রাইমা যখন নতুন বাড়িতে উঠল, তখন তার মনে হয়েছিল জীবনটা একটু শান্ত হবে। ঢাকার এক শান্ত আবাসিক এলাকায় বাবা-মায়ের নতুন ফ্ল্যাট। চার তলার ভবন, নিচে একটুখানি উঠোন, পাশে আরও কয়েকটা বাড়ি। রাইমার বয়স বাইশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষ। পড়াশোনার চাপ, নতুন পরিবেশ—সব মিলিয়ে সে একটু বিরক্তই ছিল। কিন্তু পাশের বাড়ির ছেলে সাম্য তাকে আরও বিরক্ত করে তুলল।
সাম্যের বয়স চব্বিশ। লম্বা, রোগা চেহারা, চোখে একটা চিরকালীন হাসি। রাইমা প্রথম দিনই দেখেছিল তাকে। সিঁড়িতে উঠতে গিয়ে দেখে সাম্য নিচের ফ্লোরের সামনে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে। চোখ পড়তেই সাম্য হাসল।
“নতুন পড়শি?”
রাইমা মাথা নাড়ল শুধু। কথা বলতে চায়নি। কিন্তু সাম্য থামল না।
“নাম কী?”
“রাইমা।”
“সাম্য। পাশের বাড়ি। কিছু দরকার হলে বলবেন।”
রাইমা ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। মনে মনে বলল, দরকার হবে না।
কিন্তু দরকার হয়ে গেল খুব তাড়াতাড়ি। পরের দিন সকালে রাইমা রান্নাঘরে চা বানাতে গিয়ে দেখে গ্যাসের সিলিন্ডার শেষ। বাবা অফিসে, মা বাজারে। রাইমা সিঁড়ি দিয়ে নামতে গেল দোকানে। সিঁড়ির মাঝামাঝি দেখে সাম্য দাঁড়িয়ে আছে।
“কোথায় যাচ্ছেন এত সকালে?”
“গ্যাস।”
“আমার বাসায় আছে একটা। নিয়ে যান।”
“না লাগবে না।”
সাম্য হাসল। “অহংকার করবেন না। গ্যাস শেষ হলে চা হবে না। চা ছাড়া সকাল কাটে?”
রাইমা চুপ করে দাঁড়াল। সাম্য ইতিমধ্যে বাসায় ঢুকে একটা সিলিন্ডার নিয়ে এল। রাইমা নিতে চাইল না। সাম্য সিলিন্ডারটা তার হাতে গুঁজে দিয়ে বলল, “পরে ফেরত দিয়েন। আর হ্যাঁ, চা বানালে এক কাপ আমার জন্যও।”
রাইমা রাগ করে সিলিন্ডার নিয়ে উঠে গেল। চা বানাল, কিন্তু সাম্যকে ডাকেনি। দুপুরে দেখে সিলিন্ডারের জায়গায় একটা নোট পড়ে আছে দরজার নিচে। “চা-টা খেয়ে নিলাম। খুব মিষ্টি হয়েছে। পরেরবার কম চিনি দিয়েন।”
রাইমা নোটটা ছিঁড়ে ফেলল।
সেদিন থেকে শুরু হল। সাম্য সারাক্ষণ তার সঙ্গে দুষ্টুমি করে। রাইমা যখন ছাদে কাপড় শুকায়, সাম্য নিচ থেকে চিৎকার করে বলে, “কাপড়টা উল্টে দিয়েন, না হলে শুকবে না।” রাইমা যখন বিকেলে বই নিয়ে বসে, সাম্য ব্যালকনিতে এসে গিটার বাজায় জোরে। রাইমা যখন দোকানে যায়, সাম্যও যায়। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে ঝগড়া বাধায়। একদিন পার্কিং নিয়ে। রাইমার বাবার গাড়ি একটু এদিক-ওদিক পার্ক করায় সাম্য এসে বলে, “ভাইয়া, একটু সোজা করে রাখেন। আমার বাইক বেরোতে অসুবিধা হয়।” রাইমা শুনে রেগে বলে, “আপনার বাইক আপনার সমস্যা।” সাম্য হেসে বলে, “আপনার রগ চড়ে গেছে দেখছি।”
রাইমা তাকে একদম সহ্য করতে পারে না। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হল, রাইমা যখনই বিপদে পড়ে, কেউ না কেউ তাকে সাহায্য করে। অদৃশ্যভাবে।
একদিন সন্ধ্যায় রাইমা বাজার থেকে ফিরছিল। হাতে ভারী ব্যাগ। হঠাৎ বৃষ্টির কোনো চিহ্ন ছিল না, কিন্তু রাস্তায় একটা কুকুর এসে তার সামনে দাঁড়াল। রাইমা ভয় পেল। কুকুরটা গজগজ করতে লাগল। ঠিক তখনই কেউ পেছন থেকে এসে কুকুরটাকে তাড়িয়ে দিল। রাইমা পেছন ফিরে দেখল কেউ নেই। শুধু রাস্তার মোড়ে একটা ছায়া মিলিয়ে গেল।
আরেকদিন রাতে রাইমার ঘরের বাতি নষ্ট হয়ে গেল। সে মোমবাতি জ্বালিয়ে বসেছিল। হঠাৎ দরজার নিচে একটা নতুন বাল্ব পড়ে থাকতে দেখল। কে রেখে গেল জানে না।
আরেকদিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরে দেখে তার সাইকেলের টায়ার ফ্ল্যাট। সে বিরক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিছুক্ষণ পর দেখে সাইকেলটা ঠিক করা। পাশে একটা নোট—“পরেরবার সাবধানে চালাবেন।”
রাইমা বুঝতে পারছিল না কে এসব করছে। সাম্য? কিন্তু সাম্য তো সবসময় তাকে বিরক্ত করে। সে কি এমন মানুষ?
একদিন দুপুরে রাইমা ছাদে গিয়েছিল কাপড় তুলতে। হঠাৎ তার পা পিছলে গেল। সে প্রায় পড়ে যেত। ঠিক তখনই কেউ পেছন থেকে তার কোমর ধরে টানল। রাইমা ঘুরে দাঁড়াল। সাম্য।
“সাবধানে।” সাম্যের গলায় হাসি নেই এবার। “এখানে পানি পড়ে থাকে। পিছলে যেতে পারে।”
রাইমা তার হাত সরিয়ে নিল। “আপনি কেন এখানে?”
“আমার মায়ের কাপড় তুলতে এসেছি।” সাম্য হাসল আবার। “আর আপনাকে পড়তে দেখে ধরে ফেললাম।”
রাইমা চলে গেল। কিন্তু সেদিন রাতে তার ঘুম এল না। সাম্যের হাতের ছোঁয়া তার কোমরে এখনও অনুভব করছিল। গরম। শক্ত। তার হৃদয়টা অদ্ভুতভাবে দুর্বল হয়ে গিয়েছিল।
পরের কয়েকদিন সাম্য আরও বেশি করে তাকে খোঁচা দিতে লাগল। রাইমা যখন পড়তে বসে, সাম্য এসে বলে, “এত পড়ে কী হবে? একটু হাঁটতে যান।” রাইমা যখন রান্না করে, সাম্য বলে, “ঝাল কম হয়েছে।” রাইমা রেগে যায়। কিন্তু রাতে যখন তার ঘরের জানালার কাছে একটা গোলাপ দেখে, তখন তার মন খারাপ হয়ে যায়। কে রেখে গেল?
একদিন সকালে রাইমা বাজার যেতে গিয়ে দেখে তার পার্স নেই। সে আতঙ্কিত হয়ে বাসায় ফিরে এল। পার্সে টাকা, আইডি কার্ড সব। সে কাঁদতে কাঁদতে খুঁজছিল। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। সাম্য দাঁড়িয়ে। হাতে তার পার্স।
“রাস্তায় পড়ে ছিল। চিনতে পেরে নিয়ে এলাম।”
রাইমা পার্স নিল। “ধন্যবাদ।”
সাম্য হাসল। “এবার তো ধন্যবাদ পেলাম। আগে তো শুধু রগ চড়াতেন।”
রাইমা দরজা বন্ধ করে দিল। কিন্তু তার হাত কাঁপছিল। সাম্যের চোখের দিকে তাকাতে পারেনি। সেই চোখে কিছু ছিল। কিছু গভীর।
সেদিন বিকেলে রাইমা ছাদে গিয়েছিল। সাম্যও এল। দুজনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। সূর্য ডুবছিল। আকাশ লাল।
“আপনি আমাকে পছন্দ করেন না।” সাম্য হঠাৎ বলল।
রাইমা ঘুরে তাকাল। “কেন বলছেন?”
“চোখে দেখা যায়। আমি আপনাকে বিরক্ত করি। কিন্তু আমি চাই না আপনি বিপদে পড়েন।”
রাইমা কিছু বলল না। সাম্যের কথায় তার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল। সে জানত না কেন। সাম্যের গায়ের গন্ধ তার নাকে এল। সাবানের গন্ধ। পরিষ্কার। তার শরীরটা গরম হয়ে উঠল।
সাম্য এক পা এগিয়ে এল। “রাইমা।”
নামটা তার মুখে কেমন শোনাল। গভীর। নরম।
রাইমা পিছিয়ে গেল। “আমাকে একা থাকতে দিন।”
সে দৌড়ে নিচে নেমে গেল। রাতে তার ঘুম এল না। সাম্যের চোখ, সাম্যের হাত, সাম্যের গলা—সব মিলে তার শরীরে এক অদ্ভুত আগুন জ্বলে উঠল। সে জানত না এটা কী। কিন্তু সে জানত, সাম্যকে সে সহ্য করতে পারে না। আর সেটাই তার সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
পরের দিন সকালে রাইমা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দেখল সাম্য নিচে বাইক পরিষ্কার করছে। তার হাতের শিরাগুলো দেখা যাচ্ছিল। ঘামে ভিজে শার্ট শরীরের সঙ্গে লেগে আছে। রাইমার গলা শুকিয়ে গেল। সে জানালার পর্দা টেনে দিল। কিন্তু তার মন পর্দার ওপারেই রয়ে গেল।
সেই রাতে কেউ তার দরজার নিচে একটা চকলেট রেখে গেল। সঙ্গে নোট—“মিষ্টি খেয়ে রাগ কমান।”
রাইমা চকলেটটা খেল। আর কেঁদে ফেলল। সে বুঝতে পারছিল না কেন কাঁদছে। সাম্যের জন্য? নাকি নিজের জন্য?
তিন দিন পর এক ঘটনা ঘটল যা সবকিছু বদলে দিল।
রাইমা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরছিল। রাস্তায় হঠাৎ একটা মোটরসাইকেল দ্রুত বেগে এসে তার কাছাকাছি চলে এল। রাইমা ভয় পেয়ে পথের ধারে সরে গেল। কিন্তু পা পিছলে সে প্রায় নর্দমায় পড়ে যেত। ঠিক তখনই কেউ তাকে জোরে টেনে ধরল। রাইমা চোখ খুলে দেখল সাম্য। তার বুকে মাথা রেখে সে দাঁড়িয়ে আছে। সাম্যের হাত তার কোমরে শক্ত করে জড়ানো। দুজনের শরীর লেগে আছে। রাইমার হৃদয় দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছিল। সাম্যের বুকের ধুকধুকানিও সে শুনতে পাচ্ছিল।
“ঠিক আছে?” সাম্যের গলা কেঁপে উঠল।
রাইমা মাথা তুলে তাকাল। তাদের চোখ মিলল। এত কাছে। সাম্যের ঠোঁটের কাছে তার নিশ্বাস। রাইমার শরীর জ্বলে উঠল। সে সরতে পারছিল না। সাম্যও সরছিল না।
কিছুক্ষণ পর সাম্য হাত সরাল। “সাবধানে হাঁটবেন।”
রাইমা কিছু না বলে হেঁটে চলে গেল। কিন্তু সেদিন রাতে তার ঘুম এল না। সাম্যের হাতের ছোঁয়া, তার গরম শরীর, তার চোখ—সব মিলে তার শরীরে এক অসহ্য আগুন জ্বলে উঠেছিল। সে জানত, এখন আর সে সাম্যকে শুধু বিরক্তিকর প্রতিবেশী ভেবে পারবে না।
কিছু একটা বদলে যাচ্ছিল। আর সেটা থামানো যাচ্ছিল না।
রাইমার মনে হচ্ছিল সে এক অদ্ভুত ফাঁদে পা দিয়েছে। সাম্যকে সে সহ্য করতে পারে না—এটা সে নিজেকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু রাতের পর রাত তার ঘুম নষ্ট হচ্ছিল। সাম্যের হাতের ছোঁয়া তার শরীরে লেগে ছিল। সেই দিন রাস্তায় যখন সাম্য তাকে ধরেছিল, তাদের শরীর এত কাছে চলে এসেছিল যে রাইমা নিজের হৃদয়ের শব্দ শুনতে পেয়েছিল। সাম্যের বুকের গরম, তার শ্বাসপ্রশ্বাস—সবকিছু তার মনে গেঁথে গিয়েছিল।
সাম্য কিন্তু আগের মতোই দুষ্টুমি করতে লাগল। একদিন সকালে রাইমা রান্নাঘরে ডিম ভাজছিল। সাম্য ব্যালকনি থেকে চিৎকার করে বলল, “ডিম পুড়ে যাচ্ছে দেখছি!”
রাইমা জানালা খুলে রেগে বলল, “আপনার কী?”
“আমার পেটের কী। খিদে পেয়েছে।” সাম্য হাসল। “একটা ডিম দিয়েন।”
রাইমা জানালা বন্ধ করে দিল। কিন্তু পাঁচ মিনিট পর দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। সাম্য দাঁড়িয়ে। হাতে একটা প্লেট।
“আমার বাসায় ডিম নেই। আপনার ডিমটা ভাজা হলে একটা দিয়েন।”
রাইমা প্লেটে একটা ডিম দিল। সাম্য খেয়ে বলল, “নুন কম। পরেরবার একটু বেশি দিয়েন।”
রাইমা দরজা বন্ধ করে দিল। কিন্তু হাসল। নিজেও বুঝতে পারল না কেন হাসছে।
সেদিন বিকেলে রাইমা পড়তে বসেছিল। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। ঘর অন্ধকার। সে মোমবাতি খুঁজছিল। দরজার নিচে একটা টর্চ পড়ে থাকতে দেখল। সঙ্গে নোট—“অন্ধকারে ভয় পাবেন না।”
রাইমা টর্চটা জ্বালাল। তার হাত কাঁপছিল। এবার আর সন্দেহ রইল না। সাম্যই। সবকিছু সাম্যই করছে। কিন্তু কেন লুকায়?
পরের দিন সে সাম্যকে জিজ্ঞেস করার সিদ্ধান্ত নিল। ছাদে গেল। সাম্যও এল। দুজনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
“আপনি কেন এসব করেন?” রাইমা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।
সাম্য ঘুরে তাকাল। “কী?”
“আমার বিপদে আপনি সাহায্য করেন। কিন্তু সামনে এসে বলেন না। কেন?”
সাম্য চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “আপনি আমাকে পছন্দ করেন না। আমি যদি সামনে এসে সাহায্য করি, আপনি আরও বিরক্ত হবেন। তাই লুকাই।”
রাইমা তার চোখের দিকে তাকাল। সাম্যের চোখে কোনো হাসি নেই এবার। গভীর কিছু আছে।
“আপনি আমাকে বিরক্ত করেন ইচ্ছে করে।”
“হ্যাঁ।” সাম্য এক পা এগিয়ে এল। “কারণ আপনার রগ চড়লে আপনার চোখটা সুন্দর লাগে।”
রাইমার শ্বাস বন্ধ হয়ে এল। সাম্য আরও কাছে এল। তাদের মধ্যে ব্যবধান কমে এল। সাম্যের হাত উঠে রাইমার গাল ছুঁয়ে দিল। হালকা। গরম।
“রাইমা…” সাম্যের গলা নামল। “আমি আপনাকে দেখলে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। তাই দুষ্টুমি করি। না হলে আমি আপনাকে…”
সে থেমে গেল। রাইমা তার হাত সরিয়ে নিল না। সাম্যের আঙুল তার গালে ঘষে যাচ্ছিল। তার শরীর জ্বলে উঠেছিল। পা দুটো দুর্বল হয়ে যাচ্ছিল।
সাম্য হঠাৎ সরে গেল। “যাই। মা ডাকছে।”
সে চলে গেল। রাইমা ছাদে একা দাঁড়িয়ে রইল। তার গালে সাম্যের হাতের উষ্ণতা এখনও ছিল। সে জানত, এখন আর পিছু হটার উপায় নেই।
পরের কয়েকদিন দুজনের মধ্যে এক অদ্ভুত টান তৈরি হল। সাম্য আগের মতো দুষ্টুমি করে, কিন্তু এখন তার চোখে অন্য কিছু থাকে। রাইমা রেগে যায়, কিন্তু রেগে যাওয়ার পর তার মন খারাপ হয়। একদিন সাম্য তার জন্য ফল নিয়ে এল। “খেয়ে নেন। ভিটামিন লাগবে।” রাইমা নিল। সাম্যের আঙুল তার আঙুল ছুঁয়ে গেল। দুজনের চোখ মিলল। কেউ চোখ সরাল না কয়েক সেকেন্ড।
আরেকদিন রাতে বৃষ্টির কোনো সম্ভাবনা ছিল না। আকাশ পরিষ্কার। রাইমা ছাদে গিয়েছিল হাওয়া খেতে। সাম্যও এল। দুজনে পাশাপাশি বসল। কথা হল না অনেকক্ষণ।
“আপনার কি কখনো মনে হয়,” সাম্য হঠাৎ বলল, “যে কিছু মানুষকে দেখলেই মনটা অস্থির হয়ে যায়?”
রাইমা চুপ করে রইল।
“আমার হয়।” সাম্য তার দিকে তাকাল। “প্রতিদিন। প্রতি রাতে।”
রাইমা তার দিকে তাকাল। সাম্যের চোখে আগুন। সে আগুন রাইমার শরীরেও ছড়িয়ে পড়ল। সাম্য হাত বাড়িয়ে রাইমার হাত ধরল। আঙুলগুলো জড়িয়ে গেল। গরম। শক্ত। রাইমার হৃদয় দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছিল।
সাম্য ঝুঁকে এল। তাদের নিশ্বাস মিশে গেল। রাইমা চোখ বন্ধ করে দিল। সাম্যের ঠোঁট তার ঠোঁটের কাছে এল। কিন্তু ছুঁল না। শুধু কাছে রইল।
“বলুন যদি থামাতে চাই।” সাম্যের গলা কেঁপে উঠল।
রাইমা কিছু বলল না। সাম্যের ঠোঁট তখন তার ঠোঁটে লেগে গেল। নরম। গরম। ক্ষুধার্ত। রাইমার শরীর কেঁপে উঠল। সাম্যের হাত তার কোমরে গিয়ে জড়াল। টানল কাছে। দুজনের শরীর লেগে গেল। চুমু গভীর হয়ে উঠল। রাইমার হাত সাম্যের চুলে গিয়ে উঠল। সাম্যের জিভ তার ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে ঢুকে এল। রাইমা গোঙাল। শব্দটা তার নিজের কানেও অদ্ভুত লাগল।
কিছুক্ষণ পর সাম্য সরে গেল। দুজনের নিশ্বাস দ্রুত। সাম্যের কপালে ঘাম। রাইমার গাল লাল।
“আমি থামতে পারছি না।” সাম্য বলল। “আপনি যদি চান আমি দূরে থাকি, বলুন। এখনই।”
রাইমা মাথা নাড়ল। “থাকবেন না।”
সাম্য আবার তাকে টেনে নিল। এবার চুমু আরও গভীর। আরও গরম। সাম্যের হাত তার পিঠ বেয়ে নামল। রাইমার শরীর আগুন হয়ে উঠল। সে সাম্যের বুকে মুখ রেখে শ্বাস নিল। সাম্যের হৃদয়ের শব্দ তার কানে বাজছিল।
সেদিন রাতে তারা অনেকক্ষণ ছাদে বসে রইল। হাত ধরাধরি করে। কথা কম। শুধু একে অপরের কাছে থাকা। যখন রাইমা নিচে নামল, তার পা কাঁপছিল। ঘরে ঢুকে সে আয়নার সামনে দাঁড়াল। তার ঠোঁট ফোলা। চোখ অন্য রকম। সে নিজেকে চিনতে পারছিল না।
পরের দিন সাম্য আর দুষ্টুমি করল না। বরং শান্ত। কিন্তু তার চোখ রাইমাকে অনুসরণ করছিল। রাইমা যখন রান্না করে, সাম্য এসে দাঁড়ায়। কথা বলে না। শুধু দেখে। রাইমার শরীর সেই দৃষ্টিতে জ্বলে ওঠে।
একদিন দুপুরে রাইমার বাসায় কেউ ছিল না। বাবা-মা বাইরে। রাইমা পড়ছিল। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। সাম্য।
“কী?”
“জল চাই।” সাম্য হাসল। “আমাদের ফিল্টার নষ্ট।”
রাইমা তাকে ভিতরে আসতে দিল। সাম্য জল খেল। কিন্তু গেল না। দুজনে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে রইল। ব্যবধান কম। সাম্য হঠাৎ এগিয়ে এল। রাইমা পিছনে সরে দেয়ালে পিঠ ঠেকল। সাম্য তার দুই পাশ দিয়ে হাত রেখে তাকে আটকে ফেলল।
“আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি।” সাম্যের গলা নামল। “আপনাকে দেখলে আমার শরীর অস্থির হয়ে যায়।”
রাইমা তার চোখের দিকে তাকাল। “তাহলে কেন লুকাতেন?”
“কারণ আমি ভয় পাই। যদি আপনি ফিরিয়ে দেন…”
রাইমা হাত বাড়িয়ে সাম্যের গলায় হাত রাখল। টানল কাছে। চুমু দিল। এবার সে নিজেই শুরু করল। সাম্য গোঙাল। হাত দিয়ে তাকে জোরে জড়িয়ে ধরল। চুমু গভীর থেকে গভীরতর হল। সাম্যের হাত তার কোমরের নিচে নামল। রাইমার শ্বাস বন্ধ হয়ে এল। সে সাম্যের শার্টের ভিতর হাত ঢোকাল। গরম ত্বক। শক্ত পেশি। সাম্য তার ঠোঁট ছেড়ে গলায় চুমু দিতে লাগল। রাইমা মাথা পেছনে ফেলল। গোঙানি বেরিয়ে এল।
কিছুক্ষণ পর সাম্য থামল। কপালে কপাল রেখে দাঁড়াল। “এভাবে চলবে না। আমি নিয়ন্ত্রণ হারাব।”
রাইমা তার চোখের দিকে তাকাল। “তাহলে হারান।”
সাম্য চোখ বন্ধ করে নিল। “না। আপনাকে সম্মান করতে চাই। প্রথমে সবকিছু পরিষ্কার করতে হবে।”
সে সরে গেল। রাইমা দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার শরীর কাঁপছিল। আগুন নিভছিল না।
সেদিন রাতে সাম্য তার দরজার নিচে একটা চিঠি রেখে গেল।
“রাইমা, আমি আপনাকে প্রথম দিন থেকেই লক্ষ্য করেছি। আপনার চোখ, আপনার হাসি, আপনার রগ চড়ানো—সবকিছু। আমি দুষ্টুমি করি কারণ আমি কাছে থাকতে চাই। কিন্তু সাহায্যগুলো লুকাই কারণ আমি চাই না আপনি দয়া করে আমাকে পছন্দ করেন। আমি চাই আপনি আমাকে চাইবেন। আজ আপনি চুমু দিয়েছেন। আমি আর পিছু হটতে পারব না। যদি আপনিও না পারেন, তাহলে আমাকে জানান।”
রাইমা চিঠিটা বারবার পড়ল। তার চোখ ভিজে গেল। সে জানত, এখন আর ফিরে যাওয়ার উপায় নেই। সাম্য তার রক্তে মিশে গেছে।
পরের সকালে রাইমা সাম্যের বাসার দরজায় কড়া নাড়ল। সাম্য দরজা খুলল। চোখে ঘুম। চুল এলোমেলো। শার্ট খোলা। রাইমার গলা শুকিয়ে গেল।
“চিঠি পেয়েছি।” রাইমা বলল। “আমিও পিছু হটতে পারছি না।”
সাম্য তাকে ভিতরে টেনে নিল। দরজা বন্ধ করে তাকে দেয়ালে ঠেস দিয়ে চুমু দিল। এবার কোনো সংযম নেই। চুমু ক্ষুধার্ত। গভীর। সাম্যের হাত তার শরীর ঘষে যাচ্ছে। রাইমা তার পিঠে নখ বসাচ্ছে। দুজনের নিশ্বাস দ্রুত। ঘরের বাতাস গরম হয়ে উঠেছে।
সাম্য তার ঠোঁট ছেড়ে গলায়, কানে, চোয়ালে চুমু দিতে লাগল। “আমি আপনাকে এতদিন দূরে রেখেছি। আর পারছি না।”
রাইমা তার চুল ধরে টানল। “তাহলে আর দূরে রাখবেন না।”
সাম্য তাকে তুলে নিয়ে সোফায় বসাল। নিজে হাঁটু গেড়ে বসল। রাইমার হাত দুটো ধরে চুমু দিল। “আমি আপনাকে চাই। পুরোপুরি।”
রাইমা মাথা নাড়ল। সাম্য উঠে এসে তার ওপর ঝুঁকে পড়ল। চুমু আবার শুরু হল। হাত চলতে লাগল। কাপড়ের বাধা অসহ্য লাগছিল। কিন্তু সাম্য থামল। কপালে কপাল রেখে বলল, “আজ না। আজ শুধু আপনাকে কাছে পাব। বাকিটা সময় নেব। আপনাকে হারাতে চাই না।”
রাইমা তার বুকে মুখ রেখে শুয়ে রইল। সাম্যের হৃদয়ের শব্দ শুনতে শুনতে তার চোখ বুজে এল। সাম্য তার চুলে হাত বুলোচ্ছে। নরম। ভালোবাসায় ভরা।
দুপুরে তারা ছাদে গেল। পাশাপাশি বসল। সাম্য তার হাত ধরে রেখেছে।
“কেন লুকাতেন সব?” রাইমা জিজ্ঞেস করল।
সাম্য দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “আমার বাবা মারা গেছেন ছোটবেলায়। মা একা মানুষ করেছেন। আমি সবসময় শক্ত মানুষ হওয়ার চেষ্টা করেছি। দুর্বলতা দেখাতে চাইনি। আপনাকে সাহায্য করতে গিয়ে যদি আপনি আমাকে দুর্বল ভাবেন, তা আমি চাইনি। আর… আমি ভয় পেয়েছিলাম। যদি আপনি আমাকে ফিরিয়ে দেন, তাহলে আমি টিকতে পারব না।”
রাইমা তার হাত চেপে ধরল। “আমি ফিরাইনি।”
সাম্য তার দিকে তাকাল। চোখে জল। “আমি আপনাকে ভালোবাসি। প্রথম দিন থেকে।”
রাইমা তার গালে হাত রাখল। “আমিও। যদিও আমি নিজেকে বোঝাতে চেয়েছি যে আমি আপনাকে সহ্য করতে পারি না। কিন্তু পারিনি।”
তারা আবার চুমু দিল। এবার নরম। গভীর। ভালোবাসায় ভরা। সাম্যের হাত তার পিঠে ঘুরছে। রাইমার শরীর আবার জ্বলে উঠছে। কিন্তু এবার তাড়াহুড়ো নেই। সময় আছে।
পরের কয়েক সপ্তাহ দুজনের সম্পর্ক গভীর থেকে গভীরতর হল। সাম্য আর দুষ্টুমি করে না। বরং প্রতিদিন সকালে চা নিয়ে আসে। বিকেলে একসঙ্গে হাঁটে। রাতে ছাদে বসে কথা বলে। চুমু হয়। অনেকক্ষণ। গরম। ক্ষুধার্ত। সাম্যের হাত রাইমার শরীরের প্রতিটা অংশ জানতে চায়। রাইমাও তার শরীর ছুঁতে চায়। কিন্তু তারা নিজেদের সংযত রাখে। সময় নেয়।
একদিন রাতে বৃষ্টির কোনো চিহ্ন ছিল না। আকাশ পরিষ্কার। তারা ছাদে শুয়েছিল। সাম্যের বুকে রাইমার মাথা। সাম্য তার পিঠে হাত বুলোচ্ছে।
“আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই।” সাম্য হঠাৎ বলল।
রাইমা মাথা তুলে তাকাল। “এত তাড়াতাড়ি?”
“আমি আর অপেক্ষা করতে পারছি না। আপনাকে আমার করতে চাই। পুরোপুরি।”
রাইমা হাসল। “আমার বাবাকে জিজ্ঞেস করতে হবে।”
সাম্য হাসল। “জিজ্ঞেস করব। কিন্তু আগে আপনার অনুমতি চাই।”
রাইমা তার ঠোঁটে চুমু দিল। “অনুমতি দিলাম।”
সেই রাতে চুমু আরও গভীর হল। সাম্যের হাত তার জামায় ঢুকে গেল। গরম ত্বক। রাইমা গোঙাল। সাম্য তার কানে ফিসফিস করে বলল, “আমি আপনাকে পাগল করে দিতে চাই। প্রতি রাতে।”
রাইমার শরীর কেঁপে উঠল। সে সাম্যের হাত ধরে আরও কাছে টানল। দুজনের শরীর জড়িয়ে গেল। কাপড়ের বাধা অসহ্য। কিন্তু তারা থামল না। শুধু একে অপরকে ছুঁয়ে, চুমু দিয়ে, ভালোবাসার কথা বলে রাত কাটাল।
কিছুদিন পর সাম্য রাইমার বাবার সঙ্গে কথা বলল। বাবা প্রথমে অবাক হলেন। তারপর সম্মতি দিলেন। মা কেঁদে ফেললেন খুশিতে।
বিয়ের আগে শেষ রাতে তারা ছাদে মিলিত হল। চাঁদ উজ্জ্বল। সাম্য রাইমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “আজকের পর আর কোনো লুকোচুরি নেই। আমি আপনার। আপনি আমার।”
রাইমা তার বুকে মুখ রেখে বলল, “আমি তো আগে থেকেই আপনার ছিলাম। শুধু জানতাম না।”
তারা চুমু দিল। গভীর। গরম। চিরকালের জন্য। সাম্যের হাত তার শরীর ঘষে যাচ্ছে। রাইমা তার পিঠে নখ বসাচ্ছে। দুজনের নিশ্বাস এক হয়ে যাচ্ছে। আগুন জ্বলছে। কিন্তু এবার সেই আগুন আর নিভবে না।
বিয়ের পর তারা একসঙ্গে নতুন জীবন শুরু করল। সাম্য আর কখনো তার ভালো কাজ লুকায় না। রাইমা আর কখনো তাকে বিরক্তিকর ভাবে না। রাতে যখন তারা একে অপরের কাছে শোয়, সাম্য তার কানে বলে, “আমি আপনাকে প্রথম দিন থেকে চেয়েছি। এখন পেয়েছি। আর ছাড়ব না।”
রাইমা তার বুকে মুখ রেখে হাসে। “ছাড়ার চেষ্টাও করবেন না।”
তাদের ভালোবাসা গভীর। গরম। অন্তহীন। আর সেই প্রতিবেশী দুষ্টুমি এখন শুধু স্মৃতি। এক অদ্ভুত সুন্দর স্মৃতি, যা তাদের এক করেছে চিরকালের জন্য।
....