বিয়ের পর থেকেই রুদ্র আর মায়ার সংসারটা যেন একটা চলমান খেলার ময়দান। ঢাকার মিরপুরের ছোট্ট একটা ফ্ল্যাটে তাদের সংসার। রুদ্র সফটওয়্যার কোম্পানিতে চাকরি করে, মায়া একটা বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা। সকালে ঘুম থেকে উঠেই রুদ্রের দুষ্টুমি শুরু হয়।
একদিন সকালে মায়া চা বানাচ্ছিল। রুদ্র এসে পিছন থেকে হঠাৎ বলল, “চায়ের পানি কি আজকাল নদীর পানি দিয়ে বানাচ্ছো? এত ফ্যাকাশে কেন?” মায়া ঘুরে তাকিয়ে বলল, “তুমি নিজে বানিয়ে খাও।” রুদ্র হাসতে হাসতে বলল, “না না, তোমার হাতের চাই তো আমার প্রিয়। শুধু একটু মজা করলাম।” কিন্তু মায়ার মুখে রাগের ছাপ পড়ে গেল।
আরেকদিন মায়া স্কুল থেকে ফিরে এসে ফোন খুঁজতে লাগল। রুদ্র শান্তভাবে বসছিল। মায়া জিজ্ঞেস করল, “আমার ফোন কোথায়?” রুদ্র গম্ভীর মুখে বলল, “আমি তো দেখিনি।” মায়া বাসা জুড়ে খুঁজতে লাগল। এক ঘণ্টা পর রুদ্র হাসতে হাসতে বালিশের নিচ থেকে ফোন বের করে দিল। “একটু খুঁজে নাও, না হলে মজার কী?” মায়া রাগে ফোনটা নিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
এভাবেই চলছিল দিনের পর দিন। কখনো মায়ার চুলের ক্লিপ লুকিয়ে রাখা, কখনো ইচ্ছে করে মায়ার প্রিয় সিরিয়ালের সময় টিভি চ্যানেল বদলে দেওয়া, কখনো আবার মায়াকে ইচ্ছে করে দেরি করে বাসায় ফিরে এসে জিজ্ঞেস করা, “আজ কি বাজার করেছো? নাকি ভুলে গেছো?” মায়া প্রথমে হাসত, পরে রাগ করত, তারপর আবার মানিয়ে নিত। কিন্তু ভিতরে ভিতরে তার ধৈর্য চুপচাপ কমে যাচ্ছিল।
এক রাতে মায়া বিছানায় শুয়ে ভাবছিল। রুদ্র পাশের ঘরে অফিসের কাজ করছিল। মায়ার মনে হল, এভাবে আর চলবে না। রুদ্র তাকে সবসময় জ্বালায়, কিন্তু সে কখনো পাল্টা জ্বালায় না। আজকের দিনে সে সিদ্ধান্ত নিল—এবার সে নিজেই রুদ্রকে শিক্ষা দেবে। সে আর পাত্তা দেবে না। উল্টো রুদ্রকেই জ্বালাতে শুরু করবে।
পরের দিন সকালে মায়া ইচ্ছে করে চা বানাতে দেরি করল। রুদ্র অফিস যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে অপেক্ষা করছিল। মায়া ধীরে ধীরে রান্নাঘরে গিয়ে চাপাতা ফুটাতে লাগল। রুদ্র এসে বলল, “চা হয়নি এখনো?” মায়া উদাসীনভাবে বলল, “হবে। তুমি বসে থাকো।” রুদ্র অবাক হয়ে তাকাল। সাধারণত মায়া তাড়াতাড়ি চা দিয়ে দিত। আজ সে পাত্তাই দিচ্ছে না।
অফিস থেকে ফিরে রুদ্র দেখল মায়া ফোনে কথা বলছে। রুদ্র জিজ্ঞেস করল, “কার সঙ্গে কথা?” মায়া হাসতে হাসতে বলল, “বন্ধুর সঙ্গে। তোমার দরকার কী?” রুদ্র একটু অবাক হল। সাধারণত মায়া সবকিছু খুলে বলত। আজ সে ইচ্ছে করে গোপন রাখছে।
সন্ধ্যার পর রুদ্র টিভি দেখতে চাইল। মায়া রিমোট নিয়ে নিজের সিরিয়াল চালিয়ে দিল। রুদ্র বলল, “আমার ম্যাচ চলছে।” মায়া শান্তভাবে বলল, “আজ আমার সিরিয়াল। তুমি অন্য ঘরে গিয়ে দেখো।” রুদ্র চুপ করে গেল। প্রথমবার সে বুঝতে পারল যে মায়া পাল্টা খেলতে শুরু করেছে।
রাতের খাবারের সময় মায়া ইচ্ছে করে রুদ্রের প্রিয় মাছের তরকারি কম দিয়ে দিল। রুদ্র জিজ্ঞেস করল, “আমার পাতে কম কেন?” মায়া হেসে বলল, “আজ স্বাস্থ্যের কথা ভেবে কম দিলাম। তুমি তো বলতেই থাকো ওজন বাড়ছে।” রুদ্রের মুখ শুকিয়ে গেল। সে বুঝতে পারল খেলা এখন দুই দিকেই চলছে।
পরের কয়েকদিন ধরে মায়া ধীরে ধীরে তার পরিকল্পনা এগোতে লাগল। রুদ্র যখন ফোন লুকাতে চায়, মায়া আগে থেকেই ফোন লুকিয়ে রাখে। রুদ্র যখন চা নিয়ে মজা করে, মায়া ইচ্ছে করে চায়ে চিনি কম দিয়ে দেয়। রুদ্র যখন তাকে রাগাতে চায়, মায়া উল্টো হাসতে হাসতে তাকে পাত্তা না দিয়ে অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে যায়।
একদিন সকালে রুদ্র অফিস যাওয়ার আগে মায়াকে জিজ্ঞেস করল, “আজ দুপুরে কী রান্না করবে?” মায়া উদাসীনভাবে বলল, “যা মনে আসে। তুমি ভাবো না।” রুদ্র একটু থমকে গেল। সে বুঝতে পারল মায়া আর আগের মতো নয়। সে যেন একটা নতুন খেলা শুরু করেছে।
সেই রাতে রুদ্র বিছানায় শুয়ে ভাবছিল। মায়ার এই পরিবর্তন তার মনে লাগছিল। সে জানত সে নিজেই শুরু করেছে এই দুষ্টুমি। কিন্তু এখন মায়া যখন পাল্টা দিচ্ছে, তখন তার মনে একটা অদ্ভুত আনন্দও হচ্ছিল। সে ঠিক করল, সেও পিছিয়ে থাকবে না। মায়া যদি জ্বালাতে চায়, তবে সেও আরও বেশি জ্বালাবে।
এভাবেই শুরু হল তাদের নতুন খেলা। দুজনই একে অপরকে জ্বালাতে ব্যস্ত। কেউ পরাজয় মানতে রাজি নয়। বাসায় পরিবেশটা যেন একটু একটু করে বদলে যাচ্ছিল। কিন্তু কেউ এখনো বুঝতে পারেনি যে এই ঝগড়ার আড়ালে আসলে কী চলছে।
রুদ্রের মা একদিন ফোনে জিজ্ঞেস করল, “বাসায় সব ঠিকঠাক তো?” রুদ্র হেসে বলল, “হ্যাঁ মা, সব ঠিক।” কিন্তু সে জানত সব ঠিক নয়। বরং সবকিছু আরও জটিল হয়ে যাচ্ছে। মায়াও তার বান্ধবীকে ফোনে বলছিল, “আজকাল রুদ্রকে একটু শিক্ষা দিচ্ছি। দেখি সে কতটা সয়।”
দুজনের এই দুষ্টুমি ধীরে ধীরে বাড়তে লাগল। কেউ ছাড় দিতে চাইছে না। আর এই খেলার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল তাদের সম্পর্কের এক নতুন রং। কিন্তু সেই রং এখনো পরিবারের কারও চোখে পড়েনি।'
মায়ার পাল্টা আক্রমণ শুরু হওয়ার পর রুদ্র আরও উত্তেজিত হয়ে উঠল। সে ঠিক করল, এবার সে আরও সৃজনশীল হবে। একদিন সে মায়ার স্কুলের ব্যাগ থেকে একটা গুরুত্বপূর্ণ নোটবুক লুকিয়ে রাখল। মায়া সকালে বেরোনোর সময় খুঁজে না পেয়ে বিরক্ত হল। রুদ্র শান্তভাবে বলল, “হয়তো গতকাল কোথাও রেখেছো।” মায়া রাগে অফিস থেকে ফিরে এসে নোটবুক খুঁজে পেলে রুদ্রকে বলল, “তুমি লুকিয়েছিলে জানি।” রুদ্র হাসল শুধু।
মায়াও বসে থাকল না। সে রুদ্রের অফিসের ল্যাপটপের চার্জার লুকিয়ে রাখল। রুদ্র সকালে খুঁজে না পেয়ে বিরক্ত হয়ে বলল, “চার্জার কোথায়?” মায়া উদাসীনভাবে বলল, “আমি তো দেখিনি। তুমিই হয়তো কোথাও রেখেছো।” রুদ্রকে সেদিন অফিসে গিয়ে অন্যের চার্জার ধার করতে হল। সে বুঝতে পারল খেলা এখন সমানে সমান।
এক সপ্তাহ ধরে চলল এই লুকোচুরি। কখনো মায়ার প্রিয় শাড়ি লুকিয়ে রাখা, কখনো রুদ্রের মোজা জোড়া ভিন্ন জায়গায় রাখা। বাসার পরিবেশটা যেন একটা নীরব যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল। কিন্তু দুজনের চোখেই একটা লুকানো হাসি ছিল। কেউ হারতে চাইছে না।
একদিন সন্ধ্যায় রুদ্র বাসায় এসে দেখল মায়া রান্নাঘরে ব্যস্ত। সে ইচ্ছে করে মায়ার ফোন নিয়ে নিজের পকেটে রেখে দিল। মায়া ফোন খুঁজতে লাগল। রুদ্র শান্তভাবে বসে থাকল। মায়া জিজ্ঞেস করল, “ফোন দেখেছো?” রুদ্র বলল, “না।” মায়া খুঁজতে খুঁজতে একসময় রুদ্রের পকেট থেকে ফোন বের করে নিল। “এবার তোমার পালা,” সে শান্তভাবে বলল।
সেই রাতে মায়া রুদ্রের অফিসের আইডি কার্ড লুকিয়ে রাখল। পরের দিন সকালে রুদ্র খুঁজে না পেয়ে বিরক্ত হল। মায়া হেসে বলল, “হয়তো গতকাল কোথাও পড়ে আছে।” রুদ্রকে সেদিন অফিসে গিয়ে নতুন করে প্রবেশের অনুমতি নিতে হল। সে ফিরে এসে মায়াকে বলল, “তুমি খুব বেড়ে গেছো।” মায়া উত্তর দিল, “তুমি শুরু করেছো।”
দুজনের এই খেলা এখন পরিবারের অন্য সদস্যদের চোখেও পড়তে শুরু করেছে। রুদ্রের ছোট ভাই একদিন এসে দেখল দুজন একে অপরের সঙ্গে কথা বলছে না। সে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?” রুদ্র বলল, “কিছু না।” মায়াও বলল, “কিছু না।” কিন্তু পরিবেশটা টানটান।
মায়ার বান্ধবী একদিন বাসায় এসে দেখল মায়া রুদ্রকে পাত্তা দিচ্ছে না। সে মায়াকে জিজ্ঞেস করল, “তোমাদের কী হয়েছে?” মায়া হেসে বলল, “শুধু একটু খেলা চলছে।” বান্ধবী বুঝতে পারল না পুরোপুরি।
রুদ্র একদিন সিদ্ধান্ত নিল আরও এক ধাপ এগোবে। সে মায়ার স্কুলের প্রধান শিক্ষকের নম্বর সংগ্রহ করে একটা মজার মেসেজ পাঠাল মায়ার নামে। মেসেজে লেখা ছিল, “আজ স্কুলে আসব না, ব্যস্ত আছি।” মায়া স্কুলে গিয়ে জানতে পারল বিষয়টা। সে রাগে ফিরে এসে রুদ্রকে বলল, “তুমি এটা করেছো?” রুদ্র হাসতে হাসতে বলল, “হয়তো ভুলবশত।” মায়া সেদিন রাতে রুদ্রের অফিসের গুরুত্বপূর্ণ একটা ফাইল লুকিয়ে রাখল। রুদ্রকে পরের দিন অফিসে বিপদে পড়তে হল।
এভাবে খেলা বাড়তে বাড়তে একসময় দুজনের মধ্যে কথাবার্তাও কমে গেল। তারা একে অপরকে জ্বালাতে ব্যস্ত, কিন্তু ভিতরে ভিতরে দুজনই উপভোগ করছিল এই খেলা। রুদ্র মায়ার এই সাহস দেখে অবাক হচ্ছিল। মায়াও রুদ্রের জেদ দেখে মুগ্ধ হচ্ছিল। কিন্তু কেউ কাউকে জানাতে চাইছিল না।
এক রাতে রুদ্র মায়াকে বলল, “তুমি কি আমাকে আর ভালোবাসো না?” মায়া শান্তভাবে বলল, “ভালোবাসি। শুধু তোমাকে শিক্ষা দিচ্ছি।” রুদ্র হাসল। “তাহলে খেলা চলুক।”
পরের দিন থেকে খেলা আরও তীব্র হল। মায়া রুদ্রের প্রিয় খাবার ইচ্ছে করে না বানিয়ে অন্য কিছু বানাত। রুদ্র মায়ার প্রিয় সিরিয়ালের সময় ইচ্ছে করে অন্য চ্যানেল চালিয়ে দিত। দুজনই একে অপরের দুর্বল জায়গায় আঘাত করতে লাগল। কিন্তু আঘাতগুলোতে ব্যথা ছিল না, ছিল শুধু মজা।
রুদ্রের মা একদিন বাসায় এসে দেখল পরিবেশটা অদ্ভুত। সে জিজ্ঞেস করল, “তোমাদের মধ্যে কী হচ্ছে?” রুদ্র ও মায়া দুজনেই বলল, “কিছু না মা।” কিন্তু রুদ্রের মা বুঝতে পারল কিছু একটা চলছে। সে চুপ করে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।
মায়ার বাবা একদিন ফোনে জিজ্ঞেস করল, “সব ঠিক আছে তো?” মায়া বলল, “হ্যাঁ বাবা।” কিন্তু তার গলায় একটা অন্য রকম টোন ছিল।
দুজনের এই দুষ্টুমি এখন আর শুধু দুজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। পরিবারের সবাই ধীরে ধীরে লক্ষ্য করতে শুরু করেছে যে তাদের ঝগড়াগুলো আসলে ঝগড়া নয়। বরং এর আড়ালে অন্য কিছু আছে। কিন্তু কী আছে, তা এখনো কেউ পরিষ্কার করে বুঝতে পারেনি।
খেলা চলতেই থাকল। কেউ থামতে চাইছে না। আর এই না থামার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল তাদের ভালোবাসার এক নতুন প্রকাশ।
এক মাস ধরে চলা এই খেলার পর একদিন সকালে রুদ্রের মা হঠাৎ বাসায় এসে হাজির। তিনি দেখলেন রুদ্র ও মায়া একে অপরের সঙ্গে কথা বলছে না। রুদ্র চা খেয়ে অফিসে যাচ্ছে, মায়া রান্নাঘরে ব্যস্ত। পরিবেশটা শীতল।
রুদ্রের মা মায়াকে ডেকে বললেন, “কী হয়েছে তোমাদের?” মায়া একটু ইতস্তত করে বলল, “কিছু না।” রুদ্রও একই কথা বলল। কিন্তু রুদ্রের মা আর বিশ্বাস করলেন না। তিনি দুজনকে বসালেন।
“আমি দেখছি তোমরা একে অপরকে জ্বালাচ্ছো। কিন্তু তোমাদের চোখে হাসি আছে। এটা ঝগড়া নয়। এটা অন্য কিছু।” রুদ্র ও মায়া দুজনেই চুপ করে গেল।
সেই দিন বিকেলে রুদ্রের ছোট ভাই ও মায়ার বান্ধবীও বাসায় এল। সবাই মিলে আলোচনা শুরু করল। রুদ্রের ভাই বলল, “দাদা, তুমি মায়াকে এত জ্বালাও কেন?” রুদ্র হেসে বলল, “মজা করি শুধু।” মায়ার বান্ধবী বলল, “মায়াও এখন পাল্টা দিচ্ছে। এটা তো দেখে মনে হচ্ছে তোমরা দুজনেই উপভোগ করছো।”
রুদ্রের মা হাসলেন। “আমি বুঝেছি। তোমাদের এই ঝগড়ার আড়ালে আসলে ভালোবাসা লুকিয়ে আছে। তোমরা একে অপরকে জ্বালিয়ে আসলে একে অপরের প্রতি মনোযোগ বাড়াচ্ছো।”
মায়া একটু লজ্জা পেয়ে বলল, “আমি শুধু তাকে শিক্ষা দিতে চেয়েছিলাম।” রুদ্র বলল, “আমিও শুধু মজা করছিলাম। কিন্তু এখন দেখি তুমিও কম যাও না।”
সবাই হেসে উঠল। রুদ্রের মা বললেন, “এখন থামো। নয়তো বাসার পরিবেশ নষ্ট হবে।” কিন্তু রুদ্র ও মায়া দুজনেই জানত থামবে না। খেলা চলবে, শুধু এবার একটু নরমভাবে।
সেই রাতে রুদ্র ও মায়া একা হলে রুদ্র বলল, “তুমি আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছো।” মায়া হেসে বলল, “তুমিও আমাকে। এখন থেকে সমানে সমান।” রুদ্র মায়ার হাত ধরে বলল, “খেলা চলুক। কিন্তু এবার পরিবারকে আর চিন্তায় ফেলব না।”
পরের দিন থেকে তাদের দুষ্টুমি একটু বদলে গেল। রুদ্র এখনো মায়ার ফোন লুকাত, কিন্তু লুকিয়ে রাখার পর নিজেই খুঁজে দিত। মায়া এখনো রুদ্রের চার্জার লুকাত, কিন্তু পরে নিজেই এগিয়ে দিত। তাদের খেলা এখন আর যুদ্ধ নয়, বরং একটা মজার খেলা হয়ে উঠেছিল।
একদিন সন্ধ্যায় পুরো পরিবার একসঙ্গে বসেছিল। রুদ্র ইচ্ছে করে মায়ার চায়ে চিনি বেশি দিয়ে দিল। মায়া খেয়ে বলল, “অতিরিক্ত মিষ্টি।” রুদ্র হাসল। মায়াও পাল্টা রুদ্রের পাতে অতিরিক্ত লঙ্কা দিয়ে দিল। রুদ্র খেয়ে কাশতে লাগল। সবাই হেসে উঠল।
রুদ্রের মা বললেন, “দেখো, এখন বুঝতে পারছি। তোমাদের এই ঝগড়া আসলে ভালোবাসার একটা অংশ।” মায়ার বাবা ফোনে শুনে বললেন, “ভালো আছে। তোমরা এভাবেই থাকো। শুধু অতিরিক্ত করো না।”
রুদ্র ও মায়া দুজনেই বুঝতে পারল তাদের খেলা পরিবারের সবাই এখন উপভোগ করছে। কেউ আর চিন্তিত নয়। বরং সবাই জানে এই দুষ্টুমির আড়ালে আছে গভীর ভালোবাসা।
এক রাতে রুদ্র মায়াকে বলল, “তুমি আমার জীবনের সেরা খেলোয়াড়।” মায়া উত্তর দিল, “তুমিও। এখন থেকে আমরা একসঙ্গে খেলব।” রুদ্র মায়াকে জড়িয়ে ধরল। তাদের সংসারে আবার শান্তি ফিরে এল। কিন্তু শান্তির মধ্যেও রইল সেই দুষ্টুমি। কখনো চা নিয়ে মজা, কখনো ফোন লুকানো, কখনো ইচ্ছে করে রাগানো। শুধু এবার দুজনেই জানে এটা শুধু খেলা। আর পরিবারও জানে এই খেলার আড়ালে আছে তাদের অটুট বন্ধন।
মিরপুরের সেই ছোট্ট ফ্ল্যাটে দুজনের সংসার এখন আরও রঙিন। প্রতিদিন নতুন কোনো দুষ্টুমি, প্রতিদিন নতুন কোনো হাসি। আর সবাই বুঝে গেছে—এই ঝগড়ার আড়ালে অন্য কিছু নয়, শুধু অপার ভালোবাসা।
কয়েকদিন পর এক সন্ধ্যায় রুদ্র অফিস থেকে ফিরে এসে দেখল মায়া রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে আছে। সে ইচ্ছে করে মায়ার কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, “আজকের চায়ের পানি আবার নদীর?” মায়া ঘুরে তাকিয়ে হাসল। “তুমি নিজে বানিয়ে খাও।” রুদ্র হাসতে হাসতে চায়ের কাপ নিয়ে বসল। মায়াও পাশে এসে বসল। দুজনেই জানে, খেলা থামেনি। শুধু এবার খেলাটা আরও মিষ্টি হয়ে উঠেছে।
রুদ্রের ছোট ভাই একদিন মেসেজ করে জিজ্ঞেস করল, “দাদা, এখনো খেলা চলছে?” রুদ্র উত্তর দিল, “চলছে। কিন্তু এবার দুজনেই জিতে যাচ্ছি।” মায়ার বান্ধবীও ফোনে বলল, “তোর স্বামীকে এতদিনে শেষ করে ফেললি?” মায়া হেসে বলল, “না। ওকে শেষ করলে আমার খেলা কী করে চলবে?”
এক রাতে ঝড়ের শব্দ ছাড়াই শান্ত আকাশের নিচে দুজনে ছাদে বসেছিল। রুদ্র মায়ার কাঁধে মাথা রেখে বলল, “তুমি যদি পাল্টা না দিতে, তাহলে হয়তো আমি আরও বেড়ে যেতাম।” মায়া বলল, “আমি জানতাম তুমি কম যাবে না। তাই নিজেই নেমে পড়েছিলাম।” দুজনেই হাসল।
পরিবারের সবাই এখন নিশ্চিন্ত। রুদ্রের মা মাঝে মাঝে ফোন করে শুধু জিজ্ঞেস করেন, “খেলা কেমন চলছে?” রুদ্র উত্তর দেয়, “ভালো চলছে মা।” মায়ার বাবাও মাঝে মাঝে বলেন, “মেয়েকে বেশি জ্বালিয়ো না।” রুদ্র হাসিয়ে বলে, “ও আমাকেই বেশি জ্বালায়।”
বাসার প্রতিটা কোণ এখন তাদের মজার সাক্ষী। কখনো লুকানো ফোন, কখনো এলোমেলো মোজা, কখনো অতিরিক্ত মরিচের তরকারি—সবকিছুই এখন তাদের ভালোবাসার ছোট ছোট চিহ্ন। কেউ আর ভুল করে ঝগড়া ভেবে চিন্তিত হয় না। সবাই জানে, এই দুষ্টুমির আড়ালে আছে দুজন মানুষের গভীর বোঝাপড়া আর অটুট টান।
একদিন সকালে মায়া রুদ্রকে চা দিয়ে বলল, “আজকের চা ঠিকমতো বানিয়েছি। মজা করো না।” রুদ্র চুমুক দিয়ে বলল, “মজা না করলে তো ভালোবাসা কমে যাবে।” মায়া হাসল। রুদ্রও হাসল। তাদের সংসারের এই খেলা এখন আর শেষ হওয়ার নয়। শুধু বদলে গেছে খেলার নিয়ম—এবার দুজনেই জেতার জন্য খেলে, হারার জন্য নয়।
মিরপুরের সেই ফ্ল্যাটে প্রতিদিন নতুন কোনো দুষ্টুমি জন্ম নেয়। আর প্রতিদিনই পরিবারের সবাই হাসে। কারণ তারা সবাই বুঝে গেছে—রুদ্র আর মায়ার এই ঝগড়ার আড়ালে অন্য কিছু নেই। আছে শুধু একটা অদ্ভুত, মজার, আর অপার ভালোবাসা।
....