীররা নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
ড্রয়িংরুমে তখন শ্মশানের নীরবতা। মায়ার বাবা চিঠিটা পড়লেন। সাত বছর আগের আরিয়ানের সেই লড়াইয়ের কথা, আর আজকের এই স্বীকারোক্তি—সবকিছু বৃদ্ধ বাবার হৃদয়কে স্পর্শ করল।
তিনি আরিয়ানের মাথায় হাত রাখলেন। "তুই... তুই এতদিন বলিসনি কেন রে আরিয়ান?"
"বলার সুযোগ পাইনি, চাচাজী। কিন্তু আজ বলছি—মায়াকে আমি আমার জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। আমাকে সুযোগ দিন, আমি ওকে সারাজীবন রাজরানীর মতো রাখব।"
মায়ার বাবা আরিয়ানের হাত ধরে তাকে তুলে দাঁড় করালেন। তারপর মায়ার হাতটা এনে আরিয়ানের শক্ত পটে ঢাকা হাতের ওপর রেখে দিলেন।
"যা ভুল হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। তোদের এই পাগল ভালোবাসাকে আর আলাদা করার সাধ্য আমার নেই।"
সন্ধ্যায় কাজি ডেকে সোজা আকদ করিয়ে দেওয়া হলো।
লাল বেনারসি আর সোনার গহনায় সাজানো মায়াকে যখন আরিয়ানের ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো, তখন বাইরে আবার হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
রুমের ভেতর শুধুই মোমবাতির আলো। আরিয়ান দরজা বন্ধ করে পেছনে এসে দাঁড়াল। সে মায়ার মাথার ঘোমটা সরিয়ে দিল। মায়ার মুখটা আজ লজ্জায় আর সুখে রক্তিভ।
আরিয়ান মায়াকে কোলে তুলে নিয়ে এক টানে বিছানায় ফেলে দিল। তার ওপর ঝুঁকে পড়ে সে মায়ার গালে, ঠোঁটে, আর উন্মুক্ত গলায় উদাম চুমু খেতে লাগল।
"অবশেষে তুই আমার, মায়াবতী," আরিয়ান মায়ার শাড়ির আঁচল সরিয়ে তার উন্মুক্ত বুকে মুখ গুঁজে দিল, তার নিশ্বাসের তাপে মায়ার সারা শরীর দোলা দিয়ে উঠল।
"আমি তো সবসময়ই তোমার ছিলাম, আরিয়ান... শুধু বুঝতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল," মায়া দু'হাতে আরিয়ানের গলা পেঁচিয়ে ধরে তাকে আরও গভীরে টেনে নিল।
সেই বৃষ্টিভেজা রাতে, লাল মোমবাতির মিষ্টি আলোয়, দুটো তৃষ্ণার্ত আত্মাও শরীর একাকার হয়ে গেল তাদের চিরন্তন ভালোবাসার বাঁধনে—যেখানে আর কোনো ভুল বোঝাবুঝি নেই, আছে শুধুই আজীবনের তীব্র অনুরাগ।
....