প্রথম দেখায় সে ছিল আগুন।
দ্বিতীয় দেখায় সে ছিল বিষ।
তৃতীয় দেখায় আমি নিজেই বিষ হয়ে গেলাম।
আমার নাম অর্পিতা। বয়স ২৮। কলকাতার একটা ছোট ফ্ল্যাটে একা থাকি। চাকরি করি একটা বিজ্ঞাপন এজেন্সিতে। জীবনটা ছিল সাদামাটা—সকালে অফিস, সন্ধ্যায় বাসা, রাতে নেটফ্লিক্স। কোনো নাটক নেই, কোনো ঝড় নেই। যতক্ষণ না রিয়ান এল।
রিয়ান। নামটা শুনলেই বুকের ভিতরটা কেঁপে ওঠে এখনও। সে ছিল ৩২। লম্বা, গাঢ় চোখ, হাসিটা এমন যেন জেনে বুঝে বিষ মাখা। প্রথম দেখা হয়েছিল আমাদের অফিসের একটা ক্লায়েন্ট মিটিংয়ে। সে এসেছিল ক্লায়েন্টের পক্ষ থেকে। কালো শার্ট, হাতের ঘড়ি, কণ্ঠস্বরটা এমন নরম যেন শরীরের ভিতরে ঢুকে যায়।
মিটিং শেষে সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি খুব চুপচাপ থাকো। কিন্তু চোখে আগুন আছে।”
আমি হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু সেই রাত থেকে তার কণ্ঠস্বর আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছিল।
পরের সপ্তাহে সে আবার এল। এবার সরাসরি আমার ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “কফি খাবে?”
আমি না বলতে পারিনি।
কফি হাউসে বসে সে আমার হাতের পিঠে আঙুল বুলিয়েছিল। হালকা স্পর্শ। কিন্তু সেই স্পর্শ যেন আমার ত্বকের নিচে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। আমি তার চোখের দিকে তাকিয়েছিলাম। সে হাসছিল। সেই হাসিটা ছিল বিষের মতো সুন্দর।
সেই রাত থেকে শুরু হলো আমাদের বিষাক্ত প্রেম।
প্রথম চুমুটা হয়েছিল তার গাড়িতে। বৃষ্টি পড়ছিল। জানালা বন্ধ। সে আমার চুল মুঠো করে টেনে নিল, ঠোঁট চাপল এমন জোরে যেন রক্ত বেরিয়ে আসবে। আমি হাঁপাতে হাঁপাতে তার শার্টের বোতাম খুলছিলাম। তার বুকের গরম চামড়া আমার হাতের তলায় কাঁপছিল। সে আমার স্কার্ট উপরে তুলে আমার উরুর ভিতরের দিকে হাত বাড়িয়েছিল। আঙুলগুলো ধীরে ধীরে উপরে উঠছিল। আমি তার কাঁধে দাঁত বসিয়েছিলাম।
“তুমি আমার,” সে ফিসফিস করে বলেছিল।
“আজ থেকে তুমি আমার।”
আমি কিছু বলিনি। শুধু তার আঙুলগুলোকে আরও ভিতরে ঠেলে দিয়েছিলাম।
সেই রাত থেকে আমরা একে অপরকে ছাড়িনি।
দিনে অফিসে চোখের ইশারা। রাতে তার ফ্ল্যাটে বা আমার ফ্ল্যাটে শরীরের যুদ্ধ। সে আমাকে বিছানায় ফেলে আমার দুই হাত মাথার উপরে চেপে ধরত। আমি তার নীচে কাঁপতাম। সে আমার গলায় চুমু খেত, কামড় দিত, এমন জায়গায় যেন কেউ দেখলে লজ্জা পায়। আমি তার পিঠে নখ বসাতাম। রক্তের দাগ থাকত সকাল পর্যন্ত।
কিন্তু বিষটা কোথায় লুকিয়ে ছিল, সেটা আস্তে আস্তে বুঝতে পারলাম।
রিয়ান আমাকে ভালোবাসত না। সে আমাকে অধিকার করত।
আমি যদি কোনো পুরুষ সহকর্মীর সঙ্গে হাসি, সে রাতে এসে আমার গলা চেপে ধরত।
“কে ও?”
“কেউ না—”
“মিথ্যে বোলো না।”
তার আঙুলগুলো আমার গলায় আরও শক্ত হতো। আমি হাঁপাচ্ছি। চোখে পানি। সে হঠাৎ ছেড়ে দিয়ে আমার ঠোঁটে চুমু খেত। তারপর আমাকে বিছানায় তুলে নিত। সেই রাতের সেক্স হতো আরও বেশি হিংস্র। সে আমাকে পেছন থেকে ধরে টানত, আমার চুল মুঠো করে মাথা পেছনে টেনে নিত। আমি চিৎকার করতাম। সে আরও জোরে ধাক্কা দিত।
সকালে সে আমার কপালে চুমু খেয়ে বলত, “সরি। আমি পাগল হয়ে যাই যখন তোমাকে অন্য কারো সঙ্গে দেখি।”
আমি ক্ষমা করে দিতাম। কারণ তার চোখে সেই আগুন থাকত যেটা আমাকে পুড়িয়ে মারত।
একদিন আমি তার ফোন দেখে ফেললাম। একটা মেয়ের নাম—সায়নী। অনেকগুলো মেসেজ। ছবি। সেখানে রিয়ান অন্য এক মেয়ের সঙ্গে বিছানায়।
আমি কাঁপতে কাঁপতে তাকে ফোন করলাম।
“কে এই সায়নী?”
সে হাসল।
“পুরনো বান্ধবী। কিছু না।”
“ছবি?”
“পুরনো।”
আমি বিশ্বাস করিনি। সেই রাতে সে এসে আমার দরজায় দাঁড়াল। চোখে লাল। সে আমাকে জোর করে ভিতরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করল। আমাকে দেয়ালে ঠেসে ধরল।
“তুমি আমার ফোন দেখেছ?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে শোনো। আমি যাকে চাইব, তাকে নেব। কিন্তু তুমি শুধু আমার। বুঝলে?”
আমি তার মুখে থাপ্পড় মারলাম। সে আমার হাত ধরে পেছনে মোচড়াল। তারপর আমার ঠোঁটে কামড় দিয়ে রক্ত বের করল। আমি কেঁদে উঠলাম। সে আমার অশ্রু চেটে খেল।
“কাঁদো। কাঁদলে তোমার আরও সুন্দর লাগে।”
সে আমাকে বিছানায় ফেলল। জামা ছিঁড়ে ফেলল। আমি তার বুকের উপর ঘুষি মারছিলাম। সে আমার দুই হাত একসঙ্গে ধরে মাথার উপরে চেপে রাখল। তারপর আমার পা দুটো আলাদা করে তার শরীর আমার ভিতরে ঢুকিয়ে দিল এক ঝটকায়। আমি চিৎকার করলাম। সে থামল না। প্রতিটা ধাক্কায় আমার নাম ধরে ডাকছিল।
“তুমি আমার… শুধু আমার… কেউ তোমাকে ছুঁতে পারবে না…”
আমি তার নীচে কাঁপছিলাম। শরীর দিয়ে ঘৃণা আর আনন্দ একসঙ্গে বেরোচ্ছিল। সে শেষ পর্যন্ত আমার গলায় কামড় দিয়ে মুক্ত হলো। আমি তার বুকে মুখ গুঁজে কেঁদেছিলাম।
সকালে সে চলে গেল। টেবিলে একটা চিরকুট—
“তুমি আমার বিষ। আমি তোমার মৃত্যু। চলে যেও না।”
আমি চলে যাইনি।
পরের মাসগুলো ছিল আরও বিষাক্ত।
সে আমাকে পাবলিক প্লেসে স্পর্শ করত এমনভাবে যেন কেউ দেখে ফেলবে। রেস্তোরাঁর টেবিলের নিচে তার হাত আমার স্কার্টের ভিতরে ঢুকে যেত। আমি কাঁপতাম। সে হাসত।
একদিন অফিসের পার্কিং লটে সে আমাকে গাড়ির বনেটে চাপা দিয়ে আমার পেন্টস নামিয়ে দিয়েছিল। আমি ভয়ে কাঁপছিলাম। কেউ দেখে ফেলবে। সে আমার কানে ফিসফিস করল, “চিৎকার করো না। নইলে সবাই শুনবে তুমি কতটা ভিজে আছো।”
আমি দাঁত চেপে চুপ করেছিলাম। সে পেছন থেকে ঢুকে গেল। গাড়ির বনেট ঠান্ডা। তার শরীর গরম। আমি তার হাতে মুখ চেপে ধরেছিলাম যেন আওয়াজ না বেরোয়।
রাতে সে আমাকে গোসলের ঘরে তুলে নিত। গরম জলের নীচে সে আমার চুল ধরে আমার মুখ তার উরুতে চেপে ধরত। আমি হাঁপাতে হাঁপাতে তাকে নিচেমুখ করে সন্তুষ্ট করতাম। সে আমার চুল মুঠো করে আরও গভীরে ঠেলত। আমি কাঁদতাম। সে বলত, “ভালো করে। তুমি তো আমার মেয়ে।”
আমি ঘৃণা করতাম। আর ভালোবাসতাম। একসঙ্গে।
একদিন সায়নী নিজেই আমার সামনে এল। অফিসের সামনে। সুন্দরী। লম্বা চুল। সে হেসে বলল, “রিয়ান তোমাকে নিয়ে মজা করছে। তুমি তার অনেকগুলোর একটা মাত্র।”
আমি তার মুখে থাপ্পড় মারলাম। সে হাসল।
“ওকে জিজ্ঞেস করো। ও তোমাকে কখনো ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ বলেনি। বলেছে শুধু ‘তুমি আমার’।”
সেই রাতে আমি রিয়ানের ফ্ল্যাটে গেলাম। দরজা খোলা পেলাম। সে বিছানায় শুয়ে ছিল। খালি গা। আমি তার উপর উঠে বসলাম। তার গলায় দুই হাত চেপে ধরলাম।
“তুমি আমাকে ভালোবাসো?”
সে আমার চোখের দিকে তাকাল। হাসি মুখে।
“না।”
আমি আরও শক্ত করে চেপে ধরলাম।
“তাহলে কেন?”
সে আমার হাত সরিয়ে আমার কোমর ধরে নিল। আমাকে নীচে নামিয়ে তার উপর তুলে নিল।
“কারণ তুমি আমার বিষ। আর আমি বিষ ছাড়া বাঁচতে পারি না।”
সে আমাকে চুমু খেল। আমি কেঁদে উঠলাম। সে আমার অশ্রু মুছে দিয়ে আমার শরীরের প্রতিটা অংশ চুম্বন করতে লাগল। স্তন, পেট, উরু, তারপর আরও নিচে। তার জিভ আমার ভিতরে ঢুকে গেল। আমি তার চুলে হাত বুলিয়ে কাঁপতে লাগলাম। সে আমাকে এমনভাবে চাটছিল যেন আমার আত্মা বের করে আনবে। আমি তার নাম ডেকে চিৎকার করলাম। সে থামল না। যতক্ষণ না আমি তার মুখের উপর শরীর ছেড়ে দিলাম।
তারপর সে উঠে এসে আমার ভিতরে ঢুকে গেল। ধীরে ধীরে। চোখের দিকে তাকিয়ে।
“দেখো। আমি তোমাকে মারছি না। আমি তোমাকে খাচ্ছি।”
প্রতিটা ধাক্কায় আমি তার বুকে নখ বসাচ্ছিলাম। সে আমার গলায় কামড় দিচ্ছিল। আমরা দুজনেই রক্তাক্ত। দুজনেই পাগল।
সকালে আমি তার বুকে মাথা রেখে শুয়েছিলাম। সে আমার চুলে হাত বুলোচ্ছিল।
“তুমি কি কখনো ছাড়বে আমাকে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
সে হাসল।
“না। আর তুমিও পারবে না।”
সত্যিই পারিনি।
মাস গেল। বছর গেল।
আমাদের সম্পর্ক আরও বিষাক্ত হলো। সে আমাকে অন্য মেয়েদের সঙ্গে দেখাত। ইচ্ছে করে। তারপর রাতে এসে আমাকে শাস্তি দিত। আমি তাকে অন্য পুরুষের সঙ্গে দেখতাম। তারপর গিয়ে তার গাড়িতে সেক্স করতাম রাস্তার ধারে। আমরা একে অপরকে ভাঙতাম। আবার জোড়া লাগাতাম।
একদিন আমি গর্ভবতী হলাম।
সে জানতে পেরে আমার পেটে হাত রাখল। চোখে জল। প্রথমবার।
“এটা আমাদের,” সে বলল।
“এটা আমাদের বিষ।”
আমি কেঁদেছিলাম। সে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল। সেই রাতে সে আমাকে খুব আলতো করে ভালোবেসেছিল। কোনো কামড় নেই। কোনো ধাক্কা নেই। শুধু গভীর চুমু আর ধীর গতির প্রেম। আমি তার বুকে শুয়ে শুনেছিলাম তার হৃদয়ের শব্দ।
কিন্তু বিষ তো বিষই।
সাত মাস পর বাচ্চাটা হারালাম।
হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আমি তার হাত চেপে ধরেছিলাম। সে চুপচাপ বসেছিল। চোখে কিছু নেই।
রাতে সে এসে আমার পাশে শুয়ে আমার পেটে হাত রাখল।
“আমরা আবার চেষ্টা করব,” সে বলল।
আমি মাথা নাড়লাম।
কিন্তু ভিতরে কিছু একটা মরে গিয়েছিল।
তারপর থেকে আমাদের সেক্স আরও বেশি হিংস্র হয়ে গেল। যেন আমরা একে অপরকে শাস্তি দিচ্ছি সেই সন্তানের জন্য। সে আমাকে বেঁধে রাখত। আমি তাকে আঁচড় কাটতাম। আমরা একে অপরের শরীরে দাগ ফেলতাম যেন প্রমাণ রাখি—আমরা এখনও একে অপরের।
একদিন আমি তাকে ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।
সামান্য জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে গেলাম। ট্যাক্সিতে উঠেছি। ফোন বাজছে। আমি ধরলাম না। মেসেজ আসছে—
“ফিরে আয়। নইলে আমি তোকে খুঁজে বের করে মেরে ফেলব। তারপর নিজেও মরব।”
আমি কাঁপছিলাম। ট্যাক্সিওয়ালা পেছনে তাকাল। আমি বললাম, “ফিরে চলো।”
দরজা খুলেই সে দাঁড়িয়েছিল। চোখে লাল। সে আমাকে টেনে নিয়ে ভিতরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করল। আমাকে দেয়ালে ঠেসে ধরল।
“তুমি যেতে পারবে না।”
“কেন?”
“কারণ তুমি আমার শেষ বিষ। তুমি চলে গেলে আমি বাঁচব না।”
সে আমার ঠোঁটে চুমু খেল। আমি তার বুকে ঘুষি মারলাম। সে আমার হাত ধরে পেছনে মোচড়াল। তারপর আমাকে কাঁধে তুলে বিছানায় ফেলল। জামা ছিঁড়ে ফেলল। আমি তার উপর উল্টে উঠে তার গলায় হাত দিলাম। সে হাসল।
“করো। মেরে ফেলো আমাকে।”
আমি পারলাম না।
বরং তার উপর বসে তার শরীর আমার ভিতরে নিয়ে নিলাম। আমি তার বুকে দুই হাত রেখে উপরে-নিচে নড়তে লাগলাম। সে আমার কোমর ধরে আরও জোরে টানছিল। আমরা দুজনেই চিৎকার করছিলাম। ঘৃণা আর ভালোবাসা একসঙ্গে।
শেষে আমি তার বুকে লুটিয়ে পড়লাম। সে আমার চুলে হাত বুলোচ্ছিল।
“দেখো। তুমি পারো না আমাকে ছাড়তে। আর আমিও পারি না।”
সত্যি।
এখনও আমরা একসঙ্গে আছি।
পাঁচ বছর হয়ে গেল।
আমাদের ফ্ল্যাটে দেয়ালে দাগ। বিছানায় রক্তের দাগ। শরীরে দাগ। মনে দাগ।
সে এখনও আমাকে অন্য মেয়েদের সঙ্গে ঈর্ষা করে। আমি এখনও তাকে অন্য পুরুষের সঙ্গে দেখলে পাগল হয়ে যাই। আমরা একে অপরকে ভাঙি। আবার জোড়া লাগাই। রাতে সে আমার গলায় হাত দিয়ে বলে, “তুমি আমার।” আমি তার পিঠে নখ বসিয়ে বলি, “তুমি আমার বিষ।”
কেউ জানে না আমরা কতটা বিষাক্ত।
কেউ জানে না এই বিষ কতটা মিষ্টি।
কেউ জানে না আমরা একে অপরকে কতটা খেয়ে ফেলেছি। আরও কতটা খাব।
আমি এখনও তার চোখে আগুন দেখি।
সে এখনও আমার শরীরে বিষ মাখে।
আর আমরা দুজনেই জানি—
এই প্রেম সুন্দর নয়।
এই প্রেম বিষ।
কিন্তু এই বিষ ছাড়া আমাদের শ্বাস নেই।
শেষ চুমুটা এখনও বাকি।
শেষ কামড়টা এখনও বাকি।
শেষ রাতটা এখনও বাকি।
আর যতদিন আমরা বাঁচব,
ততদিন এই বিষ আমাদের শরীরে গড়াবে।
গরম।
হিংস্র।
আর পাগল করে দেওয়া মিষ্টি।
গল্পটা এখানেই শেষ নয়।
কারণ বিষাক্ত প্রেম কখনো শেষ হয় না।
শুধু আরও গভীরে ঢোকে।
....